দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের ধামাচাপা কাম্য নয়
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের ধামাচাপা কাম্য নয়

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২৯ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও উন্নয়ন একসঙ্গে চলতে পারে কি? কোনো দেশে দুর্নীতির মধ্য দিয়ে অবকাঠামোগত সাময়িক উন্নয়ন প্রচেষ্টা চললেও সে উন্নয়ন কি টেকসই হয়? স্বাস্থ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও গণমানসে উন্নতি না ঘটিয়ে কি কোনো দেশ উন্নয়নের দাবি করতে পারে? সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়লে কি শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন অর্জন সম্ভব? এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে।

এক শ্রেণির দুর্নীতি গবেষক দুর্নীতিকে উন্নয়নের জন্য বাধা মনে করেন না। আরেক শ্রেণি দুর্নীতির ইতিবাচক ব্যাখ্যাদাতাদের ‘দুর্নীতির সংশোধনবাদী তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেন। তারা বলেন, এ রকম তত্ত্ব উন্নয়নশীল দেশগুলোর পশ্চাৎপদতাকে দীর্ঘায়িত করার ষড়যন্ত্র। আবার কেউ বলেন, অনৈতিক পথে দুর্নীতির মাধ্যমে সাময়িক উন্নয়নে জনগণকে মোহাবিষ্ট করে ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে চায়। এ দীর্ঘ বিতর্কে না জড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি চর্চার মধ্যমে বড় দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের শৈথিল্য সরকারি প্রকল্পগুলো অকার্যকর করেছে। ফলে সরকার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার মধ্যে দেশ-বিদেশে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের দুর্নীতি-প্রাসঙ্গিক ভাবমূর্তি। টিআই-এর দুর্নীতির ধারণা সূচকে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন দেশে মেগা দুর্নীতির অনেক উদারণ থাকলেও এ প্রবন্ধে দুটি প্রশংসনীয় সরকারি প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। তার আগে দেশের অতীত দুর্নীতি পরিস্থিতির ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতাসীন। এর আগেও দলটি সপ্তম সংসদ নির্বাচন জিতে পাঁচ বছর এবং স্বাধীনতাত্তোরকালে সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনা করেছে। ওই সময়ে এবং বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির শাসনামলেও এ দেশে দুর্নীতি চর্চিত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে কোন আমলে কী পরিমাণে দুর্নীতি হয়েছে, সে তুলনামূলক আলোচনা না করাই শোভন।

এ দেশে দুর্নীতি চর্চার সূচনা হয় স্বাধীনতাত্তোরকালে রিলিফ দুর্নীতির মধ্য দিয়ে। রিলিফের কম্বল থেকে শুরু করে দুস্থদের জন্য আগত ত্রাণসামগ্রী ওই সময় আত্মসাৎ করা হয়। এ কারণে বঙ্গবন্ধুকে দুঃখ করে বলতে হয়, সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। ঋতুগতভাবে শীতকালে দেশ স্বাধীন হওয়ায় ওই সময় রিলিফসামগ্রীর মধ্যে কম্বল সবচেয়ে বেশি এলেও তার সবটা দুস্থদের হাতে পৌঁছেনি।

এ জন্য বঙ্গবন্ধু কষ্ট পেয়ে বলেছিলেন, ‘আমার কম্বলটা কই?’ ডোনাল্ড এফ ম্যাকহেনরি ও কাই বার্ড নামের দুজন বিদেশি গবেষক ফরেন অ্যাফেয়ার্স জার্নালে লেখা ‘Food Bungle in Bangladesh’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে দাবি করেন, আমেরিকার দেওয়া খাদ্য সাহায্যের শতকরা ৯০ ভাগ তাদের হাতে পৌঁছেনি, যাদের জন্য ওই সহায়তা প্রেরিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসকদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে সরকারি লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা না করলে তাদের কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

কিন্তু তখন থেকে অব্যাহত গতিতে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেলেও কোনো সরকারই বিচার ও শাস্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু হয়ে নির্বাচনী দুর্নীতি অব্যাহতভাবে (তত্ত্বাবধায়ক আমলের কতিপয় নির্বাচন বাদে) বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে এ দুর্নীতি বর্ধিত মাত্রা পেয়েছে। ডিজিটালাইজেশন ও প্রশ্নবিদ্ধ ইভিএম সশস্ত্র ও সশব্দ নির্বাচনী দুর্নীতিকে নীরব রূপ দিয়েছে। দৃশ্যমানভাবে নির্বাচনে দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় না আনায় রাজনীতি, প্রশাসন ও সমাজে দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

বর্তমান সরকারের দুটি প্রশংসিত উদ্যোগের অবতারণা করা যাক। এ সরকার মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ছিন্নমূল গরিব, ভূমি ও গৃহহীনদের পুনর্বাসনের একটি দরিদ্রবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ করে। আশ্রয়ণ প্রকল্প নামের এ প্রকল্পের স্লোগান হলো-‘আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার।’

২০২০ সালের ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রকল্পের অধীনে প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ জনকে দুই শতক জমির ওপর দু’কক্ষবিশিষ্ট একটি করে সেমিপাকা ঘর করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও এক লাখ ঘর দেওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই নতুনত্বের দাবিদার ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে শেখ হাসিনা মডেল’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প’ খ্যাত আশ্রয়ণ প্রকল্পের শরীরে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিশিল্পীরা দুর্নীতির কালিমা লেপন করে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেন। ছিন্নমূলদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার নামে এ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। সে প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু বলার আগে কতিপয় পত্রিকার এ প্রাসঙ্গিক শিরোনামে চোখ বুলিয়ে নেওয়া প্রাসঙ্গিক হবে।

ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্নীতি শোভনীয়ভাবে পরিবেশন করেছে। কতিপয় পত্রিকার শিরোনাম পড়ে দেখা যাক। ১. ‘অন্তত ৩৬ উপজেলায় গরিবের ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ’ (প্রথম আলো, ৮-৭-২০২১); ২.‘নির্মাণকাজ শেষের আগেই দেয়ালে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা’ (মানবজমিন, ৮-৭-২০২১); ৩.‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম : ৫ কর্মকর্তা ওএসডি, অনিয়মে জড়িত ১৮০’ (ভোরের কাগজ, ৬-৭-২০২১); ৪. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম’ (যুগান্তর, ৮-৭-২০২০); ৫. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম : ফেঁসে যাচ্ছেন শতাধিক কর্মকর্তা!’ (কালের কণ্ঠ, ৮-৭-২০২১); ৬. ‘গৃহহীনদের ঘর নিয়েও ওদের বাণিজ্য’ (ডয়েচে ভেলে, ২৭-১-২০২১); ৭. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দিতে ২০ হাজার করে টাকা আদায়’ (জাগোনিউজ, ২৭-২-২০২১); ৮. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে ফাটল’ (যুগান্তর, ২-৭-২০২১), ৯. ‘সরকারের দরিদ্রবান্ধব প্রকল্প কেন প্রশ্নবিদ্ধ হবে’ (যায়যায়দিন, ১৪-০৭-২০২১); প্রভৃতি। এমন অসংখ্য প্রতিবেদনের মাত্র কয়েকটি নমুনা হিসাবে এখানে উপস্থাপন করা হলো। এ দুর্নীতি প্রচার পায় দেশি-বিদেশি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমেও।

এখন দেখা যাক, কারা কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর এত ভালো একটি প্রকল্প দুর্নীতির মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। উল্লেখ্য, এ প্রকল্পে ২০২০ সালে কাজ শুরু হয়। পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী অধিকাংশ উপজেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ইউএনওর নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি। ইউএনও ছাড়া কমিটির অপর সদস্যরা হলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি), এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যসচিব হিসাবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ের আমলা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মিলেমিশে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পের ভাবমূর্তি ভেঙে চুরমার করেছেন।

ইতোমধ্যে এ দুর্নীতিতে ১৮০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যম বলছে, দুর্নীতি হয়েছে সর্বস্তরে। প্রথম আলো ৩৬টি উপজেলায় গরিবের ঘর নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ এবং ভোরের কাগজ এ দুর্নীতিতে ৩৬ জন ইউপি চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার তথ্য তুলে ধরেছে (ভোরের কাগজ, ৬-৭-২০২১)। তবে সাধারণ জনগণ ধারণা করছেন, দুর্নীতির কালিমা আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রতিটি ঘরকে স্পর্শ করেছে।

কারা ঘর পাবেন, সে তালিকাকরণে দুর্নীতি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত হতে দুস্থদের ২০ হাজার বা কোথাও তার কম বা বেশি টাকা দিতে হয়েছে। তালিকায় ছিন্নমূলদের বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সচ্ছল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘খুশি করে’ বরিশালের তালতলী উপজেলার এক পরিবারে পাঁচজন ঘর বরাদ্দ পান।

একই উপজেলার চারজন সচ্ছল সাংবাদিকও ঘর বরাদ্দ পান। পটুয়াখালীর বাউফলে রহিমা বেগমের ঘর পেতে ৮৫ হাজার টাকা খরচ হয়। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য রক্ষিত স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে তিনি এ টাকার জোগান দেন।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে যশোরের বাঘারপাড়ায় ঘরপ্রতি লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে ৬৫ হাজার টাকায় ঘর বানিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। কোথাও এক নম্বর ইটের জায়গায় ব্যবহার করা হয় ২ নম্বর ইট এবং ৩৬ এমএম টিনের পরিবর্তে ৩২ এমএম টিন। ফাউন্ডেশনে ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। মেঝে ও পিলারে নিম্নমানের খোয়া এবং জানালা দরজায় ব্যবহার করা হয় নিম্নমানের সামগ্রী। ছিন্নমূল দরিদ্রদের কাছ থেকে মালামাল পরিবহণ এবং গৃহনির্মাণ শ্রমিকদের খাবারের কথা বলে অর্থ গ্রহণ করা হয়।

এসব কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো সামান্য বৃষ্টির পানিতে ভেঙে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ধসে পড়ছে দেওয়াল। ফাটল ধরেছে ঘরের দেওয়ালে। পিলার ভেঙে গেছে। দরজা জানালা ঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ঘর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়ার ভয়ে ঘরে রাতে স্বস্তিতে ঘুমাতে পারছেন না।

সরকারিভাবে তদন্ত করে এসব দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু জনা পাঁচেক ইউএনওকে ওএসডি, দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করে সরকারিভাবে এ দুর্নীতিকাণ্ডে জড়িত সবাইকে শাস্তি প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যে ৩৬ জন ইউপি চেয়ারম্যান এ দুর্নীতিকাণ্ডে জড়িত বলে প্রকাশ পেয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়নি।

তৃণমূল পর্যায়ের এসব সরকারদলীয় নেতাদের দৃশ্যমানভাবে কঠোর শাস্তি দেওয়া হলে এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি হ্রাস পেত। কিন্তু এরা হলেন প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারের রাজনৈতিক খুঁটি। নির্বাচনের সময় সরকারের এদের সমর্থন লাগে। এ কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার মধ্যে দুর্নীতি করলেও এদের বড় রকমের শাস্তি হবে বলে বিশ্বাস করা যায় না। জনগণের ধারণা, এর আগেও সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী কাজ করে পার পাওয়া অনেক নেতার মতো এদেরও শাস্তি হবে না।

তারা এও বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে এসব সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা দৃশ্যমানভাবে নির্বাচনে দুর্নীতি করেছিল। তাদের কি সে কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল? এভাবে তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির দুষ্টচক্র প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করেছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের দুঃসময়ে যেসব বিদেশি আমাদের সমর্থন দিয়েছিলেন, এ সরকার তাদের সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্বাধীনতার চার দশক পূর্তিতে সাত পর্বে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিন শ্রেণিতে ৩৩৮ জন বিদেশি ব্যক্তিত্ব ও কতিপয় সংগঠনকে সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অতিথিদের সম্মানিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অন্যান্য উপহারের সঙ্গে বিদেশি মেহমানদের হাতে ১ ভরি স্বর্ণ ও ৩০ ভরি রুপা ব্যবহার করে নির্মিত একটি সুদৃশ্য সম্মাননা ক্রেস্ট উপহার দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশি মেহমানদের হাতে এ ক্রেস্ট তুলে দেওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।

তিন ব্যাচে শতাধিক মেহমান সম্মাননা নেওয়ার পর ক্রেস্ট দুর্নীতি উন্মোচিত হয়। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমানকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে ১০৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। জানা যায়, ক্রেস্টে সোনা-রুপার পরিবর্তে দস্তা, তামা আর পিতল ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রী মহোদয় দুর্নীতিতে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দেন। তবে শাস্তি দিয়ে তো বিদেশি মেহমানদের কাছে ভূলুণ্ঠিত সম্মান ফিরে পাওয়া যাবে না। এ জন্য সুশীল সমাজ থেকে বর্ণিত সোনা-রুপা দিয়ে আবারও ক্রেস্ট বানিয়ে সম্মাননাপ্রাপ্ত মেহমানদের নকল ক্রেস্ট রিপ্লেস করতে পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা করেনি (যুগান্তর, ২০-০৫-২০১৪)।

দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিকারী প্রধানমন্ত্রীর দুটি প্রশংসনীয় প্রকল্প আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির দুষ্টচক্র নস্যাৎ করে দেশের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নির্বাচনী দুর্নীতিসহ এসব দুর্নীতিবাজদের দৃশ্যমানভাবে শাস্তি প্রদান না করায় সরকার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়িত হয়নি। বারবার ছাড় পেয়ে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির চক্র দুর্নীতি বৃদ্ধির চলমান প্রক্রিয়াকে বেগবান করেছে। আর মূলত এ জন্যই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এখন ব্যাপকহারে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

দেশপ্রেমের চশমা

দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের ধামাচাপা কাম্য নয়

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২৯ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও উন্নয়ন একসঙ্গে চলতে পারে কি? কোনো দেশে দুর্নীতির মধ্য দিয়ে অবকাঠামোগত সাময়িক উন্নয়ন প্রচেষ্টা চললেও সে উন্নয়ন কি টেকসই হয়? স্বাস্থ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও গণমানসে উন্নতি না ঘটিয়ে কি কোনো দেশ উন্নয়নের দাবি করতে পারে? সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়লে কি শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন অর্জন সম্ভব? এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে।

এক শ্রেণির দুর্নীতি গবেষক দুর্নীতিকে উন্নয়নের জন্য বাধা মনে করেন না। আরেক শ্রেণি দুর্নীতির ইতিবাচক ব্যাখ্যাদাতাদের ‘দুর্নীতির সংশোধনবাদী তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেন। তারা বলেন, এ রকম তত্ত্ব উন্নয়নশীল দেশগুলোর পশ্চাৎপদতাকে দীর্ঘায়িত করার ষড়যন্ত্র। আবার কেউ বলেন, অনৈতিক পথে দুর্নীতির মাধ্যমে সাময়িক উন্নয়নে জনগণকে মোহাবিষ্ট করে ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে চায়। এ দীর্ঘ বিতর্কে না জড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি চর্চার মধ্যমে বড় দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের শৈথিল্য সরকারি প্রকল্পগুলো অকার্যকর করেছে। ফলে সরকার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার মধ্যে দেশ-বিদেশে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের দুর্নীতি-প্রাসঙ্গিক ভাবমূর্তি। টিআই-এর দুর্নীতির ধারণা সূচকে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন দেশে মেগা দুর্নীতির অনেক উদারণ থাকলেও এ প্রবন্ধে দুটি প্রশংসনীয় সরকারি প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। তার আগে দেশের অতীত দুর্নীতি পরিস্থিতির ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতাসীন। এর আগেও দলটি সপ্তম সংসদ নির্বাচন জিতে পাঁচ বছর এবং স্বাধীনতাত্তোরকালে সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনা করেছে। ওই সময়ে এবং বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির শাসনামলেও এ দেশে দুর্নীতি চর্চিত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে কোন আমলে কী পরিমাণে দুর্নীতি হয়েছে, সে তুলনামূলক আলোচনা না করাই শোভন।

এ দেশে দুর্নীতি চর্চার সূচনা হয় স্বাধীনতাত্তোরকালে রিলিফ দুর্নীতির মধ্য দিয়ে। রিলিফের কম্বল থেকে শুরু করে দুস্থদের জন্য আগত ত্রাণসামগ্রী ওই সময় আত্মসাৎ করা হয়। এ কারণে বঙ্গবন্ধুকে দুঃখ করে বলতে হয়, সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। ঋতুগতভাবে শীতকালে দেশ স্বাধীন হওয়ায় ওই সময় রিলিফসামগ্রীর মধ্যে কম্বল সবচেয়ে বেশি এলেও তার সবটা দুস্থদের হাতে পৌঁছেনি।

এ জন্য বঙ্গবন্ধু কষ্ট পেয়ে বলেছিলেন, ‘আমার কম্বলটা কই?’ ডোনাল্ড এফ ম্যাকহেনরি ও কাই বার্ড নামের দুজন বিদেশি গবেষক ফরেন অ্যাফেয়ার্স জার্নালে লেখা ‘Food Bungle in Bangladesh’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে দাবি করেন, আমেরিকার দেওয়া খাদ্য সাহায্যের শতকরা ৯০ ভাগ তাদের হাতে পৌঁছেনি, যাদের জন্য ওই সহায়তা প্রেরিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসকদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে সরকারি লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা না করলে তাদের কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

কিন্তু তখন থেকে অব্যাহত গতিতে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেলেও কোনো সরকারই বিচার ও শাস্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু হয়ে নির্বাচনী দুর্নীতি অব্যাহতভাবে (তত্ত্বাবধায়ক আমলের কতিপয় নির্বাচন বাদে) বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে এ দুর্নীতি বর্ধিত মাত্রা পেয়েছে। ডিজিটালাইজেশন ও প্রশ্নবিদ্ধ ইভিএম সশস্ত্র ও সশব্দ নির্বাচনী দুর্নীতিকে নীরব রূপ দিয়েছে। দৃশ্যমানভাবে নির্বাচনে দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় না আনায় রাজনীতি, প্রশাসন ও সমাজে দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

বর্তমান সরকারের দুটি প্রশংসিত উদ্যোগের অবতারণা করা যাক। এ সরকার মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ছিন্নমূল গরিব, ভূমি ও গৃহহীনদের পুনর্বাসনের একটি দরিদ্রবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ করে। আশ্রয়ণ প্রকল্প নামের এ প্রকল্পের স্লোগান হলো-‘আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার।’

২০২০ সালের ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রকল্পের অধীনে প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ জনকে দুই শতক জমির ওপর দু’কক্ষবিশিষ্ট একটি করে সেমিপাকা ঘর করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও এক লাখ ঘর দেওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই নতুনত্বের দাবিদার ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে শেখ হাসিনা মডেল’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প’ খ্যাত আশ্রয়ণ প্রকল্পের শরীরে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিশিল্পীরা দুর্নীতির কালিমা লেপন করে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেন। ছিন্নমূলদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার নামে এ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। সে প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু বলার আগে কতিপয় পত্রিকার এ প্রাসঙ্গিক শিরোনামে চোখ বুলিয়ে নেওয়া প্রাসঙ্গিক হবে।

ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্নীতি শোভনীয়ভাবে পরিবেশন করেছে। কতিপয় পত্রিকার শিরোনাম পড়ে দেখা যাক। ১. ‘অন্তত ৩৬ উপজেলায় গরিবের ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ’ (প্রথম আলো, ৮-৭-২০২১); ২.‘নির্মাণকাজ শেষের আগেই দেয়ালে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা’ (মানবজমিন, ৮-৭-২০২১); ৩.‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম : ৫ কর্মকর্তা ওএসডি, অনিয়মে জড়িত ১৮০’ (ভোরের কাগজ, ৬-৭-২০২১); ৪. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম’ (যুগান্তর, ৮-৭-২০২০); ৫. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম : ফেঁসে যাচ্ছেন শতাধিক কর্মকর্তা!’ (কালের কণ্ঠ, ৮-৭-২০২১); ৬. ‘গৃহহীনদের ঘর নিয়েও ওদের বাণিজ্য’ (ডয়েচে ভেলে, ২৭-১-২০২১); ৭. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দিতে ২০ হাজার করে টাকা আদায়’ (জাগোনিউজ, ২৭-২-২০২১); ৮. ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে ফাটল’ (যুগান্তর, ২-৭-২০২১), ৯. ‘সরকারের দরিদ্রবান্ধব প্রকল্প কেন প্রশ্নবিদ্ধ হবে’ (যায়যায়দিন, ১৪-০৭-২০২১); প্রভৃতি। এমন অসংখ্য প্রতিবেদনের মাত্র কয়েকটি নমুনা হিসাবে এখানে উপস্থাপন করা হলো। এ দুর্নীতি প্রচার পায় দেশি-বিদেশি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমেও।

এখন দেখা যাক, কারা কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর এত ভালো একটি প্রকল্প দুর্নীতির মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। উল্লেখ্য, এ প্রকল্পে ২০২০ সালে কাজ শুরু হয়। পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী অধিকাংশ উপজেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ইউএনওর নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি। ইউএনও ছাড়া কমিটির অপর সদস্যরা হলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি), এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যসচিব হিসাবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ের আমলা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মিলেমিশে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পের ভাবমূর্তি ভেঙে চুরমার করেছেন।

ইতোমধ্যে এ দুর্নীতিতে ১৮০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যম বলছে, দুর্নীতি হয়েছে সর্বস্তরে। প্রথম আলো ৩৬টি উপজেলায় গরিবের ঘর নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ এবং ভোরের কাগজ এ দুর্নীতিতে ৩৬ জন ইউপি চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার তথ্য তুলে ধরেছে (ভোরের কাগজ, ৬-৭-২০২১)। তবে সাধারণ জনগণ ধারণা করছেন, দুর্নীতির কালিমা আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রতিটি ঘরকে স্পর্শ করেছে।

কারা ঘর পাবেন, সে তালিকাকরণে দুর্নীতি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত হতে দুস্থদের ২০ হাজার বা কোথাও তার কম বা বেশি টাকা দিতে হয়েছে। তালিকায় ছিন্নমূলদের বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সচ্ছল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘খুশি করে’ বরিশালের তালতলী উপজেলার এক পরিবারে পাঁচজন ঘর বরাদ্দ পান।

একই উপজেলার চারজন সচ্ছল সাংবাদিকও ঘর বরাদ্দ পান। পটুয়াখালীর বাউফলে রহিমা বেগমের ঘর পেতে ৮৫ হাজার টাকা খরচ হয়। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য রক্ষিত স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে তিনি এ টাকার জোগান দেন।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে যশোরের বাঘারপাড়ায় ঘরপ্রতি লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে ৬৫ হাজার টাকায় ঘর বানিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। কোথাও এক নম্বর ইটের জায়গায় ব্যবহার করা হয় ২ নম্বর ইট এবং ৩৬ এমএম টিনের পরিবর্তে ৩২ এমএম টিন। ফাউন্ডেশনে ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। মেঝে ও পিলারে নিম্নমানের খোয়া এবং জানালা দরজায় ব্যবহার করা হয় নিম্নমানের সামগ্রী। ছিন্নমূল দরিদ্রদের কাছ থেকে মালামাল পরিবহণ এবং গৃহনির্মাণ শ্রমিকদের খাবারের কথা বলে অর্থ গ্রহণ করা হয়।

এসব কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো সামান্য বৃষ্টির পানিতে ভেঙে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ধসে পড়ছে দেওয়াল। ফাটল ধরেছে ঘরের দেওয়ালে। পিলার ভেঙে গেছে। দরজা জানালা ঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ঘর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়ার ভয়ে ঘরে রাতে স্বস্তিতে ঘুমাতে পারছেন না।

সরকারিভাবে তদন্ত করে এসব দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু জনা পাঁচেক ইউএনওকে ওএসডি, দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করে সরকারিভাবে এ দুর্নীতিকাণ্ডে জড়িত সবাইকে শাস্তি প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যে ৩৬ জন ইউপি চেয়ারম্যান এ দুর্নীতিকাণ্ডে জড়িত বলে প্রকাশ পেয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়নি।

তৃণমূল পর্যায়ের এসব সরকারদলীয় নেতাদের দৃশ্যমানভাবে কঠোর শাস্তি দেওয়া হলে এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি হ্রাস পেত। কিন্তু এরা হলেন প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারের রাজনৈতিক খুঁটি। নির্বাচনের সময় সরকারের এদের সমর্থন লাগে। এ কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার মধ্যে দুর্নীতি করলেও এদের বড় রকমের শাস্তি হবে বলে বিশ্বাস করা যায় না। জনগণের ধারণা, এর আগেও সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী কাজ করে পার পাওয়া অনেক নেতার মতো এদেরও শাস্তি হবে না।

তারা এও বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে এসব সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা দৃশ্যমানভাবে নির্বাচনে দুর্নীতি করেছিল। তাদের কি সে কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল? এভাবে তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির দুষ্টচক্র প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করেছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের দুঃসময়ে যেসব বিদেশি আমাদের সমর্থন দিয়েছিলেন, এ সরকার তাদের সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্বাধীনতার চার দশক পূর্তিতে সাত পর্বে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিন শ্রেণিতে ৩৩৮ জন বিদেশি ব্যক্তিত্ব ও কতিপয় সংগঠনকে সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অতিথিদের সম্মানিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অন্যান্য উপহারের সঙ্গে বিদেশি মেহমানদের হাতে ১ ভরি স্বর্ণ ও ৩০ ভরি রুপা ব্যবহার করে নির্মিত একটি সুদৃশ্য সম্মাননা ক্রেস্ট উপহার দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশি মেহমানদের হাতে এ ক্রেস্ট তুলে দেওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।

তিন ব্যাচে শতাধিক মেহমান সম্মাননা নেওয়ার পর ক্রেস্ট দুর্নীতি উন্মোচিত হয়। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমানকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে ১০৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। জানা যায়, ক্রেস্টে সোনা-রুপার পরিবর্তে দস্তা, তামা আর পিতল ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রী মহোদয় দুর্নীতিতে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দেন। তবে শাস্তি দিয়ে তো বিদেশি মেহমানদের কাছে ভূলুণ্ঠিত সম্মান ফিরে পাওয়া যাবে না। এ জন্য সুশীল সমাজ থেকে বর্ণিত সোনা-রুপা দিয়ে আবারও ক্রেস্ট বানিয়ে সম্মাননাপ্রাপ্ত মেহমানদের নকল ক্রেস্ট রিপ্লেস করতে পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা করেনি (যুগান্তর, ২০-০৫-২০১৪)।

দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিকারী প্রধানমন্ত্রীর দুটি প্রশংসনীয় প্রকল্প আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির দুষ্টচক্র নস্যাৎ করে দেশের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নির্বাচনী দুর্নীতিসহ এসব দুর্নীতিবাজদের দৃশ্যমানভাবে শাস্তি প্রদান না করায় সরকার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়িত হয়নি। বারবার ছাড় পেয়ে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির চক্র দুর্নীতি বৃদ্ধির চলমান প্রক্রিয়াকে বেগবান করেছে। আর মূলত এ জন্যই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এখন ব্যাপকহারে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন