অবিচল সতর্কতা হল স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য

  প্রাণ গোপাল দত্ত ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসা শব্দটির আগে জরুরি শব্দটি যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনি পেছনে ব্যবহৃত হয় সেবা। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ রূপ হল ‘জরুরি স্বাস্থ্য সেবা’ অথবা স্বাস্থ্যসেবা। অর্থাৎ স্বাস্থ্য কোনো পণ্য বা বিক্রীত উপকরণ নয়। শিক্ষার আগে মৌলিক শব্দটিই খুব ভালোভাবে খাপ খায়। মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের অন্যতম হল শিক্ষা। মৌলিক শিক্ষা মানুষের জীবনে কতটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, তা সহজে অনুমেয়। দুটো ধারণা এখনও প্রচলিত- প্রথমটি বিলুপ্তির পথে যা হল মা-বাবা কন্যাশিশুদের লেখাপড়া শেখাতে আগ্রহী নন, এমনকি তারা বিরোধিতা করে থাকেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এখন শুধু সন্তান লেখাপড়া করে না, তাদের মা অথবা বাবা ভালো গ্রেডিংয়ের জন্য রীতিমতো সন্তানের সঙ্গে একই ক্লাসের ছাত্র বনে যান। একান্ত গরিব এবং সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষটিও বর্তমানে তার সন্তানের লেখাপড়ার প্রয়োজনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। সন্তানের জ্ঞানের পরিধির দিকে এখন মা-বাবার নজর নেই, আছে গ্রেডিংয়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বিভিন্ন প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানমূলক সমীক্ষা থেকে এটাই দেখা যাচ্ছে যে, নাগাল এবং আর্থিক সঙ্গতির মধ্যে কার্যকর ও সুরক্ষিত কোনো স্কুল থাকলে কোনো মা-বাবাই শিশুকে স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে ইতস্তত করেন না, সে ছেলেই হোক বা মেয়ে। যেখানে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত মনোভাব দেখা যায়, তার কারণ কিন্তু স্কুলের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি। যেমন, স্কুলের দূরত্বের কারণে শিশুদের, বিশেষত মেয়েদের নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা বা বিদ্যালয়ে মাত্র দু-একজন শিক্ষক থাকা এবং মাঝে মাঝে তার অনুপস্থিত থাকা, এসব কারণে শিশুদের লেখাপড়ার ব্যাপারে মা-বাবার আশঙ্কা থাকলে সেটাকে তাদের আগ্রহের অভাব বলে একবারেই ধরা ঠিক নয়। বরং সত্যটা এর বিপরীত- মা-বাবারা আসলে এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহী।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তার ভারত : উন্নয়ন ও বঞ্চনা বইয়ে উন্নয়ন ও শিক্ষা কলামে যা লিখেছেন তা হল- অ্যাডাম স্মিথের ধ্রুপদী বিশ্লেষণে বাজার ব্যবস্থার কার্যকারিতার দিকটা খুব জোরালোভাবে ধরা পড়েছে। সেই অ্যাডাম স্মিথই দু’শ বছর আগে শিক্ষা ও উন্নয়নের সংযোগটা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলেছিলেন, এ সংযোগের একটা বড় দিক হল শিক্ষাগত পরিবর্তনে সরকারি পরিসেবার কেন্দ্রীয় গুরুত্ব। তিনি সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অনেক বেশি রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদানের দাবি তুলে বলেছিলেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের একটা সামান্য অংশ ব্যয় করেই সরকার প্রায় সমগ্র জনসাধারণকে মৌলিক শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে, এমনকি তাদের পক্ষে এটা আবশ্যিক করে তুলতে পারে।

ইউরোপ ও আমেরিকার অভিজ্ঞতাগুলোকে নিবিড়ভাবে অনুধাবন করলে খুব পরিষ্কার দেখা যায়, কীভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে শিক্ষা একটা বহুপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছে; শিক্ষার এ প্রসার কিন্তু সম্ভব হয়েছে সরকারি উদ্যোগেই। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো ইউরোপ ও আমেরিকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে। এশিয়ায় আধুনিক অর্থনৈতিক বিকাশের পথিকৃৎ হচ্ছে জাপান; ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এখানে স্কুল শিক্ষায় পরিবর্তনকারী ভূমিকাটা অত্যন্ত স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মেইজি শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময়েই জাপানে সাক্ষরতার হার ইউরোপের চেয়ে বেশি ছিল, যদিও সেখানে তখনও সেই শিল্পায়ন বা আধুনিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি, যা নাকি ইউরোপে এক শতাব্দী ধরে চলে আসছিল। এটা ছিল একটা অবিমিশ্র সরকারি দায়বদ্ধতার নীতি, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন একটা নিশ্চয়তা দেবে- যাতে দেশে কোনো কমিউনিটি বা জনসমষ্টিতে একটিও নিরক্ষর পরিবার থাকবে না; কোনো পরিবারেই একজন লোকও নিরক্ষর থাকবে না। জাপানে সর্বজনীন স্কুলশিক্ষার এ নিশ্চয়তা এসেছিল সেখানকার গঠনমূলক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, যদিও সেই রাষ্ট্র ছিল স্বৈরতন্ত্রী।

মেইজি যুগে (১৮৬৮-১৯১২) জাপানে উন্নয়নের নীতিতে শিক্ষার ওপর অত্যন্ত বেশি জোর দেয়া হয়। তার একটি উদাহরণ- ১৯০৬ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে সমগ্র জাপানের গ্রাম ও নগরাঞ্চলের মোট বাজেটের ৪৩ ভাগ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। এ সময় মৌলিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অতি দ্রুত অগ্রগতি হয়। সেনাবাহিনীতে নিয়োগের দায়িত্বে থাকা পদাধিকারীরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে দেখেন যে, যেখানে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে সৈন্যদের এক-তৃতীয়াংশই ছিল নিরক্ষর, সেখানে ১৯০৬ সালে এসে দেখা গেল- সেনাবাহিনীতে আর প্রায় কেউই নিরক্ষর নেই। ১৯১০ সালের মধ্যে জাপান প্রায় পূর্ণসাক্ষর একটি দেশ হয়ে ওঠে, অন্তত কমবয়সীদের ক্ষেত্রে। আর ১৯১৩ সালে পৌঁছে দেখা গেল- জাপান, যে নাকি তখন ইংল্যান্ড বা আমেরিকার তুলনায় নিতান্ত গরিব দেশ, সে ব্রিটেনের চেয়ে বেশি এবং আমেরিকার তুলনায় দ্বিগুণসংখ্যক বই প্রকাশ করেছে। জাপানে শিক্ষার ওপর কেন্দ্রীভূত মনোযোগ তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রগতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আধুনিক জাপানের ইতিহাসের পুরোটা জুড়েই উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনের ছাপ পড়েছে; এটি হল মানব উন্নয়ন, বিশেষত স্কুলশিক্ষা দরিদ্র মানুষের প্রথম এবং প্রধান মিত্র, এটা শুধু ধনী ও সচ্ছলদেরই ব্যাপার নয়। পরবর্তীকালে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং অবশ্যই চীনও একই পথ অনুসরণ করে মৌলিক শিক্ষার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং এটা করা হয় প্রধানত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে। পূর্ব এশিয়ার দ্রুত অর্থনৈতিক প্রগতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রায়ই এবং সঙ্গত কারণেই বিশ্বায়িত বাজার অর্থনীতিকে ব্যবহার করার বিষয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর আগ্রহের ওপর জোর দেয়া হয়। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার যে, এই প্রক্রিয়াটা এখানকার জনশিক্ষাগত অর্জন থেকে বিপুল সাহায্য পেয়েছে। লোকেরা যদি পড়তে-লিখতে না পারত, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এত ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করা এ দেশগুলোর পক্ষে খুবই কঠিন হতো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রজ্ঞা ও বহুমাত্রিক দর্শনের মাধ্যমে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং একই সঙ্গে শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক কনসেপ্ট বা ধারণা বিশ্বকে নাড়া দিলেও কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের কর্মে অনীহা অথবা সরকারি চাকরি নয় বলে যে অবজ্ঞা, তা নিদারুণভাবে প্রধানমন্ত্রীর দর্শনকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করছে ঠিক একইভাবে বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রাথমিক সেবাবঞ্চিত করছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শিক্ষাকে যেভাবে অবৈতনিক করে তোলা হয়েছে, শিক্ষাবৃত্তি ও উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে, স্কুল থেকে ড্রপআউট যেভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে, এমনকি ১ জানুয়ারি দেশব্যাপী বই উৎসব ছাত্রছাত্রীদের যেভাবে স্কুলের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে, তাতে করে আমার অটল বিশ্বাস- বাংলাদেশ জাপান, তাইওয়ান, হংকং এবং সিঙ্গাপুরের দেশগুলোর মতো হয়ে উঠবে। এ প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের আরও একটি উক্তি- বাংলাদেশ দরিদ্র একটা দেশ হওয়া সত্ত্বেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ভারতকে শুধু ছুঁয়ে ফেলেনি, ছাড়িয়েও গেছে। নেপাল তো আরও দরিদ্র এবং ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তার সাক্ষরতার হার ভারতের অর্ধেক ছিল। কিন্তু কমবয়সীদের সাক্ষরতায় নেপালও ভারতকে ধরে ফেলেছে। এমনকি ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সাক্ষরতার হারের ব্যবধানটাও তিরিশ বছর আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে, যদিও ভারত এখনও কিছুটা এগিয়ে আছে।

এখানে যে সত্যটা উঠে এসেছে, তা আসলে মৌলিক শিক্ষার বিপজ্জনক অবহেলার কাহিনী, বিশেষত মেয়েদের শিক্ষাগত বঞ্চনার তীব্র বিপদ সংকেত। অথচ মৌলিক শিক্ষা হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটা মুখ্য প্রয়োজন। আমার বিবেচনায় সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্থানীয় নেতৃত্ব কোটারি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন। যেমন বিভিন্ন সংসদীয় এলাকার একেকজন ক্ষমতাসীন নেতার পরিবারের সদস্যরাই স্কুল কমিটিগুলো সদস্যপদ অলংকৃত করেন, যোগ্যতা বিবেচিত হয় না। কোনো স্কুলের একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র, সরকারের উচ্চ এবং সম্মানিত পদ থেকে অবসর নিয়ে গ্রামে থাকলেও তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। এমনটি ঘটলে নতুন প্রজন্ম নিশ্চয়ই তাকে মডেল হিসেবে নিতে পারত, তাদের মধ্যে বড় হওয়ার প্রবল আকাক্সক্ষা জাগত।

এ উপমহাদেশের উদাহরণ হিসেবে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ধরা যাক। একটি বৌদ্ধ সংঘ পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান হিন্দু রাজন্যবর্গসহ অন্যদের সহায়তায় সমগ্র এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসতেন। ১০৮৮ সালে বলন্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ৬০০ বছর আগেই নালন্দার প্রতিষ্ঠা। নালন্দা ছিল উচ্চতর জ্ঞানচর্চার এমন এক প্রাচীন কেন্দ্র- যেখানে চীন, কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং অবশিষ্ট এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ছাত্রদের আগমন ঘটত। শুধু তাই নয়, এমনকি সুদূর তুরস্ক থেকেও কিছু ছাত্র এখানে পড়তে আসতেন। সপ্তম শতাব্দীতে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ সময়ে এর সম্পূর্ণ আবাসিক ছাত্রাবাসগুলোয় অন্তত দশ হাজার শিক্ষার্থী থাকতেন।

২০১১ সালের পর বিভিন্ন জরিপ সংস্থা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব গ্রেডিং প্রকাশ করেছে, সেখানে প্রথম ২০০-এর মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ পাকিস্তানসহ সার্কভুক্ত দেশগুলোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়- তার অবনমনের পেছনে কী কারণ, সেটা খুঁজে বের করতে না পারা অবশ্যই সরকার তথা ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান উন্নয়নে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও গ্রেডিং সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্বিতীয়ত, ভর্তি সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা। তৃতীয়ত, জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে উচ্চ গ্রেডিংয়ে আগ্রহ। চতুর্থত, শিক্ষকদের শিক্ষাদান ও গবেষণায় অনীহা। গবেষক-শিক্ষকের সঙ্গে তার মেধাবী এবং প্রিয় ছাত্রছাত্রীর অনেকেই বিভিন্ন স্তরে কাজ করতে পারলে টিউশনের পরিবর্তে কিছু উপার্জন করতে পারবেন এবং গবেষণায় আগ্রহী হবেন।

এ ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে হলে দেশের গোটা স্কুলশিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার, বস্তুত পুনর্নির্মাণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের স্কুলগুলোর শিক্ষার মান ধরে রাখতে হলে সব ছাত্রকে যেভাবে স্কুলে আনা হচ্ছে, সেখান থেকে তাদের ড্রপআউট কমিয়ে আনতে হবে; শিক্ষার মান পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়াতে হবে। শিক্ষণ পদ্ধতিতে মুখস্থের পরিবর্তে চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। শিশুদের দিয়ে স্কুলশিক্ষকের সামনে শ্রেণীভেদে উপস্থিতভাবে কোনো বিষয় সম্পর্কে বলতে এবং লিখতে দিতে হবে। যেমন ১ম শ্রেণীর ছাত্রকে তোমার বাবা সম্বন্ধে বল, মা সম্পর্কে বল, ভাই সম্পর্কে বল ইত্যাদি। তখন দেখা যাবে, শিশুটি এমন কিছু বলবে, যা বিনোদন বা হাসির খোরাক জোগাবে। একই সঙ্গে তার বলার সাহস জোগাবে। আমার এখনও মনে পড়ে, আমি যখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র- তখন আমার প্রধান শিক্ষক আসগর আলী স্যার এসে বললেন, আজকে আমরা কোনো লেখাপড়া করব না। আমরা সবার পরিবার সম্পর্কে পরিচয় লাভ করব এবং প্রত্যেকে তার পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে ৫টি বাক্য বলবে এবং তা নির্জলা সত্য হতে হবে।

ক্লাসের ফার্স্টবয় হওয়ায় আমার বক্তব্যই প্রথম। আমাকে বাবা অথবা ‘মা’ সম্বন্ধে বলতে বলা হল। আমি বললাম, আমি ঠাকুরমা সম্পর্কে বলব। ক্লাসে হাসির রোল। স্যার অনুমতি দিলেন। যেই বললাম, আমার ঠাকুরমা খুব সুন্দরী ও সাহসী। হাসির বন্যা। শতকরা একশ’ ভাগ সত্য। স্যার সবাইকে থামিয়ে দিলেন, আবার অনুমতি দিয়ে বললেন, তুমি বল। আবার শুরু- আমার ঠাকুরমা শুধু সাহসী নন, দাদু থেকে শুরু করে তার ছেলেমেয়েরা সবাই তাকে যমের মতো ভয় পায়, কিন্তু আমি ভয় পাই না। এবার হাসি আর থামছিল না এবং স্যারকে বেতের সাহায্য নিতে হয়েছিল। এই যে সত্য বলার সাহস জোগানো, এ জন্য আমি এখনও আমার প্রধান শিক্ষক আসগর আলী স্যারকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করি।

দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রকে ‘তোমাদের পোষা বিড়াল অথবা পালিত গরু সম্পর্কে বল’, তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রকে ‘বই কী, বই সম্পর্কে বল’ এভাবে কথা বলার সাহস জোগানো হলে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের বলার অভ্যাস যেমন গড়ে উঠবে, তেমনি তারা ভয়হীন ও আÍবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অবিচল সতর্কতাই জ্ঞান বৃদ্ধির অন্যতম উপায় এবং অর্থবোধক স্বাধীনতার মূলভিত্তি। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে অবিচল সতর্ক থাকতে হবে এবং মনে রাখতে হবে- শিক্ষা এবং চিকিৎসা যদি পণ্য হয়ে ওঠে, তবে তার গুণগত মান বজায় থাকে না। গুণগত মানহীন শিক্ষা এবং চিকিৎসা জাতিকে, এমনকি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে।

পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যতগুলো আঞ্চলিক জোট গঠিত হয়েছে, তার মধ্যে শুধু MIKTA (Mexico, Indonesia, Korea, Turkey & Australia) তাদের মূল এজেন্ডায় Health Security-কে প্রাধান্য দিয়েছে, যা অন্য কোনো আঞ্চলিক জোটে এতটা বলিষ্ঠভাবে প্রাধান্য পায়নি। অন্যরা শুধু মুক্ত অর্থনীতি এবং উদার বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংহতির দিকেই দৃষ্টিনিবদ্ধ করেছে। MIKTA একটা শিক্ষণীয় উদাহরণ দিয়েছে- ‘MIKTA places high priority on improving global health security, as it is in the common interest of the international community to do so. In this regard, at the height of the Ebola crisis MIKTA expressed its concern that the spread of the Ebola virus represents a serious global health challenge not only to West Africa but also to the international community as a whole.

অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক; সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter