মিঠে কড়া সংলাপ

ত্যাগের মাঝেই রমজানের ফজিলত

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ০৫ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র রমজান মাস সমাগত

পবিত্র রমজান মাস সমাগত। মে মাসের মাঝামাঝি রমজানের শুরু। সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মাসটি পালন করবেন।

আমাদের দেশেও ১৬ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ১০-১২ কোটি মানুষ সেই সিয়াম সাধনায় সারা দিন রোজা রেখে পানাহার থেকে বিরত থেকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত-বন্দেগি করবেন। এ দেশে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ রোজা রাখেন।

পবিত্র রমজান মাসকে ভিন্নতর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে মসজিদে মসজিদে মুসল্লিদের ঢল নামে। বিশেষ করে জুমার নামাজ এবং তারাবির সময় মসজিদে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষই তারাবির নামাজ আদায়ের মাধ্যমে নেক আমল অর্জনের দিকে সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেন।

সারা দিন অভুক্ত থেকে ইফতারের পর সামান্য সময় বিরতি দিয়ে মসজিদ পানে ছুটে চলা এসব মুসল্লিকে দেখলে মক্কা-মদিনার কথা মনে পড়ে যায়। রমজান মাসে একবার ওমরাহ পালন করতে গিয়ে সেখানে দেখেছিলাম, মক্কা-মদিনা সারা রাত জাগ্রত থাকে।

এ দুটি নগরী সে সময় ঘুমায় না। সারা রাত খোলা থাকে মসজিদের দরজা। খোলা থাকে বাজার-হাট, দোকানপাটও। মক্কা-মদিনায় সে সময়ে রাত বলে কিছু থাকে না। বিজলি বাতিতে সারা রাত আলোকোজ্জ্বল থাকে।

মক্কা-মদিনার রাতের সে দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা মুসলিম জাহানে। আমাদের বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষও পবিত্র রমজান মাসকে মহিমান্বিত করতে সারা রাত ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করেন।

মসজিদে মসজিদে, ঘরে ঘরে ইফতারির মাধ্যমে সারা দিনের অভুক্ত হৃতয়ে তারা প্রাণের সঞ্চার করান। বুকফাটা তৃষ্ণা এলেও সারা দিনে কেউ এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত পান করেন না। আড়ালে-আবডালেও নয়।

এই যে খোদাভীতি ও খোদাপ্রীতি মুসলিম সম্প্রদায় প্রদর্শন করে চলেছে, তার মহিমা অতুলনীয়। অন্য ধর্মের মানুষও সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন, তাকে ভয় করেন; তবে সারা দিন রোদে পরিশ্রমের কাজ করে ঘাম ঝরিয়ে তৃষ্ণায় বুক ফেটে গেলেও হাতের মুঠোয় এক সাগর পানি পেয়ে সেখান থেকে একবিন্দু পান না করে খোদার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এক মহান দৃষ্টান্ত বটে।

বিশেষ করে আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষ, যারা রিকশা চালান, ঠেলা ঠেলেন, বোঝা টানেন, তারা অমানুষিক পরিশ্রম করার পরও রোজা রেখে খোদাভক্তির যে প্রমাণ দেন তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়।

কারণ আরব বিশ্ব এবং উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশের মুটে, মজুর, কৃষক, শ্রমিকসহ দরিদ্র শ্রেণীর মানুষজন রমজান মাসে অশেষ কষ্ট স্বীকার করে রোজা রাখেন। অথচ এই শ্রেণীর মানুষ দিন শেষে ইফতার হিসেবে যা খেতে পান বা খান তা নিতান্তই মামুলি।

দু’মুঠো মুড়ি আর একমুঠো ছোলা দিয়েই তাদের ইফতারি সারতে হয়। এ সময়ে দেশে খেজুর পাওয়া গেলেও এসব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকায় ইফতারের সময় তাদের ভাগ্যে একটি খেজুরও জোটে না।

ফলমূলসহ প্রয়োজনীয় অন্য কানো খাদ্যবস্তুই ইফতারির সময় তারা জোটাতে পারেন না। তাই কোনোমতে ইফতার সেরে পেট ভরে ভাত খেতে পারাটাই তাদের জন্য আনন্দের বিষয়। এ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীরই আর্থিক সচ্ছলতা এখন পর্যন্ত এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে, তারা ইফতারের সময় রকমারি ফলমূল ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে ইফতার করতে পারেন।

অন্যদিকে বাকি অর্ধেকসংখ্যক মানুষ ভালো ভালো ইফতারসামগ্রী দিয়ে রোজা ভাঙেন এবং এ শ্রেণীর কিছু মানুষ এত বেশি ইফতারসামগ্রী নিয়ে বসেন যে, রীতিমতো তাদের স্বাস্থ্যের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও শ্রেণীবৈষম্য এখনও এত বেশি যে, এক শ্রেণীর হাতে প্রচুর অর্থ, অন্যদিকে আর এক শ্রেণী এখনও আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত। এখনও এ দেশে দুই কোটিরও অধিক জনগোষ্ঠীর নুন আনতে পানতা ফুরায়।

একজন শ্রমিকের ৪-৫ জনের পরিবারে এখনও তিন বেলা খাবার বলতে কী জোটে সে পরিসংখ্যান সবার জানা নেই বলেই আমার ধারণা! বর্তমানে আমি মফস্বলের একটি জেলায় অবস্থান করছি। ঘুরেফিরে যা দেখলাম, শুনলাম ও বুঝলাম তাতে পৌর এলাকার একটি অংশ হওয়া সত্ত্বেও আমার বসবাসের এলাকার ৬০ ভাগ মানুষ এখনও দরিদ্র, যাদের ৩০ ভাগের অবস্থা অত্যন্ত করুণ।

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়নের ছোঁয়া কাদের গায়ে লেগেছে সে পরিসংখ্যান যে কেউ করে দেখতে পারেন। এখানে আমি শুধু সেসব মানুষের কথা বলতে চাইছি, যারা একটি শাড়ি-কাপড়, একটি লুঙ্গির জন্য পবিত্র রমজান মাসে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকেন। বলতে চাইছি ওই শ্রেণীর মানুষের কথা, সারা দিন রোজা রেখে ইফতারের সময় যেসব মানুষের ভাগ্যে একটি খেজুর, একটি ফল, একটু শরবত জোটে না। যারা শুধু এক গ্লাস পানি, দু’মুঠো মুড়ি আর একমুঠো ছোলা দিয়ে ইফতারি করবেন, আমি তাদের কথা বলতে চাইছি। সেই সঙ্গে তাদের কথাও বলতে চাইছি, যাদের ইফতারির টেবিলে থাকবে আস্ত একটি মুরগির রোস্ট, মোরগ মোসাল্লাম, শিক কাবাব, বটি কাবাব, বিরিয়ানি, আপেল, আঙুর, মরিয়ম খেজুর, বিদেশি ফলমূলসহ আরও কত কিছু!

রমজান মাসের আরও একটি আয়োজনের কথাও বলতে চাইছি, আর তা হল ইফতার পার্টি। রাজধানীতে রাজনৈতিক দলগুলোর ইফতার পার্টিতে দাওয়াত পেয়ে থাকেন সমাজের উঁচুতলার লোকজন। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও থানা সদরে পর্যন্ত ইদানীং রাজনৈতিক ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয় এবং সব ক্ষেত্রেই উচ্চশ্রেণীর মানুষজনই সেসব ইফতার পার্টিতে আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন।

আবার এতিম শিশুদের নিয়েও ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়। সাধারণত রাজনৈতিক দলের প্রধানরা এতিমখানা থেকে শিশু এনে তাদের ইফতার করান এবং টেলিভিশনের পর্দায় আমরা সেসব দৃশ্য দেখে থাকি।

কিন্তু সারা দেশের অনাহারী, দুস্থ-অসহায় এতিম শিশুরা এ ক্ষেত্রেও উপেক্ষিত থেকে যায়। যদি বলি, টেলিভিশনের পর্দায় নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা হিসেবে রাজধানীতে এসব করা হয়, তাহলে হয়তো কেউ তেড়ে মারতে এলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না; কিন্তু তবুও বলব, সারা দেশের এই শ্রেণীর শিশুদের উপেক্ষা করে ঢাকায় বসে এসব করে কী বোঝানো হয়, সে প্রশ্নটিও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এখানে রেখে যেতে চাই।

ঢাকায় বসে এতিম শিশুদের নিয়ে ইফতার করা বা ইফতার করানো দোষের কিছু নয়। এ কথা ধরে নিলেও বলব, দেশের সারা ইউনিয়ন, সারা গ্রামে এমনটি না করতে পারা পর্যন্ত উপরোক্ত ঘটনাকে যদি মতলববাজি বলি, তাহলে কিন্তু গোস্বা করা চলবে না।

পরিশেষে এ দেশের আরও এক শ্রেণীর মানুষের কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। এই শ্রেণীর মানুষেরা পবিত্র রমজান মাস এলেই এমন খাবো খাবো ভাব দেখান যে, পুরো দেশের সব খাদ্যসামগ্রী যেন তারা গিলে ফেলবেন! পয়সাওয়ালা এই শ্রেণীর মানুষেরা রমজান মাস শুরুর আগ থেকেই মাছ-মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর ‘গো অ্যান্ড স্টক’ শুরু করে দেন। বলা বাহুল্য, তারা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে ঘরে ঢোকান।

আর ইফতারের সময় থেকে ভোররাত পর্যন্ত সেসব খাদ্যবস্তু ভক্ষণ করে অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজান মাসে নিজেদের দেহের ওজন আরও বেশি বাড়িয়ে ফেলেন। তারা ভুলে যান যে, রমজান মাস সংযমের মাস।

এ মাসে বেশি বেশি খাওয়া কেন, কোনোকিছুই বেশি করা যাবে না। একমাত্র দান-ছদকা ও ইবাদত ছাড়া। তাছাড়া ওই শ্রেণীর মনুষের অনেকেরই রোগবালাই থাকা সত্ত্বেও এবং অনেক খাদ্যবস্তুতে ডাক্তারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা মনে করেন, এই মাসে বেশি খেলে কিছু হবে না!

যেমন অনেকেই বলে থাকেন, কোরবানির মাংস বেশি খেলে ক্ষতি নেই, এমনকি যাদের রেডমিট বা মাংস খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ তাদের অনেকেও এমন ধারণা পোষণ করেন। যাক সে কথা।

উপসংহারে বলব, পবিত্র রমজান মাস হল সংযমের মাস, খাবার-দাবার, কথাবার্তা আচার-ব্যবহার সবকিছুতেই এ মাসে সংযম প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। এ মাসে যা বেশি বেশি করতে বলা হয়েছে, তা হল নেক আমল।

আমাদের দেশে এ মাসে আমরা নেক আমল অর্জনের জন্য যা করতে পারি তা হল, প্রথমেই অসহায়-দরিদ্র জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সাধ্যমতো তাদের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান। এখনও যে দেশে দুই কোটিরও বেশি মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্যাভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন; একটু খাবার, এক টুকরা কাপড়ের জন্য হাত পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সে দেশে খাদ্যদ্রব্যের অপব্যবহার, ভোগ্যপণ্যের অপচয় একটি অপরাধ।

আর রমজান মাসে এসব করা তো মহাপাপ। তাই যারা পয়সাওয়ালা, তাদের উচিত হবে সব ধরনের অপচয়, বাহুল্য খরচ থেকে মুক্ত হয়ে আশপাশের দরিদ্রদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া।

যেসব শহুরে মানুষ গ্রামে যান না বা দেশের বাড়িতে যান না, তারা অন্তত এ মাসে সেখানে গিয়ে দেখতে পারেন, হয়তো তাদের আত্মীয়স্বজন বা পাড়াপড়শিদের কেউ কেউ অভাব-অনটনে আছেন, যাদের তারা সাহায্য করে ঘরে ফিরলে আত্মার শান্তি লাভ করতে পারবেন।

এমনকি যাদের সামর্থ্য সীমিত তারাও নিজেদের প্রয়োজন কিছুটা কাটছাঁট করে এই পবিত্র রমজান মাসে অসহায়-দরিদ্র মানুষের প্রতি অল্প পরিমাণে হলেও সাহায্যের হাত বাড়াতে পারেন। আর সক্ষম ব্যক্তিদের উদ্দেশে আবারও বলব, পবিত্র রমজান মাসে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে বেশি বেশি দান করুন। কারণ ভোগ নয়, ত্যাগের মাঝেই রমজানের ফজিলত।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter