ঈদে করোনা সংক্রমণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি
jugantor
ঈদে করোনা সংক্রমণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিবন্ধের সূচনায় অকুতোভয় ও অবিচল নিষ্ঠার প্রতীক দেশবরেণ্য শিল্প-গণমাধ্যম উদ্যোক্তা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর হৃদয়জয়ী যুগান্তর পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় জনাব নুরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবসের বর্ষস্মরণে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। ধরিত্রীর যে কোনো অপ্রত্যাশিত-অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আড়ালে বিজ্ঞানীদের ‘নিমিত্তবাদ’ প্রত্যয় অনুসারে সব ঘটনাই কোনো না কোনো নিয়মের অধীন।

অজ্ঞাত বা বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণে ঘটমান-বর্তমানের যথার্থ অনুসন্ধান সম্পূরক-পরিপূরক মোড়কে অনাবিষ্কৃতও থাকতে পারে। বৈজ্ঞানিক নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বিশ্বাস করে আজকের অজানা বিষয়টি চিরকাল অজ্ঞেয় থাকতে পারে না। সময়ের ব্যবধানে সংঘটিত যে কোনো রহস্যাবৃত বিষয়ের প্রকৃতি-পরিধি উন্মোচিত হবে-এটিই ইতিহাসের শিক্ষা। সাম্প্রতিককালে করোনার ডেল্টা প্রকরণের প্রচণ্ড তাণ্ডব বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে সংক্রমণ বিস্তার ও প্রাণসংহারে নবতর রেকর্ড স্থাপন করেছে।

চরম উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠায় বিশ্ববাসীর শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক আর্তনাদ নিদারুণ ক্ষত-বিক্ষতের করুণ অধ্যায় প্রণীত করে চলেছে। এ কঠিন মহাদুর্যোগ প্রতিরোধে জনগণের সচেতনতাই মূল অনুষঙ্গ হিসাবে চিহ্নিত। অত্যাসন্ন ঈদুল-আজহা উদযাপনে সংশ্লিষ্ট রীতিনীতির প্রতিপালন যাতে সংক্রমণ বিস্তার ও প্রাণনিধনের পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বমুখী করে বাংলাদেশকে পর্যুদস্ত করতে না পারে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকার কর্তৃক নির্দেশিত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিভিন্ন বিধিনিষেধ কোনোভাবেই উপেক্ষিত হওয়া সমীচীন নয়।

অন্যথায় ভয়াবহ অনিবার্য পরিণতি পুরো জাতিরাষ্ট্রে দারিদ্র্য-কর্মহীনতা ও ক্ষুধার অভিশপ্ত দৃশ্যপট তৈরি করবে-নিঃসন্দেহে তা বলা যায়। কবি সুকান্ত যেমন লিখেছেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ উচ্চারণে জাতিকে নির্মম কাতরতায় যন্ত্রণামুক্ত করার উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।

পবিত্র ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সব ধার্মিক নাগরিক মহান স্রষ্টার নির্দেশিত বিধানগুলো সামর্থ্য অনুযায়ী অনুসরণ করতে অবশ্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সংকটকালীন পবিত্র ধর্মের আনুষঙ্গিক কার্যকলাপ-জীবনধারা পরিবর্তনেরও বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে।

মহান স্রষ্টা বিশেষ মাসগুলোকে বছরের শ্রেষ্ঠ সময়কাল হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে-শ্রেষ্ঠ কিতাব পবিত্র কুরআন মজিদ প্রবর্তনের কারণে রমজাম মাস, পবিত্র আরাফার কারণে বছরের শ্রেষ্ঠ দিন, শ্রেষ্ঠ দশ রাত্রি হলো রমজানের আখেরি দশ রাত্রি ও বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দশ দিন হচ্ছে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। ইসলামের মূল রোকন রোজার পরই হজের অবস্থান।

এ জিলহজ মাসেই নির্দিষ্ট দিনগুলোয় হাজিরা পবিত্র কাবা শরিফ ও তার নিকটবর্তী আরাফা-মিনা-মুজদালিফাসহ কয়েকটি পবিত্রতম স্থানে মহান আল্লাহ ও তার প্রিয় রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ মোতাবেক অবস্থান ও কার্যাদি নিবিড় একাত্মতার সঙ্গে এবং কায়মনোবাক্যে সব পাপমোচনের প্রার্থনা জানিয়ে হজব্রত পালন করেন। সুস্থ ও ভ্রমণে সক্ষম ব্যক্তি সম্পূর্ণ বৈধ বা হালাল উপার্জনে প্রয়োজনীয় খরচ বহন করার ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের হজব্রত পালন করা ইসলাম ধর্মে ফরজ বা বাধ্যতামূলক কর্তব্য হিসাবে নির্ধারিত।

বৈধ ও অবৈধ উপার্জনের যথার্থ বিভাজন নির্ণয় ব্যতিরেকে অনৈতিক ও ইসলামে অনুমোদনহীন পন্থায় অর্জিত অর্থে প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যয় এবং কার্যক্রম কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের প্রিয় নবি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অতিশিগগিরই একটি সময় এরকম আসছে, যখন মানুষ এর কোনো পরোয়া করবে না যে, সম্পদ বৈধ কিংবা অবৈধ।’ [বুখারি : ২০৫৯, আবু হুরাইরা (রা.)] অতএব এ সম্পর্কে যথার্থ সজাগ থাকা এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

মূলত আরবি শব্দ ‘কুরবাতুন’ বা ‘কুরবান’ থেকে কুরবানি শব্দের উৎপত্তি; যার অর্থ পরিপূর্ণ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। প্রতিবছর আরবি মাসের ১০ জিলহজ ঈদুল-আজহা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে উপস্থিত হয় কুরবানির অফুরন্ত আনন্দ সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে। এ দিন বিশ্বের সব ধর্মপ্রাণ মুসলমান বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় হজরত ইব্রাহীম (আ.) প্রবর্তিত ত্যাগ ও কুরবানির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঈদুল-আজহা উদযাপন করে থাকে।

কুরবানি সম্পর্কে আল্লাহপাক কুরআন মজিদে ঘোষণা করেছেন, ‘সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম কর এবং কুরবানি কর’ (সুরা আল-কাউসার-২)। হাদিস শরিফের বর্ণনা মতে, আমাদের প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর দেখলেন মদিনাবাসী খেলাধুলার মধ্যে দুটি দিবস উদ্যাপন করে থাকে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা এ দুটি উৎসব উদ্যাপন কর কেন?’ তারা বলল, ‘এ দুটি দিবস জাহেলি যুগ থেকে আমরা খেলাধুলার মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করে থাকি।’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একটি হলো, ঈদুল-আজহা এবং অপরটি হলো ঈদুলফিতর’ (আবু দাঊদ)।

গবেষকদের বক্তব্য সূত্রে জানা যায়, তারা বিশ্বের ২৬টি জাতির ২ হাজার ৫০০-এর বেশি জিন নিয়ে বিশেষ ধরনের বিশ্লেষণে ৪২টি ভিন্ন জিনে বিশেষ ধরনের প্রোটিনের সংকেত পেয়েছেন। তাদের ভাষায় ‘ভাইরাস ইন্টারেকটিং প্রোটিনসের (ভিআইপি)’ সংকেতপ্রাপ্ত পাঁচটি জাতির সবাই পূর্ব এশিয়ার নাগরিক। তারা এও দাবি করেছেন, ওই ভিআইপিগুলোর সঙ্গে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের সংযোগ ছিল এবং পরিপ্রেক্ষিত অনুধাবনে বর্তমান অতিমারির দ্রুততর সময়ের মধ্যে সর্বত্রই সংক্রমণের অদমনীয় বিস্তার সম্ভব হয়েছে।

ইউএনএফপিএ-এর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক বিয়র্ন অ্যান্ডারসনের ভাষায়, দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র-হতদরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য দীর্ঘকাল সময় প্রচলিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা-পুষ্টি ও টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় বৈষম্য গভীর হচ্ছে এবং এটি প্রসূতি মায়ের ও নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া এ অঞ্চলে বাড়তি ৩৫ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে অতিমারির কারণে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধির মাত্রা জনস্বাস্থ্যকে আরও নাজুক করে তুলেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

অতিমারি শুরুর পর থেকে চালু করা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্পকে স্বাগত জানানো হলেও এসব প্রকল্পের নিগূঢ় মূল্যায়ন এবং দরিদ্রতম ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তা প্রদান কর্মসূচির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ২৩ জুন সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়-সাধারণ মানুষ সহযোগিতা না করলে বাংলাদেশের কোভিড পরিস্থিতি শোচনীয় হতে পারে।

সংস্থার মতানুসারে, বাংলাদেশে প্রথম থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের হার ১৩ শতাংশের মতো হলেও গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৃত্যু ও সংক্রমণ শনাক্তের হার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণমাধ্যম সূত্রে দেশবাসী অবগত আছেন, সমকালীন সংক্রমণ ও মৃত্যুহার প্রতিনিয়তই ধারা পরিবর্তনে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করছে। বিগত প্রায় প্রতিদিনই গড়ে শতাধিক মৃত্যু এবং সর্বোচ্চ ২৩০ প্রাণহানির ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ এবং তদানুসারে পর্যাপ্ত শয্যা-অক্সিজেন-সরঞ্জামাদি-লোকবল ইত্যাদি নগর-গ্রাম, ধনী-গরিব নির্বিশেষে নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রণোদনা-সাহায্য-সহযোগিতা, বিশেষ করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশনাগুলো যথার্থ অর্থে কার্যকর করা যাচ্ছে না। বিশিষ্টজনদের ধারণায় এর মূল কারণ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দুর্বল সমন্বয়। প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সহজবোধ্য প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যগুলো দেশবাসী অবিচল আস্থার সঙ্গে গ্রহণ করছেন বলেই ধারণা করা যায়।

স্বাস্থ্য-পররাষ্ট্র-জনপ্রশাসন সম্পর্কিত বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তির বক্তব্যে লকডাউন-শাটডাউন, সীমিত-কঠোর, দিনক্ষণ-তারিখ ইত্যাদির ঘোষণা এবং বাচনিক বিষয়গুলো কেন জানি সাংঘর্ষিক ও বিভ্রান্তিমূলক মনস্তত্ত্ব নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ক্ষেত্রবিশেষে পরিবর্তনশীল ও সামঞ্জস্যহীন কর্মপরিকল্পনা মানুষের গতিবিধি, নগর-গ্রাম-আঞ্চলিক স্থানান্তরে অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন জনগণ করোনা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ব্যবস্থাগুলো অবজ্ঞা করে চলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের কারণে তরুণ শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মহত্যা-হত্যা-মাদকসেবন-অসামাজিক অপকর্ম ইত্যাদি অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি করে চলেছে।

সচেতনতাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান অনুষঙ্গ হলেও এর প্রায়োগিক কৌশলপত্র বাস্তব অর্থে সুফল বয়ে আনছে কি না, তার বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা আবশ্যক। শহর বা গ্রামে গণমানুষকে পর্যাপ্ত সচেতন করার লক্ষ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি-জনপ্রশাসন-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাস্তবসম্মত সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। গ্রাম-নগর নির্বিশেষে প্রত্যেক জনপদে তৃণমূল-প্রান্তিক পর্যায়ে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডাকেন্দ্রিক কমিটিগুলোকে সচল করে এলাকার সচেতন নাগরিকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।

সামগ্রিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিবার-সমাজ-পাড়াভিত্তিক সংক্রমিত ব্যক্তি-ঘর-অঞ্চলগুলোকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে সংক্রমণের বিস্তার রোধ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যখন যেখানে যা প্রয়োজন, কাঠামোগত পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় সম্মিলিত উদ্যোগে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। জন-অধ্যুষিত প্রতিটি অঞ্চলকে জোন হিসাবে বিভক্ত করে পর্যাপ্ত সচেতনতামূলক পন্থা অবলম্বন ও টিকা প্রয়োগ যথাসময়ে টিকা সংগ্রহের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা না গেলে সংকট অধিকতর ঘনীভূত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

গার্মেন্টস বা অন্যান্য শিল্প-কারখানা বা চলমান রাখা আর্থিক খাতগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিবিড় মনোযোগ-পর্যবেক্ষণ-তদারকি প্রয়োজন। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলোর অপ্রতুল লোকবল-সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে এককভাবে এর প্রতিরোধ কষ্টসাধ্য বিষয়। আপামর জনগণের নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণ-সহমর্মিতা-সহযোগিতা-নিখাদ সমর্থন অবশ্যই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মোদ্দা কথা, সমন্বয়হীনতার অদক্ষতা-অযোগ্যতা ও দুর্বলতাগুলোর সঠিক চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার অনুসন্ধানে যথাযথ সমন্বয় সমধিক তাৎপর্যপূর্ণ।

অতি সম্প্রতি করোনার দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসাবে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পাঁচটি খাতে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা অতিশয় প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দরিদ্র-হতদরিদ্র-নিম্নবিত্ত-কর্মহীন-ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রদত্ত এ অর্থ সঠিক ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন উপকৃত হয়, যথোপযুক্ত তত্ত্বাবধান-তদারকি-বিতরণ ইত্যাদি সততা-স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অনবদ্য দৃষ্টান্ত নির্মাণে সহায়ক অবদান রাখতে পারে।

মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মানবতা-মহানুভবতার কর্মকৌশল আশ্রয়ণ প্রকল্পের মতো অসাধু দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে সরকারের অসাধারণ কর্মপরিকল্পনাগুলো যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। ঈদ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে লকডাউনের শিথিলতা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশনা অবজ্ঞা করার বিষয়ে বিশেষ নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে পরবর্তী সময়ে যতই কঠোর লকডাউনের কথা বলা হোক না কেন, ঈদ উদ্যাপনকালে সংক্রমণ বৃদ্ধির অনিবার্য পরিণতি ঠেকানো শুধু দুরূহ হবে না; জাতিকে যারপরনাই দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করবে, যা মোটেই কাম্য নয়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদে করোনা সংক্রমণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
১৯ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিবন্ধের সূচনায় অকুতোভয় ও অবিচল নিষ্ঠার প্রতীক দেশবরেণ্য শিল্প-গণমাধ্যম উদ্যোক্তা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর হৃদয়জয়ী যুগান্তর পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় জনাব নুরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবসের বর্ষস্মরণে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। ধরিত্রীর যে কোনো অপ্রত্যাশিত-অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আড়ালে বিজ্ঞানীদের ‘নিমিত্তবাদ’ প্রত্যয় অনুসারে সব ঘটনাই কোনো না কোনো নিয়মের অধীন।

অজ্ঞাত বা বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণে ঘটমান-বর্তমানের যথার্থ অনুসন্ধান সম্পূরক-পরিপূরক মোড়কে অনাবিষ্কৃতও থাকতে পারে। বৈজ্ঞানিক নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বিশ্বাস করে আজকের অজানা বিষয়টি চিরকাল অজ্ঞেয় থাকতে পারে না। সময়ের ব্যবধানে সংঘটিত যে কোনো রহস্যাবৃত বিষয়ের প্রকৃতি-পরিধি উন্মোচিত হবে-এটিই ইতিহাসের শিক্ষা। সাম্প্রতিককালে করোনার ডেল্টা প্রকরণের প্রচণ্ড তাণ্ডব বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে সংক্রমণ বিস্তার ও প্রাণসংহারে নবতর রেকর্ড স্থাপন করেছে।

চরম উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠায় বিশ্ববাসীর শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক আর্তনাদ নিদারুণ ক্ষত-বিক্ষতের করুণ অধ্যায় প্রণীত করে চলেছে। এ কঠিন মহাদুর্যোগ প্রতিরোধে জনগণের সচেতনতাই মূল অনুষঙ্গ হিসাবে চিহ্নিত। অত্যাসন্ন ঈদুল-আজহা উদযাপনে সংশ্লিষ্ট রীতিনীতির প্রতিপালন যাতে সংক্রমণ বিস্তার ও প্রাণনিধনের পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বমুখী করে বাংলাদেশকে পর্যুদস্ত করতে না পারে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকার কর্তৃক নির্দেশিত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিভিন্ন বিধিনিষেধ কোনোভাবেই উপেক্ষিত হওয়া সমীচীন নয়।

অন্যথায় ভয়াবহ অনিবার্য পরিণতি পুরো জাতিরাষ্ট্রে দারিদ্র্য-কর্মহীনতা ও ক্ষুধার অভিশপ্ত দৃশ্যপট তৈরি করবে-নিঃসন্দেহে তা বলা যায়। কবি সুকান্ত যেমন লিখেছেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ উচ্চারণে জাতিকে নির্মম কাতরতায় যন্ত্রণামুক্ত করার উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।

পবিত্র ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সব ধার্মিক নাগরিক মহান স্রষ্টার নির্দেশিত বিধানগুলো সামর্থ্য অনুযায়ী অনুসরণ করতে অবশ্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সংকটকালীন পবিত্র ধর্মের আনুষঙ্গিক কার্যকলাপ-জীবনধারা পরিবর্তনেরও বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে।

মহান স্রষ্টা বিশেষ মাসগুলোকে বছরের শ্রেষ্ঠ সময়কাল হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে-শ্রেষ্ঠ কিতাব পবিত্র কুরআন মজিদ প্রবর্তনের কারণে রমজাম মাস, পবিত্র আরাফার কারণে বছরের শ্রেষ্ঠ দিন, শ্রেষ্ঠ দশ রাত্রি হলো রমজানের আখেরি দশ রাত্রি ও বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দশ দিন হচ্ছে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। ইসলামের মূল রোকন রোজার পরই হজের অবস্থান।

এ জিলহজ মাসেই নির্দিষ্ট দিনগুলোয় হাজিরা পবিত্র কাবা শরিফ ও তার নিকটবর্তী আরাফা-মিনা-মুজদালিফাসহ কয়েকটি পবিত্রতম স্থানে মহান আল্লাহ ও তার প্রিয় রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ মোতাবেক অবস্থান ও কার্যাদি নিবিড় একাত্মতার সঙ্গে এবং কায়মনোবাক্যে সব পাপমোচনের প্রার্থনা জানিয়ে হজব্রত পালন করেন। সুস্থ ও ভ্রমণে সক্ষম ব্যক্তি সম্পূর্ণ বৈধ বা হালাল উপার্জনে প্রয়োজনীয় খরচ বহন করার ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের হজব্রত পালন করা ইসলাম ধর্মে ফরজ বা বাধ্যতামূলক কর্তব্য হিসাবে নির্ধারিত।

বৈধ ও অবৈধ উপার্জনের যথার্থ বিভাজন নির্ণয় ব্যতিরেকে অনৈতিক ও ইসলামে অনুমোদনহীন পন্থায় অর্জিত অর্থে প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যয় এবং কার্যক্রম কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের প্রিয় নবি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অতিশিগগিরই একটি সময় এরকম আসছে, যখন মানুষ এর কোনো পরোয়া করবে না যে, সম্পদ বৈধ কিংবা অবৈধ।’ [বুখারি : ২০৫৯, আবু হুরাইরা (রা.)] অতএব এ সম্পর্কে যথার্থ সজাগ থাকা এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

মূলত আরবি শব্দ ‘কুরবাতুন’ বা ‘কুরবান’ থেকে কুরবানি শব্দের উৎপত্তি; যার অর্থ পরিপূর্ণ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। প্রতিবছর আরবি মাসের ১০ জিলহজ ঈদুল-আজহা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে উপস্থিত হয় কুরবানির অফুরন্ত আনন্দ সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে। এ দিন বিশ্বের সব ধর্মপ্রাণ মুসলমান বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় হজরত ইব্রাহীম (আ.) প্রবর্তিত ত্যাগ ও কুরবানির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঈদুল-আজহা উদযাপন করে থাকে।

কুরবানি সম্পর্কে আল্লাহপাক কুরআন মজিদে ঘোষণা করেছেন, ‘সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম কর এবং কুরবানি কর’ (সুরা আল-কাউসার-২)। হাদিস শরিফের বর্ণনা মতে, আমাদের প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর দেখলেন মদিনাবাসী খেলাধুলার মধ্যে দুটি দিবস উদ্যাপন করে থাকে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা এ দুটি উৎসব উদ্যাপন কর কেন?’ তারা বলল, ‘এ দুটি দিবস জাহেলি যুগ থেকে আমরা খেলাধুলার মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করে থাকি।’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একটি হলো, ঈদুল-আজহা এবং অপরটি হলো ঈদুলফিতর’ (আবু দাঊদ)।

গবেষকদের বক্তব্য সূত্রে জানা যায়, তারা বিশ্বের ২৬টি জাতির ২ হাজার ৫০০-এর বেশি জিন নিয়ে বিশেষ ধরনের বিশ্লেষণে ৪২টি ভিন্ন জিনে বিশেষ ধরনের প্রোটিনের সংকেত পেয়েছেন। তাদের ভাষায় ‘ভাইরাস ইন্টারেকটিং প্রোটিনসের (ভিআইপি)’ সংকেতপ্রাপ্ত পাঁচটি জাতির সবাই পূর্ব এশিয়ার নাগরিক। তারা এও দাবি করেছেন, ওই ভিআইপিগুলোর সঙ্গে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের সংযোগ ছিল এবং পরিপ্রেক্ষিত অনুধাবনে বর্তমান অতিমারির দ্রুততর সময়ের মধ্যে সর্বত্রই সংক্রমণের অদমনীয় বিস্তার সম্ভব হয়েছে।

ইউএনএফপিএ-এর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক বিয়র্ন অ্যান্ডারসনের ভাষায়, দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র-হতদরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য দীর্ঘকাল সময় প্রচলিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা-পুষ্টি ও টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় বৈষম্য গভীর হচ্ছে এবং এটি প্রসূতি মায়ের ও নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া এ অঞ্চলে বাড়তি ৩৫ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে অতিমারির কারণে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধির মাত্রা জনস্বাস্থ্যকে আরও নাজুক করে তুলেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

অতিমারি শুরুর পর থেকে চালু করা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্পকে স্বাগত জানানো হলেও এসব প্রকল্পের নিগূঢ় মূল্যায়ন এবং দরিদ্রতম ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তা প্রদান কর্মসূচির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ২৩ জুন সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়-সাধারণ মানুষ সহযোগিতা না করলে বাংলাদেশের কোভিড পরিস্থিতি শোচনীয় হতে পারে।

সংস্থার মতানুসারে, বাংলাদেশে প্রথম থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের হার ১৩ শতাংশের মতো হলেও গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৃত্যু ও সংক্রমণ শনাক্তের হার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণমাধ্যম সূত্রে দেশবাসী অবগত আছেন, সমকালীন সংক্রমণ ও মৃত্যুহার প্রতিনিয়তই ধারা পরিবর্তনে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করছে। বিগত প্রায় প্রতিদিনই গড়ে শতাধিক মৃত্যু এবং সর্বোচ্চ ২৩০ প্রাণহানির ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ এবং তদানুসারে পর্যাপ্ত শয্যা-অক্সিজেন-সরঞ্জামাদি-লোকবল ইত্যাদি নগর-গ্রাম, ধনী-গরিব নির্বিশেষে নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রণোদনা-সাহায্য-সহযোগিতা, বিশেষ করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশনাগুলো যথার্থ অর্থে কার্যকর করা যাচ্ছে না। বিশিষ্টজনদের ধারণায় এর মূল কারণ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দুর্বল সমন্বয়। প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সহজবোধ্য প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যগুলো দেশবাসী অবিচল আস্থার সঙ্গে গ্রহণ করছেন বলেই ধারণা করা যায়।

স্বাস্থ্য-পররাষ্ট্র-জনপ্রশাসন সম্পর্কিত বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তির বক্তব্যে লকডাউন-শাটডাউন, সীমিত-কঠোর, দিনক্ষণ-তারিখ ইত্যাদির ঘোষণা এবং বাচনিক বিষয়গুলো কেন জানি সাংঘর্ষিক ও বিভ্রান্তিমূলক মনস্তত্ত্ব নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ক্ষেত্রবিশেষে পরিবর্তনশীল ও সামঞ্জস্যহীন কর্মপরিকল্পনা মানুষের গতিবিধি, নগর-গ্রাম-আঞ্চলিক স্থানান্তরে অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন জনগণ করোনা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ব্যবস্থাগুলো অবজ্ঞা করে চলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের কারণে তরুণ শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মহত্যা-হত্যা-মাদকসেবন-অসামাজিক অপকর্ম ইত্যাদি অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি করে চলেছে।

সচেতনতাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান অনুষঙ্গ হলেও এর প্রায়োগিক কৌশলপত্র বাস্তব অর্থে সুফল বয়ে আনছে কি না, তার বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা আবশ্যক। শহর বা গ্রামে গণমানুষকে পর্যাপ্ত সচেতন করার লক্ষ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি-জনপ্রশাসন-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাস্তবসম্মত সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। গ্রাম-নগর নির্বিশেষে প্রত্যেক জনপদে তৃণমূল-প্রান্তিক পর্যায়ে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডাকেন্দ্রিক কমিটিগুলোকে সচল করে এলাকার সচেতন নাগরিকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।

সামগ্রিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিবার-সমাজ-পাড়াভিত্তিক সংক্রমিত ব্যক্তি-ঘর-অঞ্চলগুলোকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে সংক্রমণের বিস্তার রোধ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যখন যেখানে যা প্রয়োজন, কাঠামোগত পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় সম্মিলিত উদ্যোগে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। জন-অধ্যুষিত প্রতিটি অঞ্চলকে জোন হিসাবে বিভক্ত করে পর্যাপ্ত সচেতনতামূলক পন্থা অবলম্বন ও টিকা প্রয়োগ যথাসময়ে টিকা সংগ্রহের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা না গেলে সংকট অধিকতর ঘনীভূত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

গার্মেন্টস বা অন্যান্য শিল্প-কারখানা বা চলমান রাখা আর্থিক খাতগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিবিড় মনোযোগ-পর্যবেক্ষণ-তদারকি প্রয়োজন। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলোর অপ্রতুল লোকবল-সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে এককভাবে এর প্রতিরোধ কষ্টসাধ্য বিষয়। আপামর জনগণের নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণ-সহমর্মিতা-সহযোগিতা-নিখাদ সমর্থন অবশ্যই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মোদ্দা কথা, সমন্বয়হীনতার অদক্ষতা-অযোগ্যতা ও দুর্বলতাগুলোর সঠিক চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার অনুসন্ধানে যথাযথ সমন্বয় সমধিক তাৎপর্যপূর্ণ।

অতি সম্প্রতি করোনার দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসাবে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পাঁচটি খাতে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা অতিশয় প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দরিদ্র-হতদরিদ্র-নিম্নবিত্ত-কর্মহীন-ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রদত্ত এ অর্থ সঠিক ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন উপকৃত হয়, যথোপযুক্ত তত্ত্বাবধান-তদারকি-বিতরণ ইত্যাদি সততা-স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অনবদ্য দৃষ্টান্ত নির্মাণে সহায়ক অবদান রাখতে পারে।

মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মানবতা-মহানুভবতার কর্মকৌশল আশ্রয়ণ প্রকল্পের মতো অসাধু দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে সরকারের অসাধারণ কর্মপরিকল্পনাগুলো যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। ঈদ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে লকডাউনের শিথিলতা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশনা অবজ্ঞা করার বিষয়ে বিশেষ নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে পরবর্তী সময়ে যতই কঠোর লকডাউনের কথা বলা হোক না কেন, ঈদ উদ্যাপনকালে সংক্রমণ বৃদ্ধির অনিবার্য পরিণতি ঠেকানো শুধু দুরূহ হবে না; জাতিকে যারপরনাই দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করবে, যা মোটেই কাম্য নয়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন