সমকালীন রাজনীতিতে আমলাতন্ত্র
jugantor
সমকালীন রাজনীতিতে আমলাতন্ত্র

  অমিত রায় চৌধুরী  

২৬ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক,

সাম্প্রতিক অতীতে আমরা কিছু বিতর্ক লক্ষ করেছি, যা যুক্তির জগৎকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কখনো সড়ক, কখনো কোটা, কখনোওবা নারীর ওপর সহিংসতাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ দানা বেঁধে উঠেছিল। আমলাতন্ত্র বনাম রাজনীতি শিরোনামে একটা তর্ক নজর কেড়েছিল। কোভিড আক্রান্ত এ জনপদে ভাবনার পরিসরে তা অনেকটা জায়গাজুড়েও বসেছিল। মহান জাতীয় সংসদে ফণা তোলা এই বিতর্কের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সমাজের নানা প্রান্তে।

প্রাচীন ভারত, এমনকি পৌরাণিক যুগেও গ্রামীণ সমাজে একটা অনানুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো কাজ করত বলে জানা যায়। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, এমনকি ভারতীয় পণ্ডিত কৌটিল্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় কীভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়ে ভেবেছিলেন। আর এসব ধ্রুপদি মনীষীদের রাষ্ট্রচিন্তার মাঝে কল্যাণকামী ভাবনার স্পষ্ট প্রাধান্য ছিল। তবে সামন্ততান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কর্তার ইচ্ছায় কর্ম সম্পন্ন হয়েছে। সমাজতন্ত্রীদের ভাবনা ছিল পার্টিনির্ভর, এককেন্দ্রিক এসব ব্যবস্থায় দলই সব ক্ষমতার উৎস ছিল। আর এ কথাও সত্যি-নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বেলায় নেতা-মন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই শেষ কথা। আধুনিক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে আমলাতন্ত্র। তাদের মেধা, শ্রম, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা আইন প্রণয়নে সাহায্য করে। গণতন্ত্রের পীঠস্থান ব্রিটেনের ঐতিহ্য হলো-রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, নির্ভয় ও নির্লোভ হয়ে কাজ করবেন আমলারা। ভ্রান্ত নীতি সম্পর্কে সরকারকে সচেতন করা, সৎ পরামর্শ দেওয়ার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না হওয়াই আমলার বৈশিষ্ট্য। এই নিরপেক্ষবোধই আমলাদের পেশাদারি তৈরি করে।

ইতিহাসের ধারায় পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে রাষ্ট্র পেয়েছিল, তা ছিল আপাদমস্তক আমলাতান্ত্রিক। বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রের চরিত্র ক্রমে ক্রমে আরও আমলাতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের অভাব প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। দেখা যায়, পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার মানচিত্রজুড়ে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রবল আধিপত্য। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ লালনের উপযুক্ত পাঠ হয় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। আর প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় স্বশাসিত সরকারের সঙ্গে পরিচয় ছিল এ জনপদের। রাষ্ট্রের অতি কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে এটা একটা ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা। পঞ্চায়েত ছিল পাঁচজনের একটা দল। জনপ্রতিনিধিত্বের জন্য এদের বাছা হতো সামন্ততান্ত্রিক লেগ্যাসি থেকে। মোগলরা ছিলেন নগরকেন্দ্রিক শাসকশ্রেণি। ১৯১৯ সালে ভিলেজ সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট পাশ হয়। যার ফলে গঠিত হয় জেলা বোর্ড, ইউনিয়ন বোর্ড। এসব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক অনুশীলনে গণমুখী শাসন কাঠামোর পরিচয় মেলে। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এসব ইউনিটগুলোকে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে। ব্রিটিশরাজ এই প্রক্রিয়া শুধু গ্রহণ করেনি, তা জারি রেখেছিল। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি এরই এক সম্প্রসারিত রূপ।

গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই স্থানীয় শাসনকাঠামো তৈরি হয়েছিল। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হলো-যার যা কাজ তাকে সেভাবে করতে দেওয়া বা ক্ষমতা দেওয়া। যেমন, স্থানীয় সরকার। আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনার দায় স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে তারা জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়। যেখান থেকে তারা কর নেবে, তা থেকেই সেবা নিশ্চিত হবে। স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ তৈরি হবে। স্বাধীনতার পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ছিল উৎসবময়। সর্বস্তরের মানুষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করত সাড়ম্বরে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই নির্বাচনগুলো ছিল রাজনীতিমনস্ক নাগরিক সমাজের এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন। অথচ সেখানে দলীয় প্রতীক বরাদ্দের সঙ্গে সঙ্গে এসব সংগঠনগুলোকে রাষ্ট্রশক্তির খুঁটি হিসাবে ব্যবহার শুরু হয়। ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ নামে নতুন এক শব্দবন্ধ রাজনীতির নির্দোষ অঙ্গনে প্রবেশ করে। নির্বাচনগুলোয়ও প্রতিযোগিতার উত্তাপ কমে আসতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় অংশীদারত্বের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ জনগোষ্ঠী ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে চলে যায়। ক্ষমতার এই দড়ি টানাটানির মাঝে আমলাতন্ত্র ও বৃহৎ দলগুলো কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। লুটেরা শ্রেণির বিস্তৃতি তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সাম্প্রতিককালে অনেক রাজনীতিকের গলায় একটা আক্ষেপের সুর ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। তারা বলছেন, আমলাদের দাপটে সরকার ও রাজনীতির কর্তৃত্ব ম্লান হয়ে পড়ছে। দেশ রাজনীতিশূন্য হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতি চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীর দখলে। আর আমলাদের দখল বেগমপাড়া পর্যন্ত প্রসারিত হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক, এ কথা সত্য। অনেকের আশঙ্কা আমলাতন্ত্রের অচলায়তন ভেঙে ফেলা সহজসাধ্য নয়। আনুগত্যের মুখোশে সরকারি প্রক্রিয়ার ফাঁদে ফেলে মন্ত্রীদের আটকাতে আমলাদের জুড়ি নেই।

জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারে চালকের আসন অবশ্যই রাজনীতিকদের কাছে থাকবে। রুলস্ অব বিজনেস অনুযায়ী রাজনীতিবিদ সচিবদের উপরে। তবে দেখতে হবে সমকালীন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে বিন্যস্ত। আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পরিচর্যার সুযোগ আছে কতটা। আমলাতন্ত্র ও রাজনীতির বিরোধ নতুন নয়। আমলাতন্ত্রের প্রশ্নহীন আনুগত্য যদি পদোন্নতির সিঁড়ি নির্ধারণ করে দেয়, তবে মানের জন্য হা-হুতাশ না করাই ভালো। আমলা যদি ন্যায়নিষ্ঠ ও দেশপ্রেমিক না হন, তাহলে তা একটি জাতির জন্য ভয়ংকর বার্তা বয়ে আনতে পারে। তবে এর দায় রাজনীতিকদেরও কম নয়। আমলাতন্ত্র একটি প্রশাসনিক শৃঙ্খল। সরকারি কাজে ব্যক্তিগত আবেগকে জড়ানো উচিত নয়। পারস্পরিক সমন্বয়, সহযোগিতার নীতির বদলে বিবাদ যদি স্থান দখল করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বুনিয়াদি আস্থা তখন দুর্বল হতে থাকে। খেয়াল রাখতে হবে, এমন দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ পরিবেশে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম যেন না হয়। দেশে উন্নয়ন হচ্ছে-এ কথা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতিরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আর সে দুর্বলতার সুযোগ যদি সুবিধাভোগী আমলা বা ব্যবসায়ী ভোগ করেন, তবে তা দুর্ভাগ্যজনক। বিতর্ক উঠছে-আমলা বা ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে দুর্নীতিবিরোধী তদারকি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রাখছেন। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভোগ করছেন সীমাহীনভাবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়নই কেবল জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয়। নাগরিকের মৌলিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, বাক্স্বাধীনতা সর্বোপরি অর্থনৈতিক মুক্তিই ছিল বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য। সুষম উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকেও আমাদের নজর দেওয়া উচিত।

ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনে ন্যায়নীতি নির্ভরতা, শুদ্ধাচার চর্চার কথা বলেছেন বিশ্বসেরা মনীষীরা। মানবসভ্যতায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ও বিবর্তন ঘটেছে ন্যায্যতার আকাঙ্ক্ষা বা দায়বদ্ধতা থেকে। যে সমাজে নিয়মনীতি, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার বিকাশ যত ঘটেছে বা প্রতিপালিত হয়েছে, সে সমাজ তত অগ্রসর ও সমৃদ্ধ হয়েছে। ব্যত্যয় ঘটলে সমাজ কেবলই বিপন্নতা ও বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়েছে-ইতিহাস তাই বলে। মনে রাখতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সরকারকে আস্থাহীন করে ফেলে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি অবিশ্বাস নৈরাজ্য ডেকে আনতে পারে।

রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের চিরায়ত চরিত্রকে বিশ্লেষণ করতে গেলে অবশ্যই প্রেক্ষিতটা আমলে নিতে হবে। স্বাধীন দেশের আমলাতন্ত্র ও রাজনীতি-উভয়েরই বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আমলাতন্ত্রকে একটা দক্ষতানির্ভর, পক্ষপাতহীন, শৃঙ্খলাপ্রবণ ও ব্যক্তিনিরপেক্ষ সংগঠন হিসাবে দেখেছেন। নির্ভেজাল পেশাদারি এ গোষ্ঠীর অন্তর্গত শক্তি; যাকে আচরণগতভাবে যান্ত্রিক একটি ব্যবস্থা হিসাবে ধরা যায়। এই প্রশিক্ষিত সংগঠন যখন কোনো উপনিবেশ বা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করে, তখন তার আদর্শ, দর্শন ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। অর্থাৎ শাসকের এজেন্ডা বাস্তবায়নই তখন তার উদ্দেশ্য। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আমলাতন্ত্রে মানবিক অনুপস্থিতি কখনোই কাক্সিক্ষত নয়। দায়িত্বশীলতা, নাগরিকতাবোধ ও দেশপ্রেম একটি স্বাধীন দেশে আমলাতন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা=উত্তরকালে নেতাকর্মীর উদ্দেশ্য ও কর্মে তারতম্য লক্ষণীয়। একাত্তর-পূর্ব অধ্যায়ে আমরা রাজনীতিতে যে আবেগ, মহত্ত্ব ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত দেখেছি, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমরা তা পাইনি। স্বাধীনতা লাভের পর দেশ গঠনের জন্য যে শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল, তার অভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে দেখা দেয়। অথচ একটি সাম্যভিত্তিক বিজ্ঞানমনস্ক জাতি প্রতিষ্ঠার সংকল্পে যে রাজনীতিমনস্ক বাঙালি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ধারাবাহিক সংগ্রামে শরিক হয়, যে সর্বাত্মক ত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ নিরস্ত্র জাতি বঙ্গবন্ধুর ডাকে সশস্ত্র জনযুদ্ধে শামিল হয়ে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় অনিবার্য করে তোলে, সে দেশে স্বাধীনতার পর লোভ, ভোগ ও কর্তৃত্বের দাপটে রাজনীতির সুস্থ ধারা ক্রমেই রুগ্ণ হয়ে পড়ে। আর বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশকে আদর্শগতভাবে পঙ্গু করে ফেলে।

রাজনীতিকে যিনি ব্রত হিসাবে গ্রহণ করবেন, নীতিগতভাবে তার ভূষণ হবে জ্ঞান, মেধা ও দেশপ্রেম। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। একদম ছোট থেকে বড়-সর্বত্রই কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, লোভ, ভোগ ও দখল হলো লক্ষ্য। প্রচলিত রাজনৈতিক দর্শনে বৃহৎ একটি অংশের ত্যাগ ও সাধারণ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা নেই, আছে কর্তৃত্বের বাসনা; অগোচরেই পুষ্ট হচ্ছে সামন্ততান্ত্রিক মানসকাঠামো। প্রদর্শনবাদী সংস্কৃতির দাপট প্রবল। আর অত্যন্ত কমন ফেনোমেনা হলো-সর্বত্রই এক আওয়াজ-দল করে কী পেলাম?

অথচ এই কিছুদিন আগেও রাজনীতি করতে যাওয়ার মানেই ছিল দেশের জন্য বৃহত্তর স্বার্থে সবকিছু উৎসর্গ করা, এমনকি সংসার ধর্ম পর্যন্ত; যা ভারতবর্ষে খুব একটা বিরল দৃষ্টান্ত নয়। খুব দ্রুতই চিত্রপটে পরিবর্তনগুলো ঘটেছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে দ্রুতলয়ে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে ছাত্র-যুবক সম্প্রদায়, তাদের বড় একটা অংশ লেখাপড়ায় সময় দেয় না। ইতিহাস, অর্থনীতি বা প্রযুক্তি কোনোটিতেই তাদের আগ্রহ নেই। তাদের উৎসাহ ধরা পড়ে বিলাসবহুল গাড়িতে বা ক্ষমতার প্রদর্শনীতে। কিছুদিন আগেও যেসব রাজনীতিঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দেখেছি, তাদের জ্ঞানের গভীরতায় মুগ্ধ হয়েছি। জীবনযাপনে যে সাধারণত্ব, কথাবার্তায় যে শালীনতা, আচরণে যে বিনয় ফুটে উঠতে দেখেছি, তা আজ উধাও। কাজেই ভাবতেই হবে রাজনীতির এই কর্মীরা আমলাতন্ত্রকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। না জ্ঞানে, না নৈতিকতায়, না দেশপ্রেমে। প্রসঙ্গটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অবশ্যই সরলীকরণ করা উচিত হবে না। এখনো রাজনীতিতে প্রজ্ঞাবান, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও স্থিতধী ব্যক্তিত্ব আছেন। তবে সবার উচিত হবে এই শুদ্ধতর ধারা যেন কোনোভাবেই বিবর্ণ হয়ে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া।

লেখক : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com

সমকালীন রাজনীতিতে আমলাতন্ত্র

 অমিত রায় চৌধুরী 
২৬ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক,
অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক

সাম্প্রতিক অতীতে আমরা কিছু বিতর্ক লক্ষ করেছি, যা যুক্তির জগৎকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কখনো সড়ক, কখনো কোটা, কখনোওবা নারীর ওপর সহিংসতাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ দানা বেঁধে উঠেছিল। আমলাতন্ত্র বনাম রাজনীতি শিরোনামে একটা তর্ক নজর কেড়েছিল। কোভিড আক্রান্ত এ জনপদে ভাবনার পরিসরে তা অনেকটা জায়গাজুড়েও বসেছিল। মহান জাতীয় সংসদে ফণা তোলা এই বিতর্কের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সমাজের নানা প্রান্তে।

প্রাচীন ভারত, এমনকি পৌরাণিক যুগেও গ্রামীণ সমাজে একটা অনানুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো কাজ করত বলে জানা যায়। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, এমনকি ভারতীয় পণ্ডিত কৌটিল্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় কীভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়ে ভেবেছিলেন। আর এসব ধ্রুপদি মনীষীদের রাষ্ট্রচিন্তার মাঝে কল্যাণকামী ভাবনার স্পষ্ট প্রাধান্য ছিল। তবে সামন্ততান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কর্তার ইচ্ছায় কর্ম সম্পন্ন হয়েছে। সমাজতন্ত্রীদের ভাবনা ছিল পার্টিনির্ভর, এককেন্দ্রিক এসব ব্যবস্থায় দলই সব ক্ষমতার উৎস ছিল। আর এ কথাও সত্যি-নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বেলায় নেতা-মন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই শেষ কথা। আধুনিক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে আমলাতন্ত্র। তাদের মেধা, শ্রম, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা আইন প্রণয়নে সাহায্য করে। গণতন্ত্রের পীঠস্থান ব্রিটেনের ঐতিহ্য হলো-রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, নির্ভয় ও নির্লোভ হয়ে কাজ করবেন আমলারা। ভ্রান্ত নীতি সম্পর্কে সরকারকে সচেতন করা, সৎ পরামর্শ দেওয়ার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না হওয়াই আমলার বৈশিষ্ট্য। এই নিরপেক্ষবোধই আমলাদের পেশাদারি তৈরি করে।

ইতিহাসের ধারায় পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে রাষ্ট্র পেয়েছিল, তা ছিল আপাদমস্তক আমলাতান্ত্রিক। বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রের চরিত্র ক্রমে ক্রমে আরও আমলাতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের অভাব প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। দেখা যায়, পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার মানচিত্রজুড়ে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রবল আধিপত্য। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ লালনের উপযুক্ত পাঠ হয় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। আর প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় স্বশাসিত সরকারের সঙ্গে পরিচয় ছিল এ জনপদের। রাষ্ট্রের অতি কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে এটা একটা ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা। পঞ্চায়েত ছিল পাঁচজনের একটা দল। জনপ্রতিনিধিত্বের জন্য এদের বাছা হতো সামন্ততান্ত্রিক লেগ্যাসি থেকে। মোগলরা ছিলেন নগরকেন্দ্রিক শাসকশ্রেণি। ১৯১৯ সালে ভিলেজ সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট পাশ হয়। যার ফলে গঠিত হয় জেলা বোর্ড, ইউনিয়ন বোর্ড। এসব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক অনুশীলনে গণমুখী শাসন কাঠামোর পরিচয় মেলে। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এসব ইউনিটগুলোকে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে। ব্রিটিশরাজ এই প্রক্রিয়া শুধু গ্রহণ করেনি, তা জারি রেখেছিল। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি এরই এক সম্প্রসারিত রূপ।

গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই স্থানীয় শাসনকাঠামো তৈরি হয়েছিল। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হলো-যার যা কাজ তাকে সেভাবে করতে দেওয়া বা ক্ষমতা দেওয়া। যেমন, স্থানীয় সরকার। আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনার দায় স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে তারা জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়। যেখান থেকে তারা কর নেবে, তা থেকেই সেবা নিশ্চিত হবে। স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ তৈরি হবে। স্বাধীনতার পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ছিল উৎসবময়। সর্বস্তরের মানুষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করত সাড়ম্বরে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই নির্বাচনগুলো ছিল রাজনীতিমনস্ক নাগরিক সমাজের এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন। অথচ সেখানে দলীয় প্রতীক বরাদ্দের সঙ্গে সঙ্গে এসব সংগঠনগুলোকে রাষ্ট্রশক্তির খুঁটি হিসাবে ব্যবহার শুরু হয়। ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ নামে নতুন এক শব্দবন্ধ রাজনীতির নির্দোষ অঙ্গনে প্রবেশ করে। নির্বাচনগুলোয়ও প্রতিযোগিতার উত্তাপ কমে আসতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় অংশীদারত্বের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ জনগোষ্ঠী ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে চলে যায়। ক্ষমতার এই দড়ি টানাটানির মাঝে আমলাতন্ত্র ও বৃহৎ দলগুলো কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। লুটেরা শ্রেণির বিস্তৃতি তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সাম্প্রতিককালে অনেক রাজনীতিকের গলায় একটা আক্ষেপের সুর ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। তারা বলছেন, আমলাদের দাপটে সরকার ও রাজনীতির কর্তৃত্ব ম্লান হয়ে পড়ছে। দেশ রাজনীতিশূন্য হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতি চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীর দখলে। আর আমলাদের দখল বেগমপাড়া পর্যন্ত প্রসারিত হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক, এ কথা সত্য। অনেকের আশঙ্কা আমলাতন্ত্রের অচলায়তন ভেঙে ফেলা সহজসাধ্য নয়। আনুগত্যের মুখোশে সরকারি প্রক্রিয়ার ফাঁদে ফেলে মন্ত্রীদের আটকাতে আমলাদের জুড়ি নেই।

জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারে চালকের আসন অবশ্যই রাজনীতিকদের কাছে থাকবে। রুলস্ অব বিজনেস অনুযায়ী রাজনীতিবিদ সচিবদের উপরে। তবে দেখতে হবে সমকালীন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে বিন্যস্ত। আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পরিচর্যার সুযোগ আছে কতটা। আমলাতন্ত্র ও রাজনীতির বিরোধ নতুন নয়। আমলাতন্ত্রের প্রশ্নহীন আনুগত্য যদি পদোন্নতির সিঁড়ি নির্ধারণ করে দেয়, তবে মানের জন্য হা-হুতাশ না করাই ভালো। আমলা যদি ন্যায়নিষ্ঠ ও দেশপ্রেমিক না হন, তাহলে তা একটি জাতির জন্য ভয়ংকর বার্তা বয়ে আনতে পারে। তবে এর দায় রাজনীতিকদেরও কম নয়। আমলাতন্ত্র একটি প্রশাসনিক শৃঙ্খল। সরকারি কাজে ব্যক্তিগত আবেগকে জড়ানো উচিত নয়। পারস্পরিক সমন্বয়, সহযোগিতার নীতির বদলে বিবাদ যদি স্থান দখল করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বুনিয়াদি আস্থা তখন দুর্বল হতে থাকে। খেয়াল রাখতে হবে, এমন দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ পরিবেশে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম যেন না হয়। দেশে উন্নয়ন হচ্ছে-এ কথা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতিরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আর সে দুর্বলতার সুযোগ যদি সুবিধাভোগী আমলা বা ব্যবসায়ী ভোগ করেন, তবে তা দুর্ভাগ্যজনক। বিতর্ক উঠছে-আমলা বা ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে দুর্নীতিবিরোধী তদারকি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রাখছেন। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভোগ করছেন সীমাহীনভাবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়নই কেবল জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয়। নাগরিকের মৌলিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, বাক্স্বাধীনতা সর্বোপরি অর্থনৈতিক মুক্তিই ছিল বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য। সুষম উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকেও আমাদের নজর দেওয়া উচিত।

ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনে ন্যায়নীতি নির্ভরতা, শুদ্ধাচার চর্চার কথা বলেছেন বিশ্বসেরা মনীষীরা। মানবসভ্যতায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ও বিবর্তন ঘটেছে ন্যায্যতার আকাঙ্ক্ষা বা দায়বদ্ধতা থেকে। যে সমাজে নিয়মনীতি, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার বিকাশ যত ঘটেছে বা প্রতিপালিত হয়েছে, সে সমাজ তত অগ্রসর ও সমৃদ্ধ হয়েছে। ব্যত্যয় ঘটলে সমাজ কেবলই বিপন্নতা ও বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়েছে-ইতিহাস তাই বলে। মনে রাখতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সরকারকে আস্থাহীন করে ফেলে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি অবিশ্বাস নৈরাজ্য ডেকে আনতে পারে।

রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের চিরায়ত চরিত্রকে বিশ্লেষণ করতে গেলে অবশ্যই প্রেক্ষিতটা আমলে নিতে হবে। স্বাধীন দেশের আমলাতন্ত্র ও রাজনীতি-উভয়েরই বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আমলাতন্ত্রকে একটা দক্ষতানির্ভর, পক্ষপাতহীন, শৃঙ্খলাপ্রবণ ও ব্যক্তিনিরপেক্ষ সংগঠন হিসাবে দেখেছেন। নির্ভেজাল পেশাদারি এ গোষ্ঠীর অন্তর্গত শক্তি; যাকে আচরণগতভাবে যান্ত্রিক একটি ব্যবস্থা হিসাবে ধরা যায়। এই প্রশিক্ষিত সংগঠন যখন কোনো উপনিবেশ বা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করে, তখন তার আদর্শ, দর্শন ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। অর্থাৎ শাসকের এজেন্ডা বাস্তবায়নই তখন তার উদ্দেশ্য। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আমলাতন্ত্রে মানবিক অনুপস্থিতি কখনোই কাক্সিক্ষত নয়। দায়িত্বশীলতা, নাগরিকতাবোধ ও দেশপ্রেম একটি স্বাধীন দেশে আমলাতন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা=উত্তরকালে নেতাকর্মীর উদ্দেশ্য ও কর্মে তারতম্য লক্ষণীয়। একাত্তর-পূর্ব অধ্যায়ে আমরা রাজনীতিতে যে আবেগ, মহত্ত্ব ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত দেখেছি, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমরা তা পাইনি। স্বাধীনতা লাভের পর দেশ গঠনের জন্য যে শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল, তার অভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে দেখা দেয়। অথচ একটি সাম্যভিত্তিক বিজ্ঞানমনস্ক জাতি প্রতিষ্ঠার সংকল্পে যে রাজনীতিমনস্ক বাঙালি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ধারাবাহিক সংগ্রামে শরিক হয়, যে সর্বাত্মক ত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ নিরস্ত্র জাতি বঙ্গবন্ধুর ডাকে সশস্ত্র জনযুদ্ধে শামিল হয়ে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় অনিবার্য করে তোলে, সে দেশে স্বাধীনতার পর লোভ, ভোগ ও কর্তৃত্বের দাপটে রাজনীতির সুস্থ ধারা ক্রমেই রুগ্ণ হয়ে পড়ে। আর বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশকে আদর্শগতভাবে পঙ্গু করে ফেলে।

রাজনীতিকে যিনি ব্রত হিসাবে গ্রহণ করবেন, নীতিগতভাবে তার ভূষণ হবে জ্ঞান, মেধা ও দেশপ্রেম। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। একদম ছোট থেকে বড়-সর্বত্রই কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, লোভ, ভোগ ও দখল হলো লক্ষ্য। প্রচলিত রাজনৈতিক দর্শনে বৃহৎ একটি অংশের ত্যাগ ও সাধারণ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা নেই, আছে কর্তৃত্বের বাসনা; অগোচরেই পুষ্ট হচ্ছে সামন্ততান্ত্রিক মানসকাঠামো। প্রদর্শনবাদী সংস্কৃতির দাপট প্রবল। আর অত্যন্ত কমন ফেনোমেনা হলো-সর্বত্রই এক আওয়াজ-দল করে কী পেলাম?

অথচ এই কিছুদিন আগেও রাজনীতি করতে যাওয়ার মানেই ছিল দেশের জন্য বৃহত্তর স্বার্থে সবকিছু উৎসর্গ করা, এমনকি সংসার ধর্ম পর্যন্ত; যা ভারতবর্ষে খুব একটা বিরল দৃষ্টান্ত নয়। খুব দ্রুতই চিত্রপটে পরিবর্তনগুলো ঘটেছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে দ্রুতলয়ে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে ছাত্র-যুবক সম্প্রদায়, তাদের বড় একটা অংশ লেখাপড়ায় সময় দেয় না। ইতিহাস, অর্থনীতি বা প্রযুক্তি কোনোটিতেই তাদের আগ্রহ নেই। তাদের উৎসাহ ধরা পড়ে বিলাসবহুল গাড়িতে বা ক্ষমতার প্রদর্শনীতে। কিছুদিন আগেও যেসব রাজনীতিঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দেখেছি, তাদের জ্ঞানের গভীরতায় মুগ্ধ হয়েছি। জীবনযাপনে যে সাধারণত্ব, কথাবার্তায় যে শালীনতা, আচরণে যে বিনয় ফুটে উঠতে দেখেছি, তা আজ উধাও। কাজেই ভাবতেই হবে রাজনীতির এই কর্মীরা আমলাতন্ত্রকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। না জ্ঞানে, না নৈতিকতায়, না দেশপ্রেমে। প্রসঙ্গটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অবশ্যই সরলীকরণ করা উচিত হবে না। এখনো রাজনীতিতে প্রজ্ঞাবান, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও স্থিতধী ব্যক্তিত্ব আছেন। তবে সবার উচিত হবে এই শুদ্ধতর ধারা যেন কোনোভাবেই বিবর্ণ হয়ে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া।

লেখক : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন