গ্যাস বিস্ফোরণ রোধে ব্যক্তি পর্যায়ে সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ
jugantor
গ্যাস বিস্ফোরণ রোধে ব্যক্তি পর্যায়ে সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ

  সালাহ্ উদ্দিন নাগরী  

২৪ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৬ জুলাই ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়লে একই পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হন। রাতে গ্যাসের চুলায় খাবার গরম করতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গত ২৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় তল্লা বাজার এলাকার তিনতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে রান্নাঘরে গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে ১১ জন দগ্ধ হয়েছেন।

গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় মগবাজার ওয়ারলেস এলাকায় একটি তিনতলা ভবনে হঠাৎ বিকট শব্দের বিস্ফোরণে পুরো ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এতে আটজনের মৃত্যু হয়। আহত ও দগ্ধ হয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। ভবনের পার্শ্ববর্তী ফ্লাইওভার ও রাস্তার যানবাহনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, শব্দের তীব্রতায় অনেক যানবাহনের জানালার কাচ ভেঙে যায়। রাস্তায় দাঁড়ানো একটি বাস দুমড়ে-মুচড়ে যায়, স্টিয়ারিং ধরা অবস্থায় মৃত্যু হয় চালকের।

তদন্তে জানা গেছে, এ বিস্ফোরণের কারণ ভবনের ভেতর পাইপ লিকেজ থেকে জমে যাওয়া গ্যাস। আরও আগে, ২০১৯ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে একটি ভবনের দেয়াল উড়ে গিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়। এ সময় আশপাশের অনেক ভবন ও বাসাবাড়ি কেঁপে ওঠে। একটি সূত্রমতে, ওই ভবনের নিচতলায় বাসায় রান্নার জন্য দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে।

গ্যাসলাইন লিকেজ এবং যানবাহন, বাসাবাড়ি, কলকারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিসংখ্যানটি খুব ছোট নয়। ফায়ার সার্ভিস বলছে- গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ২০১৫ সালে ৮০টি, ২০১৬ সালে ১৩১টি ও ২০১৭ সালে ৭৯টি দুর্ঘটনা ঘটে। গত ১০ বছরে ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৭ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ১ হাজার ৫৯০ জনের প্রাণ গেছে। বড় অগ্নিকাণ্ড মানেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ।

এই যে গ্যাস লিকেজ ও গ্যাস সিলিন্ডার থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে, তারপরও কি আমরা সতর্ক হচ্ছি? বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের মতে, সিএনজিচালিত ৪৪ শতাংশ বাসের গ্যাস সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার নিয়ে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলাচল করছে। বছরে প্রায় দেড়শ’ গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু সরকারের নানা প্রচেষ্টার পরও সিএনজিচালিত গাড়ির মালিক-চালকরা রিটেস্টে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা হোটেল রেস্তোরাঁর প্রবেশমুখের পাশে রাখা বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডারগুলো রান্নার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। সতর্কতার কোনো ব্যবস্থা নেই; আল্লাহ না করুন, যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে প্রাণহানি ও ক্ষতির মাত্রা কী হবে কে জানে!

তিতাস গ্যাস কোম্পানি কর্তৃক গ্রাহকদের অনুরোধ করে বলা হচ্ছে- ‘বাসাবাড়িতে গ্যাস দুর্ঘটনা রোধে রান্নাঘরে সার্বক্ষণিক বায়ু প্রবাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রান্নাঘরের দরজা-জানালা খোলার ১০-১৫ মিনিট পর চুলা জ্বালান এবং বৈদ্যুতিক সুইচ অন করুন। গ্যাসের গন্ধ পেলে চুলা জ্বালাবেন না। বৈদ্যুতিক সুইচ অন করবেন না, রান্না শেষে চুলা বন্ধ রাখুন এবং নিয়মিত গ্যাস লাইন পরীক্ষা করুন।’

তিতাসের নোটিশের এ কথাগুলো আমরা হয়তো সবাই কমবেশি জানি, কিন্তু পালন করি না। তাই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর হা-হুতাশ করা এবং অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ যে কোনো সাহায্য-সহযোগিতার জন্য কল সেন্টারের ১৬৪১৬ নম্বরে কল করতে বলেছে। আমরা তো অনেকেই জানি না বা জানার চেষ্টাও করি না যে, তিতাসের একটি কল সেন্টার আছে এবং ওই কল সেন্টার গ্রাহকসেবা দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত।

বাসাবাড়িতে ২৪ ঘণ্টা গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখায় রান্নাঘর ও চুলার সংযোগ পাইপ গরম হয়ে ঝুঁকি বাড়ায়। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলা জ্বালিয়ে রাখা, চুলার ওপর কাপড় শুকানোর অভ্যাস থেকে হয়তো আমরা সরে আসতে পেরেছি। কিন্তু তাতেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রান্নাঘরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি। চুলা বন্ধ করার পর সিলিন্ডারের মুখ সেফটি ক্যাপ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তেল চিটচিটে সিলিন্ডার পাইপ পরিষ্কার করা, রেগুলেটর নিয়মিত চেক করা, চুলা জ্বালানোর আগে রান্নাঘরের জানালা খুলে দেওয়ার বিষয়গুলো সবসময় নিশ্চিত করতে হবে। রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক সুইচবোর্ড বসানোর স্থান নির্বাচন সঠিক হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে। বাসাবাড়ি বা যে কোনো স্থাপনায় গ্যাসলাইন প্রয়োজনের মুহূর্তে বন্ধ করার জন্য একটি সুইচ থাকে।

দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ ব্যক্তিই সেই সুইচটির অবস্থান ও বন্ধ করার পদ্ধতি জানে না। তাই দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের লোক এসে সংযোগ বন্ধ করবে সে অপেক্ষায় থাকতে হয়। কেন এমন হবে? আমরা কি এসব ছোট বিষয় জেনে রাখতে পারি না? বাঁচতে হলে তো জানতেই হবে। স্মরণে রাখা দরকার-গ্যাসলাইন এবং গ্যাস সিলিন্ডারজনিত দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি ও মাত্রা কমিয়ে আনতে ব্যক্তি, পরিবার, এলাকাবাসীর সতর্কতা এবং দ্রুত পদক্ষেপের গুরুত্ব অপরিসীম।

অনেক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নিচতলায় গ্যাস সিলিন্ডার রেখে পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যদি কোনো কারণে ওইসব সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে পুরো স্থাপনা ও বসবাসকারীদের কঠিন সমস্যায় পড়তে হতে পারে। বাসাবাড়ি, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে, আর এই সুযোগে এলপিজি গ্যাসের বাজারে ঢুকে পড়েছে বহু অখ্যাত কোম্পানি।

বিক্রি হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের পুরোনো সিলিন্ডার। বহু বিক্রেতার সিলিন্ডার মজুতের মানসম্পন্ন কোনো স্থান নেই। নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই ঠাসাঠাসি করে একটার ওপর আরেকটি সিলিন্ডার রাখা হচ্ছে। এমনকি স্টেশনারি, ফাস্টফুড শপ এবং মুদি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার।

আমাদের সতর্কতা কোথায়? সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার সময় আমরা গাড়িতেই বসে থাকি, মোবাইল চালাই। কিন্তু প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস রিফিলের সময় সতর্কতামূলক বিষয়গুলো সাইনবোর্ডে লেখা থাকলেও আমরা সেগুলোকে মোটেই আমলে আনি না। ইতোমধ্যে অবশ্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সিলিন্ডার ব্যবহাকারীরা যদি নিজেদের ও জনমানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আমলে না আনে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবাধ্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় প্রতিনিয়ত দূরপাল্লার রুটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে ভালো মানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডারকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে ‘বোমা’, ‘চলন্ত বোমা’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, অকালে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, পঙ্গু হচ্ছে হাজারো মানুষ। তারপরও আমাদের মধ্যে সতর্কতা সেভাবে এখনো লক্ষ করা যাচ্ছে না।

সারা দেশে বাসাবাড়ি, স্থাপনা ও যানবাহনের সব গ্যাস সিলিন্ডার মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। জননিরাপত্তার উপায় বের করতে হবে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা যানবাহনের বাৎসরিক নবায়নের সময় গ্যাস সিলিন্ডার ক্লিয়ারেন্সের শর্ত বেঁধে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন এবং একইসঙ্গে নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ সব ধরনের গ্যাস সিলিন্ডারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার কথাও বলছেন। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক এ প্রস্তাবটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

আমাদের জনপদগুলোতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প এলাকা-সব যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিল্ডিং কোড না মেনে যেভাবে গা ঘেঁষে একটার পর একটা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, তাতে শুধু সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়, যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। নির্মাণ সামগ্রীর গুণগত মানও রক্ষিত হচ্ছে না। তাই নগরবাসী প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় ধরনের দুর্যোগেরই হুমকির মধ্যে আছে।

পরিবার, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি সবার কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে ছোটবেলা থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। জনগণকে সার্বক্ষণিক সচেতন রাখার জন্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রচার আরও বাড়াতে হবে। প্রত্যেককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো একজনের কোনো একটি অসতর্ক আচরণে অনেক সময় অন্যদেরও বড় খেসারত দিতে হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

snagari2012@gmail.com

গ্যাস বিস্ফোরণ রোধে ব্যক্তি পর্যায়ে সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ

 সালাহ্ উদ্দিন নাগরী 
২৪ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৬ জুলাই ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়লে একই পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হন। রাতে গ্যাসের চুলায় খাবার গরম করতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গত ২৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় তল্লা বাজার এলাকার তিনতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে রান্নাঘরে গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে ১১ জন দগ্ধ হয়েছেন।

গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় মগবাজার ওয়ারলেস এলাকায় একটি তিনতলা ভবনে হঠাৎ বিকট শব্দের বিস্ফোরণে পুরো ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এতে আটজনের মৃত্যু হয়। আহত ও দগ্ধ হয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। ভবনের পার্শ্ববর্তী ফ্লাইওভার ও রাস্তার যানবাহনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, শব্দের তীব্রতায় অনেক যানবাহনের জানালার কাচ ভেঙে যায়। রাস্তায় দাঁড়ানো একটি বাস দুমড়ে-মুচড়ে যায়, স্টিয়ারিং ধরা অবস্থায় মৃত্যু হয় চালকের।

তদন্তে জানা গেছে, এ বিস্ফোরণের কারণ ভবনের ভেতর পাইপ লিকেজ থেকে জমে যাওয়া গ্যাস। আরও আগে, ২০১৯ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে একটি ভবনের দেয়াল উড়ে গিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়। এ সময় আশপাশের অনেক ভবন ও বাসাবাড়ি কেঁপে ওঠে। একটি সূত্রমতে, ওই ভবনের নিচতলায় বাসায় রান্নার জন্য দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে।

গ্যাসলাইন লিকেজ এবং যানবাহন, বাসাবাড়ি, কলকারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিসংখ্যানটি খুব ছোট নয়। ফায়ার সার্ভিস বলছে- গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ২০১৫ সালে ৮০টি, ২০১৬ সালে ১৩১টি ও ২০১৭ সালে ৭৯টি দুর্ঘটনা ঘটে। গত ১০ বছরে ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৭ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ১ হাজার ৫৯০ জনের প্রাণ গেছে। বড় অগ্নিকাণ্ড মানেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ।

এই যে গ্যাস লিকেজ ও গ্যাস সিলিন্ডার থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে, তারপরও কি আমরা সতর্ক হচ্ছি? বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের মতে, সিএনজিচালিত ৪৪ শতাংশ বাসের গ্যাস সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার নিয়ে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলাচল করছে। বছরে প্রায় দেড়শ’ গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু সরকারের নানা প্রচেষ্টার পরও সিএনজিচালিত গাড়ির মালিক-চালকরা রিটেস্টে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা হোটেল রেস্তোরাঁর প্রবেশমুখের পাশে রাখা বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডারগুলো রান্নার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। সতর্কতার কোনো ব্যবস্থা নেই; আল্লাহ না করুন, যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে প্রাণহানি ও ক্ষতির মাত্রা কী হবে কে জানে!

তিতাস গ্যাস কোম্পানি কর্তৃক গ্রাহকদের অনুরোধ করে বলা হচ্ছে- ‘বাসাবাড়িতে গ্যাস দুর্ঘটনা রোধে রান্নাঘরে সার্বক্ষণিক বায়ু প্রবাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রান্নাঘরের দরজা-জানালা খোলার ১০-১৫ মিনিট পর চুলা জ্বালান এবং বৈদ্যুতিক সুইচ অন করুন। গ্যাসের গন্ধ পেলে চুলা জ্বালাবেন না। বৈদ্যুতিক সুইচ অন করবেন না, রান্না শেষে চুলা বন্ধ রাখুন এবং নিয়মিত গ্যাস লাইন পরীক্ষা করুন।’

তিতাসের নোটিশের এ কথাগুলো আমরা হয়তো সবাই কমবেশি জানি, কিন্তু পালন করি না। তাই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর হা-হুতাশ করা এবং অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ যে কোনো সাহায্য-সহযোগিতার জন্য কল সেন্টারের ১৬৪১৬ নম্বরে কল করতে বলেছে। আমরা তো অনেকেই জানি না বা জানার চেষ্টাও করি না যে, তিতাসের একটি কল সেন্টার আছে এবং ওই কল সেন্টার গ্রাহকসেবা দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত।

বাসাবাড়িতে ২৪ ঘণ্টা গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখায় রান্নাঘর ও চুলার সংযোগ পাইপ গরম হয়ে ঝুঁকি বাড়ায়। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলা জ্বালিয়ে রাখা, চুলার ওপর কাপড় শুকানোর অভ্যাস থেকে হয়তো আমরা সরে আসতে পেরেছি। কিন্তু তাতেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রান্নাঘরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি। চুলা বন্ধ করার পর সিলিন্ডারের মুখ সেফটি ক্যাপ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তেল চিটচিটে সিলিন্ডার পাইপ পরিষ্কার করা, রেগুলেটর নিয়মিত চেক করা, চুলা জ্বালানোর আগে রান্নাঘরের জানালা খুলে দেওয়ার বিষয়গুলো সবসময় নিশ্চিত করতে হবে। রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক সুইচবোর্ড বসানোর স্থান নির্বাচন সঠিক হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে। বাসাবাড়ি বা যে কোনো স্থাপনায় গ্যাসলাইন প্রয়োজনের মুহূর্তে বন্ধ করার জন্য একটি সুইচ থাকে।

দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ ব্যক্তিই সেই সুইচটির অবস্থান ও বন্ধ করার পদ্ধতি জানে না। তাই দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের লোক এসে সংযোগ বন্ধ করবে সে অপেক্ষায় থাকতে হয়। কেন এমন হবে? আমরা কি এসব ছোট বিষয় জেনে রাখতে পারি না? বাঁচতে হলে তো জানতেই হবে। স্মরণে রাখা দরকার-গ্যাসলাইন এবং গ্যাস সিলিন্ডারজনিত দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি ও মাত্রা কমিয়ে আনতে ব্যক্তি, পরিবার, এলাকাবাসীর সতর্কতা এবং দ্রুত পদক্ষেপের গুরুত্ব অপরিসীম।

অনেক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নিচতলায় গ্যাস সিলিন্ডার রেখে পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যদি কোনো কারণে ওইসব সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে পুরো স্থাপনা ও বসবাসকারীদের কঠিন সমস্যায় পড়তে হতে পারে। বাসাবাড়ি, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে, আর এই সুযোগে এলপিজি গ্যাসের বাজারে ঢুকে পড়েছে বহু অখ্যাত কোম্পানি।

বিক্রি হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের পুরোনো সিলিন্ডার। বহু বিক্রেতার সিলিন্ডার মজুতের মানসম্পন্ন কোনো স্থান নেই। নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই ঠাসাঠাসি করে একটার ওপর আরেকটি সিলিন্ডার রাখা হচ্ছে। এমনকি স্টেশনারি, ফাস্টফুড শপ এবং মুদি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার।

আমাদের সতর্কতা কোথায়? সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার সময় আমরা গাড়িতেই বসে থাকি, মোবাইল চালাই। কিন্তু প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস রিফিলের সময় সতর্কতামূলক বিষয়গুলো সাইনবোর্ডে লেখা থাকলেও আমরা সেগুলোকে মোটেই আমলে আনি না। ইতোমধ্যে অবশ্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সিলিন্ডার ব্যবহাকারীরা যদি নিজেদের ও জনমানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আমলে না আনে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবাধ্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় প্রতিনিয়ত দূরপাল্লার রুটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে ভালো মানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডারকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে ‘বোমা’, ‘চলন্ত বোমা’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, অকালে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, পঙ্গু হচ্ছে হাজারো মানুষ। তারপরও আমাদের মধ্যে সতর্কতা সেভাবে এখনো লক্ষ করা যাচ্ছে না।

সারা দেশে বাসাবাড়ি, স্থাপনা ও যানবাহনের সব গ্যাস সিলিন্ডার মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। জননিরাপত্তার উপায় বের করতে হবে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা যানবাহনের বাৎসরিক নবায়নের সময় গ্যাস সিলিন্ডার ক্লিয়ারেন্সের শর্ত বেঁধে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন এবং একইসঙ্গে নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ সব ধরনের গ্যাস সিলিন্ডারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার কথাও বলছেন। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক এ প্রস্তাবটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

আমাদের জনপদগুলোতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প এলাকা-সব যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিল্ডিং কোড না মেনে যেভাবে গা ঘেঁষে একটার পর একটা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, তাতে শুধু সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়, যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। নির্মাণ সামগ্রীর গুণগত মানও রক্ষিত হচ্ছে না। তাই নগরবাসী প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় ধরনের দুর্যোগেরই হুমকির মধ্যে আছে।

পরিবার, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি সবার কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে ছোটবেলা থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। জনগণকে সার্বক্ষণিক সচেতন রাখার জন্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রচার আরও বাড়াতে হবে। প্রত্যেককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো একজনের কোনো একটি অসতর্ক আচরণে অনেক সময় অন্যদেরও বড় খেসারত দিতে হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

snagari2012@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন