আবদ্ধ সময়ের আর্তনাদ
jugantor
আবদ্ধ সময়ের আর্তনাদ

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম  

২৫ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রায় দুই বছর ধরে সময় কীভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে নানা জনের নানা মত। কেউ বলছেন, করোনার সময়টা বেশ ভালো, আরামে ঘুমাতে পারছি, ঘুম না এলে অন্তর্জালে ঢু মেরে জগতের নানা খবর নিচ্ছি। কেউ বলছেন, এ সময়টা বড্ড খারাপ, সব সময় আবদ্ধ পরিবেশে থেকে বিগড়ে যাচ্ছে মন। কোনো কাজ ভালো লাগে না। চারদিকে দুঃসংবাদ। রোগ-শোক, অভাব, মৃত্যু, হতাশা আর ভাল্লাগে না। গোটা বিশ্বের মানুষ এখন সারা বেলা শুধু আর্তনাদের সুরে কথা বলছে। পৃথিবী নামক শখের ছাদবাগানে এখন শুধু দুঃখের লার্ভা কিলবিল করছে! এ দুঃখের সুনামি থামবে কবে? বিশ্বের এ ভয়ানক ব্যারাম কি ভালো হবে না?

খারাপ বা ভালো যাই হোক না কেন, সময় গড়িয়ে চলতেই থাকবে। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার প্রথমদিকে বাইরে থেকে ঘরে ফিরে পোশাক পরিবর্তন, হাত ধোয়া বা গোসল করাকে একটা বোঝা মনে করত অনেকে। চীনে যখন সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হলো, তখন সংবাদটা শুনে মনে হতো, চীন সে তো অনেক দূরের দেশ। আমাদের ওসব কথা না ভাবলেও চলবে। এরপর ইউরোপে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানির খবরগুলোকেও অনেকে পাত্তা দেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশ করোনায় মৃতের সংখ্যায় প্রথম স্থান অধিকার করলে অনেকে বলেছেন, ওদের সময় এখন কিছু হারানোর। সারা বিশ্বে তারা এর চেয়ে বেশি প্রাণনাশ করেছে আধুনিক অস্ত্র বিক্রি ও যুদ্ধবাজি করে।

এরপর আমরা করোনা মোকাবিলায় সফলতা দেখিয়েছি বলে আত্মতুষ্টিতে ডিগবাজি খেয়ে যখন আত্মহারা, ঠিক তখনই শুরু হয়েছে ব্রাজিলে মারাত্মক সংক্রমণ ও উচ্চ মৃত্যুহার। ২০২১ সালের মার্চে ভারতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভয়াবহ আক্রমণ শুরু হলে শহর পেরিয়ে ওদের গ্রাম-গঞ্জে মরণ কামড় বসাতে থাকে করোনা। চারদিকে ছড়াতে থাকে মৃত্যুর করাল থাবা, আক্রান্ত মানুষের কান্নার চিৎকার, প্রাণ বাঁচানোর আকুতি ও আর্তনাদ শোনা যেতে থাকলে আমাদের দেশে সবার টনক নড়ে। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধ করে দিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। নদী ও সমুদ্রপথে রাতের আঁধারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সঙ্গে নিয়ে সীমান্তপথ পাড়ি দিয়ে আসে অসচেতন মানুষ। বিশেষ করে ডেল্টা সংক্রমিত চোরাচালানি, নাবিক, নৌকার মাঝি, অবৈধ গরু ব্যবসায়ী এবং চোরাচালান হয়ে আসা কাপড়, মসলা ও মনোহারি দ্রব্যের ফেরিওয়ালারা সবার চোখের সামনে গ্রামগঞ্জে ঘুরে মূলত করোনারভাইরাস ফেরি করে সীমান্তের জেলাগুলোতে ছড়িয়ে দেয়। এরপর তা সারা দেশে বিস্তার লাভ করে। ধারণা ছিল গ্রামে করোনা নেই, ওতে আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু সময় আমাদের কাউকে ক্ষমা করেনি। সময়ের আবর্তে আমরা সংক্রমণের বেড়াজালে আটকা পড়ে এখন মৃত্যুর স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছি।

সামান্য কয়েকদিন ঘরবন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠে স্কুলে যেতে না পেরে ২০২০ সালে এক শিশু খেলনা বন্দুক তাক করে তার মাকে বলেছিল, ‘করোনাকে গুলি করে মারা যায় না?’ সে জানত না যে, করোনাকে খালি চোখে দেখা যায় না। এ জীবাণু নিজেই এক মারাত্মক অস্ত্র। করোনাকে গুলি করে মেরে ফেলার মতো বন্দুক নেই। করোনার টিকা তখনো বের হয়নি।

২০২১ সালে আমাদের দেশে ডেল্টার সংক্রমণ রোধে মানুষের ঘরের বাইরে বের হওয়া ঠেকাতে আধুনিক অস্ত্র হাতে পুলিশ, আনসার, বিজিবির সঙ্গে সেনাবাহিনী রাস্তায় নেমে পড়লে আবার শিশুর মুখে প্রশ্ন শোনা যায়-মা, ওসব আসল বন্দুক দিয়ে কাকে গুলি করা হবে? করোনাকে না মানুষকে? শিশুটি এবার কঠোর লকডাউনের মধ্যে ঘরে বসে শুধু ইন্টারনেট দিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে আর ভাবছে, যদিও ওরা সংখ্যায় অনেক; কিন্তু করোনাকে চোখে দেখা যায় না। তাই ওই আসল বন্দুক দিয়েও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে গুলি করা যাবে না।

এখন চলছে করোনায় কর্ম হারানো স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচানোর আর্তনাদ। এসব দরিদ্র মানুষের আর্তনাদ শোনার মতো মানুষ কম। ব্যবসায়ীরা নিজেদের কারখানা টিকিয়ে রেখে বিত্ত বাঁচানোর জন্য তৎপর। এ কঠিন সময়ে তারা নিজ নিজ ব্যবসা হারানোর ভয়ে আর্তনাদ করছেন। সেজন্য সরকার বেশ সচেতন। এসব ব্যবসা টিকে থাকতে না পারলে সরকারের অর্থনীতি বাঁচানোর আর্তনাদ আরও গভীর হবে।

এভাবে অর্থনীতি বাঁচানোর সুযোগ দিতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া শিশু শ্রমিকদের মা-বাবা ও স্বজনদের আর্তনাদের মেয়াদ কতদিন টিকে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। করোনায় বিপর্যস্ত নিম্ন আয়ের মানুষদের হাসপাতালে সেবা নেওয়ার সুযোগ খুব কম। গ্রামপর্যায়ে প্রাণবায়ু সংবলিত করোনার চিকিৎসাসেবা নেই। গ্রাম-গঞ্জে করোনাক্রান্ত হয়ে অক্সিজেনের অভাবে নিরুপায় কেউ যখন শহরের হাসপাতালে আসার সুযোগ পাচ্ছে, তখন অনেকের সময় শেষ-অর্থাৎ শহরের হাসপাতালের পরিবেশ বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে বেশির ভাগ রোগী। সেসময় তাদের অবুঝ বাচ্চা বা স্বজনদের আর্তনাদের দৃশ্য যারা টিভিতে দেখেছেন, তারা কী বলবেন?

করোনার সময় শিশু শ্রমিক-কর্মচারী চালিত কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অমূলক দোহাই দিয়ে খোলা হয়নি। অন্যদিকে দায়সারা অনলাইন ক্লাস সম্পন্ন করা হলেও পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি তাদের। ফলে সনদও পায়নি তারা। ইতোমধ্যে চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের। তাদের কষ্ট ও আর্তনাদের শব্দ ভেতরে ভেতরে গুমরে কেঁদে-কেটে নিস্তব্ধ রূপ ধারণ করলেও কেউ তা শোনার প্রয়োজন মনে করছে না। কে বাঁচাবে তাদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের?

শত শত করুণ আর্তনাদের মধ্যে এখন চিন্তা শুধু ‘কেমনে মারব করোনা’ বা ‘কেমনে মরবে করোনা’। মেঘে মেঘে বেলা বেড়ে সূর্য পশ্চিমে হেলতে শুরু করছে। এত সংকটের মধ্যে সবাই জীবন বাঁচাতে একটি টিকার জন্য এখন মরিয়া। কারণ, সবাই জেনে গেছে করোনাকে গুলি করে মারতে হলে একটি কার্যকর ‘টিকা-বন্দুকের’ সফল প্রয়োগ ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাই টিকার চাহিদা প্রবল হতে থাকবে সামনের দিনগুলোয়।

এ চরম আবদ্ধ সময়ে একটু আনন্দের ছোঁয়া পেতে মানুষ ঈদের ছুটিতে ছুটে গেছে শেকড়ের কাছে নিজ ভিটেমাটির সোঁদা গন্ধ পেতে, ফেলে আসা বাবা-মা ও স্বজনদের কাছে মন খুলে নিজের সুখ-দুঃখের কথা ব্যক্ত করে একটু শান্তি পেতে। তাই বৃষ্টি, বন্যা, করোনা ও যানবাহনের অভাব উপেক্ষা করে মানুষ হয়েছিল ঘরমুখী। কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে সামান্য শিথিলতা পেয়ে নিজেদের খোদাভীরুতাকে প্রমাণ করে ম্লান হয়ে যাওয়া কুরবানির ঈদকে তারা কিছুটা অম্লান করে আবার ফিরে আসছে নিজ নিজ ডেরায়। তবে তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য সবাইকে খুব দ্রুত টিকা দিতে না পারলে অচিরেই মহা-আর্তনাদ শুরু হয়ে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যেতে পারে। সবার জন্য দ্রুত টিকা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হলে এ ভয়ংকর আবদ্ধ পরিবেশে ম্লান হয়ে যাওয়া মুখগুলোয় অম্লান হাসি ফুটতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান

fakrul@ru.ac.bd

আবদ্ধ সময়ের আর্তনাদ

 ড. মো. ফখরুল ইসলাম 
২৫ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রায় দুই বছর ধরে সময় কীভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে নানা জনের নানা মত। কেউ বলছেন, করোনার সময়টা বেশ ভালো, আরামে ঘুমাতে পারছি, ঘুম না এলে অন্তর্জালে ঢু মেরে জগতের নানা খবর নিচ্ছি। কেউ বলছেন, এ সময়টা বড্ড খারাপ, সব সময় আবদ্ধ পরিবেশে থেকে বিগড়ে যাচ্ছে মন। কোনো কাজ ভালো লাগে না। চারদিকে দুঃসংবাদ। রোগ-শোক, অভাব, মৃত্যু, হতাশা আর ভাল্লাগে না। গোটা বিশ্বের মানুষ এখন সারা বেলা শুধু আর্তনাদের সুরে কথা বলছে। পৃথিবী নামক শখের ছাদবাগানে এখন শুধু দুঃখের লার্ভা কিলবিল করছে! এ দুঃখের সুনামি থামবে কবে? বিশ্বের এ ভয়ানক ব্যারাম কি ভালো হবে না?

খারাপ বা ভালো যাই হোক না কেন, সময় গড়িয়ে চলতেই থাকবে। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার প্রথমদিকে বাইরে থেকে ঘরে ফিরে পোশাক পরিবর্তন, হাত ধোয়া বা গোসল করাকে একটা বোঝা মনে করত অনেকে। চীনে যখন সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হলো, তখন সংবাদটা শুনে মনে হতো, চীন সে তো অনেক দূরের দেশ। আমাদের ওসব কথা না ভাবলেও চলবে। এরপর ইউরোপে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানির খবরগুলোকেও অনেকে পাত্তা দেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশ করোনায় মৃতের সংখ্যায় প্রথম স্থান অধিকার করলে অনেকে বলেছেন, ওদের সময় এখন কিছু হারানোর। সারা বিশ্বে তারা এর চেয়ে বেশি প্রাণনাশ করেছে আধুনিক অস্ত্র বিক্রি ও যুদ্ধবাজি করে।

এরপর আমরা করোনা মোকাবিলায় সফলতা দেখিয়েছি বলে আত্মতুষ্টিতে ডিগবাজি খেয়ে যখন আত্মহারা, ঠিক তখনই শুরু হয়েছে ব্রাজিলে মারাত্মক সংক্রমণ ও উচ্চ মৃত্যুহার। ২০২১ সালের মার্চে ভারতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভয়াবহ আক্রমণ শুরু হলে শহর পেরিয়ে ওদের গ্রাম-গঞ্জে মরণ কামড় বসাতে থাকে করোনা। চারদিকে ছড়াতে থাকে মৃত্যুর করাল থাবা, আক্রান্ত মানুষের কান্নার চিৎকার, প্রাণ বাঁচানোর আকুতি ও আর্তনাদ শোনা যেতে থাকলে আমাদের দেশে সবার টনক নড়ে। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধ করে দিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। নদী ও সমুদ্রপথে রাতের আঁধারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সঙ্গে নিয়ে সীমান্তপথ পাড়ি দিয়ে আসে অসচেতন মানুষ। বিশেষ করে ডেল্টা সংক্রমিত চোরাচালানি, নাবিক, নৌকার মাঝি, অবৈধ গরু ব্যবসায়ী এবং চোরাচালান হয়ে আসা কাপড়, মসলা ও মনোহারি দ্রব্যের ফেরিওয়ালারা সবার চোখের সামনে গ্রামগঞ্জে ঘুরে মূলত করোনারভাইরাস ফেরি করে সীমান্তের জেলাগুলোতে ছড়িয়ে দেয়। এরপর তা সারা দেশে বিস্তার লাভ করে। ধারণা ছিল গ্রামে করোনা নেই, ওতে আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু সময় আমাদের কাউকে ক্ষমা করেনি। সময়ের আবর্তে আমরা সংক্রমণের বেড়াজালে আটকা পড়ে এখন মৃত্যুর স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছি।

সামান্য কয়েকদিন ঘরবন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠে স্কুলে যেতে না পেরে ২০২০ সালে এক শিশু খেলনা বন্দুক তাক করে তার মাকে বলেছিল, ‘করোনাকে গুলি করে মারা যায় না?’ সে জানত না যে, করোনাকে খালি চোখে দেখা যায় না। এ জীবাণু নিজেই এক মারাত্মক অস্ত্র। করোনাকে গুলি করে মেরে ফেলার মতো বন্দুক নেই। করোনার টিকা তখনো বের হয়নি।

২০২১ সালে আমাদের দেশে ডেল্টার সংক্রমণ রোধে মানুষের ঘরের বাইরে বের হওয়া ঠেকাতে আধুনিক অস্ত্র হাতে পুলিশ, আনসার, বিজিবির সঙ্গে সেনাবাহিনী রাস্তায় নেমে পড়লে আবার শিশুর মুখে প্রশ্ন শোনা যায়-মা, ওসব আসল বন্দুক দিয়ে কাকে গুলি করা হবে? করোনাকে না মানুষকে? শিশুটি এবার কঠোর লকডাউনের মধ্যে ঘরে বসে শুধু ইন্টারনেট দিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে আর ভাবছে, যদিও ওরা সংখ্যায় অনেক; কিন্তু করোনাকে চোখে দেখা যায় না। তাই ওই আসল বন্দুক দিয়েও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে গুলি করা যাবে না।

এখন চলছে করোনায় কর্ম হারানো স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচানোর আর্তনাদ। এসব দরিদ্র মানুষের আর্তনাদ শোনার মতো মানুষ কম। ব্যবসায়ীরা নিজেদের কারখানা টিকিয়ে রেখে বিত্ত বাঁচানোর জন্য তৎপর। এ কঠিন সময়ে তারা নিজ নিজ ব্যবসা হারানোর ভয়ে আর্তনাদ করছেন। সেজন্য সরকার বেশ সচেতন। এসব ব্যবসা টিকে থাকতে না পারলে সরকারের অর্থনীতি বাঁচানোর আর্তনাদ আরও গভীর হবে।

এভাবে অর্থনীতি বাঁচানোর সুযোগ দিতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া শিশু শ্রমিকদের মা-বাবা ও স্বজনদের আর্তনাদের মেয়াদ কতদিন টিকে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। করোনায় বিপর্যস্ত নিম্ন আয়ের মানুষদের হাসপাতালে সেবা নেওয়ার সুযোগ খুব কম। গ্রামপর্যায়ে প্রাণবায়ু সংবলিত করোনার চিকিৎসাসেবা নেই। গ্রাম-গঞ্জে করোনাক্রান্ত হয়ে অক্সিজেনের অভাবে নিরুপায় কেউ যখন শহরের হাসপাতালে আসার সুযোগ পাচ্ছে, তখন অনেকের সময় শেষ-অর্থাৎ শহরের হাসপাতালের পরিবেশ বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে বেশির ভাগ রোগী। সেসময় তাদের অবুঝ বাচ্চা বা স্বজনদের আর্তনাদের দৃশ্য যারা টিভিতে দেখেছেন, তারা কী বলবেন?

করোনার সময় শিশু শ্রমিক-কর্মচারী চালিত কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অমূলক দোহাই দিয়ে খোলা হয়নি। অন্যদিকে দায়সারা অনলাইন ক্লাস সম্পন্ন করা হলেও পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি তাদের। ফলে সনদও পায়নি তারা। ইতোমধ্যে চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের। তাদের কষ্ট ও আর্তনাদের শব্দ ভেতরে ভেতরে গুমরে কেঁদে-কেটে নিস্তব্ধ রূপ ধারণ করলেও কেউ তা শোনার প্রয়োজন মনে করছে না। কে বাঁচাবে তাদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের?

শত শত করুণ আর্তনাদের মধ্যে এখন চিন্তা শুধু ‘কেমনে মারব করোনা’ বা ‘কেমনে মরবে করোনা’। মেঘে মেঘে বেলা বেড়ে সূর্য পশ্চিমে হেলতে শুরু করছে। এত সংকটের মধ্যে সবাই জীবন বাঁচাতে একটি টিকার জন্য এখন মরিয়া। কারণ, সবাই জেনে গেছে করোনাকে গুলি করে মারতে হলে একটি কার্যকর ‘টিকা-বন্দুকের’ সফল প্রয়োগ ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাই টিকার চাহিদা প্রবল হতে থাকবে সামনের দিনগুলোয়।

এ চরম আবদ্ধ সময়ে একটু আনন্দের ছোঁয়া পেতে মানুষ ঈদের ছুটিতে ছুটে গেছে শেকড়ের কাছে নিজ ভিটেমাটির সোঁদা গন্ধ পেতে, ফেলে আসা বাবা-মা ও স্বজনদের কাছে মন খুলে নিজের সুখ-দুঃখের কথা ব্যক্ত করে একটু শান্তি পেতে। তাই বৃষ্টি, বন্যা, করোনা ও যানবাহনের অভাব উপেক্ষা করে মানুষ হয়েছিল ঘরমুখী। কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে সামান্য শিথিলতা পেয়ে নিজেদের খোদাভীরুতাকে প্রমাণ করে ম্লান হয়ে যাওয়া কুরবানির ঈদকে তারা কিছুটা অম্লান করে আবার ফিরে আসছে নিজ নিজ ডেরায়। তবে তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য সবাইকে খুব দ্রুত টিকা দিতে না পারলে অচিরেই মহা-আর্তনাদ শুরু হয়ে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যেতে পারে। সবার জন্য দ্রুত টিকা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হলে এ ভয়ংকর আবদ্ধ পরিবেশে ম্লান হয়ে যাওয়া মুখগুলোয় অম্লান হাসি ফুটতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান

fakrul@ru.ac.bd

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন