দুর্যোগ মোকাবিলা করছে ম্যানগ্রোভ
jugantor
দুর্যোগ মোকাবিলা করছে ম্যানগ্রোভ

  ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম  

১৮ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ম্যানগ্রোভ ঝোপজাতীয় ছোট গাছ, যা উপকূলীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। ম্যানগ্রোভকে লবণাক্তসহিষ্ণু গাছও বলা হয়ে থাকে। ওই গাছ উপকূলীয় অঞ্চলে মাটি ও পানিতে বিদ্যমান লবণের ঘনত্ব কমাতে সাহায্য করে থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ গাছ কর্তৃক লবণের ঘনত্ব কমানোকে প্রাকৃতিক ফিলট্রেশন বলা হয়ে থাকে। ম্যানগ্রোভের প্রায় ১১০টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৫৪টি প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ দৃশ্যমান রয়েছে। বিশ্বে ১০০টির বেশি অঞ্চলে ওই প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ জন্মায়। পৃথিবীর ৫ ডিগ্রি উত্তর এবং ৫ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে সবচেয়ে বেশি ম্যানগ্রোভ গাছ দৃশ্যমান রয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ম্যানগ্রোভ ১৪টির বেশি দেশে পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে এশিয়ায় ৪২ শতাংশ, আফ্রিকায় ২১ শতাংশ, উত্তর-মধ্য-আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ১৫ শতাংশ, ওশেনিয়ায় ১২ শতাংশ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ১০ শতাংশ রয়েছে।

সমগ্র বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৩৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রয়েছে। বিশ্বে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। সেখানে প্রায় ২৩ হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো যথাক্রমে ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ স্থানে রয়েছে। ফিলিপাইন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দিক থেকে রয়েছে ১০ম স্থানে। সেখানে প্রায় ২ হাজার ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশ্বে ১৫তম, যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫৫৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে।

ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৭৭৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৩১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ম্যানগ্রোভ বায়োমও রয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যতম বড় ম্যানগ্রোভ বন। বনটি প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। ওই বনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা রয়েছে বাংলাদেশে, বাকিটা ভারতে। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালের ৭ ডিসেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিবছর সুনামি ও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সুন্দরবন ওই ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমিয়ে মানুষকে ক্ষয়ক্ষতির আক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাকে। সুন্দরবনের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে সিডর ও আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ কম হয়েছিল। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সুন্দরবনের অবদান অনস্বীকার্য। এই ম্যানগ্রোভ বনে প্রায় ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪৯ প্রজাতির ম্যামালিয়ান, ৫৯ প্রজাতির রেপটাইলস, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির ক্র‌্যাব, ৪৩ প্রজাতির মোলাস্কা এবং ২৬০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ডলফিন, পাইথন ও কুমির বিলুপ্ত না হলেও অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবুও পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমারোহে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এ বন খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আশ্রয়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাছাড়া সুন্দরবন কাঠ, মধু, পাতা, ওষুধ ও মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের টেকসই জীবনযাপনে সহায়তা করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গ্রিনহাউজ গ্যাস কার্বন ডাইঅক্সাইডের অন্যতম ভূমিকা রয়েছে। বায়ুমণ্ডলে মানবসৃষ্ট এ গ্রিনহাউজ গ্যাসের বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ম্যানগ্রোভ বনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যটি ২০১৭ সালে হারিকেন ইরমার আঘাতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই অঙ্গরাজ্যের ম্যানগ্রোভ বন প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ক্ষতি কমাতে সাহায্য করেছিল। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১০০ গজ উচ্চতার একটি ম্যানগ্রোভ গাছ প্রায় ৬৬ শতাংশ ঢেউয়ের উচ্চতা কমাতে সাহায্য করে।

কাজেই ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। অন্যান্য বনের তুলনায় ম্যানগ্রোভ বন বায়ুমণ্ডলে চারগুণ বেশি কার্বন কমাতে সাহায্য করে। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমগ্র বিশ্বে ম্যানগ্রোভ বন কর্তৃক বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন টন কার্বন শোষিত হয়। মোটা দাগে বলা যায়, ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বায়ুমণ্ডলে নির্গত কার্বনের পরিমাণ কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

রেড প্রজাতির ম্যানগ্রোভ মাটিতে সোডিয়ামের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। এ ধরনের ম্যানগ্রোভের কোষে বিদ্যমান ভেক্যুলে লবণ জমা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভ গাছ এ পদ্ধতিতে মাটিতে প্রায় ৯০-৯৭ শতাংশ লবণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। ফলে অন্যান্য প্রজাতির গাছ যা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না, তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ অনেকটা পানিতে জন্মায় বিধায় মাটিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। অ্যানঅ্যারোবিক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেন গ্যাস নির্গত হওয়ায় মাটিতে নাইট্রেজেনের পরিমাণ কমে যায়। এ অবস্থায় ম্যানগ্রোভের বায়বীয় শেকড় সরাসরি বায়ু থেকে নাইট্রোজেন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে গাছের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সাহায্য করে থাকে। এভাবে ম্যানগ্রোভ বায়ুমণ্ডলে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানগুলোর চক্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

ম্যানগ্রোভ বন লবণাক্ততার প্রাদুর্ভাব কমিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের টেকসই জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তবুও ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণে বহু হুমকি রয়েছে। তবে উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, মৎস্যচাষ, কৃষি, বন ধ্বংস, লবণ উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ম্যানগ্রোভ গাছ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। যদি ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ করা না যায়, ভবিষ্যতে সমগ্র পৃথিবীতে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। ফলে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃত সুন্দরবনের স্বীকৃতিও অনেকটা অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে সুন্দরবনে বিদ্যমান ম্যানগ্রোভের সম্প্রসারণে তার সরকারকে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন, যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ করতে হবে। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ, আশ্রয়ণে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অপূরণীয় ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাই ম্যানগ্রোভ বনের সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে আমাদের।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

mohammad.alam@wsu.edu

দুর্যোগ মোকাবিলা করছে ম্যানগ্রোভ

 ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম 
১৮ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ম্যানগ্রোভ ঝোপজাতীয় ছোট গাছ, যা উপকূলীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। ম্যানগ্রোভকে লবণাক্তসহিষ্ণু গাছও বলা হয়ে থাকে। ওই গাছ উপকূলীয় অঞ্চলে মাটি ও পানিতে বিদ্যমান লবণের ঘনত্ব কমাতে সাহায্য করে থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ গাছ কর্তৃক লবণের ঘনত্ব কমানোকে প্রাকৃতিক ফিলট্রেশন বলা হয়ে থাকে। ম্যানগ্রোভের প্রায় ১১০টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৫৪টি প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ দৃশ্যমান রয়েছে। বিশ্বে ১০০টির বেশি অঞ্চলে ওই প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ জন্মায়। পৃথিবীর ৫ ডিগ্রি উত্তর এবং ৫ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে সবচেয়ে বেশি ম্যানগ্রোভ গাছ দৃশ্যমান রয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ম্যানগ্রোভ ১৪টির বেশি দেশে পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে এশিয়ায় ৪২ শতাংশ, আফ্রিকায় ২১ শতাংশ, উত্তর-মধ্য-আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ১৫ শতাংশ, ওশেনিয়ায় ১২ শতাংশ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ১০ শতাংশ রয়েছে।

সমগ্র বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৩৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রয়েছে। বিশ্বে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। সেখানে প্রায় ২৩ হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো যথাক্রমে ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ স্থানে রয়েছে। ফিলিপাইন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দিক থেকে রয়েছে ১০ম স্থানে। সেখানে প্রায় ২ হাজার ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশ্বে ১৫তম, যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫৫৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে।

ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৭৭৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৩১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ম্যানগ্রোভ বায়োমও রয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যতম বড় ম্যানগ্রোভ বন। বনটি প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। ওই বনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা রয়েছে বাংলাদেশে, বাকিটা ভারতে। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালের ৭ ডিসেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিবছর সুনামি ও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সুন্দরবন ওই ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমিয়ে মানুষকে ক্ষয়ক্ষতির আক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাকে। সুন্দরবনের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে সিডর ও আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ কম হয়েছিল। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সুন্দরবনের অবদান অনস্বীকার্য। এই ম্যানগ্রোভ বনে প্রায় ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪৯ প্রজাতির ম্যামালিয়ান, ৫৯ প্রজাতির রেপটাইলস, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির ক্র‌্যাব, ৪৩ প্রজাতির মোলাস্কা এবং ২৬০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ডলফিন, পাইথন ও কুমির বিলুপ্ত না হলেও অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবুও পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমারোহে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এ বন খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আশ্রয়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাছাড়া সুন্দরবন কাঠ, মধু, পাতা, ওষুধ ও মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের টেকসই জীবনযাপনে সহায়তা করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গ্রিনহাউজ গ্যাস কার্বন ডাইঅক্সাইডের অন্যতম ভূমিকা রয়েছে। বায়ুমণ্ডলে মানবসৃষ্ট এ গ্রিনহাউজ গ্যাসের বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ম্যানগ্রোভ বনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যটি ২০১৭ সালে হারিকেন ইরমার আঘাতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই অঙ্গরাজ্যের ম্যানগ্রোভ বন প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ক্ষতি কমাতে সাহায্য করেছিল। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১০০ গজ উচ্চতার একটি ম্যানগ্রোভ গাছ প্রায় ৬৬ শতাংশ ঢেউয়ের উচ্চতা কমাতে সাহায্য করে।

কাজেই ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। অন্যান্য বনের তুলনায় ম্যানগ্রোভ বন বায়ুমণ্ডলে চারগুণ বেশি কার্বন কমাতে সাহায্য করে। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমগ্র বিশ্বে ম্যানগ্রোভ বন কর্তৃক বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন টন কার্বন শোষিত হয়। মোটা দাগে বলা যায়, ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বায়ুমণ্ডলে নির্গত কার্বনের পরিমাণ কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

রেড প্রজাতির ম্যানগ্রোভ মাটিতে সোডিয়ামের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। এ ধরনের ম্যানগ্রোভের কোষে বিদ্যমান ভেক্যুলে লবণ জমা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভ গাছ এ পদ্ধতিতে মাটিতে প্রায় ৯০-৯৭ শতাংশ লবণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। ফলে অন্যান্য প্রজাতির গাছ যা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না, তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ অনেকটা পানিতে জন্মায় বিধায় মাটিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। অ্যানঅ্যারোবিক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেন গ্যাস নির্গত হওয়ায় মাটিতে নাইট্রেজেনের পরিমাণ কমে যায়। এ অবস্থায় ম্যানগ্রোভের বায়বীয় শেকড় সরাসরি বায়ু থেকে নাইট্রোজেন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে গাছের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সাহায্য করে থাকে। এভাবে ম্যানগ্রোভ বায়ুমণ্ডলে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানগুলোর চক্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

ম্যানগ্রোভ বন লবণাক্ততার প্রাদুর্ভাব কমিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের টেকসই জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তবুও ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণে বহু হুমকি রয়েছে। তবে উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, মৎস্যচাষ, কৃষি, বন ধ্বংস, লবণ উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ম্যানগ্রোভ গাছ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। যদি ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ করা না যায়, ভবিষ্যতে সমগ্র পৃথিবীতে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। ফলে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃত সুন্দরবনের স্বীকৃতিও অনেকটা অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে সুন্দরবনে বিদ্যমান ম্যানগ্রোভের সম্প্রসারণে তার সরকারকে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন, যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ করতে হবে। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ, আশ্রয়ণে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অপূরণীয় ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাই ম্যানগ্রোভ বনের সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে আমাদের।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

mohammad.alam@wsu.edu

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন