আয় হ্রাসকালে মূল্যস্ফীতির থাবা
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
আয় হ্রাসকালে মূল্যস্ফীতির থাবা

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

২৮ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি জুন মাসের মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুনের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশে, যা বিগত ৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আর মের (৫ দশমিক ২৬) তুলনায় জুনে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য উভয় খাতই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। মূল্যস্ফীতি এমন একসময় ঘটল, যখন করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবে দেশে কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস ও অন্য কারণে মানুষের, বিশেষ করে গরিব, নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, বেকারত্বের হার বেড়েছে এবং দারিদ্র্যহারে ঊর্ধ্বগতি সুস্পষ্ট রূপ নিয়েছে।

বিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী চাল, ভোজ্যতেল এবং বেশকিছু অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে (২০২০-২১) চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতা আসেনি।

ওই অর্থবছরে সরকারি হিসাবে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ জানা না গেলেও মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, উপর্যুপরি বন্যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমন চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টন, যা শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নয়, বরং আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ লাখ টন কম। আর ইউএসডিএ-এর এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ১৭ মে একটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, হিটশক ও পোকার আক্রমণে ২০২০-২১ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯০ লাখ টন, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ টন এবং গত অর্থবছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬ লাখ টন কম।

এই যখন চাল উৎপাদনের অবস্থা, তখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে সরকার ৬ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে।

সরকার ধান-চালের সংগ্রহমূল্য গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১ ও ৩ টাকা বৃদ্ধি করে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২৫ জুলাই পর্যন্ত বোরো ধান সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার টন, যা লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক। আর একই তারিখ পর্যন্ত সিদ্ধ ও আতপ মিলে চাল সংগ্রহের পরিমাণ ৭ লাখ ৮৪ হাজার টন দাঁড়িয়েছে। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণের সম্ভাবনাও কম।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মোতাবেক বর্তমানে (২৫ জুলাই) সরকারি গুদামে চাল মজুত ১৩ লাখ টন দাঁড়ালেও তা সরকারের খাদ্যভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং গ্রামের ৫০ লাখ দুস্থ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণের জন্য যথেষ্ট নয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক জুনে কেজিপ্রতি মোটা চালের দাম পৌঁছে ৪৫ দশমিক ৮৬ টাকায়, যা আগের মাসের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি।

আর জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাজারে মোটা চালের দাম ২০১৭ সালের দরকে ছুঁয়ে ফেলে। ১৪ জুলাই একটি দৈনিকের (প্রথম আলো) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মধ্যে বাংলাদেশেই এখন চালের দাম সর্বোচ্চ। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা ছুঁয়েছে। প্রতি কেজি মাঝারি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়।

সরু চালের কেজিপ্রতি দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ভাদ্র থেকে কার্তিকের মাঝামাঝি সময়কালে দেশে অভ্যন্তরীণভাবে কোনো খাদ্যশস্য উৎপাদিত না হওয়ায় এ সময় সাধারণত চালের দামে বৃদ্ধির প্রবণতা থাকে। এখনই প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির ব্যবস্থা না নেওয়া হলে চালের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।

খাদ্য সচিব বলেছেন, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্কে বেসরকারি খাতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ উচ্চ শুল্কহারে বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে যে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি, তা গত অর্থবছরে প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে শুল্কহার আরও কমাতে হবে।

চালের দাম নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো চালের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। দুই. বিবিএসের সর্বশেষ হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬ (চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০১৯ সালে প্রকাশিত) মোতাবেক জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৪৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। আবার মাসিক মোট খাদ্য বাবদ খরচের ২৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ব্যয় হয় মূলত চাল ক্রয়ে। অবশ্য গ্রামাঞ্চলে চাল বাবদ খরচ কিছুটা বেশি।

দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দামে উল্লম্ফন ঘটেছে। গত অক্টোবরেও প্রতি পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৫০৫ টাকা। এরপর থেকে তা বাড়ছেই। ঈদুল-আজহার আগেই অর্থাৎ জুনে পাঁচ লিটার ভোজ্যতেল কিনতে হয় ৭০০ টাকায়। এখন দাম আরও বেড়েছে। বেড়েছে গরু, খাসির মাংস, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম।

করোনা মহামারির কারণে খাদ্যবহির্ভূত খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়। শহরাঞ্চলে বেড়েছে পানির দাম। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গণপরিবহণ চলাচলে সরকার নানারকম শর্ত আরোপ করায় বেড়েছে যাতায়াত ব্যয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, করোনা মহামারির কারণে দেশে কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বে প্রতি তিনজনের একজন চাকরি বা কাজ হারিয়েছেন। ফলে মানুষের আয় কমেছে। সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে।

এ অঞ্চলের ৬৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা সাময়িকভাবে কাজ থেকে ছিটকে পড়েছেন। ৫০ শতাংশ জানিয়েছেন, করোনার কারণে তারা চাকরি হারিয়েছেন। একই সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমশক্তিতে প্রবেশের উপযোগী মানুষ, বিশেষ করে শ্রমশক্তির চূড়ামণি যুবকরা। করোনার কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শ্লথগতির কারণে বেড়েছে বেকারত্বের হার, যা দারিদ্র্যহার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। কারণ, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

২০২০-২১ অর্থবছরে একাধিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থার গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে দেশে দারিদ্র্যহারে উল্লম্ফন ঘটে। এ হার দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে।

২০ এপ্রিল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্রাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। জরিপে যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার উপরে বসবাস করেন, কিন্তু যে কোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তাদের নতুন দরিদ্র হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জরিপে আরও বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি।

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ছিল ৪৪ শতাংশ। গত ১৩ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের একটি নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী কোভিড-১৯ বাংলাদেশের দুই দশকের দারিদ্র্য হ্রাসের নিয়মিত গতিকে উলটোমুখী করেছে। দেশে এখন ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

বিবিএস-এর সর্বশেষ ২০১৬ সালের ‘হায়েস’-এ দেশে দারিদ্র্যহার দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্ততায় অর্থমন্ত্রী ২০১৮ সালে দেশে দারিদ্র্যহার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান। অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্যহার নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি, যদিও তিনি বলেছেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার।’ বিবিএস করোনা মহামারির সময়কালসহ কয়েক বছর ধরে ‘হায়েস’ প্রকাশ না করায় জনগণ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপে উঠে আসা নতুন দরিদ্র সংখ্যা ও উচ্চ দারিদ্র্যহারের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করেছে।

সবশেষে বলতে চাই, যে সময় সাধারণ মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে এবং দারিদ্র্যহারে উল্লম্ফন ঘটেছে, সেসময় মূল্যস্ফীতি তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে। বিশেষ করে গরিব ও অতি গরিবরা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। তাই মূল্যস্ফীতি হ্রাসসহ সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মণ্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

আয় হ্রাসকালে মূল্যস্ফীতির থাবা

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
২৮ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি জুন মাসের মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুনের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশে, যা বিগত ৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আর মের (৫ দশমিক ২৬) তুলনায় জুনে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য উভয় খাতই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। মূল্যস্ফীতি এমন একসময় ঘটল, যখন করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবে দেশে কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস ও অন্য কারণে মানুষের, বিশেষ করে গরিব, নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, বেকারত্বের হার বেড়েছে এবং দারিদ্র্যহারে ঊর্ধ্বগতি সুস্পষ্ট রূপ নিয়েছে।

বিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী চাল, ভোজ্যতেল এবং বেশকিছু অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে (২০২০-২১) চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতা আসেনি।

ওই অর্থবছরে সরকারি হিসাবে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ জানা না গেলেও মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, উপর্যুপরি বন্যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমন চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টন, যা শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নয়, বরং আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ লাখ টন কম। আর ইউএসডিএ-এর এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ১৭ মে একটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, হিটশক ও পোকার আক্রমণে ২০২০-২১ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯০ লাখ টন, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ টন এবং গত অর্থবছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬ লাখ টন কম।

এই যখন চাল উৎপাদনের অবস্থা, তখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে সরকার ৬ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে।

সরকার ধান-চালের সংগ্রহমূল্য গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১ ও ৩ টাকা বৃদ্ধি করে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২৫ জুলাই পর্যন্ত বোরো ধান সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার টন, যা লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক। আর একই তারিখ পর্যন্ত সিদ্ধ ও আতপ মিলে চাল সংগ্রহের পরিমাণ ৭ লাখ ৮৪ হাজার টন দাঁড়িয়েছে। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণের সম্ভাবনাও কম।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মোতাবেক বর্তমানে (২৫ জুলাই) সরকারি গুদামে চাল মজুত ১৩ লাখ টন দাঁড়ালেও তা সরকারের খাদ্যভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং গ্রামের ৫০ লাখ দুস্থ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণের জন্য যথেষ্ট নয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক জুনে কেজিপ্রতি মোটা চালের দাম পৌঁছে ৪৫ দশমিক ৮৬ টাকায়, যা আগের মাসের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি।

আর জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাজারে মোটা চালের দাম ২০১৭ সালের দরকে ছুঁয়ে ফেলে। ১৪ জুলাই একটি দৈনিকের (প্রথম আলো) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মধ্যে বাংলাদেশেই এখন চালের দাম সর্বোচ্চ। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা ছুঁয়েছে। প্রতি কেজি মাঝারি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়।

সরু চালের কেজিপ্রতি দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ভাদ্র থেকে কার্তিকের মাঝামাঝি সময়কালে দেশে অভ্যন্তরীণভাবে কোনো খাদ্যশস্য উৎপাদিত না হওয়ায় এ সময় সাধারণত চালের দামে বৃদ্ধির প্রবণতা থাকে। এখনই প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির ব্যবস্থা না নেওয়া হলে চালের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।

খাদ্য সচিব বলেছেন, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্কে বেসরকারি খাতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ উচ্চ শুল্কহারে বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে যে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি, তা গত অর্থবছরে প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে শুল্কহার আরও কমাতে হবে।

চালের দাম নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো চালের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। দুই. বিবিএসের সর্বশেষ হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬ (চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০১৯ সালে প্রকাশিত) মোতাবেক জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৪৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। আবার মাসিক মোট খাদ্য বাবদ খরচের ২৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ব্যয় হয় মূলত চাল ক্রয়ে। অবশ্য গ্রামাঞ্চলে চাল বাবদ খরচ কিছুটা বেশি।

দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দামে উল্লম্ফন ঘটেছে। গত অক্টোবরেও প্রতি পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৫০৫ টাকা। এরপর থেকে তা বাড়ছেই। ঈদুল-আজহার আগেই অর্থাৎ জুনে পাঁচ লিটার ভোজ্যতেল কিনতে হয় ৭০০ টাকায়। এখন দাম আরও বেড়েছে। বেড়েছে গরু, খাসির মাংস, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম।

করোনা মহামারির কারণে খাদ্যবহির্ভূত খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়। শহরাঞ্চলে বেড়েছে পানির দাম। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গণপরিবহণ চলাচলে সরকার নানারকম শর্ত আরোপ করায় বেড়েছে যাতায়াত ব্যয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, করোনা মহামারির কারণে দেশে কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বে প্রতি তিনজনের একজন চাকরি বা কাজ হারিয়েছেন। ফলে মানুষের আয় কমেছে। সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে।

এ অঞ্চলের ৬৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা সাময়িকভাবে কাজ থেকে ছিটকে পড়েছেন। ৫০ শতাংশ জানিয়েছেন, করোনার কারণে তারা চাকরি হারিয়েছেন। একই সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমশক্তিতে প্রবেশের উপযোগী মানুষ, বিশেষ করে শ্রমশক্তির চূড়ামণি যুবকরা। করোনার কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শ্লথগতির কারণে বেড়েছে বেকারত্বের হার, যা দারিদ্র্যহার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। কারণ, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

২০২০-২১ অর্থবছরে একাধিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থার গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে দেশে দারিদ্র্যহারে উল্লম্ফন ঘটে। এ হার দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে।

২০ এপ্রিল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্রাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। জরিপে যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার উপরে বসবাস করেন, কিন্তু যে কোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তাদের নতুন দরিদ্র হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জরিপে আরও বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি।

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ছিল ৪৪ শতাংশ। গত ১৩ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের একটি নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী কোভিড-১৯ বাংলাদেশের দুই দশকের দারিদ্র্য হ্রাসের নিয়মিত গতিকে উলটোমুখী করেছে। দেশে এখন ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

বিবিএস-এর সর্বশেষ ২০১৬ সালের ‘হায়েস’-এ দেশে দারিদ্র্যহার দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্ততায় অর্থমন্ত্রী ২০১৮ সালে দেশে দারিদ্র্যহার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান। অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্যহার নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি, যদিও তিনি বলেছেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার।’ বিবিএস করোনা মহামারির সময়কালসহ কয়েক বছর ধরে ‘হায়েস’ প্রকাশ না করায় জনগণ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপে উঠে আসা নতুন দরিদ্র সংখ্যা ও উচ্চ দারিদ্র্যহারের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করেছে।

সবশেষে বলতে চাই, যে সময় সাধারণ মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে এবং দারিদ্র্যহারে উল্লম্ফন ঘটেছে, সেসময় মূল্যস্ফীতি তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে। বিশেষ করে গরিব ও অতি গরিবরা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। তাই মূল্যস্ফীতি হ্রাসসহ সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মণ্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন