করোনা মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় টাস্কফোর্স
jugantor
করোনা মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় টাস্কফোর্স

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

১৮ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শুরুতে এটি স্পষ্ট করে নিতে চাই, শিরোনাম দেখে কারও যাতে এই ভ্রান্ত ধারণা না হয় যে, দেশের সব দল-মতের মানুষকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় টাস্কফোর্স তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে। আমি আসলে কোন টাস্কফোর্সের কথা বলছি, তা নিয়ে আলোচনার আগে করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপ নিয়ে কয়েকটি কথা বলা যাক। করোনা মোকাবিলায় একটি জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল গত বছরের ১৯ এপ্রিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে এর সদস্য সচিব করা হলেও একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে এর প্রধান করা নিয়ে তখনই বিতর্ক হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, কমিটিতে জনস্বাস্থ্য এবং করোনা মহামারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অন্যান্য রোগের বিশেষজ্ঞ তুলনায় অনেক কম। দলীয় কিংবা অন্য প্রভাবের ভিত্তিতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করার উদাহরণ হয়ে থাকবে এ কমিটি।

করোনা মোকাবিলায় জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের এক মাসের বেশি সময় পার হওয়ার পর দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকায় এসেছিল করোনার পরীক্ষা, করোনা চিকিৎসা, হাসপাতালগুলোয় নন-করোনা রোগীদের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে নানারকম সমন্বয়হীনতা এবং অব্যবস্থাপনা চলছে। সেই রিপোর্টে টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সহিদুল্লার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, আমাদের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে সরকার।’ ওই রিপোর্টে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সদস্য হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। তাদের এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের কথা না শুনুক, ক্ষতি নেই। দরকার হলে সরকার কমিটি ভেঙে দিক। কিন্তু মানুষের ভোগান্তি কমুক।’

এক মাস পেরোতে না পেরোতেই কমিটির সদস্যদের মধ্যে এমন হতাশা জেঁকে বসেছিল। এরপর এক বছরের বেশি সময় ধরে নানা সময়ে নানাভাবে এ কমিটির কোনো না কোনো সদস্যকে আমরা অন রেকর্ড ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেছি। বিশেষ করে মাত্র একটি কোম্পানির সঙ্গে টিকা নিয়ে চুক্তি করা, লকডাউন দেওয়ার সময় সেটিকে কার্যকর করার পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে তারা প্রকাশ্যেই তাদের পরামর্শ রাখা হচ্ছে না বলে জানিয়েছিলেন।

সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটেছে কয়েকদিন আগে। সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শ অগ্রাহ্য করে বিধিনিষেধ শিথিল করে দিল। সিদ্ধান্তটি এমন সময় নেওয়া হলো, যখন বাংলাদেশে সরকারি হিসাব মতেই করোনা শনাক্তকরণের হার ৩০ শতাংশের বেশি এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২০০-এর বেশি। পরিস্থিতি এ পূর্বাভাস খুব স্পষ্টভাবে দিচ্ছে, বাংলাদেশ বর্তমান ঢেউটির চূড়ার দিকে যাচ্ছে। পৃথিবীর করোনার ইতিহাসে চূড়ার দিকে যাওয়ার সময় লকডাউন খুলে দেওয়ার উদাহরণ হিসাবে আমাদের কথা আসবে নিশ্চয়ই। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এ কমিটির একাধিক সদস্য আলাদাভাবে পত্রিকায় এর বিরোধিতা করেছেন। কয়েকদিন পরে অবশ্য রীতিমতো পত্রিকায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে পুরো কমিটি এর প্রতিবাদ করেছে। তাতে তারা কুরবানির হাট বন্ধ করার কথাও পুনরুল্লেখ করেছেন।

সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে যুক্তি দেখিয়েছে, সেটি মিডিয়াকে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। সরকারের যুক্তি হচ্ছে মানুষকে ঈদুল-আজহার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে দেওয়া, এর সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক কর্মকা- চলতে দেওয়া এবং আগের ঈদগুলোয় মানুষের বাড়ি যাওয়া ঠেকাতে না পারার কারণে এবার আর সেটি না করা। সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হয়েছে, না অযৌক্তিক সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। আমি বলছি, কীভাবে এ সিদ্ধান্তগুলো আরও অনেক সমন্বিতভাবে করা যেতে পারত। আমরা যেভাবে করোনা মোকাবিলার চেষ্টা করছি, সেটি গোড়াতেই ভুল চিন্তার ফসল। নিশ্চিতভাবেই করোনার বিস্তার রোধ করার জন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (বিশেষ করে এপিডেমিওলজিস্ট), ভাইরোলজিস্ট, সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। মহামারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তার সঙ্গে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের বিশেষজ্ঞরা কাজ করবেন। তাদের সবাইকে নিয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠিত হবে।

আমেরিকার জাতীয় অ্যালার্জি এবং সংক্রামক ব্যাধি ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর এন্থনি ফাউচিকে চিনেছি আমরা করোনা মহামারির কারণেই। অনেক সময় আমরা দেখেছি করোনা নিয়ে ট্রাম্প যা বলছেন, মানুষকে যে ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেটার স্পষ্টভাবে বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন ফাউচি। এমনকি তিনি ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করছেন-এমন দৃশ্যেরও সাক্ষী হয়েছি আমরা।

একটা রাষ্ট্র যেভাবে কাজ করে তার এ ভূমিকা যদি আমরা বুঝি, তাহলে আমরা বুঝব টেকনিক্যাল কমিটির দেওয়া পরামর্শ যে কোনো দেশের পক্ষে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুরোপুরি পালন করা সম্ভব নাও হতে পারে। গত বছর করোনার শুরু হওয়ার পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন করোনা মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি তৈরি করে, যেটি পরিচিত ছিল, ‘হোয়াইট হাউস করোনাভাইরাস টাস্কফোর্স’ নামে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে নানা গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট সেক্টরের মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল এ টাস্কফোর্স।

করোনা নিয়ে যেহেতু ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আচরণে নানারকম উদাসীনতা দেখিয়েছিলেন, অনুমান করি সে কারণেই তিনি নিজে সেই কমিটিতে ছিলেন না। জো বাইডেন যেহেতু করোনাকে তার পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নিজেই করোনা মোকাবিলা সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হয়েছেন। করোনা মোকাবিলায় তার কমিটির নাম হচ্ছে ‘হোয়াইট হাউস কোভিড-১৯ রেসপন্স টিম’। এ কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন-মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্টের কাউন্সিলর, ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) কমিশনার, প্রেসিডেন্টের প্রধান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক, আমেরিকার সার্জন জেনারেল, সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের পরিচালক, কৌশলগত যোগাযোগ ও প্রচারের পরিচালক, ডিজিটাল মাধ্যম ও ডেটার পরিচালক, সরবরাহ ব্যবস্থার পরিচালক এবং টিকা সেবা প্রদান বিভাগের সমন্বয়ক।

এখানে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসাবে সর্বোচ্চ দুজন ব্যক্তি আছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ছাড়াও যোগাযোগ এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা আছেন। এ কমিটি যখন কোনো সিদ্ধান্তের জন্য বসে, প্রতিটি বিষয়ে আলোচনা করে তর্কবিতর্ক করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহীতার সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে নেওয়ার সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার আশঙ্কা নিশ্চিতভাবেই কম থাকে। সবচেয়ে জরুরি যেটি হয়, সেটি হচ্ছে এতে সমন্বয়হীনতার আশঙ্কা অনেক কমে।

দেশে আমরা দেখছি করোনা মোকাবিলায় একটি টেকনিক্যাল কমিটি আছে, যারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে। তারপর হয়তো সরকারের উচ্চপর্যায়ের কিছু মানুষ মিলে যেমন লকডাউন দেওয়া বা না দেওয়া, দিলেও সেটি কতটুকু ও কীভাবে কার্যকর করা হবে, চিকিৎসার সার্বিক পরিকল্পনা কী হবে ইত্যাদি করোনা মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সমস্যা হচ্ছে, সরকারি পর্যায়ে যখন এ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়, তখন সেটি নেওয়া হয় একেবারেই একতরফাভাবে। করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তাৎক্ষণিক মতামত দেওয়া বা যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ থাকে না।

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, নিশ্চিতভাবেই আমি মনে করছি না বা চাইছি না সরকার সব দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে একটি টাস্কফোর্স তৈরি করতে যাবে। কিন্তু করোনা মোকাবিলার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটা টাস্কফোর্স যদি হতো, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো ভিন্ন ফল দিতে পারত। সাম্প্রতিককালে সরকারের অতি আমলানির্ভরতা নিয়ে সরকারের বাইরে থেকে তো বটেই, সরকারি দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কথা বলছেন। হতে পারে করোনার ক্ষেত্রে এমন টাস্কফোর্স না হওয়াটাও আমলাদেরই পরিকল্পনার অংশ, যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন তারা।

করোনা চূড়ায় পৌঁছার সময় ঈদের আগে যেভাবে সবকিছু খুলে দেওয়া হলো, এ উৎসবের নানা কর্মকাণ্ড ঘিরে যেভাবে মানুষের জমায়েত হবে, সবকিছু করোনা পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে যাবে সন্দেহ নেই। এ পরিস্থিতিতে খুব দ্রুত একটি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠনই পারে ভবিষ্যতে করোনা মোকাবিলাকে সহজতর এবং ফলপ্রসূ করতে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

করোনা মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় টাস্কফোর্স

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
১৮ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শুরুতে এটি স্পষ্ট করে নিতে চাই, শিরোনাম দেখে কারও যাতে এই ভ্রান্ত ধারণা না হয় যে, দেশের সব দল-মতের মানুষকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় টাস্কফোর্স তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে। আমি আসলে কোন টাস্কফোর্সের কথা বলছি, তা নিয়ে আলোচনার আগে করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপ নিয়ে কয়েকটি কথা বলা যাক। করোনা মোকাবিলায় একটি জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল গত বছরের ১৯ এপ্রিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে এর সদস্য সচিব করা হলেও একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে এর প্রধান করা নিয়ে তখনই বিতর্ক হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, কমিটিতে জনস্বাস্থ্য এবং করোনা মহামারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অন্যান্য রোগের বিশেষজ্ঞ তুলনায় অনেক কম। দলীয় কিংবা অন্য প্রভাবের ভিত্তিতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করার উদাহরণ হয়ে থাকবে এ কমিটি।

করোনা মোকাবিলায় জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের এক মাসের বেশি সময় পার হওয়ার পর দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকায় এসেছিল করোনার পরীক্ষা, করোনা চিকিৎসা, হাসপাতালগুলোয় নন-করোনা রোগীদের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে নানারকম সমন্বয়হীনতা এবং অব্যবস্থাপনা চলছে। সেই রিপোর্টে টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সহিদুল্লার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, আমাদের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে সরকার।’ ওই রিপোর্টে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সদস্য হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। তাদের এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের কথা না শুনুক, ক্ষতি নেই। দরকার হলে সরকার কমিটি ভেঙে দিক। কিন্তু মানুষের ভোগান্তি কমুক।’

এক মাস পেরোতে না পেরোতেই কমিটির সদস্যদের মধ্যে এমন হতাশা জেঁকে বসেছিল। এরপর এক বছরের বেশি সময় ধরে নানা সময়ে নানাভাবে এ কমিটির কোনো না কোনো সদস্যকে আমরা অন রেকর্ড ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেছি। বিশেষ করে মাত্র একটি কোম্পানির সঙ্গে টিকা নিয়ে চুক্তি করা, লকডাউন দেওয়ার সময় সেটিকে কার্যকর করার পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে তারা প্রকাশ্যেই তাদের পরামর্শ রাখা হচ্ছে না বলে জানিয়েছিলেন।

সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটেছে কয়েকদিন আগে। সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শ অগ্রাহ্য করে বিধিনিষেধ শিথিল করে দিল। সিদ্ধান্তটি এমন সময় নেওয়া হলো, যখন বাংলাদেশে সরকারি হিসাব মতেই করোনা শনাক্তকরণের হার ৩০ শতাংশের বেশি এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২০০-এর বেশি। পরিস্থিতি এ পূর্বাভাস খুব স্পষ্টভাবে দিচ্ছে, বাংলাদেশ বর্তমান ঢেউটির চূড়ার দিকে যাচ্ছে। পৃথিবীর করোনার ইতিহাসে চূড়ার দিকে যাওয়ার সময় লকডাউন খুলে দেওয়ার উদাহরণ হিসাবে আমাদের কথা আসবে নিশ্চয়ই। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এ কমিটির একাধিক সদস্য আলাদাভাবে পত্রিকায় এর বিরোধিতা করেছেন। কয়েকদিন পরে অবশ্য রীতিমতো পত্রিকায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে পুরো কমিটি এর প্রতিবাদ করেছে। তাতে তারা কুরবানির হাট বন্ধ করার কথাও পুনরুল্লেখ করেছেন।

সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে যুক্তি দেখিয়েছে, সেটি মিডিয়াকে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। সরকারের যুক্তি হচ্ছে মানুষকে ঈদুল-আজহার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে দেওয়া, এর সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক কর্মকা- চলতে দেওয়া এবং আগের ঈদগুলোয় মানুষের বাড়ি যাওয়া ঠেকাতে না পারার কারণে এবার আর সেটি না করা। সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হয়েছে, না অযৌক্তিক সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। আমি বলছি, কীভাবে এ সিদ্ধান্তগুলো আরও অনেক সমন্বিতভাবে করা যেতে পারত। আমরা যেভাবে করোনা মোকাবিলার চেষ্টা করছি, সেটি গোড়াতেই ভুল চিন্তার ফসল। নিশ্চিতভাবেই করোনার বিস্তার রোধ করার জন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (বিশেষ করে এপিডেমিওলজিস্ট), ভাইরোলজিস্ট, সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। মহামারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তার সঙ্গে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের বিশেষজ্ঞরা কাজ করবেন। তাদের সবাইকে নিয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠিত হবে।

আমেরিকার জাতীয় অ্যালার্জি এবং সংক্রামক ব্যাধি ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর এন্থনি ফাউচিকে চিনেছি আমরা করোনা মহামারির কারণেই। অনেক সময় আমরা দেখেছি করোনা নিয়ে ট্রাম্প যা বলছেন, মানুষকে যে ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেটার স্পষ্টভাবে বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন ফাউচি। এমনকি তিনি ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করছেন-এমন দৃশ্যেরও সাক্ষী হয়েছি আমরা।

একটা রাষ্ট্র যেভাবে কাজ করে তার এ ভূমিকা যদি আমরা বুঝি, তাহলে আমরা বুঝব টেকনিক্যাল কমিটির দেওয়া পরামর্শ যে কোনো দেশের পক্ষে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুরোপুরি পালন করা সম্ভব নাও হতে পারে। গত বছর করোনার শুরু হওয়ার পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন করোনা মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি তৈরি করে, যেটি পরিচিত ছিল, ‘হোয়াইট হাউস করোনাভাইরাস টাস্কফোর্স’ নামে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে নানা গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট সেক্টরের মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল এ টাস্কফোর্স।

করোনা নিয়ে যেহেতু ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আচরণে নানারকম উদাসীনতা দেখিয়েছিলেন, অনুমান করি সে কারণেই তিনি নিজে সেই কমিটিতে ছিলেন না। জো বাইডেন যেহেতু করোনাকে তার পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নিজেই করোনা মোকাবিলা সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হয়েছেন। করোনা মোকাবিলায় তার কমিটির নাম হচ্ছে ‘হোয়াইট হাউস কোভিড-১৯ রেসপন্স টিম’। এ কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন-মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্টের কাউন্সিলর, ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) কমিশনার, প্রেসিডেন্টের প্রধান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক, আমেরিকার সার্জন জেনারেল, সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের পরিচালক, কৌশলগত যোগাযোগ ও প্রচারের পরিচালক, ডিজিটাল মাধ্যম ও ডেটার পরিচালক, সরবরাহ ব্যবস্থার পরিচালক এবং টিকা সেবা প্রদান বিভাগের সমন্বয়ক।

এখানে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসাবে সর্বোচ্চ দুজন ব্যক্তি আছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ছাড়াও যোগাযোগ এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা আছেন। এ কমিটি যখন কোনো সিদ্ধান্তের জন্য বসে, প্রতিটি বিষয়ে আলোচনা করে তর্কবিতর্ক করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহীতার সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে নেওয়ার সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার আশঙ্কা নিশ্চিতভাবেই কম থাকে। সবচেয়ে জরুরি যেটি হয়, সেটি হচ্ছে এতে সমন্বয়হীনতার আশঙ্কা অনেক কমে।

দেশে আমরা দেখছি করোনা মোকাবিলায় একটি টেকনিক্যাল কমিটি আছে, যারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে। তারপর হয়তো সরকারের উচ্চপর্যায়ের কিছু মানুষ মিলে যেমন লকডাউন দেওয়া বা না দেওয়া, দিলেও সেটি কতটুকু ও কীভাবে কার্যকর করা হবে, চিকিৎসার সার্বিক পরিকল্পনা কী হবে ইত্যাদি করোনা মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সমস্যা হচ্ছে, সরকারি পর্যায়ে যখন এ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়, তখন সেটি নেওয়া হয় একেবারেই একতরফাভাবে। করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তাৎক্ষণিক মতামত দেওয়া বা যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ থাকে না।

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, নিশ্চিতভাবেই আমি মনে করছি না বা চাইছি না সরকার সব দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে একটি টাস্কফোর্স তৈরি করতে যাবে। কিন্তু করোনা মোকাবিলার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটা টাস্কফোর্স যদি হতো, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো ভিন্ন ফল দিতে পারত। সাম্প্রতিককালে সরকারের অতি আমলানির্ভরতা নিয়ে সরকারের বাইরে থেকে তো বটেই, সরকারি দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কথা বলছেন। হতে পারে করোনার ক্ষেত্রে এমন টাস্কফোর্স না হওয়াটাও আমলাদেরই পরিকল্পনার অংশ, যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন তারা।

করোনা চূড়ায় পৌঁছার সময় ঈদের আগে যেভাবে সবকিছু খুলে দেওয়া হলো, এ উৎসবের নানা কর্মকাণ্ড ঘিরে যেভাবে মানুষের জমায়েত হবে, সবকিছু করোনা পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে যাবে সন্দেহ নেই। এ পরিস্থিতিতে খুব দ্রুত একটি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠনই পারে ভবিষ্যতে করোনা মোকাবিলাকে সহজতর এবং ফলপ্রসূ করতে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন