কিশোর গ্যাং দমনে কারও কি দায় নেই?
jugantor
কিশোর গ্যাং দমনে কারও কি দায় নেই?

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২৭ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েকটি ক্ষেত্রে হঠাৎই যেন ধস নেমেছে। ক্রমিক করলে অনেক নম্বর দিতে হবে। স্খলনের তো অন্ত নেই। নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে কেবল। এর মধ্যে নতুন নামকরণে পর্দার সামনে চলে এসেছে ‘কিশোর গ্যাং’ পরিচয়ের এক ভয়ানক উপদ্রব, যা নানা দিক থেকে আমাদের সমাজের জন্য আশঙ্কা ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষবৃক্ষের চারা কয়েক বছর হয় রোপণ করেছে লোভী রাজনীতির ভেতরে বসবাস করা নানা এলাকার কিছুসংখ্যক দাপুটে মানুষ। এরা বেশির ভাগই স্থানীয় দখলদার-মাস্তান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের গায়ে সরকারদলীয় রাজনীতির সিলমোহর থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পুলিশ প্রশাসন কিশোর গ্যাং প্রতিহত করার জন্য যতই শক্ত কথা বলুক না কেন, কোথাও এসে তাদের ব্রেক কষতে হচ্ছে। নষ্ট রাজনীতির অক্টোপাসের শক্তি এত বেশি যে, বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের মতো অকুস্থলে এলে রক্ষা করার সব শক্তি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে নাগরিকের জীবনসংশয় হতে থাকে। অরাজক হয়ে পড়ে সমাজ-জীবন। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। সমাজের অবক্ষয় দৃশ্যমান; কিন্তু এ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করার দায়দায়িত্ব কাদের, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

আট-দশ বছর আগে থেকে ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম দেশবাসীকে পরিচিত করায়। এতে আমরা জানতে পারি, রাজধানীর নানা অংশে-উত্তরা, বছিলা, মিরপুর, মতিঝিল-এমন অনেক জায়গায় কিশোর ও উঠতি তরুণদের গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। এরা মোটরসাইকেলে বেপরোয়া ঘোরাফেরা করে। মাদকসেবন ও কেনাবেচায় যুক্ত থাকে। এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষ হয়। রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে। খুনাখুনিও হয়। এ গ্রুপে বস্তিবাসী বখাটে কিশোররা যেমন থাকে, তেমনি স্কুল-কলেজে পড়ুয়া তথাকথিত ভদ্র পরিবারের ছেলেরাও থাকে। ক্রমে কিশোর গ্যাং ভাইরাসের মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে আজ। শুরু থেকেই আমরা আমাদের লেখায় পুলিশ প্রশাসনের কাছে বহুবার নিবেদন করেছি অঙ্কুরেই বিষবৃক্ষের মূল উপড়ে দেওয়া হোক। এ দেশের শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তপনা করা এ গ্যাংগুলোর মূলোচ্ছেদ করতে পারত না? তেমনটি না করায় এসব বাহিনীর প্রতি আস্থা দেশবাসীর কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু নষ্ট রাজনীতি চলমান থাকায় এবং সব ক্ষেত্রে রাজনীতিকরণের অন্ধকার নেমে আসায় হয়তো একপর্যায়ে পুলিশবাহিনীকেও আপসের ফর্মুলায় যেতে হয় বলে মানুষের ধারণা। না হলে সময়মতো টুঁটি চেপে ধরার বদলে এসব বিষবৃক্ষের চারা বেড়ে ওঠার পথ করে দিচ্ছে কেমন করে!

১৬ জুলাই যুগান্তরে এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। তথ্যসূত্রে বেশ খোলামেলাভাবে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং : ১৯ গ্রুপের হাতে জিম্মি রমনা-মতিঝিল।’ রিপোর্টটি পড়ে আমরা যারা কিশোর গ্যাংয়ের সূত্রপাত এবং এদের সন্ত্রাসের খবর সংবাদমাধ্যমে লক্ষ করছিলাম, তাদের মনে হবে এ সন্ত্রাসীদের ছড়িয়ে পড়া ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে শক্তিশালী। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দুর্নীতির কথা বিবেচনায় রেখেও অন্তত এ সত্যটি মানা যায়, এ বৈশ্বিক মহামারি সামাল দেওয়া অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও কঠিন। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে খুব বেশি দায়ী করা যায় না। কিন্তু কিশোর গ্যাং তো আণুবীক্ষণিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস নয়। এ তো চোখের ওপর বেড়ে ওঠা কিশোর-তরুণ সন্ত্রাসী, যারা দিনদুপুরেও সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে বেড়াচ্ছে। এদের টুঁটি চেপে ধরা, মূলোচ্ছেদ করা একটি দেশের পুলিশ প্রশাসনের জন্য বড় কোনো বিষয় হতে পারে না। আমাদের দেশের পুলিশবাহিনী গোপন শত্রু ভয়ংকর জঙ্গিদের অনেকটা সাফল্যের সঙ্গেই নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। অথচ এ পুলিশ প্রশাসনই কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিকদের মতো ফাঁকা হুংকারই দিচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের ছোট্ট চারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনেই ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে বিশাল বিস্তারি হয়ে যাচ্ছে। এর কী উত্তর আছে প্রশাসনের কাছে?

তাহলে উত্তর কি পাওয়া যাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সরকারের কাছে? যুগান্তরের রিপোর্টে পরিসংখ্যান রয়েছে রাজধানীর কোথায় কয়টি গ্রুপ সক্রিয়। সরকারি দলের কোন কোন নেতার প্রশ্রয়ে কোন কোন গ্রুপ নির্ভয়ে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত এর প্রতিবাদ দেখিনি সরকারি দলের পক্ষ থেকে। আর প্রতিবাদ করলেই বা মানছে কে! এলাকার ভুক্তভোগী নাগরিকের সামনে সবকিছুই তো প্রকাশ্য। আমি ভেবে পাই না, সামাজিক সংকটের কথা না হয় বাদই দিলাম। এর রাজনৈতিক বিরূপ প্রভাবের কথা কি ভাবছেন না আমাদের ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতারা? আমার তো এখন এ আপ্তবাক্যটিই মনে হচ্ছে বারবার-‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’ কিছুসংখ্যক ক্ষুদ্র-মাঝারি নেতার এলাকার নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে সরকারি দল ও সরকার নিজেদের যে কত বড় ক্ষতি করছে, তা বিবেচনা করার সুস্থ মেধার কি কেউ নেই! নাকি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন তারা যে নাগরিকের সুখ-সুবিধা আর নিরাপত্তার প্রশ্ন চুলোয় যাক, আমাদের দাপুটে অবস্থান বজায় থাকুক। আর অমন সিদ্ধান্ত সঠিক থাকলে একটি অঙ্ক সহজেই মিলে যায়, তা হচ্ছে এত শক্তি ও ক্ষমতা থাকার পরও পুলিশ প্রশাসনকে কেন কিশোর গ্যাং দমনে ব্যর্থতা কবুল করতে হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন জানে, কিশোর গ্যাংয়ের মূলোচ্ছেদ করতে হলে তাদের গডফাদারদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে; কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া পুলিশ প্রশাসন কি এ ব্যাপারে এক পাও হাঁটতে পারে? এলাকার সন্ত্রাসী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে সরকারি পক্ষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা সাময়িক পূরণ হলেও গায়ে যে ক্যানসারের ক্ষত তৈরি হবে, তা থেকে মুক্তি কোথায়? এ নিয়ে কি কখনো রাজনৈতির নিয়ন্ত্রকদের ভাবনার অবকাশ তৈরি হয়েছে?

আমাদের দেশের সরকারগুলোকে কখনো জনগণের প্রকৃত সরকার হয়ে উঠতে দেখা যায়নি। তাই রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য প্রয়োজনে সমাজকে ভেঙেচুরে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতেও ক্ষমতার রাজনীতি দ্বিধা করে না। নাহলে এলাকার মাস্তান নেতার হাত শক্তিশালী করার জন্য, নির্বাচনে হাতিয়ার বানানোর জন্য কিশোর গ্যাং প্রতিপালনের অলিখিত অনুমোদন দিলেও সমাজে যে বড় রকমের ক্ষত তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়ে কারও ভাবনা দেখছি না। স্বার্থবাদী রাজনীতির সে দায় কখনো থাকে না। এ ধারার নেতৃত্বের কাছে তাৎক্ষণিক লাভটাই বড় লাভ। কিন্তু দরিদ্রের কুটিরে আগুন লাগলে কি পাশের দেবালয় রক্ষা পায়?

ক্রমে বিপথে যাচ্ছে কিশোর-তরুণরা। বস্তিবাসী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে তথাকথিক ভদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরাও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। টিকটকের কুপ্রভাব সম্পর্কে তো দেশবাসী অবহিত। এদের মাদক গ্রহণ ও মাদক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার খবরও আমরা পাচ্ছি। ছিনতাই-রাহাজানিতেও লিপ্ত থাকে এরা। এদের মধ্য থেকেই তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং। পারিবারিক বাঁধন ও শাসন অনেকটা শিথিল হয়ে যাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। জাতীয় পর্যায়েও এ ধারার সংগঠনে রাজনীতিকরণ সম্পন্ন হয়েছে। সমাজ সুরক্ষায় এসব সংগঠনেরও এখন কোনো দায় নেই। এরপর যদি সমাজ সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র এগিয়ে না আসে, তবে অচিরেই মূল্যহীন হয়ে যাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চাকচিক্য। এ দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক হতাশার পর শক্ত অবস্থানে থাকা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। অনেক বছর অব্যাহতভাবে সরকার পরিচালনা করার কৃতিত্ব ধারণ করে আছে আওয়ামী লীগ। অন্য দুই দল বারবার ক্ষমতায় এলেও জনগণের বড় অংশের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এবং নানা কূটরাজনীতির পথ ধরে আওয়ামী লীগ সরকার আপাতদৃষ্টিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এ কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নানা সংকট থেকে সমাজকে রক্ষা করে সমাজ-জীবন সুন্দর করা ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনের দায় তো কোনো পক্ষকে নিতে দেখছি না!

করোনার অভিশাপ আমাদের কতদিন বয়ে বেড়াতে হয়, তা কেউ জানে না। একদিন নিশ্চয়ই বিশ্ববাসী এবং আমরা করোনামুক্ত হব। কিন্তু পরবর্তী সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা নিয়ে কি আমরা কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের কথা ভাবছি? আমাদের মতো দেশে আমরা নতুন একটি শ্রেণি পাব, যারা করোনার ছোবলে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। এসব পরিবারকে সুরক্ষা দিতে না পারলে একটি তীব্র সামাজিক বিক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যাওয়ায় সমাজে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবে একটি অসাধু চক্র। ফলে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। এভাবেই সামাজিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। সুশাসন অনুপস্থিত থাকা একটি সরকারব্যবস্থায় যদি সামাজিক জীবন উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা না থাকে, ঘোর অন্ধকার গ্রাস করার অপেক্ষাতেই আমাদের থাকতে হবে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে সংকট তৈরির একটি নতুন ক্ষত কিশোর গ্যাং নিয়ে এ লেখার প্রতিপাদ্য তৈরি করেছিলাম। জনগণের টাকায় পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জনগণের সরকার দাবিদার বর্তমান সরকার যদি জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কর্তব্য বিবেচনা করে, তবে স্পষ্ট করে জানাতে হবে কিশোর গ্যাং ও তাদের প্রশ্রয়দাতাদের উচ্ছেদ করায় বাধা কোথায়? সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া কিশোর গ্যাংয়ের দুষ্টচক্র থেকে রক্ষা পেতে চায় পরিবার, সমাজ ও দেশবাসী। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজেই এ কাজে সাফল্য পেতে পারে। এখন বুঝতে হবে রাজনৈতিক সরকারের এ সদিচ্ছা আছে কি না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

কিশোর গ্যাং দমনে কারও কি দায় নেই?

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২৭ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েকটি ক্ষেত্রে হঠাৎই যেন ধস নেমেছে। ক্রমিক করলে অনেক নম্বর দিতে হবে। স্খলনের তো অন্ত নেই। নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে কেবল। এর মধ্যে নতুন নামকরণে পর্দার সামনে চলে এসেছে ‘কিশোর গ্যাং’ পরিচয়ের এক ভয়ানক উপদ্রব, যা নানা দিক থেকে আমাদের সমাজের জন্য আশঙ্কা ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষবৃক্ষের চারা কয়েক বছর হয় রোপণ করেছে লোভী রাজনীতির ভেতরে বসবাস করা নানা এলাকার কিছুসংখ্যক দাপুটে মানুষ। এরা বেশির ভাগই স্থানীয় দখলদার-মাস্তান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের গায়ে সরকারদলীয় রাজনীতির সিলমোহর থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পুলিশ প্রশাসন কিশোর গ্যাং প্রতিহত করার জন্য যতই শক্ত কথা বলুক না কেন, কোথাও এসে তাদের ব্রেক কষতে হচ্ছে। নষ্ট রাজনীতির অক্টোপাসের শক্তি এত বেশি যে, বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের মতো অকুস্থলে এলে রক্ষা করার সব শক্তি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে নাগরিকের জীবনসংশয় হতে থাকে। অরাজক হয়ে পড়ে সমাজ-জীবন। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। সমাজের অবক্ষয় দৃশ্যমান; কিন্তু এ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করার দায়দায়িত্ব কাদের, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

আট-দশ বছর আগে থেকে ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম দেশবাসীকে পরিচিত করায়। এতে আমরা জানতে পারি, রাজধানীর নানা অংশে-উত্তরা, বছিলা, মিরপুর, মতিঝিল-এমন অনেক জায়গায় কিশোর ও উঠতি তরুণদের গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। এরা মোটরসাইকেলে বেপরোয়া ঘোরাফেরা করে। মাদকসেবন ও কেনাবেচায় যুক্ত থাকে। এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষ হয়। রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে। খুনাখুনিও হয়। এ গ্রুপে বস্তিবাসী বখাটে কিশোররা যেমন থাকে, তেমনি স্কুল-কলেজে পড়ুয়া তথাকথিত ভদ্র পরিবারের ছেলেরাও থাকে। ক্রমে কিশোর গ্যাং ভাইরাসের মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে আজ। শুরু থেকেই আমরা আমাদের লেখায় পুলিশ প্রশাসনের কাছে বহুবার নিবেদন করেছি অঙ্কুরেই বিষবৃক্ষের মূল উপড়ে দেওয়া হোক। এ দেশের শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তপনা করা এ গ্যাংগুলোর মূলোচ্ছেদ করতে পারত না? তেমনটি না করায় এসব বাহিনীর প্রতি আস্থা দেশবাসীর কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু নষ্ট রাজনীতি চলমান থাকায় এবং সব ক্ষেত্রে রাজনীতিকরণের অন্ধকার নেমে আসায় হয়তো একপর্যায়ে পুলিশবাহিনীকেও আপসের ফর্মুলায় যেতে হয় বলে মানুষের ধারণা। না হলে সময়মতো টুঁটি চেপে ধরার বদলে এসব বিষবৃক্ষের চারা বেড়ে ওঠার পথ করে দিচ্ছে কেমন করে!

১৬ জুলাই যুগান্তরে এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। তথ্যসূত্রে বেশ খোলামেলাভাবে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং : ১৯ গ্রুপের হাতে জিম্মি রমনা-মতিঝিল।’ রিপোর্টটি পড়ে আমরা যারা কিশোর গ্যাংয়ের সূত্রপাত এবং এদের সন্ত্রাসের খবর সংবাদমাধ্যমে লক্ষ করছিলাম, তাদের মনে হবে এ সন্ত্রাসীদের ছড়িয়ে পড়া ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে শক্তিশালী। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দুর্নীতির কথা বিবেচনায় রেখেও অন্তত এ সত্যটি মানা যায়, এ বৈশ্বিক মহামারি সামাল দেওয়া অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও কঠিন। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে খুব বেশি দায়ী করা যায় না। কিন্তু কিশোর গ্যাং তো আণুবীক্ষণিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস নয়। এ তো চোখের ওপর বেড়ে ওঠা কিশোর-তরুণ সন্ত্রাসী, যারা দিনদুপুরেও সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে বেড়াচ্ছে। এদের টুঁটি চেপে ধরা, মূলোচ্ছেদ করা একটি দেশের পুলিশ প্রশাসনের জন্য বড় কোনো বিষয় হতে পারে না। আমাদের দেশের পুলিশবাহিনী গোপন শত্রু ভয়ংকর জঙ্গিদের অনেকটা সাফল্যের সঙ্গেই নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। অথচ এ পুলিশ প্রশাসনই কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিকদের মতো ফাঁকা হুংকারই দিচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের ছোট্ট চারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনেই ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে বিশাল বিস্তারি হয়ে যাচ্ছে। এর কী উত্তর আছে প্রশাসনের কাছে?

তাহলে উত্তর কি পাওয়া যাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সরকারের কাছে? যুগান্তরের রিপোর্টে পরিসংখ্যান রয়েছে রাজধানীর কোথায় কয়টি গ্রুপ সক্রিয়। সরকারি দলের কোন কোন নেতার প্রশ্রয়ে কোন কোন গ্রুপ নির্ভয়ে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত এর প্রতিবাদ দেখিনি সরকারি দলের পক্ষ থেকে। আর প্রতিবাদ করলেই বা মানছে কে! এলাকার ভুক্তভোগী নাগরিকের সামনে সবকিছুই তো প্রকাশ্য। আমি ভেবে পাই না, সামাজিক সংকটের কথা না হয় বাদই দিলাম। এর রাজনৈতিক বিরূপ প্রভাবের কথা কি ভাবছেন না আমাদের ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতারা? আমার তো এখন এ আপ্তবাক্যটিই মনে হচ্ছে বারবার-‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’ কিছুসংখ্যক ক্ষুদ্র-মাঝারি নেতার এলাকার নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে সরকারি দল ও সরকার নিজেদের যে কত বড় ক্ষতি করছে, তা বিবেচনা করার সুস্থ মেধার কি কেউ নেই! নাকি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন তারা যে নাগরিকের সুখ-সুবিধা আর নিরাপত্তার প্রশ্ন চুলোয় যাক, আমাদের দাপুটে অবস্থান বজায় থাকুক। আর অমন সিদ্ধান্ত সঠিক থাকলে একটি অঙ্ক সহজেই মিলে যায়, তা হচ্ছে এত শক্তি ও ক্ষমতা থাকার পরও পুলিশ প্রশাসনকে কেন কিশোর গ্যাং দমনে ব্যর্থতা কবুল করতে হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন জানে, কিশোর গ্যাংয়ের মূলোচ্ছেদ করতে হলে তাদের গডফাদারদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে; কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া পুলিশ প্রশাসন কি এ ব্যাপারে এক পাও হাঁটতে পারে? এলাকার সন্ত্রাসী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে সরকারি পক্ষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা সাময়িক পূরণ হলেও গায়ে যে ক্যানসারের ক্ষত তৈরি হবে, তা থেকে মুক্তি কোথায়? এ নিয়ে কি কখনো রাজনৈতির নিয়ন্ত্রকদের ভাবনার অবকাশ তৈরি হয়েছে?

আমাদের দেশের সরকারগুলোকে কখনো জনগণের প্রকৃত সরকার হয়ে উঠতে দেখা যায়নি। তাই রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য প্রয়োজনে সমাজকে ভেঙেচুরে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতেও ক্ষমতার রাজনীতি দ্বিধা করে না। নাহলে এলাকার মাস্তান নেতার হাত শক্তিশালী করার জন্য, নির্বাচনে হাতিয়ার বানানোর জন্য কিশোর গ্যাং প্রতিপালনের অলিখিত অনুমোদন দিলেও সমাজে যে বড় রকমের ক্ষত তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়ে কারও ভাবনা দেখছি না। স্বার্থবাদী রাজনীতির সে দায় কখনো থাকে না। এ ধারার নেতৃত্বের কাছে তাৎক্ষণিক লাভটাই বড় লাভ। কিন্তু দরিদ্রের কুটিরে আগুন লাগলে কি পাশের দেবালয় রক্ষা পায়?

ক্রমে বিপথে যাচ্ছে কিশোর-তরুণরা। বস্তিবাসী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে তথাকথিক ভদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরাও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। টিকটকের কুপ্রভাব সম্পর্কে তো দেশবাসী অবহিত। এদের মাদক গ্রহণ ও মাদক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার খবরও আমরা পাচ্ছি। ছিনতাই-রাহাজানিতেও লিপ্ত থাকে এরা। এদের মধ্য থেকেই তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং। পারিবারিক বাঁধন ও শাসন অনেকটা শিথিল হয়ে যাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। জাতীয় পর্যায়েও এ ধারার সংগঠনে রাজনীতিকরণ সম্পন্ন হয়েছে। সমাজ সুরক্ষায় এসব সংগঠনেরও এখন কোনো দায় নেই। এরপর যদি সমাজ সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র এগিয়ে না আসে, তবে অচিরেই মূল্যহীন হয়ে যাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চাকচিক্য। এ দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক হতাশার পর শক্ত অবস্থানে থাকা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। অনেক বছর অব্যাহতভাবে সরকার পরিচালনা করার কৃতিত্ব ধারণ করে আছে আওয়ামী লীগ। অন্য দুই দল বারবার ক্ষমতায় এলেও জনগণের বড় অংশের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এবং নানা কূটরাজনীতির পথ ধরে আওয়ামী লীগ সরকার আপাতদৃষ্টিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এ কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নানা সংকট থেকে সমাজকে রক্ষা করে সমাজ-জীবন সুন্দর করা ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনের দায় তো কোনো পক্ষকে নিতে দেখছি না!

করোনার অভিশাপ আমাদের কতদিন বয়ে বেড়াতে হয়, তা কেউ জানে না। একদিন নিশ্চয়ই বিশ্ববাসী এবং আমরা করোনামুক্ত হব। কিন্তু পরবর্তী সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা নিয়ে কি আমরা কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের কথা ভাবছি? আমাদের মতো দেশে আমরা নতুন একটি শ্রেণি পাব, যারা করোনার ছোবলে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। এসব পরিবারকে সুরক্ষা দিতে না পারলে একটি তীব্র সামাজিক বিক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যাওয়ায় সমাজে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবে একটি অসাধু চক্র। ফলে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। এভাবেই সামাজিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। সুশাসন অনুপস্থিত থাকা একটি সরকারব্যবস্থায় যদি সামাজিক জীবন উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা না থাকে, ঘোর অন্ধকার গ্রাস করার অপেক্ষাতেই আমাদের থাকতে হবে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে সংকট তৈরির একটি নতুন ক্ষত কিশোর গ্যাং নিয়ে এ লেখার প্রতিপাদ্য তৈরি করেছিলাম। জনগণের টাকায় পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জনগণের সরকার দাবিদার বর্তমান সরকার যদি জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কর্তব্য বিবেচনা করে, তবে স্পষ্ট করে জানাতে হবে কিশোর গ্যাং ও তাদের প্রশ্রয়দাতাদের উচ্ছেদ করায় বাধা কোথায়? সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া কিশোর গ্যাংয়ের দুষ্টচক্র থেকে রক্ষা পেতে চায় পরিবার, সমাজ ও দেশবাসী। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজেই এ কাজে সাফল্য পেতে পারে। এখন বুঝতে হবে রাজনৈতিক সরকারের এ সদিচ্ছা আছে কি না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন