ঐতিহ্যের নবায়নই সংস্কার

  বিমল সরকার ০৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোটাবিরোধী

‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

কবির তেজোদ্দীপ্ত ও দিকনির্দেশনামূলক কথামালার সঙ্গে এখানে আমি খানিকটা যোগ করে বলতে চাই- এখন যৌবন যার, নিজেকে কাজে নিযুক্ত করার তার শ্রেষ্ঠ সময়। এখন যৌবন যার, দেশ ও জাতির কল্যাণে মনোনিবেশ করার তার শ্রেষ্ঠ সময়। অথচ এই যুবশক্তিটি এখন অনেকটাই সঠিক দিকনির্দেশনা ও গন্তব্যহীন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ও আবেদনের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে রাজপথে অবস্থান করছে তারা। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকলেও সংশ্লিষ্টদের মাঝে এখনও স্বস্তি ফিরে আসেনি।

১৮৫৮ সালে বিএ পাস করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হিসেবে বের হয়ে আসেন, তখন ুবঙ্কিমচন্দ্রের বয়স হয়েছিল মাত্র ২০। এতবড় বাঙালি তথা ভারতীয় বিদ্বান ব্যক্তিকে কোনোরকম পরীক্ষা ছাড়াই তখন সিভিল সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বঙ্কিমচন্দ্রই প্রথম বাঙালি বা ভারতীয় সিভিলিয়ান।

অন্য অনেক কিছুর মতো ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) গোড়াপত্তনও হয় লর্ড কর্নওয়ালিসের (১৭৮৬-১৭৯৩) হাত দিয়ে। শুরুতে ইংরেজরা আইসিএস পরীক্ষায় ভারতীয় গ্র্যাজুয়েটদের আবেদনের সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ করে ২১ বছর। একই সিলেবাসের অধীন লন্ডনে ইংরেজ প্রতিযোগীদের সঙ্গে একই সারিতে বসে পরীক্ষাটি দিতে হতো।

সময়ের ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বটে। পরীক্ষার অন্তত ২-৩ মাস আগেই জাহাজে করে ভারতীয় অংশগ্রহণেচ্ছুদের বিলাত গিয়ে পৌঁছাতে হতো। ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজালের বিষয়টি তো ছিলই- উপরন্তু বয়স, কঠিন ও দুর্বোধ্য ভাষা-সিলেবাস এবং দূরযাত্রা (সমুদ্রযাত্রা)- এসব কারণে যথারীতি অংশগ্রহণ করলেও বছরের পর বছর কোনো দেশীয় প্রতিযোগী আইসিএস পরীক্ষায় সফলতার মুখ দেখেননি, দেখতে পারেননি।

পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের মুখে ধাপে ধাপে বয়সসীমা বাড়িয়ে প্রথমে ২৩, পরে ২৪ করা হয়। আরও পরে ২৬। ধাপে ধাপে সংশোধন ও সংস্কারের একপর্যায়ে বিলাতে ও ভারতে প্রবর্তন করা হয় যুগপৎ পরীক্ষা গ্রহণের রীতি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম আইসিএস পাস করা বাঙালি তথা ভারতীয়। ১৮৬৪ সালে ২২ বছর বয়সে বিলাত থেকে আইসিএস হয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। গোটা ভারতবাসীর সে কী আনন্দ!

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভেঙে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ‘সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস অব পাকিস্তান’ (সিএসপি) গঠন করা হয়। ইপিসিএস মানে ‘ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস’ (প্রাদেশিক)। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর শুরু হয় আমাদের নবযাত্রা। স্বাধীন দেশের উপযোগী করে গঠন করা হয় বিসিএস- বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস। পাকিস্তানি জমানার সিএসপি বা ইপিসিএসেরই সংস্কারকৃত রূপ ‘বিসিএস’। সর্বোচ্চ পদমর্যাদার সরকারি চাকরিতে নিয়োগের এই বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য সাধারণ আবেদনকারীর সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয় প্রথমে ২৭।

এভাবে দীর্ঘদিন চলার পর ২০১১ সালে বয়সসীমা বাড়ানো হয়। বর্তমানে ৩০। মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য কোটাধারীর জন্য নির্ধারিত আছে দুই বছর বেশি, অর্থাৎ ৩২ বছর। আবারও স্মরণযোগ্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বারবার নানা পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়েই আমাদের এগিয়ে চলা।

বঙ্কিমচন্দ্র ও সত্যেন্দ্রনাথরা ২০ বছরে স্নাতকধারী হয়েছিলেন। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে দেশ-বিদেশে প্রচলিত কোটা-ফোটা, বয়সসীমা, সেশনজট ও শিক্ষা ব্যবস্থার খোঁজখবর মোটামুটি সবারই কমবেশি জানা। অস্বীকার করার উপায় নেই, গত ২-৩ বছর আগেও অন্তত ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত আমাদের দেশে হাজার হাজার, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে ‘সেশনজট’ নামের ভূতটি চরম অভিশাপ হিসেবে বিরাজ করত। এই ভূতের করাল থাবা থেকে এখনও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি আমাদের তরুণ ও যুবসমাজ।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করার জন্য তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থী ও বেকার যুবক-যুবতীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। ওদের অনেকেই দুঃসহ সেশনজটের জাঁতাকলের সর্বশেষ বলি। এদেরই একটি বড় অংশ দুটি শিক্ষাবর্ষ (২০০৭-২০০৮ ও ২০০৮-২০০৯) একীভূতকরণের শিকার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ২০০৭ সালে এইচএসসি পাস করে ওরা মাস্টার্স করে বের হয়েছে ২০১৬ সালে। যারা যে কোনো একটি কিংবা দুটি পরীক্ষায় ঘটনাক্রমে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের বর্তমান বয়সটি সহজেই অনুমান করা যায়। দুনিয়ার কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষা গ্রহণ করতে সময় লেগেছে ৬ মাস (১৪৭ দিন)? এবং ডিগ্রি পরীক্ষার ফল প্রকাশে লেগেছে সাড়ে ৮ মাস (২০৮ দিন)!

ইংরেজ আমল, পাকিস্তান আমল, এমনকি আমাদের স্বাধীনতা লাভের পর এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে ধাপে ধাপে যা করা হয়েছে তা-ই সংস্কার। সংস্কারের মধ্য দিয়েই এ পর্যন্ত এগিয়ে আসা। এখানে আমাদের প্রত্যেকেরই অনুধাবন করা দরকার, সংস্কার মানে কুসংস্কার নয়। কোনো কিছুর মধ্যে আবদ্ধ থাকার নামও সংস্কার নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঐতিহ্যের নবায়নই সংস্কার। সংস্কার মানে আধুনিকতা।

সংস্কার মানে বাদ দেয়া কিংবা একেবারে বন্ধ করে দেয়া নয়। সংস্কার মানে মেরামত বা পরিশুদ্ধ করা। আধুনিকায়ন বা উৎকর্ষসাধন করা। যুগোপযোগী করা। সংস্কার প্রতিনিয়ত করার বিষয় নয়, তবে কখনও কখনও করতেই হয়; প্রয়োজনের তাগিদে, বাস্তবতার নিরিখে। যেমন বাড়িঘর, দালানকোঠা সংস্কারে আমরা হাত দিই। জগতে বলতে গেলে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। একসময় সুদীর্ঘকাল ‘সূর্য পৃথিবীর চারদিক প্রদক্ষিণ করত’। আমাদের পৃথিবীটিকে একদম ‘গোলাকার’ বলেই জানতাম। সময়ের প্রবাহে আমাদের ভাবনায় আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।

যে কোনো বিষয়েরই সংস্কার হতে পারে। বাঁশ তো সবার জন্যই উপকারী। দৈনন্দিন কাজে কতভাবেই না ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই বংশদণ্ডকে কেটে-চেঁছে যদি বাঁশির রূপ দেয়া যায় তাতে অসুবিধা কোথায়? বাঁশের সংস্কারকৃত রূপ বাঁশির সুরের মূর্ছনায় কে মোহিত না হয়! মনে রাখতে হবে ‘তালা’টি বর্তমানের। পুরনো, জীর্ণশীর্ণ ‘চাবি’ দিয়ে মরচে ধরা জীর্ণ এ তালা খোলা আর সম্ভব নয়। এ তালার জন্য সংস্কারকৃত নতুন চাবিরই দরকার। চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য এবং ভুক্তভোগী তরুণ-তরুণীদের আশা-আকাক্সক্ষা প্রণিধানযোগ্য। সবার মাঝে শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

বিমল সরকার : সহকারী অধ্যাপক, বাজিতপুর কলেজ; কিশোরগঞ্জ

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.