বিধিনিষেধ না মানার পরিণতি
jugantor
বিধিনিষেধ না মানার পরিণতি

  মেজর (অব.) সুধীর সাহা  

২২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইতোমধ্যেই করোনার ভারতীয় স্ট্রেনকে গোটা বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক হিসাবে আখ্যা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এবার তারা আরও কঠিন কথা উচ্চারিত করল। তারা জানিয়ে দিল, এই ভারতীয় স্ট্রেনের বিরুদ্ধে করোনা টিকা কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ভারতের এই নতুন স্ট্রেনের দেখা মিলেছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে।

এরই মধ্যে তা ভারতে মরণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে তীব্রভাবে। এ মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়েছে ৪৪টি দেশে। বাংলাদেশও তা থেকে বাদ পড়েনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ভারতীয় স্ট্রেনে সংক্রমণের হার অনেক বেশি এবং অ্যান্টিবডির প্রভাবও এর ওপর অনেক কম। ভারতে এখন করোনাভাইরাস মহাদাপটে বসবাস করছে। চারদিকে সংক্রমণ, মৃত্যু, অক্সিজেনের অভাব, হাসপাতালে বেডের অভাব সব মিলিয়ে ভারতকে রীতিমতো মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ।

ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বাড়বাড়ন্তের জন্য রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সমাবেশকে দায়ী করেছে বিশ্বসমাজ, বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থার তরফ থেকে প্রকাশিত করোনাবিষয়ক সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে কোভিড-১৯ সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতের পেছনে রাজনৈতিক জনসভা এবং ধর্মীয় জমায়েতের বড় ভূমিকা রয়েছে। এর আগে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক পত্রিকা ল্যানসেটও ভারতের ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সমাবেশের মতো অতি সংক্রামক অনুষ্ঠানকে দায়ী করেছে।

মালদহ থেকে উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরের দূরত্ব প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। আর বিহারের বক্সারের দূরত্ব ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি। হামিরপুর এবং বক্সারের সঙ্গে মালদহকে যেন একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে গঙ্গা। সেই বিহার এবং উত্তরপ্রদেশে গঙ্গায় ভাসতে দেখা গিয়েছে একের পর এক মৃতদেহ। গঙ্গায় দেহ মিলছে বিহার, ব্রহ্মপুর এবং উত্তরপ্রদেশের গ্রামগুলোতে। অতিমারির আবহে শেষকৃত্যের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারেনি পরিবারের লোক এবং প্রশাসন। ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে গঙ্গায়। কোথাও গঙ্গার পাড়ে অল্প মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেওয়া হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত মৃতদেহ। অধিক স্রোতের টানে সেই মাটি সরে গিয়ে দেহগুলো ভেসে যাচ্ছে গঙ্গায়। এক হিসাবে বলা হয়, গঙ্গার ১ হাজার ১৪০ কিলোমিটার যাত্রাপথে নদীর তীরে ২ হাজারেরও বেশি লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের ২৭ জেলায় গঙ্গার তীরে কবর দেওয়া হয়েছে অসংখ্য লাশ। গঙ্গার স্রোতে মাটি সরে গিয়ে সেই কবর দেওয়া লাশের একটি অংশ আবার ভেসে গেছে গঙ্গায়। গঙ্গার জলের স্তর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাটি সরে যাচ্ছে এবং লাশগুলো মাটি থেকে বেরিয়ে গঙ্গার জলে ভেসে যাচ্ছে। অন্যদিকে, গঙ্গায় মরদেহ ভাসালে মোক্ষ লাভ হবে- এই ধর্মীয় বিশ্বাসেও আধপোড়া মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে কোথাও কোথাও। গঙ্গায় মৃতদেহ ফেলা যাবে না- এ বিষয়ে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। এটাও বলা হয়েছে, গঙ্গায় মরদেহ দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনকেই তার সৎকারের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু গঙ্গাকে দূষণমুক্ত রাখার যত নির্দেশই থাকুক, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে করোনাকালে তা ধুয়েমুছে গেছে।

সোমবার রাত দেড়টা নাগাদ কলকাতার সুজিত বাবুর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯ ঘণ্টা করোনা রোগীর এ মৃতদেহ পড়ে থাকে নার্সিংহোমেই। জেলা প্রশাসকের দপ্তরের কন্ট্রোল রুম, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের কন্ট্রোল রুম এবং পৌরসভার কন্ট্রোল রুমে বারবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর লাশবাহী গাড়ি আসে নার্সিংহোমে। মতু কাশ্যপ গিয়েছিল বাবা পিয়ারে লালকে দাহ করতে; কিন্তু পারেনি। চাষের জমিতে সামান্য কাজ করে মতু। পোড়ানোর জন্য কাঠের খবর নিয়ে সে জানল, কাঠের দাম আগের তুলনায় ডাবল হয়ে গেছে। সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য মতুর নেই। তাই মতু গঙ্গার চরে নিয়ে এসেছে বাবার মৃতদেহ। বালি খুঁড়ে সেখানেই কবর দেবে। ক্ষমতা নেই নাপিত প্রদীপ কুমারেরও। করোনা তাদের সবকিছু নিংড়ে নিয়েছে। ছারখার হয়ে যাচ্ছে ভারতের উত্তর প্রদেশের গ্রামের পর গ্রাম। কাজকর্ম নেই বহুদিন। আধপেটা কিংবা না খাওয়া মানুষগুলোর কাছে শবদেহ একটা বড় বোঝা, তা সে যতই নিকটাত্মীয়ের হোক না কেন।

১৩৫ কোটি মানুষের দেশ ভারত আজ দুর্ভোগের কবলে। সেখানে আকাশ-বাতাস ভারি করে তুলেছে মানুষের মৃত্যুর বাস্তবতা। ভারত হয়ে উঠেছে দিশেহারা। লাশের মিছিলে হাসপাতাল, সরকার, সামর্থ্যবান মানুষ সব যেন থ’ বনে গেছে। বহু মৃত্যু ঘটে যাচ্ছে চিকিৎসা না পেয়ে। দিল্লি আর অমৃতসরের দুটি হাসপাতালে ভর্তি থাকা ৩৩ জন রোগী অকস্মাৎ বুঝতে পারল, তাদের অক্সিজেন আস্তে আস্তে কমে আসছে। তারপর একসময় অক্সিজেন বন্ধই হয়ে গেল। তাদের সামনে অথবা আড়ালে হাসপাতালের নার্স ও ডাক্তাররা কাঁদছে। কারণ অক্সিজেন নেই আর এক ফোঁটাও। এই ডাক্তার আর নার্সদের চোখের সামনেই শ্বাস নিতে না পেরে ৩৩ জন রোগীর করুণ মৃত্যু হলো। এভাবে গোয়াতে মৃত্যু হলো আরও কিছু রোগীর। ভারতের প্রতিটি হাসপাতালেই দেখা গেল এমন মৃত্যুর বাস্তবতা। এটা এড়ানো যায়নি; কিন্তু এর ভয়াবহতা এড়ানো যেত। প্রয়োজন ছিল সঠিক পদক্ষেপ ও সুবিচারের। এ সুবিচার কোনো আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হয় না। গণতন্ত্রের আদালতে নির্বাচিত সরকারকে করতে হয় এর জবাবদিহি। কোটি কোটি ভোট দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সোনায় মুড়ে ক্ষমতা নিয়ে আসে যে জনগণ, তাদের জন্য শ্বাসবায়ুর ব্যবস্থাটি করার বাধ্যবাধকতা অবশ্যই আছে।

এটা ঠিক জনগণের দুর্ভাগ্য নয়, এটা রীতিমতো অবিচার। ভারতবাসীর এটা প্রাপ্য ছিল না। ভারতে ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করা লাখো মানুষ গত বছরেই কুপোকাত হয়েছিল। গত বছরের লকডাউন তাদের আর্থিক কফিনে শেষ পেরেক পুঁতেছিল। করোনার চেইন ভাঙার লকডাউন বিশেষ কোনো কাজে লাগেনি। চেইন ভাঙা যায়নি। নিজের নিয়মেই সংক্রমণের গ্রাফ শিখরে উঠেছে, আবার তার পতনও ঘটেছে। আর তাতেই তাদের দেশের কর্তারা ভেবেছেন, মহামারি বিদেয় হলো। তাই নিম্নমুখী গ্রাফ দেখে ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছিল ভারতের কর্তৃপক্ষ। তারই কঠিন ফলাফল আজ তাদের দুয়ারে।

ভারতের করোনা নিয়ে এত কথা লেখার উদ্দেশ্য ইতিহাসের শিক্ষা নেওয়া এবং দেওয়া। শতবর্ষ আগের স্প্যানিশ ফ্লু, প্লেগ বা কলেরার মড়ক কোনোটাই এত সহজে দূর হয়নি। করোনাও সহজে বিদায় হবে, তেমন আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। মড়ক লাগলে কী মানুষ অবস্থার শিকার হয়, তা ভারত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ভয়ের জায়গাটা ঠিকমতো চিহ্নিত হবে এবং সময় থাকতেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমনিতেই আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতার সীমা-পরিসীমা নেই। হাসপাতালের সংখ্যা, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংখ্যা, অক্সিজেনের ব্যবস্থা কোনোদিকেই স্বস্তি নিয়ে তাকানোর উপায় নেই। সংক্রমণ বেড়ে গেলে পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত কিটও আমাদের হাতে নেই। তাই সাবধান হতে হবে এখনই।

সংক্রমণ এ মুহূর্তে কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আছে বলে আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঠেকাতে হবে। কোনোভাবেই ভারতের ভ্যারিয়েন্টকে বাংলাদেশে শাখা-প্রশাখা বিস্তারের সুযোগ দেওয়া যাবে না। এমনিতেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সচেতন নয়; বিশেষ করে গ্রামের মানুষগুলো। জ্বর হলে পাড়াগাঁয়ের মানুষ ভাবে, সাধারণ ভাইরাল জ্বর। পরীক্ষা করাটাই যেন তাদের কাছে আতঙ্ক। বহু বাড়াবাড়ির পর যখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। তাই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা বা উদাসীনতা নয়। কোনোভাবেই বিপদে ফেলা যাবে না দেশের মানুষকে। দেশের মানুষ যে সাধারণ বিধিনিষেধ শোনে না, তা প্রমাণ করেছে বারবার। সর্বশেষ এই ঈদে গ্রামে যাওয়া নিয়ে যা দেখাল- মানুষের চাপে মৃত্যু হওয়ার মতো পরিবেশেও শিশুসন্তান আর পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় বাড়িয়ে যেভাবে নিজেদের বিপদ ডেকে আনল, তাতেই বোঝা যায়, নিজেকে বাঁচানোর বিন্দুমাত্র দায়িত্ববোধ কাঁধে নেওয়ার কথা বড় একটি শ্রেণির মানুষ মোটেই চিন্তা করে না। আর কর্তৃপক্ষের চিন্তার জায়গাটা সেখানেই।

যারা নিজেকে রক্ষা করার কথা ভাবে না, তাদের কীভাবে বাঁচাবেন? তারপরও হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। কঠিন হতে হবে সরকারকে। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশের রাজনীতিবিদদের। শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকার সময় এটা নয়। ক্ষমতা, দাপট, কর্তৃত্ব ইত্যাদি অটুট রাখার বাসনা এবং দাঁত-নখ বের করা অশুভ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শাসক দলসহ বিরোধী শিবিরের সব রাজনৈতিক দলকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। বাঁচাতে হবে দেশ ও দেশের অসহায় মানুষকে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

বিধিনিষেধ না মানার পরিণতি

 মেজর (অব.) সুধীর সাহা 
২২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইতোমধ্যেই করোনার ভারতীয় স্ট্রেনকে গোটা বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক হিসাবে আখ্যা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এবার তারা আরও কঠিন কথা উচ্চারিত করল। তারা জানিয়ে দিল, এই ভারতীয় স্ট্রেনের বিরুদ্ধে করোনা টিকা কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ভারতের এই নতুন স্ট্রেনের দেখা মিলেছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে।

এরই মধ্যে তা ভারতে মরণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে তীব্রভাবে। এ মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়েছে ৪৪টি দেশে। বাংলাদেশও তা থেকে বাদ পড়েনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ভারতীয় স্ট্রেনে সংক্রমণের হার অনেক বেশি এবং অ্যান্টিবডির প্রভাবও এর ওপর অনেক কম। ভারতে এখন করোনাভাইরাস মহাদাপটে বসবাস করছে। চারদিকে সংক্রমণ, মৃত্যু, অক্সিজেনের অভাব, হাসপাতালে বেডের অভাব সব মিলিয়ে ভারতকে রীতিমতো মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ।

ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বাড়বাড়ন্তের জন্য রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সমাবেশকে দায়ী করেছে বিশ্বসমাজ, বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থার তরফ থেকে প্রকাশিত করোনাবিষয়ক সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে কোভিড-১৯ সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতের পেছনে রাজনৈতিক জনসভা এবং ধর্মীয় জমায়েতের বড় ভূমিকা রয়েছে। এর আগে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক পত্রিকা ল্যানসেটও ভারতের ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সমাবেশের মতো অতি সংক্রামক অনুষ্ঠানকে দায়ী করেছে।

মালদহ থেকে উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরের দূরত্ব প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। আর বিহারের বক্সারের দূরত্ব ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি। হামিরপুর এবং বক্সারের সঙ্গে মালদহকে যেন একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে গঙ্গা। সেই বিহার এবং উত্তরপ্রদেশে গঙ্গায় ভাসতে দেখা গিয়েছে একের পর এক মৃতদেহ। গঙ্গায় দেহ মিলছে বিহার, ব্রহ্মপুর এবং উত্তরপ্রদেশের গ্রামগুলোতে। অতিমারির আবহে শেষকৃত্যের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারেনি পরিবারের লোক এবং প্রশাসন। ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে গঙ্গায়। কোথাও গঙ্গার পাড়ে অল্প মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেওয়া হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত মৃতদেহ। অধিক স্রোতের টানে সেই মাটি সরে গিয়ে দেহগুলো ভেসে যাচ্ছে গঙ্গায়। এক হিসাবে বলা হয়, গঙ্গার ১ হাজার ১৪০ কিলোমিটার যাত্রাপথে নদীর তীরে ২ হাজারেরও বেশি লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের ২৭ জেলায় গঙ্গার তীরে কবর দেওয়া হয়েছে অসংখ্য লাশ। গঙ্গার স্রোতে মাটি সরে গিয়ে সেই কবর দেওয়া লাশের একটি অংশ আবার ভেসে গেছে গঙ্গায়। গঙ্গার জলের স্তর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাটি সরে যাচ্ছে এবং লাশগুলো মাটি থেকে বেরিয়ে গঙ্গার জলে ভেসে যাচ্ছে। অন্যদিকে, গঙ্গায় মরদেহ ভাসালে মোক্ষ লাভ হবে- এই ধর্মীয় বিশ্বাসেও আধপোড়া মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে কোথাও কোথাও। গঙ্গায় মৃতদেহ ফেলা যাবে না- এ বিষয়ে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। এটাও বলা হয়েছে, গঙ্গায় মরদেহ দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনকেই তার সৎকারের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু গঙ্গাকে দূষণমুক্ত রাখার যত নির্দেশই থাকুক, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে করোনাকালে তা ধুয়েমুছে গেছে।

সোমবার রাত দেড়টা নাগাদ কলকাতার সুজিত বাবুর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯ ঘণ্টা করোনা রোগীর এ মৃতদেহ পড়ে থাকে নার্সিংহোমেই। জেলা প্রশাসকের দপ্তরের কন্ট্রোল রুম, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের কন্ট্রোল রুম এবং পৌরসভার কন্ট্রোল রুমে বারবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর লাশবাহী গাড়ি আসে নার্সিংহোমে। মতু কাশ্যপ গিয়েছিল বাবা পিয়ারে লালকে দাহ করতে; কিন্তু পারেনি। চাষের জমিতে সামান্য কাজ করে মতু। পোড়ানোর জন্য কাঠের খবর নিয়ে সে জানল, কাঠের দাম আগের তুলনায় ডাবল হয়ে গেছে। সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য মতুর নেই। তাই মতু গঙ্গার চরে নিয়ে এসেছে বাবার মৃতদেহ। বালি খুঁড়ে সেখানেই কবর দেবে। ক্ষমতা নেই নাপিত প্রদীপ কুমারেরও। করোনা তাদের সবকিছু নিংড়ে নিয়েছে। ছারখার হয়ে যাচ্ছে ভারতের উত্তর প্রদেশের গ্রামের পর গ্রাম। কাজকর্ম নেই বহুদিন। আধপেটা কিংবা না খাওয়া মানুষগুলোর কাছে শবদেহ একটা বড় বোঝা, তা সে যতই নিকটাত্মীয়ের হোক না কেন।

১৩৫ কোটি মানুষের দেশ ভারত আজ দুর্ভোগের কবলে। সেখানে আকাশ-বাতাস ভারি করে তুলেছে মানুষের মৃত্যুর বাস্তবতা। ভারত হয়ে উঠেছে দিশেহারা। লাশের মিছিলে হাসপাতাল, সরকার, সামর্থ্যবান মানুষ সব যেন থ’ বনে গেছে। বহু মৃত্যু ঘটে যাচ্ছে চিকিৎসা না পেয়ে। দিল্লি আর অমৃতসরের দুটি হাসপাতালে ভর্তি থাকা ৩৩ জন রোগী অকস্মাৎ বুঝতে পারল, তাদের অক্সিজেন আস্তে আস্তে কমে আসছে। তারপর একসময় অক্সিজেন বন্ধই হয়ে গেল। তাদের সামনে অথবা আড়ালে হাসপাতালের নার্স ও ডাক্তাররা কাঁদছে। কারণ অক্সিজেন নেই আর এক ফোঁটাও। এই ডাক্তার আর নার্সদের চোখের সামনেই শ্বাস নিতে না পেরে ৩৩ জন রোগীর করুণ মৃত্যু হলো। এভাবে গোয়াতে মৃত্যু হলো আরও কিছু রোগীর। ভারতের প্রতিটি হাসপাতালেই দেখা গেল এমন মৃত্যুর বাস্তবতা। এটা এড়ানো যায়নি; কিন্তু এর ভয়াবহতা এড়ানো যেত। প্রয়োজন ছিল সঠিক পদক্ষেপ ও সুবিচারের। এ সুবিচার কোনো আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হয় না। গণতন্ত্রের আদালতে নির্বাচিত সরকারকে করতে হয় এর জবাবদিহি। কোটি কোটি ভোট দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সোনায় মুড়ে ক্ষমতা নিয়ে আসে যে জনগণ, তাদের জন্য শ্বাসবায়ুর ব্যবস্থাটি করার বাধ্যবাধকতা অবশ্যই আছে।

এটা ঠিক জনগণের দুর্ভাগ্য নয়, এটা রীতিমতো অবিচার। ভারতবাসীর এটা প্রাপ্য ছিল না। ভারতে ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করা লাখো মানুষ গত বছরেই কুপোকাত হয়েছিল। গত বছরের লকডাউন তাদের আর্থিক কফিনে শেষ পেরেক পুঁতেছিল। করোনার চেইন ভাঙার লকডাউন বিশেষ কোনো কাজে লাগেনি। চেইন ভাঙা যায়নি। নিজের নিয়মেই সংক্রমণের গ্রাফ শিখরে উঠেছে, আবার তার পতনও ঘটেছে। আর তাতেই তাদের দেশের কর্তারা ভেবেছেন, মহামারি বিদেয় হলো। তাই নিম্নমুখী গ্রাফ দেখে ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছিল ভারতের কর্তৃপক্ষ। তারই কঠিন ফলাফল আজ তাদের দুয়ারে।

ভারতের করোনা নিয়ে এত কথা লেখার উদ্দেশ্য ইতিহাসের শিক্ষা নেওয়া এবং দেওয়া। শতবর্ষ আগের স্প্যানিশ ফ্লু, প্লেগ বা কলেরার মড়ক কোনোটাই এত সহজে দূর হয়নি। করোনাও সহজে বিদায় হবে, তেমন আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। মড়ক লাগলে কী মানুষ অবস্থার শিকার হয়, তা ভারত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ভয়ের জায়গাটা ঠিকমতো চিহ্নিত হবে এবং সময় থাকতেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমনিতেই আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতার সীমা-পরিসীমা নেই। হাসপাতালের সংখ্যা, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংখ্যা, অক্সিজেনের ব্যবস্থা কোনোদিকেই স্বস্তি নিয়ে তাকানোর উপায় নেই। সংক্রমণ বেড়ে গেলে পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত কিটও আমাদের হাতে নেই। তাই সাবধান হতে হবে এখনই।

সংক্রমণ এ মুহূর্তে কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আছে বলে আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঠেকাতে হবে। কোনোভাবেই ভারতের ভ্যারিয়েন্টকে বাংলাদেশে শাখা-প্রশাখা বিস্তারের সুযোগ দেওয়া যাবে না। এমনিতেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সচেতন নয়; বিশেষ করে গ্রামের মানুষগুলো। জ্বর হলে পাড়াগাঁয়ের মানুষ ভাবে, সাধারণ ভাইরাল জ্বর। পরীক্ষা করাটাই যেন তাদের কাছে আতঙ্ক। বহু বাড়াবাড়ির পর যখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। তাই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা বা উদাসীনতা নয়। কোনোভাবেই বিপদে ফেলা যাবে না দেশের মানুষকে। দেশের মানুষ যে সাধারণ বিধিনিষেধ শোনে না, তা প্রমাণ করেছে বারবার। সর্বশেষ এই ঈদে গ্রামে যাওয়া নিয়ে যা দেখাল- মানুষের চাপে মৃত্যু হওয়ার মতো পরিবেশেও শিশুসন্তান আর পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় বাড়িয়ে যেভাবে নিজেদের বিপদ ডেকে আনল, তাতেই বোঝা যায়, নিজেকে বাঁচানোর বিন্দুমাত্র দায়িত্ববোধ কাঁধে নেওয়ার কথা বড় একটি শ্রেণির মানুষ মোটেই চিন্তা করে না। আর কর্তৃপক্ষের চিন্তার জায়গাটা সেখানেই।

যারা নিজেকে রক্ষা করার কথা ভাবে না, তাদের কীভাবে বাঁচাবেন? তারপরও হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। কঠিন হতে হবে সরকারকে। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশের রাজনীতিবিদদের। শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকার সময় এটা নয়। ক্ষমতা, দাপট, কর্তৃত্ব ইত্যাদি অটুট রাখার বাসনা এবং দাঁত-নখ বের করা অশুভ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শাসক দলসহ বিরোধী শিবিরের সব রাজনৈতিক দলকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। বাঁচাতে হবে দেশ ও দেশের অসহায় মানুষকে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন