বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় করণীয়
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় করণীয়

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

২৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩ জুন প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত এক দশকের বেশি সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সূচক মে মাসে সর্বোচ্চ হয়েছে। বলা হয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১২৭ দশমিক ১ পয়েন্টে, যা এপ্রিল মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং গত বছরের মে মাসের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

আর মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ১০ জুন একটি দৈনিকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির পর থেকে খাদ্যশস্যের চাহিদা আকাশচুম্বী। কিন্তু সে তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি, বরং সংকুচিত হয়েছে। এর মূল কারণ দেশে দেশে লকডাউনসহ আরোপিত নানা বিধিনিষেধ। করোনার ধাক্কায় শুধু বিশ্ববাজারেই নয়, সরবরাহ কমেছে স্থানীয় বাজারে।

ফলে খাদ্যশস্যের দাম ক্রমান্বয়ে ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগামী মৌসুমে খাদ্যশস্যের দাম আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যসূচকের প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের খাদ্যপণ্যের দামের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থা মোকাবিলায় আমাদের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

দেশে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি জানা যায় গত বছরের ৮ মার্চ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে করোনার প্রথম ঢেউ শেষে মার্চে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। করোনাকালীন আমাদের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। দেশে উৎপাদিত মোট চালের কম-বেশি ৫৫ শতাংশই বোরো এবং এটি উৎপাদনের দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে। আর দেশে উৎপাদিত মোট চালের কম-বেশি ৩৮ শতাংশ আমন এবং এটি রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়কালে ঘূর্ণিঝড় আম্পান, দীর্ঘ খরা, আগের মৌসুমে ধানচাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম জমিতে বোরোর চাষ-ইত্যাদি কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার (২ কোটি ৪ লাখ টন) তুলনায় ৮ লাখ টন কম বোরো চাল উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টনে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হারে ছিল ঋণাত্মক।

সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরেও (২০২০-২১) চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল না হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওই অর্থবছরে সরকারি হিসাবে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ জানা না গেলেও মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, উপর্যুপরি বন্যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমন চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে, যা শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নয়, বরং আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ লাখ টন কম।

আর ইউএসডিএ’র এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত ১৭ মে একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, হিটশক ও পোকার আক্রমণে চলতি বছরে সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯০ লাখ টনে, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ টন এবং গত অর্থবছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬ লাখ টন কম।

এই যখন চাল উৎপাদনের অবস্থা, তখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহের অবস্থা আরও হতাশাব্যঞ্জক। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বোরো মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ৮ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ টনে। সরকার নির্ধারিত বোরো ধানের কেজিপ্রতি দাম (২৬ টাকা) খোলাবাজারের দামের চেয়ে কম হওয়ায় ধানচাষিরা সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহী হননি।

এদিকে ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় চালকল মালিকরা চুক্তিমূল্যে (প্রতি কেজি ৩৭ টাকা) চাল সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করে চালের কেজিপ্রতি দাম বৃদ্ধির দাবি জানান। সরকার দাম বৃদ্ধিতে রাজি না হওয়ায় মৌসুম শেষে সাড়ে ১১ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাড়ে ৭ লাখ টন চাল সংগৃহীত হয়। প্রায় একই কারণে পরবর্তী অর্থবছরে (২০২০-২১) আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয় চালের আকারে মাত্র ৮৩ হাজার ২০২ টন।

সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে সরকার ৬ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকার ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১ ও ৩ টাকা বৃদ্ধি করেছে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২১ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত ধান ও চালের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২ লাখ ১৩ হাজার টন এবং ৪ লাখ ৮৪ হাজার টন। ধান সংগ্রহের পরিমাণ আর বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণের সম্ভাবনাও কম।

দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হলে আমদানির মাধ্যমে সে গ্যাপ পূরণের কথা। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি খাতে কোনো চাল আমদানি হয়নি। আর চাল আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক বিদ্যমান থাকায় ওই অর্থবছরে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ৪ হাজার টনে। চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা সত্ত্বেও ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথমভাগে সরকার চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়নি। অবস্থা বেগতিক দেখে ওই অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধ্বের শুরুতে সরকার চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় চালের আমদানি শুল্ক অনেকটা হ্রাস করেও বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারি খাতেও চাল আমদানি সম্ভব হয়নি। ফলে এপ্রিল মাসে সরকারি গুদামে চালের মজুত একযুগের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে আসে। এর সুযোগ নেয় চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা। দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ৫০ টাকায় পৌঁছে। আর মাঝারি ও সরু চালের দামে বল্গাহীন ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়।

সরকারি তথ্য মোতাবেক, আমাদের দ্বিতীয় খাদ্যশস্য গমের উৎপাদন ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের ১৯ লাখ টন থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১২-১৩ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। দেশের চাহিদা মেটাতে আমাদের বছরে কম-বেশি ৬০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়।

এখন দেখা যাক, খাদ্যশস্যের বাইরে খাদ্যের অন্যসব উপাদানে আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে? আমিষের প্রধান উৎস মাছ উৎপাদনে স্বনির্ভরতার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে দেশ। আমিষের আরেক উৎস ডিম উৎপাদনেও দেশ স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে। শাকসবজি উৎপাদনেও আমরা স্বনির্ভরতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছেছি। তবে এসব খাদ্যপণ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছলেও মাংস, দুধ, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, ফল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা উৎপাদনে দেশ অনেক পিছিয়ে আছে। আমদানির মাধ্যমে এসব খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হলো-খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের দুর্বল দিক এবং খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতা বিবেচনায় নিয়ে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতকরণে এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখায় সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। এজন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে কৃষকদের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ।

করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো, প্রথম ঢেউয়ে সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানী ঢাকাসহ মহানগরীগুলো। আর সংক্রমণের হটস্পট ছিল রাজধানী ঢাকা। অন্যদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিশ্বের সর্বাধিক সংক্রমণশীল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, যা মূলত ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট নামে পরিচিত- এর সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হয়েছে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো যেমন- রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়াকে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের প্রভাব দেশের গ্রামাঞ্চলে ছিল না বললেই চলে।

অন্যদিকে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ থেকে এখন সীমান্তবর্তী ও অন্যান্য জেলার গ্রামাঞ্চলও রেহাই পাচ্ছে না। ফসল ফলানো কৃষক করোনায় আক্রান্ত হলে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তাদের জরুরিভিত্তিতে করোনার টিকাদান কর্মসূচির আওতাভুক্ত করতে হবে। দুই. কৃষির উন্নয়নে বাজেটে ঘোষিত সব সুযোগ-সুবিধার পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহে কৃষকের জন্য যেসব প্রণোদনার ঘোষণা বাজেটে দেওয়া হয়েছে সেগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন তাদের অধিক পরিমাণে ফসল ফলাতে উৎসাহিত করবে।

তিন. আসন্ন আমন মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। বন্যায় আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অনেকটা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আমন চাষের জমিতে আবারও ফসল ফলাতে যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে তা হলো বীজের অভাব। কারণ বন্যার পানিতে বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়। এ সমস্যাটির সমাধানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে সচেষ্ট হতে হবে। চার. আগামী ছয় মাসে দেশে চালের চাহিদা ও মজুতের পরিমাণ নির্ধারণে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। জরিপের পর সরকারি-বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় চাল আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ব্যাপারে গত অর্থবছরের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতার বিষয়টি মনে রেখে গম আমদানিও ত্বরান্বিত করা যুক্তিযুক্ত হবে। পাঁচ. খাদ্যশস্যবহির্ভূত যেসব খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে আমরা আমদানির ওপর নির্ভরশীল, প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোর আমদানিও ত্বরান্বিত করতে হবে; কারণ করোনার দ্বিতীয় এবং সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউয়ে সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হলে একদিকে সেগুলোর সংকট দেখা দিতে পারে এবং অন্যদিকে অনেক বেশি দামে সেগুলো আমদানি করতে হতে পারে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্যসচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় করণীয়

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
২৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩ জুন প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত এক দশকের বেশি সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সূচক মে মাসে সর্বোচ্চ হয়েছে। বলা হয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১২৭ দশমিক ১ পয়েন্টে, যা এপ্রিল মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং গত বছরের মে মাসের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

আর মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ১০ জুন একটি দৈনিকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির পর থেকে খাদ্যশস্যের চাহিদা আকাশচুম্বী। কিন্তু সে তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি, বরং সংকুচিত হয়েছে। এর মূল কারণ দেশে দেশে লকডাউনসহ আরোপিত নানা বিধিনিষেধ। করোনার ধাক্কায় শুধু বিশ্ববাজারেই নয়, সরবরাহ কমেছে স্থানীয় বাজারে।

ফলে খাদ্যশস্যের দাম ক্রমান্বয়ে ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগামী মৌসুমে খাদ্যশস্যের দাম আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যসূচকের প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের খাদ্যপণ্যের দামের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থা মোকাবিলায় আমাদের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

দেশে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি জানা যায় গত বছরের ৮ মার্চ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে করোনার প্রথম ঢেউ শেষে মার্চে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। করোনাকালীন আমাদের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। দেশে উৎপাদিত মোট চালের কম-বেশি ৫৫ শতাংশই বোরো এবং এটি উৎপাদনের দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে। আর দেশে উৎপাদিত মোট চালের কম-বেশি ৩৮ শতাংশ আমন এবং এটি রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়কালে ঘূর্ণিঝড় আম্পান, দীর্ঘ খরা, আগের মৌসুমে ধানচাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম জমিতে বোরোর চাষ-ইত্যাদি কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার (২ কোটি ৪ লাখ টন) তুলনায় ৮ লাখ টন কম বোরো চাল উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টনে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হারে ছিল ঋণাত্মক।

সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরেও (২০২০-২১) চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল না হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওই অর্থবছরে সরকারি হিসাবে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ জানা না গেলেও মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, উপর্যুপরি বন্যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমন চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে, যা শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নয়, বরং আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ লাখ টন কম।

আর ইউএসডিএ’র এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত ১৭ মে একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, হিটশক ও পোকার আক্রমণে চলতি বছরে সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯০ লাখ টনে, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ টন এবং গত অর্থবছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬ লাখ টন কম।

এই যখন চাল উৎপাদনের অবস্থা, তখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহের অবস্থা আরও হতাশাব্যঞ্জক। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বোরো মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ৮ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ টনে। সরকার নির্ধারিত বোরো ধানের কেজিপ্রতি দাম (২৬ টাকা) খোলাবাজারের দামের চেয়ে কম হওয়ায় ধানচাষিরা সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহী হননি।

এদিকে ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় চালকল মালিকরা চুক্তিমূল্যে (প্রতি কেজি ৩৭ টাকা) চাল সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করে চালের কেজিপ্রতি দাম বৃদ্ধির দাবি জানান। সরকার দাম বৃদ্ধিতে রাজি না হওয়ায় মৌসুম শেষে সাড়ে ১১ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাড়ে ৭ লাখ টন চাল সংগৃহীত হয়। প্রায় একই কারণে পরবর্তী অর্থবছরে (২০২০-২১) আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয় চালের আকারে মাত্র ৮৩ হাজার ২০২ টন।

সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে সরকার ৬ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকার ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১ ও ৩ টাকা বৃদ্ধি করেছে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২১ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত ধান ও চালের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২ লাখ ১৩ হাজার টন এবং ৪ লাখ ৮৪ হাজার টন। ধান সংগ্রহের পরিমাণ আর বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণের সম্ভাবনাও কম।

দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হলে আমদানির মাধ্যমে সে গ্যাপ পূরণের কথা। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি খাতে কোনো চাল আমদানি হয়নি। আর চাল আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক বিদ্যমান থাকায় ওই অর্থবছরে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ৪ হাজার টনে। চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা সত্ত্বেও ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথমভাগে সরকার চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়নি। অবস্থা বেগতিক দেখে ওই অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধ্বের শুরুতে সরকার চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় চালের আমদানি শুল্ক অনেকটা হ্রাস করেও বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারি খাতেও চাল আমদানি সম্ভব হয়নি। ফলে এপ্রিল মাসে সরকারি গুদামে চালের মজুত একযুগের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে আসে। এর সুযোগ নেয় চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা। দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ৫০ টাকায় পৌঁছে। আর মাঝারি ও সরু চালের দামে বল্গাহীন ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়।

সরকারি তথ্য মোতাবেক, আমাদের দ্বিতীয় খাদ্যশস্য গমের উৎপাদন ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের ১৯ লাখ টন থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১২-১৩ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। দেশের চাহিদা মেটাতে আমাদের বছরে কম-বেশি ৬০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়।

এখন দেখা যাক, খাদ্যশস্যের বাইরে খাদ্যের অন্যসব উপাদানে আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে? আমিষের প্রধান উৎস মাছ উৎপাদনে স্বনির্ভরতার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে দেশ। আমিষের আরেক উৎস ডিম উৎপাদনেও দেশ স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে। শাকসবজি উৎপাদনেও আমরা স্বনির্ভরতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছেছি। তবে এসব খাদ্যপণ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছলেও মাংস, দুধ, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, ফল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা উৎপাদনে দেশ অনেক পিছিয়ে আছে। আমদানির মাধ্যমে এসব খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হলো-খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের দুর্বল দিক এবং খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতা বিবেচনায় নিয়ে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতকরণে এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখায় সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। এজন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে কৃষকদের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ।

করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো, প্রথম ঢেউয়ে সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানী ঢাকাসহ মহানগরীগুলো। আর সংক্রমণের হটস্পট ছিল রাজধানী ঢাকা। অন্যদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিশ্বের সর্বাধিক সংক্রমণশীল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, যা মূলত ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট নামে পরিচিত- এর সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হয়েছে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো যেমন- রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়াকে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের প্রভাব দেশের গ্রামাঞ্চলে ছিল না বললেই চলে।

অন্যদিকে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ থেকে এখন সীমান্তবর্তী ও অন্যান্য জেলার গ্রামাঞ্চলও রেহাই পাচ্ছে না। ফসল ফলানো কৃষক করোনায় আক্রান্ত হলে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তাদের জরুরিভিত্তিতে করোনার টিকাদান কর্মসূচির আওতাভুক্ত করতে হবে। দুই. কৃষির উন্নয়নে বাজেটে ঘোষিত সব সুযোগ-সুবিধার পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহে কৃষকের জন্য যেসব প্রণোদনার ঘোষণা বাজেটে দেওয়া হয়েছে সেগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন তাদের অধিক পরিমাণে ফসল ফলাতে উৎসাহিত করবে।

তিন. আসন্ন আমন মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। বন্যায় আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অনেকটা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আমন চাষের জমিতে আবারও ফসল ফলাতে যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে তা হলো বীজের অভাব। কারণ বন্যার পানিতে বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়। এ সমস্যাটির সমাধানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে সচেষ্ট হতে হবে। চার. আগামী ছয় মাসে দেশে চালের চাহিদা ও মজুতের পরিমাণ নির্ধারণে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। জরিপের পর সরকারি-বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় চাল আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ব্যাপারে গত অর্থবছরের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতার বিষয়টি মনে রেখে গম আমদানিও ত্বরান্বিত করা যুক্তিযুক্ত হবে। পাঁচ. খাদ্যশস্যবহির্ভূত যেসব খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে আমরা আমদানির ওপর নির্ভরশীল, প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোর আমদানিও ত্বরান্বিত করতে হবে; কারণ করোনার দ্বিতীয় এবং সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউয়ে সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হলে একদিকে সেগুলোর সংকট দেখা দিতে পারে এবং অন্যদিকে অনেক বেশি দামে সেগুলো আমদানি করতে হতে পারে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্যসচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন