সবার উপরে মানুষ সত্য
jugantor
সবার উপরে মানুষ সত্য

  সুভাষ চৌধুরী  

২৭ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি এখন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এক বছরে এ দানবের হাতে প্রাণ দিয়েছেন বিশ্বের ৪০ লাখ মানুষ। এর ভয়াবহতা ছড়িয়েছে পুরো পৃথিবীতে। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনা অতিমারিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এর শেষ কোথায়, তা কেবল ভবিতব্যই জানে। তারপরও করোনার কবল থেকে বাঁচার লড়াই শুরু হয়েছে জোরেশোরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের চূড়ান্ত চেষ্টায় একদিন কোভিড-১৯ ধরাশায়ী হবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। একদিন আমরা জিতবই।

করোনায় যে দৈনিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তার হিসাব থাকছে সরকারি দপ্তরে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে না পেরে যেসব প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, এর হিসাব রাখছে না কেউ। করোনা হয়েছে-এমন খবর এলেই স্বজন ও প্রতিবেশীদের আচরণ পালটে যাচ্ছে। ছোঁয়াচে ব্যাধি, তাই তার ধারেকাছে যাওয়া যাবে না, তার বাড়ির কাছ দিয়ে চলাচল করা যাবে না; যতটা সম্ভব তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। যে পরিবারে করোনা হানা দিয়েছে, সে পরিবারের কারও সঙ্গে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দেওয়া যাবে না। করোনা রোগীকে স্পর্শ করা যাবে না। ওই বাড়ির কোনো লোককে আমার বাড়ি আসতে দেওয়া যাবে না। এমন সব উদ্ভট ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও সরব-নীরব প্রোপাগান্ডা চলছে গ্রামে গ্রামে, শহরে, পাড়া-মহল্লায়।

করোনা রোগীর মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া যাবে না, এমন প্রচারে এটাই বলতে হয়-করোনা হওয়াটাই যেন মহাপাপ কিংবা বড় অপরাধ! এ দৃষ্টিকোণ থেকে করোনায় মৃত্যুও তাহলে এর চেয়ে মারাত্মক অপরাধ! এমন সব প্রশ্নই বর্তমানে উঠে আসছে সমাজের সামনে। কেউ এর জবাব দিতে পারছেন না। তবে এই ভ্রান্ত ধারণা ছুড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে এসেছেন দেশের চিকিৎসকরা। তাদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন সেবক-সেবিকাসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা নিজের সুরক্ষার পাশাপাশি অপরের প্রাণ বাঁচানোর জন্য সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন। মাস্ক ও অন্য সুরক্ষাসামগ্রী তুলেও দিচ্ছেন। কেবল চিকিৎসক-নার্স নন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাঠপর্যায়ে করোনা প্রতিরোধে কাজ করছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন। এই মহামারি দুর্যোগ রুখতে তাদের ভূমিকা হয়ে উঠেছে প্রশংসনীয়। তারা রোগকে ঘৃণা করেছেন, রোগীকে সেবা দিয়েছেন। এই মহত্ত্ব স্মারক হয়ে থাকবে। তারা শিখিয়েছেন-মানুষ মানুষের জন্য। তারা শিখিয়েছেন-মানবতা শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তারা ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি ও পেশা দেখেননি। সম্প্রদায় দেখেননি। ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ কিংবা জাতপাত দেখেননি। তারা শুধু সেবা দিয়ে গেছেন। সেবা দিতে ও নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধি, সংবাদকর্মী। মৃতদের এই মিছিলে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছেন কেউ না কেউ।

করোনায় মৃতদের কথিত ‘অপরাধ’ নিয়ে সমাজ এখন শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। কারণ এই দুর্ঘটনা যার-তার পরিবারে ঘটতে পারে। আর সেটিই হবে বড় ‘অপরাধ’! এই অপরাধ ঢাকতে অনেকেই প্রকাশ করছেন না তার অথবা তার পরিবারে করোনার হানা দেওয়ার কথা কিংবা করোনা উপসর্গের কথা। করোনা শনাক্ত হয়ে অথবা করোনা উপসর্গে মৃতদের নিয়ে চোখের পানি ফেললেও স্বজনরা দাফন-কাফনে অংশ নিচ্ছেন কমই। হিন্দুদের সৎকারেও এগিয়ে আসছে না হিন্দু স্বজন। এই অপরাধের শেষ কোথায় জানি না। তবু বলব, মানুষ মানুষের জন্য। আর মানবতাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এমন হাজারো ঘটনার মধ্যে তিনটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে।

জুনের শেষদিকে কুষ্টিয়ার মিরপুরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৭০ বছরের প্রফুল্ল কর্মকার। তার মরদেহটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে যখন নামানো হলো বাড়ির কাছে শ্মশানের পাশে, তখন মধ্যরাত। সৎকারের জন্য শ্মশান কমিটির কেউ এগিয়ে এলেন না। তারা কেবল চাবি পাঠিয়ে দায় এড়িয়ে থাকলেন। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। চারদিকে ঘোর অন্ধকার। স্বামী প্রফুল্ল কুমারের পাশে স্ত্রী কল্পনা কর্মকার বসে কেবলই চোখের জল মুছছেন। শ্মশান ঘিরে চারদিকে বিভীষিকা। একসময় রাত পোহাল। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল। আর স্বজনরা গা ঢাকা দিলেন সৎকার করার ভয়ে। অবশেষে মিরপুরের ইউএনওর পরামর্শে একদল মুসলমান যুবক এগিয়ে এলেন। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সমাহিত করলেন প্রফুল্ল কুমারকে। সেদিন তারা ধর্ম-বর্ণ কোনো কিছুই আমলে আনেননি-শুধু প্রমাণ করলেন, মানুষ মানুষের জন্য।

অন্যদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া ইউনিয়নের গৌরীপুর গ্রামের দিনমজুর বিধান চন্দ্র মণ্ডল করোনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজ বাড়িতে মারা যান ১০ জুন সন্ধ্যায়। হতদরিদ্র এই মানুষটির বাড়িতে আছেন তার স্ত্রী শৈব মণ্ডলসহ দুটি শিশুসন্তান। বিধানের করোনা পজিটিভ হওয়ার পর থেকে তার বাড়ির ধারেকাছে আসত না কেউ। সাতক্ষীরা থেকে কিছুদিন চিকিৎসা নিয়ে আর্থিক সংকটের কারণে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন বাড়িতে। মৃত্যুর পর স্ত্রী ও শিশুদের কান্নার রোল ভেসে এলো। তবু প্রতিবেশী কারও হৃদয় গলেনি। এগিয়ে এলেন না কোনো স্বজন, প্রতিবেশী। রাতভর মৃত স্বামীর পাশে থেকে শৈব রানী বারবার আতঙ্কে নিজ গৃহে কেঁপে উঠছিলেন। প্রতিবেশী কারও বাড়িতে গিয়ে সহযোগিতাও পেলেন না। শ্মশানে নিয়ে সৎকার করার ভয়ে সবাই পালিয়েছে। এভাবে কাটল এক বিভীষিকাময় রাত। শৈব রানীর চোখ বেয়ে কেবলই ঝরল অশ্রু। হায়! কী অপরাধ তার স্বামীর? অবশেষে শ্যামনগরের সিডো নামের একটি বেসরকারি সংস্থার তিন কলেজ শিক্ষার্থী মুসলিম যুবক করোনাকে ঘৃণা করে সুরক্ষিত স্বাস্থ্যসামগ্রী পরে এগিয়ে এলেন। মৃত্যুর ১৫ ঘণ্টা পর তারা ঘর থেকে বের করলেন বিধানের নিথর দেহ। তার স্ত্রী ও শিশুদের কান্নায় ততক্ষণে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মুসলিম শিক্ষার্থী হাফিজ, মিলন ও জামাল বাদশা মানবতাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম উচ্চারণ করে সমাহিত করলেন বিধান চন্দ্র মণ্ডলকে (৩৭)। ততক্ষণে শ্মশানের কাছে শৈব রানী সন্তানদের কোলে নিয়ে বিলাপ করছেন। আর দূর থেকে তার স্বজনরা দেখলেন-করোনার ‘অপরাধী’ বিধান মণ্ডলের অন্তিমযাত্রা ও শেষকৃত্য।

সর্বশেষ ৯ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ‘অপরাধে’ যশোরের মনিরামপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান খানপুর গ্রামের প্রফুল্ল কর্মকার। হাসপাতালে তিন ঘণ্টা পড়ে থাকল তার নিথর দেহ। ছেলে অথবা পরিবার ও আত্মীয়স্বজন-কেউ তার দেহ গ্রহণ করতে চাইলেন না। অবশেষে তাকওয়া ফাউন্ডেশনের কয়েকজন মুসলিম যুবক কথিত ‘করোনা অপরাধী’ প্রফুল্ল কুমারের লাশের সৎকার করলেন নিকটস্থ শ্মশানে। আর দূর থেকে তা প্রত্যক্ষ করে তার কাছে না এসে চোখের জল ফেললেন স্বজনরা। করোনা ‘অপরাধের’ এটাই কি তাহলে একমাত্র শাস্তি?

কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও যশোরের মনিরামপুরের এই তিন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত আমাদের শিক্ষা দিয়েছে-‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’

সুভাষ চৌধুরী : যুগান্তর প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা

সবার উপরে মানুষ সত্য

 সুভাষ চৌধুরী 
২৭ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি এখন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এক বছরে এ দানবের হাতে প্রাণ দিয়েছেন বিশ্বের ৪০ লাখ মানুষ। এর ভয়াবহতা ছড়িয়েছে পুরো পৃথিবীতে। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনা অতিমারিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এর শেষ কোথায়, তা কেবল ভবিতব্যই জানে। তারপরও করোনার কবল থেকে বাঁচার লড়াই শুরু হয়েছে জোরেশোরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের চূড়ান্ত চেষ্টায় একদিন কোভিড-১৯ ধরাশায়ী হবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। একদিন আমরা জিতবই।

করোনায় যে দৈনিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তার হিসাব থাকছে সরকারি দপ্তরে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে না পেরে যেসব প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, এর হিসাব রাখছে না কেউ। করোনা হয়েছে-এমন খবর এলেই স্বজন ও প্রতিবেশীদের আচরণ পালটে যাচ্ছে। ছোঁয়াচে ব্যাধি, তাই তার ধারেকাছে যাওয়া যাবে না, তার বাড়ির কাছ দিয়ে চলাচল করা যাবে না; যতটা সম্ভব তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। যে পরিবারে করোনা হানা দিয়েছে, সে পরিবারের কারও সঙ্গে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দেওয়া যাবে না। করোনা রোগীকে স্পর্শ করা যাবে না। ওই বাড়ির কোনো লোককে আমার বাড়ি আসতে দেওয়া যাবে না। এমন সব উদ্ভট ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও সরব-নীরব প্রোপাগান্ডা চলছে গ্রামে গ্রামে, শহরে, পাড়া-মহল্লায়।

করোনা রোগীর মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া যাবে না, এমন প্রচারে এটাই বলতে হয়-করোনা হওয়াটাই যেন মহাপাপ কিংবা বড় অপরাধ! এ দৃষ্টিকোণ থেকে করোনায় মৃত্যুও তাহলে এর চেয়ে মারাত্মক অপরাধ! এমন সব প্রশ্নই বর্তমানে উঠে আসছে সমাজের সামনে। কেউ এর জবাব দিতে পারছেন না। তবে এই ভ্রান্ত ধারণা ছুড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে এসেছেন দেশের চিকিৎসকরা। তাদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন সেবক-সেবিকাসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা নিজের সুরক্ষার পাশাপাশি অপরের প্রাণ বাঁচানোর জন্য সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন। মাস্ক ও অন্য সুরক্ষাসামগ্রী তুলেও দিচ্ছেন। কেবল চিকিৎসক-নার্স নন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাঠপর্যায়ে করোনা প্রতিরোধে কাজ করছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন। এই মহামারি দুর্যোগ রুখতে তাদের ভূমিকা হয়ে উঠেছে প্রশংসনীয়। তারা রোগকে ঘৃণা করেছেন, রোগীকে সেবা দিয়েছেন। এই মহত্ত্ব স্মারক হয়ে থাকবে। তারা শিখিয়েছেন-মানুষ মানুষের জন্য। তারা শিখিয়েছেন-মানবতা শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তারা ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি ও পেশা দেখেননি। সম্প্রদায় দেখেননি। ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ কিংবা জাতপাত দেখেননি। তারা শুধু সেবা দিয়ে গেছেন। সেবা দিতে ও নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধি, সংবাদকর্মী। মৃতদের এই মিছিলে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছেন কেউ না কেউ।

করোনায় মৃতদের কথিত ‘অপরাধ’ নিয়ে সমাজ এখন শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। কারণ এই দুর্ঘটনা যার-তার পরিবারে ঘটতে পারে। আর সেটিই হবে বড় ‘অপরাধ’! এই অপরাধ ঢাকতে অনেকেই প্রকাশ করছেন না তার অথবা তার পরিবারে করোনার হানা দেওয়ার কথা কিংবা করোনা উপসর্গের কথা। করোনা শনাক্ত হয়ে অথবা করোনা উপসর্গে মৃতদের নিয়ে চোখের পানি ফেললেও স্বজনরা দাফন-কাফনে অংশ নিচ্ছেন কমই। হিন্দুদের সৎকারেও এগিয়ে আসছে না হিন্দু স্বজন। এই অপরাধের শেষ কোথায় জানি না। তবু বলব, মানুষ মানুষের জন্য। আর মানবতাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এমন হাজারো ঘটনার মধ্যে তিনটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে।

জুনের শেষদিকে কুষ্টিয়ার মিরপুরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৭০ বছরের প্রফুল্ল কর্মকার। তার মরদেহটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে যখন নামানো হলো বাড়ির কাছে শ্মশানের পাশে, তখন মধ্যরাত। সৎকারের জন্য শ্মশান কমিটির কেউ এগিয়ে এলেন না। তারা কেবল চাবি পাঠিয়ে দায় এড়িয়ে থাকলেন। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। চারদিকে ঘোর অন্ধকার। স্বামী প্রফুল্ল কুমারের পাশে স্ত্রী কল্পনা কর্মকার বসে কেবলই চোখের জল মুছছেন। শ্মশান ঘিরে চারদিকে বিভীষিকা। একসময় রাত পোহাল। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল। আর স্বজনরা গা ঢাকা দিলেন সৎকার করার ভয়ে। অবশেষে মিরপুরের ইউএনওর পরামর্শে একদল মুসলমান যুবক এগিয়ে এলেন। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সমাহিত করলেন প্রফুল্ল কুমারকে। সেদিন তারা ধর্ম-বর্ণ কোনো কিছুই আমলে আনেননি-শুধু প্রমাণ করলেন, মানুষ মানুষের জন্য।

অন্যদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া ইউনিয়নের গৌরীপুর গ্রামের দিনমজুর বিধান চন্দ্র মণ্ডল করোনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজ বাড়িতে মারা যান ১০ জুন সন্ধ্যায়। হতদরিদ্র এই মানুষটির বাড়িতে আছেন তার স্ত্রী শৈব মণ্ডলসহ দুটি শিশুসন্তান। বিধানের করোনা পজিটিভ হওয়ার পর থেকে তার বাড়ির ধারেকাছে আসত না কেউ। সাতক্ষীরা থেকে কিছুদিন চিকিৎসা নিয়ে আর্থিক সংকটের কারণে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন বাড়িতে। মৃত্যুর পর স্ত্রী ও শিশুদের কান্নার রোল ভেসে এলো। তবু প্রতিবেশী কারও হৃদয় গলেনি। এগিয়ে এলেন না কোনো স্বজন, প্রতিবেশী। রাতভর মৃত স্বামীর পাশে থেকে শৈব রানী বারবার আতঙ্কে নিজ গৃহে কেঁপে উঠছিলেন। প্রতিবেশী কারও বাড়িতে গিয়ে সহযোগিতাও পেলেন না। শ্মশানে নিয়ে সৎকার করার ভয়ে সবাই পালিয়েছে। এভাবে কাটল এক বিভীষিকাময় রাত। শৈব রানীর চোখ বেয়ে কেবলই ঝরল অশ্রু। হায়! কী অপরাধ তার স্বামীর? অবশেষে শ্যামনগরের সিডো নামের একটি বেসরকারি সংস্থার তিন কলেজ শিক্ষার্থী মুসলিম যুবক করোনাকে ঘৃণা করে সুরক্ষিত স্বাস্থ্যসামগ্রী পরে এগিয়ে এলেন। মৃত্যুর ১৫ ঘণ্টা পর তারা ঘর থেকে বের করলেন বিধানের নিথর দেহ। তার স্ত্রী ও শিশুদের কান্নায় ততক্ষণে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মুসলিম শিক্ষার্থী হাফিজ, মিলন ও জামাল বাদশা মানবতাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম উচ্চারণ করে সমাহিত করলেন বিধান চন্দ্র মণ্ডলকে (৩৭)। ততক্ষণে শ্মশানের কাছে শৈব রানী সন্তানদের কোলে নিয়ে বিলাপ করছেন। আর দূর থেকে তার স্বজনরা দেখলেন-করোনার ‘অপরাধী’ বিধান মণ্ডলের অন্তিমযাত্রা ও শেষকৃত্য।

সর্বশেষ ৯ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ‘অপরাধে’ যশোরের মনিরামপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান খানপুর গ্রামের প্রফুল্ল কর্মকার। হাসপাতালে তিন ঘণ্টা পড়ে থাকল তার নিথর দেহ। ছেলে অথবা পরিবার ও আত্মীয়স্বজন-কেউ তার দেহ গ্রহণ করতে চাইলেন না। অবশেষে তাকওয়া ফাউন্ডেশনের কয়েকজন মুসলিম যুবক কথিত ‘করোনা অপরাধী’ প্রফুল্ল কুমারের লাশের সৎকার করলেন নিকটস্থ শ্মশানে। আর দূর থেকে তা প্রত্যক্ষ করে তার কাছে না এসে চোখের জল ফেললেন স্বজনরা। করোনা ‘অপরাধের’ এটাই কি তাহলে একমাত্র শাস্তি?

কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও যশোরের মনিরামপুরের এই তিন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত আমাদের শিক্ষা দিয়েছে-‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’

সুভাষ চৌধুরী : যুগান্তর প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন