এ মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিরোধ করতে হবে
jugantor
এ মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিরোধ করতে হবে

  ড. আমিনুর রহমান  

২৫ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ২৫ জুলাই। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে প্রথমবারের মতো বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে এদিন। পানিতে ডুবে মৃত্যু একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারায় পানিতে ডুবে। পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধকল্পে এ বছরের স্ল্নোগান নির্ধারণ করা হয়েছে-‘Anyone can drown, no one should’-‘যে কেউ পানিতে ডুবে যেতে পারে, সবাই মিলে প্রতিরোধ করি’। পানিতে ডুবে মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এ বছরের ২৮ এপ্রিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ৭৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধবিষয়ক একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ফলে জাতিসংঘ ২৫ জুলাইকে ‘বিশ্ব পানিতে ডোবা প্রতিরোধ দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করে। আয়ারল্যান্ড সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে এবং ৭৯টি সদস্য রাষ্ট্রের সহ-পৃষ্ঠপোষকতায় এ নতুন রেজুলেশনটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম উত্থাপন করেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা। জাতিসংঘে খসড়া রেজুলেশনটি উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রদূত ফাতিমা বলেন, ‘গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত, স্বল্পব্যয়ের প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রার বেশ কয়েকটির অর্জনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। উল্লেখ্য, বন্যা ও জলযান দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে কোনো কোনো দেশের পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম। পানিতে ডুবে মোট মৃত্যুর ৯০ শতাংশেরও বেশি ঘটে থাকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয়। আফ্রিকাতে পানিতে ডুবে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি এবং এশিয়াতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পানিতে ডুবার ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। গ্রামাঞ্চলে অধিক সংখ্যক শিশু-কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বে শিশু মৃত্যুর ১০টি প্রধান কারণের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু অন্যতম। বাংলাদেশসহ বেশির ভাগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় ১-৪ বছর বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, এরপর রয়েছে ৫-৯ বছর বয়সি শিশুরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহযোগিতায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ ২০০৫ সালে বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে অনুরূপ একটি জরিপ পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যার একটি ভীতিকর চিত্র উঠে আসে। ২০১৬ সালের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতিবছর সব বয়সি প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। এদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থাৎ আনুমানিক ১৪ হাজার ৫০০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু। অন্যভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন, অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০ হাজার। এ জরিপটিতে অধিক সংখ্যক উন্মুক্ত জলাশয়, সচেতনতার অভাব, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান, শিশুদের সাঁতার না জানা এবং কমিউনিটিতে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার প্রধান প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২০-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার পরে পানিতে ডুবা হচ্ছে দ্বিতীয় প্রধান ঘাতক।

উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে গৃহীত কার্যকর পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। তাছাড়া এ পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপযুক্তও নয়। দেশের প্রেক্ষাপট এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য এরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ ২০০৫ সাল থেকে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে দেশের অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউনিসেফ-বাংলাদেশ এবং দাতাগোষ্ঠী যেমন, ইউকেএইড, অসএইড, গ্র্যান্ড চ্যালেঞ্জেস কানাডা, ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিস এবং দ্য রয়েল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন, যুক্তরাজ্যের সহযোগিতায় কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি উদ্ভাবিত স্বল্পব্যয়ে বাস্তবায়নযোগ্য দুটি প্রধান পানিতে ডুবা প্রতিরোধ ব্যবস্থা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য আঁচল নামক কমিউনিটি ডে-কেয়ার এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ৬-১০ বছর বয়সি শিশুদের জন্য সুইমসেইফ নামক জীবন রক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। একেকটি আঁচলে ১-৫ বছর বয়সি ২০-২৫ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুদের তত্ত্বাবধানে রাখেন, যে সময় শিশুর মা-বাবা সাংসারিক কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় কাটান। ওই সময়েই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পানিতে ডুবার ঘটনা ঘটে থাকে। আঁচলে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশে সহায়ক এরূপ কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখা হয় যা শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুইমসেইফ কর্মসূচির মাধ্যমে ৬-১০ বছর বয়সি শিশুরা স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত একজন কমিউনিটি সাঁতার প্রশিক্ষকের সহায়তায় জীবন রক্ষাকারী সাঁতার দক্ষতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। স্থানীয় পুকুরে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি নিরাপদ বেষ্টনীর ভেতর শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। শিশুরা প্রতিদিন আধ ঘণ্টা এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং গড়ে ১৪ দিনের মধ্যে তারা ২৫ মিটার সাঁতার কাটার এবং ৩০ সেকেন্ড গভীর পানিতে ভেসে থাকার দক্ষতা অর্জন করে, যা জীবন রক্ষাকারী সাঁতারের মানদণ্ড।

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু আঁচল কার্যক্রমে দিনে নির্ধারিত চার ঘণ্টা অবস্থান করে, তাদের পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা ৮০ শতাংশেরও অধিক কমে যায়। একইভাবে, সুইমসেইফ কর্মসূচি ৯০ শতাংশের বেশি সুরক্ষা প্রদান করে। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব গ্রামে আঁচল গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং শিশুরা (১-৪ বছর বয়সি) কমপক্ষে এক বছর আঁচল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের পানিতে ডুবে যাওয়ার সংখ্যা ৮৮ শতাংশ হ্র্রাস পেয়েছে। কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করে কার্ডিও-পালমোনারি রিসাসিটেশনসহ (সিপিআর) প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণবিষয়ক আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ৮০ শতাংশের বেশি কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এ গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা জরুরি প্রয়োজনে তাদের দক্ষতা প্রয়োগ করে পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির জীবন রক্ষা করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ড্রাউনিং-প্রিভেনটিং অ্যা লিডিং কিলার’ (২০১৪)-এ পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধকল্পে এ তিনটি উদ্ভাবনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে তাদের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও দেশীয় রীতিনীতিকে বিবেচনায় নিয়ে এ প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশেও এ উদ্ভাবনগুলো বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। উপরিউক্ত কার্যকারিতাগুলো বিবেচনা করে ভিয়েতনাম সরকার বাংলাদেশে উদ্ভাবিত প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলোকে তাদের দেশে বাস্তবায়ন করছে।

বাংলাদেশ সরকার পানিতে ডুবে যাওয়াকে শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রাগুলো (এসডিজি), বিশেষত এসডিজি ৩- সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ অর্জনের লক্ষ্যে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনসচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পাঁচ বছরের নিচে দুই লাখ শিশুর সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আট হাজার কমিউনিটি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ৬-১০ বছর বয়সি শিশুদের সাঁতার শেখানোর একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে শিশুদের এ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু প্রতিরোধে যত দ্রুত সম্ভব এসব কার্যক্রম দেশব্যাপী পরিচালনা করার এখনই সময়।

আয়ারল্যান্ড সরকারের অংশীদারত্বে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ-বাংলাদেশ এবং দ্য রয়েল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশনের সমর্থনে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি প্রথমবারের মতো সময়োপযোগী এ ঐতিহাসিক পানিতে ডুবা প্রতিরোধবিষয়ক রেজুলেশনটি উত্থাপন করেন। রেজুলেশনটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় পানিতে ডুবা প্রতিরোধ বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত করে, যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন পানিতে ডুবা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা।

ড. আমিনুর রহমান : পরিচালক, ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার; উপনির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ

এ মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিরোধ করতে হবে

 ড. আমিনুর রহমান 
২৫ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ২৫ জুলাই। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে প্রথমবারের মতো বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে এদিন। পানিতে ডুবে মৃত্যু একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারায় পানিতে ডুবে। পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধকল্পে এ বছরের স্ল্নোগান নির্ধারণ করা হয়েছে-‘Anyone can drown, no one should’-‘যে কেউ পানিতে ডুবে যেতে পারে, সবাই মিলে প্রতিরোধ করি’। পানিতে ডুবে মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এ বছরের ২৮ এপ্রিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ৭৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধবিষয়ক একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ফলে জাতিসংঘ ২৫ জুলাইকে ‘বিশ্ব পানিতে ডোবা প্রতিরোধ দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করে। আয়ারল্যান্ড সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে এবং ৭৯টি সদস্য রাষ্ট্রের সহ-পৃষ্ঠপোষকতায় এ নতুন রেজুলেশনটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম উত্থাপন করেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা। জাতিসংঘে খসড়া রেজুলেশনটি উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রদূত ফাতিমা বলেন, ‘গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত, স্বল্পব্যয়ের প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রার বেশ কয়েকটির অর্জনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। উল্লেখ্য, বন্যা ও জলযান দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে কোনো কোনো দেশের পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম। পানিতে ডুবে মোট মৃত্যুর ৯০ শতাংশেরও বেশি ঘটে থাকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয়। আফ্রিকাতে পানিতে ডুবে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি এবং এশিয়াতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পানিতে ডুবার ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। গ্রামাঞ্চলে অধিক সংখ্যক শিশু-কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বে শিশু মৃত্যুর ১০টি প্রধান কারণের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু অন্যতম। বাংলাদেশসহ বেশির ভাগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় ১-৪ বছর বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, এরপর রয়েছে ৫-৯ বছর বয়সি শিশুরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহযোগিতায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ ২০০৫ সালে বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে অনুরূপ একটি জরিপ পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যার একটি ভীতিকর চিত্র উঠে আসে। ২০১৬ সালের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতিবছর সব বয়সি প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। এদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থাৎ আনুমানিক ১৪ হাজার ৫০০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু। অন্যভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন, অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০ হাজার। এ জরিপটিতে অধিক সংখ্যক উন্মুক্ত জলাশয়, সচেতনতার অভাব, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান, শিশুদের সাঁতার না জানা এবং কমিউনিটিতে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার প্রধান প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২০-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার পরে পানিতে ডুবা হচ্ছে দ্বিতীয় প্রধান ঘাতক।

উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে গৃহীত কার্যকর পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। তাছাড়া এ পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপযুক্তও নয়। দেশের প্রেক্ষাপট এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য এরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ ২০০৫ সাল থেকে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে দেশের অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউনিসেফ-বাংলাদেশ এবং দাতাগোষ্ঠী যেমন, ইউকেএইড, অসএইড, গ্র্যান্ড চ্যালেঞ্জেস কানাডা, ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিস এবং দ্য রয়েল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন, যুক্তরাজ্যের সহযোগিতায় কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি উদ্ভাবিত স্বল্পব্যয়ে বাস্তবায়নযোগ্য দুটি প্রধান পানিতে ডুবা প্রতিরোধ ব্যবস্থা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য আঁচল নামক কমিউনিটি ডে-কেয়ার এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ৬-১০ বছর বয়সি শিশুদের জন্য সুইমসেইফ নামক জীবন রক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। একেকটি আঁচলে ১-৫ বছর বয়সি ২০-২৫ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুদের তত্ত্বাবধানে রাখেন, যে সময় শিশুর মা-বাবা সাংসারিক কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় কাটান। ওই সময়েই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পানিতে ডুবার ঘটনা ঘটে থাকে। আঁচলে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশে সহায়ক এরূপ কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখা হয় যা শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুইমসেইফ কর্মসূচির মাধ্যমে ৬-১০ বছর বয়সি শিশুরা স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত একজন কমিউনিটি সাঁতার প্রশিক্ষকের সহায়তায় জীবন রক্ষাকারী সাঁতার দক্ষতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। স্থানীয় পুকুরে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি নিরাপদ বেষ্টনীর ভেতর শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। শিশুরা প্রতিদিন আধ ঘণ্টা এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং গড়ে ১৪ দিনের মধ্যে তারা ২৫ মিটার সাঁতার কাটার এবং ৩০ সেকেন্ড গভীর পানিতে ভেসে থাকার দক্ষতা অর্জন করে, যা জীবন রক্ষাকারী সাঁতারের মানদণ্ড।

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু আঁচল কার্যক্রমে দিনে নির্ধারিত চার ঘণ্টা অবস্থান করে, তাদের পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা ৮০ শতাংশেরও অধিক কমে যায়। একইভাবে, সুইমসেইফ কর্মসূচি ৯০ শতাংশের বেশি সুরক্ষা প্রদান করে। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব গ্রামে আঁচল গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং শিশুরা (১-৪ বছর বয়সি) কমপক্ষে এক বছর আঁচল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের পানিতে ডুবে যাওয়ার সংখ্যা ৮৮ শতাংশ হ্র্রাস পেয়েছে। কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করে কার্ডিও-পালমোনারি রিসাসিটেশনসহ (সিপিআর) প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণবিষয়ক আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ৮০ শতাংশের বেশি কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এ গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা জরুরি প্রয়োজনে তাদের দক্ষতা প্রয়োগ করে পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির জীবন রক্ষা করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ড্রাউনিং-প্রিভেনটিং অ্যা লিডিং কিলার’ (২০১৪)-এ পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধকল্পে এ তিনটি উদ্ভাবনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে তাদের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও দেশীয় রীতিনীতিকে বিবেচনায় নিয়ে এ প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশেও এ উদ্ভাবনগুলো বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। উপরিউক্ত কার্যকারিতাগুলো বিবেচনা করে ভিয়েতনাম সরকার বাংলাদেশে উদ্ভাবিত প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলোকে তাদের দেশে বাস্তবায়ন করছে।

বাংলাদেশ সরকার পানিতে ডুবে যাওয়াকে শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রাগুলো (এসডিজি), বিশেষত এসডিজি ৩- সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ অর্জনের লক্ষ্যে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনসচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পাঁচ বছরের নিচে দুই লাখ শিশুর সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আট হাজার কমিউনিটি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ৬-১০ বছর বয়সি শিশুদের সাঁতার শেখানোর একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে শিশুদের এ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু প্রতিরোধে যত দ্রুত সম্ভব এসব কার্যক্রম দেশব্যাপী পরিচালনা করার এখনই সময়।

আয়ারল্যান্ড সরকারের অংশীদারত্বে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ-বাংলাদেশ এবং দ্য রয়েল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশনের সমর্থনে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি প্রথমবারের মতো সময়োপযোগী এ ঐতিহাসিক পানিতে ডুবা প্রতিরোধবিষয়ক রেজুলেশনটি উত্থাপন করেন। রেজুলেশনটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় পানিতে ডুবা প্রতিরোধ বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত করে, যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন পানিতে ডুবা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা।

ড. আমিনুর রহমান : পরিচালক, ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার; উপনির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন