মধ্যম আয়ের সুফল নিশ্চিত করতে হবে
jugantor
মধ্যম আয়ের সুফল নিশ্চিত করতে হবে

  সম্পাদকীয়  

২১ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের একাংশ মানুষের কাছে মধ্যম আয়ের সুফল রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অধিবাসী হিসাবে আমাদের পথচলার বয়স হয়েছে পুরো ৫০ বছর। তাই ২০২১ সাল আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। কারণ, বছরটি এখন বিজয় ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হিসাবে আমরা সম্মান, শ্রদ্ধা আর গর্বের সঙ্গে পালন করছি। আমাদের সবারই জানা, এ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ফসল। এটি দলমতনির্বিশেষে প্রত্যেকের কাছে অহংকারের বিষয়। শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাচ্ছি তাদের উদ্দেশে, যারা স্বাধীনতাযুদ্ধে জীবন ও রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন-আর গর্বের বিষয় হলো এদেশের মানুষ হিসাবে আমরা ধারণ করে চলেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া শিশুর বয়সও এখন ৫০ বছর। পরিণত বয়সের একজন মানুষ তিনি। হয়তো বা তৃতীয় প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণায় মুখর তার ঘরবাড়ি। এমন একটি ছবি চোখে ভেসে বেড়ালে কার না ভালো লাগে! স্বাধীনতার সমান বয়সি একজন মানুষের বেলায় এ রকমই তো হওয়ার কথা। অর্ধশত বছর বয়সি সেই মানুষ বাংলাদেশের গড় আয়ু থেকে এখন ২২ দশমিক ছয় বছর দূরে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী আমাদের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৬ বছর। ৫০ বছরের মানুষটিও হয়তো বাংলাদেশের গড় আয়ু থেকে আরও বেশিদিন বেঁচে থেকে এ পৃথিবীর আলো-বাতাস উপভোগ করবেন। এর মানে হলো বাংলাদেশের গড় আয়ু বেড়েছে। এটি অবশ্যই আমাদের বড় একটি অর্জন। এর বাইরে আরও কিছু বড় অর্জন আছে আমাদের। তার মধ্যে আছে, ২০২১ সালে অর্থাৎ বিজয় ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর চার বছর আগেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। নিম্ন আয়ের দেশের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে এখন আমরা রীতিমতো মধ্যম আয়ের দেশে অবস্থান করছি। তবে বিশ্বব্যাংক মধ্যম আয়ের দেশ দুভাবে ভাগ করেছে-১. নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, ২. উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। হ্যাঁ, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে অবস্থান করছি। এর পাশাপাশি আরও এক অর্জন-বিশ্বে মানবসম্পদ উন্নয়নেও এসেছে আমাদের সাফল্য। ২০১৯ সালের জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ এখন ১৩৫তম স্থানে দাঁড়ানো। আমাদের মাথাপিছু আয়ের সূচকও ধীরে ধীরে হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী। সর্বশেষ বাজার মূল্যে মাথাপিছু আয়েও এসেছে গতি-বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ হলো ২ হাজার ৬৪ ডলার। অর্জন শুধু এসবের মধ্যেই থেমে নেই, দেশে ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। শীর্ষস্থানীয় ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এ সাফল্যকে নিঃসন্দেহে খাদ্য-নিরাপত্তার মাইলফলক বলা যায়। দেশে এখন ধান উৎপাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৭০ লাখ টনের বেশি। বাংলাদেশের উৎপাদিত ধানের মধ্যে ৫৬ ভাগই আসে বোরো থেকে, আর বাকিটা আসে আউশ আর আমন থেকে। ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে শীর্ষ ধান উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় অবস্থানে। স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। রীতিমতো বিস্ময়কর ব্যাপার। অর্থনীতিবিদদের চোখে বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচক ঊর্ধ্বমুখী।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ, এটি এখন পুরোনো খবর। ভিশন ২০২১-এর উদ্দেশ্যে স্বল্পোন্নত অবস্থায় বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়। লক্ষ্যাভিমুখে পৌঁছানোর জন্য গৃহীত হয় নানা পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ। পর্যায়ক্রমে শুরু হয় তার বাস্তবায়ন কার্যক্রম। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি এসে প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে যায়। এটি আমাদের জন্য সুখবর। এ সাফল্য নিয়ে গর্ব হয়। সত্যিই উন্নতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী রেখে আমরা সামনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি। এ সাফল্য নিয়ে গর্ব হয়, উঁচু গলায় বুক ফুলিয়ে বলতে ইচ্ছা হয়, বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সোজা সামনের দিকে। তবু ভীত হই যখন দেখি, উল্লেখযোগ্য অংশ মানুষের কাছে মধ্যম আয়ের একটি দেশের এ সুফল এখনো রয়ে গেছে অধরা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা। এখন সময় এসেছে সেই আকাঙ্ক্ষা আমরা বাস্তবে কতটা রূপ দিতে পেরেছি তা খুঁটিয়ে দেখার।

কিছুদিন আগে সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (ভি-ডেম) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের প্রথম সারির একটি বাংলা দৈনিকের শেষ পৃষ্ঠায় গুরুত্বসহ সংবাদটি প্রকাশিত হয়। তাতে জানা যায়, আমাদের গণতন্ত্র নিয়ে সুখবর দেওয়ার কিছু নেই। সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি-ডেম ইনস্টিটিউট পাঁচ বছর ধরে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। প্রতিবেদনে উদার গণতন্ত্র সূচকে (লিবারেল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স) ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৪তম। আর স্কোর হলো শূন্য দশমিক ১। নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র সূচকে (ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স) বাংলাদেশের স্থান আরও নিচে নেমে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮তম, আর স্কোর শূন্য দশমিক ২৭। এছাড়া বাংলাদেশ লিবারেল কম্পোনেন্ট ইনডেক্স, ইগলিট্যারিয়ান কম্পোনেন্ট ইনডেক্স, পার্টিসিপেটরি কম্পোনেন্ট ইনডেক্স ও ডেলিবারেটিভ কম্পোনেন্ট ইনডেক্সের অবস্থাও খুশি হওয়ার মতো নয়। এসব সূচকে বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে ১৬১তম, ১৭৬তম, ১৪৩তম ও ১৫৮তম স্থানে দাঁড়িয়ে। ভি-ডেম ইনস্টিটিউট তার এ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, শাসনতন্ত্রের দিক থেকে বাংলাদেশ রয়েছে ‘নির্বাচনভিত্তিক স্বেচ্ছাতন্ত্র’ (ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি) বিভাগে।

ভি-ডেমের বার্ষিক প্রতিবেদনে উদার গণতন্ত্রের সূচকে শীর্ষ তিন দেশ হলো ডেনমার্ক, সুইডেন ও নরওয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় উদার গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে আছে ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, মিয়ানমার (সেনাশাসন জারি হওয়ার আগে), পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। তবে নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র থেকে ভারত নেমে এসেছে ‘নির্বাচনভিত্তিক স্বেচ্ছাতন্ত্র’ বিভাগে।

ভি-ডেমের বার্ষিক প্রতিবেদন নিয়ে সরকারিভাবে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে দলীয় অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বক্তব্য ছাপা হয়েছে বেশ কটি দৈনিক পত্রিকায়। সেখানে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এ অঞ্চলীয় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তার মতে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র যথেষ্ট উদার। মাহবুবউল আলম হয়তো ঠিকই বলেছেন। আমরা জানি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভকারী দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোয় গণতন্ত্র হলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান মাধ্যম। ভি-ডেমের বৈশ্বিক গণতন্ত্রী শাসনব্যবস্থার সূচকগুলো এসব দেশে যে গুরুত্ব পায়, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।

এখন আসি আসল প্রসঙ্গে। করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা পুরো এলোমেলো হয়ে পড়েছে। সরকার নানারকম প্রণোদনার ব্যবস্থা চালু রাখা সত্ত্বেও করোনাকালীন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ আর আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখে। বেসরকারি সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে এ ছবি উঠে এসেছে। আমরা জানি, করোনা মহামারির আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। সন্দেহ নেই, সেই সংখ্যা এখন আরও অনেক বেড়ে গেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) সর্বশেষ জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার ৪২ শতাংশ। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসা মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাদের বড় অংশই বাধ্য হয়ে বয়ে বেড়াচ্ছে দারিদ্র্যের কঠিন জোয়াল। সেই জোয়াল এত ভারী যে তা বইতে গিয়ে রীতিমতো কুঁজো হয়ে পড়ছে তাদের কাঁধ-তবু নিস্তার নেই, ইচ্ছা না-থাকার পরও অসহায় ভঙ্গি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে এসব দরিদ্র মানুষকে। চোখের সামনে আজ তারা যে বাংলাদেশকে দেখছে, সেই দেশ তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। তাই আশাহত হয়ে অসহায় চোখে তাদের দেখতে হচ্ছে ধনী আর দরিদ্রের মধ্যে দিন দিন বেড়ে চলা ব্যবধান, স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের অনতিক্রম্য দূরত্ব। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও পরিষ্কার-১০ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে দেশের ৩৫ শতাংশ সম্পদ। এ পরিসংখ্যানই কি পরিষ্কার করে দেয় না ধনী-গরিব এখন কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে! শুধু নিরুপায় দৃষ্টিতে আমাদের দেখতে হয় এ দেশে ১৮ কোটির মধ্যে এখনো বিশালসংখ্যক মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এর মধ্যে করোনা মহামারির আগে চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ। আরও চিন্তার কারণ কি জানেন? দেশের অর্ধেক মানুষেরই নেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনোরকম সংশ্লিষ্টতা।

এ কঠিন সত্য জানা থাকার পরও দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বিজয় আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী গভীর এক তাৎপর্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। কারণ বিজয় আর স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে ও মনে যত্নে সাজিয়ে পুরো জাতি ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সাড়ে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। শত্রুমুক্ত দেশের সর্বস্তরের মানুষের আশা ছিল স্বাধীন এ দেশে থাকবে সমতার নীতি, আইনের শাসন, লেখাপড়ার অধিকার, খাওয়া-থাকা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তাসহ বৈষম্যহীন একটি সমাজ। থাকবে সংখ্যালঘুদের সামাজিক নিরাপত্তা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। এসব প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, এখন সময় এসেছে তার হিসাব নেওয়ার। স্বাধীনতার সমান বয়সি একজন মানুষের মনে এ ধরনের অনেক প্রশ্ন একে একে জড়ো হতে থাকে। তার মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, বাংলাদেশের বর্তমান যে চেহারা, তার জন্যই কি লাখ লাখ মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল? কেন শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি? কেন সমাজে এত শ্রেণিবিভেদ? কেন সুশাসনের বড় অভাব?

আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশ। এ সাফল্য নিয়ে গর্ব হয় ঠিকই, তবু ভীত হই যখন দেখি দেশের একাংশ মানুষের কাছে মধ্যম আয়ের সুফল রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর জন্য আমরা কাকে দুষব? কী কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, তা খুঁজে বের করার সময় কি এখনো হয়নি? আমরা জানি, আমাদের এ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ হলো মুক্তিযুদ্ধের ফসল। অথচ কী হতভাগা আমরা! আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে আজও ঢেলে সাজাতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি বারবার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাকস্বাধীনতাও আইনের শাসন। কিন্তু আমরা উদার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অপরিহার্য সূচকগুলোকে নিষ্ক্রিয় রেখে আমলাতন্ত্রকে মহিরুহে রূপ দিয়ে চলেছি, দলতন্ত্রকে করে তুলেছি অপ্রতিরোধ্য। বিজয় ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে পৌঁছে কে দেবেন এর উত্তর? বর্তমান প্রজন্ম এ প্রশ্নে কাউকে ছাড় দেবেন, ভাবার কারণ নেই। আসলেই এ দায় এড়ানোর কোনো উপায় নেই।

আতাহার খান : মুক্তিযোদ্ধা (৮ নম্বর সেক্টর), সাংবাদিক, কবি

মধ্যম আয়ের সুফল নিশ্চিত করতে হবে

 সম্পাদকীয় 
২১ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের একাংশ মানুষের কাছে মধ্যম আয়ের সুফল রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
দেশের একাংশ মানুষের কাছে মধ্যম আয়ের সুফল রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অধিবাসী হিসাবে আমাদের পথচলার বয়স হয়েছে পুরো ৫০ বছর। তাই ২০২১ সাল আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। কারণ, বছরটি এখন বিজয় ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হিসাবে আমরা সম্মান, শ্রদ্ধা আর গর্বের সঙ্গে পালন করছি। আমাদের সবারই জানা, এ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ফসল। এটি দলমতনির্বিশেষে প্রত্যেকের কাছে অহংকারের বিষয়। শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাচ্ছি তাদের উদ্দেশে, যারা স্বাধীনতাযুদ্ধে জীবন ও রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন-আর গর্বের বিষয় হলো এদেশের মানুষ হিসাবে আমরা ধারণ করে চলেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া শিশুর বয়সও এখন ৫০ বছর। পরিণত বয়সের একজন মানুষ তিনি। হয়তো বা তৃতীয় প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণায় মুখর তার ঘরবাড়ি। এমন একটি ছবি চোখে ভেসে বেড়ালে কার না ভালো লাগে! স্বাধীনতার সমান বয়সি একজন মানুষের বেলায় এ রকমই তো হওয়ার কথা। অর্ধশত বছর বয়সি সেই মানুষ বাংলাদেশের গড় আয়ু থেকে এখন ২২ দশমিক ছয় বছর দূরে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী আমাদের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৬ বছর। ৫০ বছরের মানুষটিও হয়তো বাংলাদেশের গড় আয়ু থেকে আরও বেশিদিন বেঁচে থেকে এ পৃথিবীর আলো-বাতাস উপভোগ করবেন। এর মানে হলো বাংলাদেশের গড় আয়ু বেড়েছে। এটি অবশ্যই আমাদের বড় একটি অর্জন। এর বাইরে আরও কিছু বড় অর্জন আছে আমাদের। তার মধ্যে আছে, ২০২১ সালে অর্থাৎ বিজয় ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর চার বছর আগেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। নিম্ন আয়ের দেশের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে এখন আমরা রীতিমতো মধ্যম আয়ের দেশে অবস্থান করছি। তবে বিশ্বব্যাংক মধ্যম আয়ের দেশ দুভাবে ভাগ করেছে-১. নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, ২. উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। হ্যাঁ, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে অবস্থান করছি। এর পাশাপাশি আরও এক অর্জন-বিশ্বে মানবসম্পদ উন্নয়নেও এসেছে আমাদের সাফল্য। ২০১৯ সালের জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ এখন ১৩৫তম স্থানে দাঁড়ানো। আমাদের মাথাপিছু আয়ের সূচকও ধীরে ধীরে হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী। সর্বশেষ বাজার মূল্যে মাথাপিছু আয়েও এসেছে গতি-বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ হলো ২ হাজার ৬৪ ডলার। অর্জন শুধু এসবের মধ্যেই থেমে নেই, দেশে ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। শীর্ষস্থানীয় ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এ সাফল্যকে নিঃসন্দেহে খাদ্য-নিরাপত্তার মাইলফলক বলা যায়। দেশে এখন ধান উৎপাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৭০ লাখ টনের বেশি। বাংলাদেশের উৎপাদিত ধানের মধ্যে ৫৬ ভাগই আসে বোরো থেকে, আর বাকিটা আসে আউশ আর আমন থেকে। ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে শীর্ষ ধান উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় অবস্থানে। স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। রীতিমতো বিস্ময়কর ব্যাপার। অর্থনীতিবিদদের চোখে বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচক ঊর্ধ্বমুখী।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ, এটি এখন পুরোনো খবর। ভিশন ২০২১-এর উদ্দেশ্যে স্বল্পোন্নত অবস্থায় বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়। লক্ষ্যাভিমুখে পৌঁছানোর জন্য গৃহীত হয় নানা পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ। পর্যায়ক্রমে শুরু হয় তার বাস্তবায়ন কার্যক্রম। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি এসে প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে যায়। এটি আমাদের জন্য সুখবর। এ সাফল্য নিয়ে গর্ব হয়। সত্যিই উন্নতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী রেখে আমরা সামনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি। এ সাফল্য নিয়ে গর্ব হয়, উঁচু গলায় বুক ফুলিয়ে বলতে ইচ্ছা হয়, বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সোজা সামনের দিকে। তবু ভীত হই যখন দেখি, উল্লেখযোগ্য অংশ মানুষের কাছে মধ্যম আয়ের একটি দেশের এ সুফল এখনো রয়ে গেছে অধরা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা। এখন সময় এসেছে সেই আকাঙ্ক্ষা আমরা বাস্তবে কতটা রূপ দিতে পেরেছি তা খুঁটিয়ে দেখার।

কিছুদিন আগে সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (ভি-ডেম) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের প্রথম সারির একটি বাংলা দৈনিকের শেষ পৃষ্ঠায় গুরুত্বসহ সংবাদটি প্রকাশিত হয়। তাতে জানা যায়, আমাদের গণতন্ত্র নিয়ে সুখবর দেওয়ার কিছু নেই। সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি-ডেম ইনস্টিটিউট পাঁচ বছর ধরে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। প্রতিবেদনে উদার গণতন্ত্র সূচকে (লিবারেল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স) ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৪তম। আর স্কোর হলো শূন্য দশমিক ১। নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র সূচকে (ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স) বাংলাদেশের স্থান আরও নিচে নেমে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮তম, আর স্কোর শূন্য দশমিক ২৭। এছাড়া বাংলাদেশ লিবারেল কম্পোনেন্ট ইনডেক্স, ইগলিট্যারিয়ান কম্পোনেন্ট ইনডেক্স, পার্টিসিপেটরি কম্পোনেন্ট ইনডেক্স ও ডেলিবারেটিভ কম্পোনেন্ট ইনডেক্সের অবস্থাও খুশি হওয়ার মতো নয়। এসব সূচকে বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে ১৬১তম, ১৭৬তম, ১৪৩তম ও ১৫৮তম স্থানে দাঁড়িয়ে। ভি-ডেম ইনস্টিটিউট তার এ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, শাসনতন্ত্রের দিক থেকে বাংলাদেশ রয়েছে ‘নির্বাচনভিত্তিক স্বেচ্ছাতন্ত্র’ (ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি) বিভাগে।

ভি-ডেমের বার্ষিক প্রতিবেদনে উদার গণতন্ত্রের সূচকে শীর্ষ তিন দেশ হলো ডেনমার্ক, সুইডেন ও নরওয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় উদার গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে আছে ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, মিয়ানমার (সেনাশাসন জারি হওয়ার আগে), পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। তবে নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র থেকে ভারত নেমে এসেছে ‘নির্বাচনভিত্তিক স্বেচ্ছাতন্ত্র’ বিভাগে।

ভি-ডেমের বার্ষিক প্রতিবেদন নিয়ে সরকারিভাবে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে দলীয় অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বক্তব্য ছাপা হয়েছে বেশ কটি দৈনিক পত্রিকায়। সেখানে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এ অঞ্চলীয় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তার মতে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র যথেষ্ট উদার। মাহবুবউল আলম হয়তো ঠিকই বলেছেন। আমরা জানি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভকারী দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোয় গণতন্ত্র হলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান মাধ্যম। ভি-ডেমের বৈশ্বিক গণতন্ত্রী শাসনব্যবস্থার সূচকগুলো এসব দেশে যে গুরুত্ব পায়, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।

এখন আসি আসল প্রসঙ্গে। করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা পুরো এলোমেলো হয়ে পড়েছে। সরকার নানারকম প্রণোদনার ব্যবস্থা চালু রাখা সত্ত্বেও করোনাকালীন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ আর আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখে। বেসরকারি সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে এ ছবি উঠে এসেছে। আমরা জানি, করোনা মহামারির আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। সন্দেহ নেই, সেই সংখ্যা এখন আরও অনেক বেড়ে গেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) সর্বশেষ জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার ৪২ শতাংশ। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসা মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাদের বড় অংশই বাধ্য হয়ে বয়ে বেড়াচ্ছে দারিদ্র্যের কঠিন জোয়াল। সেই জোয়াল এত ভারী যে তা বইতে গিয়ে রীতিমতো কুঁজো হয়ে পড়ছে তাদের কাঁধ-তবু নিস্তার নেই, ইচ্ছা না-থাকার পরও অসহায় ভঙ্গি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে এসব দরিদ্র মানুষকে। চোখের সামনে আজ তারা যে বাংলাদেশকে দেখছে, সেই দেশ তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। তাই আশাহত হয়ে অসহায় চোখে তাদের দেখতে হচ্ছে ধনী আর দরিদ্রের মধ্যে দিন দিন বেড়ে চলা ব্যবধান, স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের অনতিক্রম্য দূরত্ব। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও পরিষ্কার-১০ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে দেশের ৩৫ শতাংশ সম্পদ। এ পরিসংখ্যানই কি পরিষ্কার করে দেয় না ধনী-গরিব এখন কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে! শুধু নিরুপায় দৃষ্টিতে আমাদের দেখতে হয় এ দেশে ১৮ কোটির মধ্যে এখনো বিশালসংখ্যক মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এর মধ্যে করোনা মহামারির আগে চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ। আরও চিন্তার কারণ কি জানেন? দেশের অর্ধেক মানুষেরই নেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনোরকম সংশ্লিষ্টতা।

এ কঠিন সত্য জানা থাকার পরও দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বিজয় আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী গভীর এক তাৎপর্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। কারণ বিজয় আর স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে ও মনে যত্নে সাজিয়ে পুরো জাতি ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সাড়ে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। শত্রুমুক্ত দেশের সর্বস্তরের মানুষের আশা ছিল স্বাধীন এ দেশে থাকবে সমতার নীতি, আইনের শাসন, লেখাপড়ার অধিকার, খাওয়া-থাকা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তাসহ বৈষম্যহীন একটি সমাজ। থাকবে সংখ্যালঘুদের সামাজিক নিরাপত্তা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। এসব প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, এখন সময় এসেছে তার হিসাব নেওয়ার। স্বাধীনতার সমান বয়সি একজন মানুষের মনে এ ধরনের অনেক প্রশ্ন একে একে জড়ো হতে থাকে। তার মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, বাংলাদেশের বর্তমান যে চেহারা, তার জন্যই কি লাখ লাখ মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল? কেন শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি? কেন সমাজে এত শ্রেণিবিভেদ? কেন সুশাসনের বড় অভাব?

আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশ। এ সাফল্য নিয়ে গর্ব হয় ঠিকই, তবু ভীত হই যখন দেখি দেশের একাংশ মানুষের কাছে মধ্যম আয়ের সুফল রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর জন্য আমরা কাকে দুষব? কী কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, তা খুঁজে বের করার সময় কি এখনো হয়নি? আমরা জানি, আমাদের এ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ হলো মুক্তিযুদ্ধের ফসল। অথচ কী হতভাগা আমরা! আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে আজও ঢেলে সাজাতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি বারবার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন। কিন্তু আমরা উদার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অপরিহার্য সূচকগুলোকে নিষ্ক্রিয় রেখে আমলাতন্ত্রকে মহিরুহে রূপ দিয়ে চলেছি, দলতন্ত্রকে করে তুলেছি অপ্রতিরোধ্য। বিজয় ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে পৌঁছে কে দেবেন এর উত্তর? বর্তমান প্রজন্ম এ প্রশ্নে কাউকে ছাড় দেবেন, ভাবার কারণ নেই। আসলেই এ দায় এড়ানোর কোনো উপায় নেই।

আতাহার খান : মুক্তিযোদ্ধা (৮ নম্বর সেক্টর), সাংবাদিক, কবি

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন