করোনাকালের ঈদে নানা ছন্দপতন
jugantor
করোনাকালের ঈদে নানা ছন্দপতন

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২৪ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত দেড় বছর ধরে নতুন পৃথিবীর সঙ্গে বিশ্ববাসীর পরিচয়। এই পরিচিতি আর যাত্রাপথ স্বস্তির নয়। আতঙ্ক আর উদ্বেগের। করোনা মহামারি সারা পৃথিবীকেই নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। মানুষের যাপিত জীবনে এনেছে পরিবর্তন। কোয়ারেন্টিন, হোমকোয়ারেন্টিন, লকডাউন, শাটডাউন নানা শব্দের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে। আমরা সামাজিক নৈকট্য আর মেলবন্ধনে বিশ্বাসী জাতি। অথচ আমাদের পরিচিত করিয়েছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামে একটি নতুন ধারণার সঙ্গে।

আর সবকিছুর মধ্যে জড়িয়ে ভয়ংকর অদৃশ্য শত্রু করোনা ছড়িয়ে যাচ্ছে মৃত্যুভীতি। মৃত্যু আর সংক্রমিত হওয়ার মিছিল বড় করছে। বাংলাদেশের ধর্মপ্রবণ ও উৎসবপ্রিয় মানুষের চিরচেনা দিনগুলোকেও এলোমেলো করে দিয়েছে। এই করোনার রক্তচক্ষুর মধ্য দিয়ে আমরা দুটো ঈদুল ফিতর আর দুটো ঈদুল আজহা উদযাপন করেছি।

গেল ঈদুল ফিতরে ভয়ংকর ঈদযাত্রা প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল। সে সময়ের ব্যবস্থাপনা আমাদের কাছে খুব শুদ্ধ মনে হয়নি। সে কথা বিভিন্ন সময় আমরা লিখেছিও। করোনা সংক্রমণ থেকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করার জন্য দরকার হলে সরকারকে নির্মম হতে হতো। কিন্তু সরকার তা পারেনি। বরঞ্চ ভুল সিদ্ধান্তে করোনা সংক্রমণের পথ প্রশস্ত করেছিল। আমরা বলেছিলাম, মৃত্যু ঠেকানো যেখানে প্রধান বিষয়, সেখানে অর্থনীতি গতিশীল রাখার কৃতিত্ব প্রদর্শন জরুরি নয়।

হাজার হাজার পোশাক কারখানা খোলা এবং লাখ লাখ শ্রমিককে লকডাউনের বাইরে রেখে লকডাউনের গুরুত্ব সবার কাছে পৌঁছানো যাবে না। জানা কথা, এ দেশের আবেগী মানুষ ঈদের ছুটিতে ছুটবেই। মুখের কথায় আর সতর্কবাণীতে তাদের আটকানো যাবে না। আর প্রকৃত কঠিন লকডাউন দিতে হলে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের সামনে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তারপরই প্রয়োজনে বল প্রয়োগে মানুষকে ঘরে আটকে রাখলেও তা নিন্দার হবে না। কিন্তু সে পথে হাঁটেনি সরকার। বরঞ্চ দিকভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গণপরিবহণ বন্ধ করে, স্বাস্থ্যবিধি মানার সুযোগ বন্ধ করে স্বাস্থ্যঝুঁকির পথ রচনা করে ভয়ংকর ঈদযাত্রার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পরও আরও দুবার গণপরিবহণ বন্ধ করে একই ধরনের সংকট তৈরি করা হয়েছিল। দেশজুড়ে করোনা সংকট তীব্র হওয়ায় সরকার ১৪ দিনের কঠিন লকডাউন দেয়। সব বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়। আমরা বরাবরই বলে আসছি, প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে মানুষকে ঘরে আটকানো যাবে না। বাস্তবেও তাই ঘটল। দু-চারদিন রয়ে-সয়ে চললেও ‘কঠিন লকডাউন’ কাগজে-কলমেই রয়ে গেল।

এবার ঈদের আগে সরকারি নীতিনির্ধারকদের কিছুটা হলেও বোধোদয় হয়েছিল। গণপরিবহণ খোলা রেখে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে (!) ঈদযাত্রার পথ খোলা রাখা হয়েছিল। একইসঙ্গে ফেরার পথ কিছুটা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কারণ ২৩ জুলাই থেকে পোশাক কারখানাসহ সবকিছু কঠোরভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা এসেছে। এই সংকটে আমাদের কাছে এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে। তবে আমাদের মনে হয়, প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে নিয়ন্ত্রণ হয়তো রক্ষা করা যাবে না। তবে যেভাবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এসব প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেলাশেষে কতটুকু কাজে দেবে, তা সময়েই বলে দেবে।

সাম্প্রতিক সময়ে এসে মানুষের জীবনযাত্রার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে অনেকগুণ। কেনায় আর উপহারে ছোট থেকে বড় অনেকেই একাধিক সেট পোশাক পেয়ে থাকে। খাবার-দাবারেও ঐশ্বর্য বেড়েছে। ঈদ কেনাকাটার জন্য বিপুল সম্ভারে আর আয়োজনে সাজে শপিংমলগুলো। মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় নানা রকম মার্কেট তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। অনেক সামর্থ্যবান আজকাল ঈদ-শপিংয়ে দেশের বাইরেও যান। এসবও কি অতীত হতে চলেছে?

এমন এক অগ্রগতির ধারায় করোনাকাল বড় রকম ছন্দপতন ঘটিয়েছে। স্থবির করে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। প্রকৃত অর্থে ঈদুল ফিতরের উৎসব শুরু হয় রমজান মাসের প্রথম থেকেই। রমজান হচ্ছে ঈদের আগমনী সুর। করোনা রমজানকেও উৎসবের আঙ্গিকে উদযাপিত হতে দেয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে মসজিদগুলোতে মুসল্লির সংখ্যা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

চিরায়ত তারাবি নামাজে ছন্দপতন ঘটেছিল। এভাবে ঈদ উৎসবের প্রেক্ষাপট রচনার একটি অনুষঙ্গ বিবর্ণ হয়ে যায়। ইফতারি নিয়ে একটি সাজসাজ প্রস্তুতি থাকে রাজধানী থেকে ছোট-বড় শহরে। নামকরা রেস্টুরেন্ট থেকে মৌসুমি দোকানগুলোতে হরেক ইফতারির মেলা বসে। এবার তা একেবারেই সীমিত হয়ে গিয়েছিল। সেহরির সময় কোনো রেস্টুরেন্ট খুলতে দেখা যায়নি এবার। সব মিলিয়ে করোনাকালের ঈদ প্রস্তুতির মধ্যে একটি বিষণ্ণতা যেন ছড়িয়ে ছিল।

করোনার আক্রমণ ঠেকাতে দেশবাসীর প্রতি আবেদন ছিল এবার যেন কেউ নাড়ির টানে শেকড়ের দিকে ছুটে যান। নিজেদের আটকে রাখেন নিজ নিজ অবস্থানে। আগে ঈদযাত্রা সুখকর করার জন্য সরকারি উদ্যোগ থাকত। সড়ক বিভাগ ব্যস্ত থাকত রাস্তাঘাট মেরামতিতে। সাধারণ ট্রেনের বাইরেও বিশেষ ট্রেন চালু থাকত। রেলস্টেশনে সারারাত জেগে টিকিটের জন্য লাইন দেওয়া হতো।

সংবাদকর্মীরা সেসব সচিত্র রিপোর্ট করার জন্য ছুটোছুটি করতেন। ট্রেনগুলোতে নাকে-কানে-ছাদে ভরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসতে হাসতে মানুষ ছুটত গ্রামের ঠিকানায়। দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার জন্য বিশাল বিশাল লঞ্চ ভরপুর হয়ে যেত। সড়কপথের বাসগুলোর অতিরিক্ত চাপ কোনো কোনো সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি করত। বিরোধী দল কণ্ঠ সচল করত। সরকার যে ঠিকভাবে ঈদযাত্রার আয়োজন করতে পারেনি, তা নিয়ে লাগাতার বিবৃতি দিতে থাকত।

করোনাকালে এসবের কোনো কিছুই করতে হয়নি গত চারটি ঈদযাত্রায়। সীমিতভাবে দোকানপাট আর শপিংমল খুলে দেওয়া হলেও তেমন বেচাকেনা হয়নি। আমি জানি না দশ ভাগের বেশি মানুষ এবার ঈদের পোশাক কিনেছিল কিনা। সাধারণ মানুষের অনেকেরেই জীবিকা বন্ধ। বেঁচে থাকার জন্য ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছে। মধ্যবিত্তও আর্থিকভাবে তেমন সুখে নেই। এতে করে যে ঈদের রমরমা খাবারের আয়োজন, এতেও এবার অনেকটা ছেদ পড়েছে। বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই আটকে থেকেছে। ছোটদের ঈদের পোশাক পরে এবাড়ি-ওবাড়ি বা পথে পথে ছুটোছুটি করার চিরচেনা ছবি খুব কমই আমরা দেখেছি।

জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের কোনো ঈদগাহ প্রস্তুত করার প্রয়োজন ছিল না। সামাজিক দূরত্ব মেনে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে পুরুষ মুসলমানের ঈদের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ঈদের নামাজ আদায় করা। নামাজান্তে কোলাকুলি করা। করোনাকালে কোলাকুলি তো নিষিদ্ধই।

ঈদুল আজহার বড় ধর্মীয় অনুষঙ্গ কুরবানি। যত্রতত্র গরুর হাট বসানো, অনেকের মধ্যে প্রতিযোগিতা দিয়ে গরু কেনা আমাদের দেশে একটু বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে থাকে। কোভিডকালীন এবারের কুরবানির ঈদে হাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার হাজার পরামর্শ-অনুরোধ থাকলেও তা তেমনভাবে পালিত হয়নি। বিকল্প হিসাবে অনলাইনের মাধ্যমে পশু ক্রয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। এ ধারার অনেক খামারও গড়ে উঠেছে।

আমি সাভার অঞ্চলে এমন কয়েকটি খামারে গিয়ে কিছুটা হতাশ হয়েছি। জীবন্ত গরু ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যে গরুর প্রকৃত মাংসের ওজন হতে পারে সাড়ে তিন মণ, তার দাম পড়ে যায় এক লাখ টাকার উপরে। মাংসের কেজি দাঁড়ায় ৭০০ টাকার ওপরে। যদিও কুরবানির মাংস দরদামে হিসাব অনেকে করতে চান না, তবুও মানুষের একটি বাজেট থাকে। সাধারণত বাজারে যে দরে মাংস বিক্রি হয়, কুরবানির গরুর মাংসের দাম এর চেয়ে কিছুটা বেশি হয়। তাই বলে কেজি প্রতি ১০০ টাকার উপরে হলে তা তো হিসাবে আসবেই।

অনলাইনে পশু কেনাকে জনপ্রিয় করতে হলে সাধারণ বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কোভিডকালীন যা জরুরি। কিন্তু এ দেশে বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার্যত সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই। এখানে আমরা ব্যবসায়ীদের দয়ার ওপর থাকতেই বাধ্য হই। কিন্তু সে দয়া পাব কেন! ব্যবসায়ী শ্রেণি মুনাফা বোঝেন। তারা ভারসাম্যমূলক লাভ করে স্বস্তি পান না। তারা লাভের সূচক ঊর্ধ্বমুখী রাখতেই পছন্দ করেন। গরুর খামারিরা পোশাক শিল্পের মালিকদের মতো বলবেন, তাদের লস হচ্ছে। আবার ফি বছর খামার আরও বড় করবেন। আর আমাদের সরকারি অভিভাবকরা স্বাস্থ্যবিধি মানার সদুপদেশই দিয়ে যাবেন।

তাই নিজেদের এবং চারপাশের মানুষদের সুস্থ রাখতে সাধারণ মানুষকেই সচেতন থাকতে হবে। কিন্তু সেখানেও বড় অস্বস্তি। আগে বলা হতো ‘গরিবের করোনা হয় না’, ‘গ্রামে করোনা নেই’- ইতোমধ্যে এসব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কয়েক দিন আগে একটি টিভি চ্যানেল তাদের প্রতিবেদনে সদরঘাটে লঞ্চের ডেকে বসা একজন মাঝ বয়সি যাত্রীকে প্রশ্ন করল- কেন তিনি মাস্ক পরেননি? উত্তরে যাত্রী দৃঢ়তার সঙ্গেই বললেন, মাস্ক পরলে করোনা হবে না আর না পরলে করোনা হবে- এ কথাকে তিনি বিশ্বাসই করেন না। আমি বুঝে পাই না, এমন অবুঝ যে দেশের মানুষ, বিধাতা ছাড়া তাদের কে রক্ষা করবে?

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি আমাদের নিবেদন থাকবে, অনেক ভুল আমাদের হয়ে গেছে। আপনারা দয়া করে দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে করোনা চিকিৎসার উপযোগী করুন। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানের পদ শূন্য রেখে আপনারা যে সংকট তৈরি করেছেন, এর অভাব কীভাবে পূরণ করবেন আমরা জানি না।

তবুও আমরা হতাশ হতে চাই না। প্রত্যাশা রাখব, সাবধানে সুরক্ষায় থেকে সুস্থ দেহে যার যার কর্মস্থলে, অবস্থানে ফিরে আসুন

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

করোনাকালের ঈদে নানা ছন্দপতন

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২৪ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত দেড় বছর ধরে নতুন পৃথিবীর সঙ্গে বিশ্ববাসীর পরিচয়। এই পরিচিতি আর যাত্রাপথ স্বস্তির নয়। আতঙ্ক আর উদ্বেগের। করোনা মহামারি সারা পৃথিবীকেই নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। মানুষের যাপিত জীবনে এনেছে পরিবর্তন। কোয়ারেন্টিন, হোমকোয়ারেন্টিন, লকডাউন, শাটডাউন নানা শব্দের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে। আমরা সামাজিক নৈকট্য আর মেলবন্ধনে বিশ্বাসী জাতি। অথচ আমাদের পরিচিত করিয়েছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামে একটি নতুন ধারণার সঙ্গে।

আর সবকিছুর মধ্যে জড়িয়ে ভয়ংকর অদৃশ্য শত্রু করোনা ছড়িয়ে যাচ্ছে মৃত্যুভীতি। মৃত্যু আর সংক্রমিত হওয়ার মিছিল বড় করছে। বাংলাদেশের ধর্মপ্রবণ ও উৎসবপ্রিয় মানুষের চিরচেনা দিনগুলোকেও এলোমেলো করে দিয়েছে। এই করোনার রক্তচক্ষুর মধ্য দিয়ে আমরা দুটো ঈদুল ফিতর আর দুটো ঈদুল আজহা উদযাপন করেছি।

গেল ঈদুল ফিতরে ভয়ংকর ঈদযাত্রা প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল। সে সময়ের ব্যবস্থাপনা আমাদের কাছে খুব শুদ্ধ মনে হয়নি। সে কথা বিভিন্ন সময় আমরা লিখেছিও। করোনা সংক্রমণ থেকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করার জন্য দরকার হলে সরকারকে নির্মম হতে হতো। কিন্তু সরকার তা পারেনি। বরঞ্চ ভুল সিদ্ধান্তে করোনা সংক্রমণের পথ প্রশস্ত করেছিল। আমরা বলেছিলাম, মৃত্যু ঠেকানো যেখানে প্রধান বিষয়, সেখানে অর্থনীতি গতিশীল রাখার কৃতিত্ব প্রদর্শন জরুরি নয়।

হাজার হাজার পোশাক কারখানা খোলা এবং লাখ লাখ শ্রমিককে লকডাউনের বাইরে রেখে লকডাউনের গুরুত্ব সবার কাছে পৌঁছানো যাবে না। জানা কথা, এ দেশের আবেগী মানুষ ঈদের ছুটিতে ছুটবেই। মুখের কথায় আর সতর্কবাণীতে তাদের আটকানো যাবে না। আর প্রকৃত কঠিন লকডাউন দিতে হলে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের সামনে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তারপরই প্রয়োজনে বল প্রয়োগে মানুষকে ঘরে আটকে রাখলেও তা নিন্দার হবে না। কিন্তু সে পথে হাঁটেনি সরকার। বরঞ্চ দিকভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গণপরিবহণ বন্ধ করে, স্বাস্থ্যবিধি মানার সুযোগ বন্ধ করে স্বাস্থ্যঝুঁকির পথ রচনা করে ভয়ংকর ঈদযাত্রার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পরও আরও দুবার গণপরিবহণ বন্ধ করে একই ধরনের সংকট তৈরি করা হয়েছিল। দেশজুড়ে করোনা সংকট তীব্র হওয়ায় সরকার ১৪ দিনের কঠিন লকডাউন দেয়। সব বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়। আমরা বরাবরই বলে আসছি, প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে মানুষকে ঘরে আটকানো যাবে না। বাস্তবেও তাই ঘটল। দু-চারদিন রয়ে-সয়ে চললেও ‘কঠিন লকডাউন’ কাগজে-কলমেই রয়ে গেল।

এবার ঈদের আগে সরকারি নীতিনির্ধারকদের কিছুটা হলেও বোধোদয় হয়েছিল। গণপরিবহণ খোলা রেখে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে (!) ঈদযাত্রার পথ খোলা রাখা হয়েছিল। একইসঙ্গে ফেরার পথ কিছুটা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কারণ ২৩ জুলাই থেকে পোশাক কারখানাসহ সবকিছু কঠোরভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা এসেছে। এই সংকটে আমাদের কাছে এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে। তবে আমাদের মনে হয়, প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে নিয়ন্ত্রণ হয়তো রক্ষা করা যাবে না। তবে যেভাবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এসব প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেলাশেষে কতটুকু কাজে দেবে, তা সময়েই বলে দেবে।

সাম্প্রতিক সময়ে এসে মানুষের জীবনযাত্রার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে অনেকগুণ। কেনায় আর উপহারে ছোট থেকে বড় অনেকেই একাধিক সেট পোশাক পেয়ে থাকে। খাবার-দাবারেও ঐশ্বর্য বেড়েছে। ঈদ কেনাকাটার জন্য বিপুল সম্ভারে আর আয়োজনে সাজে শপিংমলগুলো। মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় নানা রকম মার্কেট তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। অনেক সামর্থ্যবান আজকাল ঈদ-শপিংয়ে দেশের বাইরেও যান। এসবও কি অতীত হতে চলেছে?

এমন এক অগ্রগতির ধারায় করোনাকাল বড় রকম ছন্দপতন ঘটিয়েছে। স্থবির করে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। প্রকৃত অর্থে ঈদুল ফিতরের উৎসব শুরু হয় রমজান মাসের প্রথম থেকেই। রমজান হচ্ছে ঈদের আগমনী সুর। করোনা রমজানকেও উৎসবের আঙ্গিকে উদযাপিত হতে দেয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে মসজিদগুলোতে মুসল্লির সংখ্যা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

চিরায়ত তারাবি নামাজে ছন্দপতন ঘটেছিল। এভাবে ঈদ উৎসবের প্রেক্ষাপট রচনার একটি অনুষঙ্গ বিবর্ণ হয়ে যায়। ইফতারি নিয়ে একটি সাজসাজ প্রস্তুতি থাকে রাজধানী থেকে ছোট-বড় শহরে। নামকরা রেস্টুরেন্ট থেকে মৌসুমি দোকানগুলোতে হরেক ইফতারির মেলা বসে। এবার তা একেবারেই সীমিত হয়ে গিয়েছিল। সেহরির সময় কোনো রেস্টুরেন্ট খুলতে দেখা যায়নি এবার। সব মিলিয়ে করোনাকালের ঈদ প্রস্তুতির মধ্যে একটি বিষণ্ণতা যেন ছড়িয়ে ছিল।

করোনার আক্রমণ ঠেকাতে দেশবাসীর প্রতি আবেদন ছিল এবার যেন কেউ নাড়ির টানে শেকড়ের দিকে ছুটে যান। নিজেদের আটকে রাখেন নিজ নিজ অবস্থানে। আগে ঈদযাত্রা সুখকর করার জন্য সরকারি উদ্যোগ থাকত। সড়ক বিভাগ ব্যস্ত থাকত রাস্তাঘাট মেরামতিতে। সাধারণ ট্রেনের বাইরেও বিশেষ ট্রেন চালু থাকত। রেলস্টেশনে সারারাত জেগে টিকিটের জন্য লাইন দেওয়া হতো।

সংবাদকর্মীরা সেসব সচিত্র রিপোর্ট করার জন্য ছুটোছুটি করতেন। ট্রেনগুলোতে নাকে-কানে-ছাদে ভরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসতে হাসতে মানুষ ছুটত গ্রামের ঠিকানায়। দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার জন্য বিশাল বিশাল লঞ্চ ভরপুর হয়ে যেত। সড়কপথের বাসগুলোর অতিরিক্ত চাপ কোনো কোনো সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি করত। বিরোধী দল কণ্ঠ সচল করত। সরকার যে ঠিকভাবে ঈদযাত্রার আয়োজন করতে পারেনি, তা নিয়ে লাগাতার বিবৃতি দিতে থাকত।

করোনাকালে এসবের কোনো কিছুই করতে হয়নি গত চারটি ঈদযাত্রায়। সীমিতভাবে দোকানপাট আর শপিংমল খুলে দেওয়া হলেও তেমন বেচাকেনা হয়নি। আমি জানি না দশ ভাগের বেশি মানুষ এবার ঈদের পোশাক কিনেছিল কিনা। সাধারণ মানুষের অনেকেরেই জীবিকা বন্ধ। বেঁচে থাকার জন্য ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছে। মধ্যবিত্তও আর্থিকভাবে তেমন সুখে নেই। এতে করে যে ঈদের রমরমা খাবারের আয়োজন, এতেও এবার অনেকটা ছেদ পড়েছে। বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই আটকে থেকেছে। ছোটদের ঈদের পোশাক পরে এবাড়ি-ওবাড়ি বা পথে পথে ছুটোছুটি করার চিরচেনা ছবি খুব কমই আমরা দেখেছি।

জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের কোনো ঈদগাহ প্রস্তুত করার প্রয়োজন ছিল না। সামাজিক দূরত্ব মেনে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে পুরুষ মুসলমানের ঈদের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ঈদের নামাজ আদায় করা। নামাজান্তে কোলাকুলি করা। করোনাকালে কোলাকুলি তো নিষিদ্ধই।

ঈদুল আজহার বড় ধর্মীয় অনুষঙ্গ কুরবানি। যত্রতত্র গরুর হাট বসানো, অনেকের মধ্যে প্রতিযোগিতা দিয়ে গরু কেনা আমাদের দেশে একটু বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে থাকে। কোভিডকালীন এবারের কুরবানির ঈদে হাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার হাজার পরামর্শ-অনুরোধ থাকলেও তা তেমনভাবে পালিত হয়নি। বিকল্প হিসাবে অনলাইনের মাধ্যমে পশু ক্রয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। এ ধারার অনেক খামারও গড়ে উঠেছে।

আমি সাভার অঞ্চলে এমন কয়েকটি খামারে গিয়ে কিছুটা হতাশ হয়েছি। জীবন্ত গরু ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যে গরুর প্রকৃত মাংসের ওজন হতে পারে সাড়ে তিন মণ, তার দাম পড়ে যায় এক লাখ টাকার উপরে। মাংসের কেজি দাঁড়ায় ৭০০ টাকার ওপরে। যদিও কুরবানির মাংস দরদামে হিসাব অনেকে করতে চান না, তবুও মানুষের একটি বাজেট থাকে। সাধারণত বাজারে যে দরে মাংস বিক্রি হয়, কুরবানির গরুর মাংসের দাম এর চেয়ে কিছুটা বেশি হয়। তাই বলে কেজি প্রতি ১০০ টাকার উপরে হলে তা তো হিসাবে আসবেই।

অনলাইনে পশু কেনাকে জনপ্রিয় করতে হলে সাধারণ বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কোভিডকালীন যা জরুরি। কিন্তু এ দেশে বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার্যত সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই। এখানে আমরা ব্যবসায়ীদের দয়ার ওপর থাকতেই বাধ্য হই। কিন্তু সে দয়া পাব কেন! ব্যবসায়ী শ্রেণি মুনাফা বোঝেন। তারা ভারসাম্যমূলক লাভ করে স্বস্তি পান না। তারা লাভের সূচক ঊর্ধ্বমুখী রাখতেই পছন্দ করেন। গরুর খামারিরা পোশাক শিল্পের মালিকদের মতো বলবেন, তাদের লস হচ্ছে। আবার ফি বছর খামার আরও বড় করবেন। আর আমাদের সরকারি অভিভাবকরা স্বাস্থ্যবিধি মানার সদুপদেশই দিয়ে যাবেন।

তাই নিজেদের এবং চারপাশের মানুষদের সুস্থ রাখতে সাধারণ মানুষকেই সচেতন থাকতে হবে। কিন্তু সেখানেও বড় অস্বস্তি। আগে বলা হতো ‘গরিবের করোনা হয় না’, ‘গ্রামে করোনা নেই’- ইতোমধ্যে এসব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কয়েক দিন আগে একটি টিভি চ্যানেল তাদের প্রতিবেদনে সদরঘাটে লঞ্চের ডেকে বসা একজন মাঝ বয়সি যাত্রীকে প্রশ্ন করল- কেন তিনি মাস্ক পরেননি? উত্তরে যাত্রী দৃঢ়তার সঙ্গেই বললেন, মাস্ক পরলে করোনা হবে না আর না পরলে করোনা হবে- এ কথাকে তিনি বিশ্বাসই করেন না। আমি বুঝে পাই না, এমন অবুঝ যে দেশের মানুষ, বিধাতা ছাড়া তাদের কে রক্ষা করবে?

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি আমাদের নিবেদন থাকবে, অনেক ভুল আমাদের হয়ে গেছে। আপনারা দয়া করে দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে করোনা চিকিৎসার উপযোগী করুন। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানের পদ শূন্য রেখে আপনারা যে সংকট তৈরি করেছেন, এর অভাব কীভাবে পূরণ করবেন আমরা জানি না।

তবুও আমরা হতাশ হতে চাই না। প্রত্যাশা রাখব, সাবধানে সুরক্ষায় থেকে সুস্থ দেহে যার যার কর্মস্থলে, অবস্থানে ফিরে আসুন

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন