ব্লেন্ডেড শিক্ষায় দেশজ ব্লেন্ডার চাই
jugantor
ব্লেন্ডেড শিক্ষায় দেশজ ব্লেন্ডার চাই

  ড. মো. ফখরুল ইসলা ম  

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সশরীরে উপস্থিতি ও ভার্চুয়াল পদ্ধতির সংমিশ্রণে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোকে সহজ ভাষায় ব্লেন্ডেড শিক্ষা বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের শিক্ষায় শ্রেণিকক্ষের একঘেঁয়েমি কাটানোর জন্য কিছু সময় মুখের বক্তৃতা ও কিছু সময় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঠদান করা হয়। পাঠদানে বৈচিত্র্য আনতে ও তা আনন্দময় করতে ব্লেন্ডেড শিক্ষণ পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে।

অন্য কথায়, একইসঙ্গে সশরীরে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ও অনলাইনের বা অনসাইটের শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের মাঝে বোঝানো ও প্রদর্শন করার মাধ্যমে পাঠদান করার পদ্ধতি হচ্ছে ব্লেন্ডেড শিক্ষা। প্রত্যেক মানুষের শেখার ইচ্ছা ও মনন এক নয়। আবার প্রত্যেক শিক্ষকের শেখানোর কৌশল ও ধরন এক নয়। কেউ একবার শুনেই শিখে ফেলে, কেউ দেখে শেখে, কেউ লিখে শেখে। কাউকে বহুবার বহু কসরত করেও শেখানো যায় না।

এমন নানা কারণ ও নানা ধরনের মধ্যে ‘ঘোল’ তৈরি করে শিক্ষার বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য করে শিক্ষার্থীর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার কৌশলকেও আমরা ব্লেন্ডেড শিক্ষণ বলতে পারি। করোনাকাল শুরু হওয়ার আগে এ পদ্ধতিতে শিক্ষাদানে কিছুটা ভাটা পড়লেও দীর্ঘদিন ঘরবন্দি মানুষ আবার নতুন করে এর ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

তবে ব্লেন্ডেড শিক্ষাপদ্ধতি নতুন কিছু নয়। প্রথমদিকে শিশু ও বয়স্ক শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্লেন্ডেড শিক্ষার কথা ভাবা হলেও পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তির সাহায্যে লেখাপড়াকে সহজ করে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। মূল্যবান সময়কে জয় করে সব মানুষের জন্য দ্রুত আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের নিরিখে এটাকে আধুনিক শিক্ষার নীতি ও রূপরেখার মধ্যে বিবেচনা করা শুরু হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬০ সালে এ পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের চিন্তা শুরু করে। এরপর প্লাটো বা ‘প্রোগ্রামড লজিক ফর অটোমেটিক টিচিং’ অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেখাতে পারে এমন একটি উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়। এজন্য ১৯৭০ সালে স্যাটেলাইট বেজড্ লাইভ ভিডিও শুরু করা হয়। এটা ব্যয়বহুল প্রমাণিত হওয়ায় পাশাপাশি ছোট প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে গবেষণা অব্যাহত থাকে।

এরপর ১৯৯০ সালে আটলান্টার একটি এডুকেশনাল কোম্পানি তাদের ইন্টারঅ্যাকটিভ লার্নিং সেন্টারের প্রেস রিলিজে প্রথমবারের মতো আইপিএসসি লার্নিং নামে এর ঘোষণা দেয় (ওয়াসিফ জান্নাত ২০০০)। কিন্তু ব্লেন্ডেড শিক্ষা নামটি দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট ছিল। এরপর ‘হ্যান্ডবুক অব ব্লেন্ডেড লার্নিং’ নামক পাবলিকেশনে (গ্রাহাম ও বঙ্ক ২০০৬) বলা হয়, ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং এমন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যা ফেস-টু-ফেস ইন্সট্রাকশন ও কম্পিউটার ব্যবহার করে ইন্সট্রাকশনের একটি ব্লেন্ডেড মডেল।’

ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের জন্য বিশ্বব্যাপী নানা কৌশলের অবতারণা করা হয়। দেশজ প্রযুক্তির সক্ষমতা, আর্থিক বরাদ্দ, মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতার হার, গ্রাম ও শহরের মধ্যে আয় ও জীবনমানের সমতা ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে খুব সহজেই ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ প্রক্রিয়ায় সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বিশেষ করে করোনাকালীন শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক দেশ খুব দ্রুত শিক্ষা এডাপ্টেশন প্রক্রিয়ায় উপনীত হয়েছে। তাই উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষায় পিছিয়ে যাওয়া বা সেশনজটসংক্রান্ত সমস্যার কথা তেমন একটা শোনা যায় না।

ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের জন্য নানা আধুনিক মডেল প্রচলিত রয়েছে। এর কতগুলো কমন বা সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। যেগুলো সহজ, আনন্দময়, ইন্টারঅ্যাকটিভ ও ইন্টারেস্টিং সেগুলো সব দেশের সব বয়সি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য। তবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেসব উপকরণের কথা বলা হয়েছে, তা আমাদের মতো দরিদ্র দেশের পক্ষে একসঙ্গে জোগান ও সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের দেশে কয়েক দশক আগে চালু হওয়া দূরশিক্ষণ এক ধরনের ব্লেন্ডেড লার্নিং ছিল।

দেখা গেছে, অনেক বয়স্ক ব্যক্তির বাড়িতে টিভি সেট নেই। বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে টিভি অনুদান দেওয়া হলেও সেখানে পাড়ার যুবকরা রাতভর বিদেশি সিনেমা চালাত। এখনো ব্লেন্ডেড লার্নিংকে দূরশিক্ষণের ভাবনার মতো মনে করা হয়। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি গত ২৭.০৫.২০২১ তারিখে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং একটি জীবনব্যাপী শিক্ষা। এটি বয়স্কদের ও কর্মজীবীদের জন্য।’ এটি অতি পুরোনো ভাবনা। অথচ, করোনাকালে আমরা ২০২১ সালে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে উচ্চশিক্ষার ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের আধুনিক প্রচলনের কথা ভাবছি।

আমরা ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ-২০১৮-২০৩০’-এর অধীনে উন্নত বিশ্বের আদলে ব্লেন্ডেড লার্নিং পরিকল্পনার কথা ভেবে কর্মপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করেছি। কারণ, আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা সমান নয়। আয় বৈষম্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সচল বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটে সবার প্রবেশগম্যতার অভাব ও গতির তারতম্য অনলাইন পাঠদানের ক্ষেত্রে চরম হতাশার চিত্র তুলে ধরায় অদ্যাবধি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেনি। শুধু কর্মপরিকল্পনা ও সমস্যা চিহ্নিত করতেই আমরা ২২ মাস অতিবাহিত করে ফেলেছি। কারণ, উন্নত বিশ্বের আদলে আমাদের অনলাইন শিক্ষা প্রক্রিয়া অচল প্রমাণিত হয়েছে।

এখন ব্লেন্ডেড লার্নিং প্ল্যানে যে খসড়া মডেলের কথা বলা হচ্ছে, তাও পরীক্ষামূলক। কিন্তু এ মুহূর্তে কোনো বিষয়ে একইসঙ্গে অনলাইন ও অনসাইট পরীক্ষা চালানোর সময় নেই। এখন সেশনজট থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত সবাইকে টিকা দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে স্বল্পসংখ্যক উপস্থিতি নিয়ে পরীক্ষাগুলো শেষ করাটাই বড় কাজ।

ফ্লিপ্ড ক্লাসরুম সব সময়ের জন্য ভালো। মুখের বক্তৃতা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে বা একটু অবকাশ দিয়ে ফ্লিপ্ড প্রক্রিয়া (ভিডিও পডকাস্ট, বুক রিডিং অ্যান্ড অ্যানালাইজিং, ওয়েবসাইট) বেশ ফলদায়ক। এতে একঘেঁয়েমি দূর হয় এবং আনন্দের সঙ্গে শিক্ষালাভে মন চাঙা হয়ে ওঠে। আমরা ২৫-২৬ বছর আগে বিদেশে অধ্যয়নকালীন এসব পদ্ধতিতে ক্লাস করতাম। সারা দিন ক্লাস করতেও বোরিং লাগত না। এ বছর যদি করোনা চলে যায়, আমরা আগামী বছরের জন্য এ মডেলের মাধ্যমে দ্রুতলয়ে এ পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারব।

তবে আমাদের দেশজ পরিস্থিতিতে ব্লেন্ডেড লার্নিং কতটুকু কার্যকর হবে, তা গভীরভাবে ভাবতে হবে। এর যেমন কিছু ভালো দিক আছে, তেমনি কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে। ভালো দিক হলো, শিক্ষার্থীদের একইসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের টিচিং মেটেরিয়াল দেওয়া যায়। কোনটা বেশি ভালো, সেটা বাছাই করে তারা নিজেদের ব্রেনের প্ল্যাটফরম তৈরি করে নিতে পারে এবং সেই অনুযায়ী উচ্চতর গবেষণা প্লট সাজাতে পারে।

মিশ্রণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক শুধু উপায় বাতলে দেন, কাজটা সম্পন্ন করতে হয় শিক্ষার্থীকে। ব্লেন্ডেড লার্নিং হলো পাঁচমিশালী শিক্ষা। খিচুড়ি রান্নার আগে তাতে প্রোটিন থাকে না। কিন্তু যখন অনেক কিছু একত্রে মিশ্রিত হয়ে সিদ্ধ হয়ে যায়, তখন সেটা প্রোটিনে রূপান্তর হয়ে শরীরের পুষ্টি সাধন করে। তবে ব্লেন্ডেড লার্নিং দিতে গিয়ে অখাদ্য তৈরি করে কাউকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।

ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের বিদেশি উপকরণ ও সুবিধাদি আর আমাদের দেশের সুবিধাদি মোটেও এক সমান ও মানের নয়। আমাদের দেশজ মডেল নেই। আমাদের সব শিক্ষক এ শিক্ষার মেটেরিয়াল্স জোগাড় করতে জানেন না। এর খরচ বেশি, প্রযুক্তি ব্যবহারের ট্রেনিং নেই। ব্লেন্ডেড লার্নিং দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ে। আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট মাত্র একটি। আরও অনেক স্থাপন করা দরকার।

করোনাকালে নিরুপায় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পঞ্চগড়ে পাট ধুচ্ছে, কুড়িগ্রামে অটোরিকশা চালাচ্ছে, কুয়াকাটায় আমড়া বিক্রি করছে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করার জন্য। তারা নিজেরা টাকার অভাবে এমবি (ডাটা) কিনে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। তাদের ক্ষেত্রে শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে টিউশনি করে বাড়িতে টাকা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসে যোগ দেওয়া ও পরীক্ষা দিয়ে পাশ করাটা জরুরি। তাই দেশজ ব্লেন্ডিং মডেল বাদ দিয়ে বিদেশি মডেল নিয়ে পাঠদান শুরু করে দূরশিক্ষণের মতো অদূরদর্শিতায় সেটা আবারও যেন তাল-লয়ের বেসুরো বিবেচনায় বন্ধ করতে না হয়।

আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সমস্যা সমাধানের উপযোগী দেশজ ব্লেন্ডার চালু করতে প্রয়োজন- ১. গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সহজ অংশগ্রহণ করার মানসিকতা; ২. শিক্ষকদের টিচিং ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তা পাঠদানে প্রস্তুত করার ক্যাপাসিটি থাকা; ৩. সব শিক্ষার্থীর সেসব তথ্য গ্রহণ করার সক্ষমতা থাকা; ৪. শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ও নির্দিষ্ট সময়ের সুষ্ঠু ব্যবহারের ব্যাপারে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা; ৫. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চগতির নেটওয়ার্ক ও শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে সব শিক্ষার্থীর সামনে সংযুক্ত মনিটর, ডিভাইস থাকা, যা দিয়ে কেউ কারোটা না দেখে সংক্ষিপ্ত প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে দ্রুত পরীক্ষার উত্তর পোস্ট করবে এবং শিক্ষক সেটা দ্রুত মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রস্তুত করতে পারবেন।

দেশজ ব্লেন্ডার দিয়ে আমাদের দেশে পরীক্ষায় নকল রোধ, একাধিক কোম্পানির অ্যান্টি প্লেজারিজম সফটওয়্যার ব্যবহার করে একাডেমিক প্লেজারিজম রোধ, অনপুস্থিতি রোধ ইত্যাদি জরুরি। ব্লেন্ডেড লার্নিং প্রক্রিয়ায় সাধারণত কোনো ক্লাসের শেষে অথবা সপ্তাহান্তে মূল্যায়ন বা ফলাফল তৈরি করা হয়ে যায়। তাই আমাদের সমাজ বা দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আরও চিন্তাভাবনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে।

অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা যেহেতু আমাদের দেশজ প্রক্রিয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সুফল দিতে পারেনি, তাই ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে। সেক্ষেত্রে টেকসই দেশজ ব্লেন্ডেড লার্নিং প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সবাইকে দ্রুত টিকা দিয়ে, হল খুলে দিয়ে সশরীরে শ্রেণিকক্ষে আসার সুযোগ করে দিলে শিক্ষার ফটক খোলার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাসহ অনেক সমস্যার সমাধান খুব দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

fakrul@ru.ac.bd

ব্লেন্ডেড শিক্ষায় দেশজ ব্লেন্ডার চাই

 ড. মো. ফখরুল ইসলা ম 
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সশরীরে উপস্থিতি ও ভার্চুয়াল পদ্ধতির সংমিশ্রণে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোকে সহজ ভাষায় ব্লেন্ডেড শিক্ষা বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের শিক্ষায় শ্রেণিকক্ষের একঘেঁয়েমি কাটানোর জন্য কিছু সময় মুখের বক্তৃতা ও কিছু সময় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঠদান করা হয়। পাঠদানে বৈচিত্র্য আনতে ও তা আনন্দময় করতে ব্লেন্ডেড শিক্ষণ পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে।

অন্য কথায়, একইসঙ্গে সশরীরে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ও অনলাইনের বা অনসাইটের শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের মাঝে বোঝানো ও প্রদর্শন করার মাধ্যমে পাঠদান করার পদ্ধতি হচ্ছে ব্লেন্ডেড শিক্ষা। প্রত্যেক মানুষের শেখার ইচ্ছা ও মনন এক নয়। আবার প্রত্যেক শিক্ষকের শেখানোর কৌশল ও ধরন এক নয়। কেউ একবার শুনেই শিখে ফেলে, কেউ দেখে শেখে, কেউ লিখে শেখে। কাউকে বহুবার বহু কসরত করেও শেখানো যায় না।

এমন নানা কারণ ও নানা ধরনের মধ্যে ‘ঘোল’ তৈরি করে শিক্ষার বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য করে শিক্ষার্থীর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার কৌশলকেও আমরা ব্লেন্ডেড শিক্ষণ বলতে পারি। করোনাকাল শুরু হওয়ার আগে এ পদ্ধতিতে শিক্ষাদানে কিছুটা ভাটা পড়লেও দীর্ঘদিন ঘরবন্দি মানুষ আবার নতুন করে এর ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

তবে ব্লেন্ডেড শিক্ষাপদ্ধতি নতুন কিছু নয়। প্রথমদিকে শিশু ও বয়স্ক শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্লেন্ডেড শিক্ষার কথা ভাবা হলেও পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তির সাহায্যে লেখাপড়াকে সহজ করে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। মূল্যবান সময়কে জয় করে সব মানুষের জন্য দ্রুত আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের নিরিখে এটাকে আধুনিক শিক্ষার নীতি ও রূপরেখার মধ্যে বিবেচনা করা শুরু হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬০ সালে এ পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের চিন্তা শুরু করে। এরপর প্লাটো বা ‘প্রোগ্রামড লজিক ফর অটোমেটিক টিচিং’ অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেখাতে পারে এমন একটি উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়। এজন্য ১৯৭০ সালে স্যাটেলাইট বেজড্ লাইভ ভিডিও শুরু করা হয়। এটা ব্যয়বহুল প্রমাণিত হওয়ায় পাশাপাশি ছোট প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে গবেষণা অব্যাহত থাকে।

এরপর ১৯৯০ সালে আটলান্টার একটি এডুকেশনাল কোম্পানি তাদের ইন্টারঅ্যাকটিভ লার্নিং সেন্টারের প্রেস রিলিজে প্রথমবারের মতো আইপিএসসি লার্নিং নামে এর ঘোষণা দেয় (ওয়াসিফ জান্নাত ২০০০)। কিন্তু ব্লেন্ডেড শিক্ষা নামটি দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট ছিল। এরপর ‘হ্যান্ডবুক অব ব্লেন্ডেড লার্নিং’ নামক পাবলিকেশনে (গ্রাহাম ও বঙ্ক ২০০৬) বলা হয়, ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং এমন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যা ফেস-টু-ফেস ইন্সট্রাকশন ও কম্পিউটার ব্যবহার করে ইন্সট্রাকশনের একটি ব্লেন্ডেড মডেল।’

ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের জন্য বিশ্বব্যাপী নানা কৌশলের অবতারণা করা হয়। দেশজ প্রযুক্তির সক্ষমতা, আর্থিক বরাদ্দ, মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতার হার, গ্রাম ও শহরের মধ্যে আয় ও জীবনমানের সমতা ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে খুব সহজেই ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ প্রক্রিয়ায় সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বিশেষ করে করোনাকালীন শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক দেশ খুব দ্রুত শিক্ষা এডাপ্টেশন প্রক্রিয়ায় উপনীত হয়েছে। তাই উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষায় পিছিয়ে যাওয়া বা সেশনজটসংক্রান্ত সমস্যার কথা তেমন একটা শোনা যায় না।

ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের জন্য নানা আধুনিক মডেল প্রচলিত রয়েছে। এর কতগুলো কমন বা সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। যেগুলো সহজ, আনন্দময়, ইন্টারঅ্যাকটিভ ও ইন্টারেস্টিং সেগুলো সব দেশের সব বয়সি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য। তবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেসব উপকরণের কথা বলা হয়েছে, তা আমাদের মতো দরিদ্র দেশের পক্ষে একসঙ্গে জোগান ও সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের দেশে কয়েক দশক আগে চালু হওয়া দূরশিক্ষণ এক ধরনের ব্লেন্ডেড লার্নিং ছিল।

দেখা গেছে, অনেক বয়স্ক ব্যক্তির বাড়িতে টিভি সেট নেই। বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে টিভি অনুদান দেওয়া হলেও সেখানে পাড়ার যুবকরা রাতভর বিদেশি সিনেমা চালাত। এখনো ব্লেন্ডেড লার্নিংকে দূরশিক্ষণের ভাবনার মতো মনে করা হয়। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি গত ২৭.০৫.২০২১ তারিখে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং একটি জীবনব্যাপী শিক্ষা। এটি বয়স্কদের ও কর্মজীবীদের জন্য।’ এটি অতি পুরোনো ভাবনা। অথচ, করোনাকালে আমরা ২০২১ সালে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে উচ্চশিক্ষার ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের আধুনিক প্রচলনের কথা ভাবছি।

আমরা ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ-২০১৮-২০৩০’-এর অধীনে উন্নত বিশ্বের আদলে ব্লেন্ডেড লার্নিং পরিকল্পনার কথা ভেবে কর্মপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করেছি। কারণ, আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা সমান নয়। আয় বৈষম্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সচল বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটে সবার প্রবেশগম্যতার অভাব ও গতির তারতম্য অনলাইন পাঠদানের ক্ষেত্রে চরম হতাশার চিত্র তুলে ধরায় অদ্যাবধি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেনি। শুধু কর্মপরিকল্পনা ও সমস্যা চিহ্নিত করতেই আমরা ২২ মাস অতিবাহিত করে ফেলেছি। কারণ, উন্নত বিশ্বের আদলে আমাদের অনলাইন শিক্ষা প্রক্রিয়া অচল প্রমাণিত হয়েছে।

এখন ব্লেন্ডেড লার্নিং প্ল্যানে যে খসড়া মডেলের কথা বলা হচ্ছে, তাও পরীক্ষামূলক। কিন্তু এ মুহূর্তে কোনো বিষয়ে একইসঙ্গে অনলাইন ও অনসাইট পরীক্ষা চালানোর সময় নেই। এখন সেশনজট থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত সবাইকে টিকা দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে স্বল্পসংখ্যক উপস্থিতি নিয়ে পরীক্ষাগুলো শেষ করাটাই বড় কাজ।

ফ্লিপ্ড ক্লাসরুম সব সময়ের জন্য ভালো। মুখের বক্তৃতা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে বা একটু অবকাশ দিয়ে ফ্লিপ্ড প্রক্রিয়া (ভিডিও পডকাস্ট, বুক রিডিং অ্যান্ড অ্যানালাইজিং, ওয়েবসাইট) বেশ ফলদায়ক। এতে একঘেঁয়েমি দূর হয় এবং আনন্দের সঙ্গে শিক্ষালাভে মন চাঙা হয়ে ওঠে। আমরা ২৫-২৬ বছর আগে বিদেশে অধ্যয়নকালীন এসব পদ্ধতিতে ক্লাস করতাম। সারা দিন ক্লাস করতেও বোরিং লাগত না। এ বছর যদি করোনা চলে যায়, আমরা আগামী বছরের জন্য এ মডেলের মাধ্যমে দ্রুতলয়ে এ পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারব।

তবে আমাদের দেশজ পরিস্থিতিতে ব্লেন্ডেড লার্নিং কতটুকু কার্যকর হবে, তা গভীরভাবে ভাবতে হবে। এর যেমন কিছু ভালো দিক আছে, তেমনি কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে। ভালো দিক হলো, শিক্ষার্থীদের একইসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের টিচিং মেটেরিয়াল দেওয়া যায়। কোনটা বেশি ভালো, সেটা বাছাই করে তারা নিজেদের ব্রেনের প্ল্যাটফরম তৈরি করে নিতে পারে এবং সেই অনুযায়ী উচ্চতর গবেষণা প্লট সাজাতে পারে।

মিশ্রণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক শুধু উপায় বাতলে দেন, কাজটা সম্পন্ন করতে হয় শিক্ষার্থীকে। ব্লেন্ডেড লার্নিং হলো পাঁচমিশালী শিক্ষা। খিচুড়ি রান্নার আগে তাতে প্রোটিন থাকে না। কিন্তু যখন অনেক কিছু একত্রে মিশ্রিত হয়ে সিদ্ধ হয়ে যায়, তখন সেটা প্রোটিনে রূপান্তর হয়ে শরীরের পুষ্টি সাধন করে। তবে ব্লেন্ডেড লার্নিং দিতে গিয়ে অখাদ্য তৈরি করে কাউকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।

ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের বিদেশি উপকরণ ও সুবিধাদি আর আমাদের দেশের সুবিধাদি মোটেও এক সমান ও মানের নয়। আমাদের দেশজ মডেল নেই। আমাদের সব শিক্ষক এ শিক্ষার মেটেরিয়াল্স জোগাড় করতে জানেন না। এর খরচ বেশি, প্রযুক্তি ব্যবহারের ট্রেনিং নেই। ব্লেন্ডেড লার্নিং দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ে। আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট মাত্র একটি। আরও অনেক স্থাপন করা দরকার।

করোনাকালে নিরুপায় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পঞ্চগড়ে পাট ধুচ্ছে, কুড়িগ্রামে অটোরিকশা চালাচ্ছে, কুয়াকাটায় আমড়া বিক্রি করছে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করার জন্য। তারা নিজেরা টাকার অভাবে এমবি (ডাটা) কিনে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। তাদের ক্ষেত্রে শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে টিউশনি করে বাড়িতে টাকা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসে যোগ দেওয়া ও পরীক্ষা দিয়ে পাশ করাটা জরুরি। তাই দেশজ ব্লেন্ডিং মডেল বাদ দিয়ে বিদেশি মডেল নিয়ে পাঠদান শুরু করে দূরশিক্ষণের মতো অদূরদর্শিতায় সেটা আবারও যেন তাল-লয়ের বেসুরো বিবেচনায় বন্ধ করতে না হয়।

আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সমস্যা সমাধানের উপযোগী দেশজ ব্লেন্ডার চালু করতে প্রয়োজন- ১. গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সহজ অংশগ্রহণ করার মানসিকতা; ২. শিক্ষকদের টিচিং ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তা পাঠদানে প্রস্তুত করার ক্যাপাসিটি থাকা; ৩. সব শিক্ষার্থীর সেসব তথ্য গ্রহণ করার সক্ষমতা থাকা; ৪. শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ও নির্দিষ্ট সময়ের সুষ্ঠু ব্যবহারের ব্যাপারে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা; ৫. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চগতির নেটওয়ার্ক ও শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে সব শিক্ষার্থীর সামনে সংযুক্ত মনিটর, ডিভাইস থাকা, যা দিয়ে কেউ কারোটা না দেখে সংক্ষিপ্ত প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে দ্রুত পরীক্ষার উত্তর পোস্ট করবে এবং শিক্ষক সেটা দ্রুত মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রস্তুত করতে পারবেন।

দেশজ ব্লেন্ডার দিয়ে আমাদের দেশে পরীক্ষায় নকল রোধ, একাধিক কোম্পানির অ্যান্টি প্লেজারিজম সফটওয়্যার ব্যবহার করে একাডেমিক প্লেজারিজম রোধ, অনপুস্থিতি রোধ ইত্যাদি জরুরি। ব্লেন্ডেড লার্নিং প্রক্রিয়ায় সাধারণত কোনো ক্লাসের শেষে অথবা সপ্তাহান্তে মূল্যায়ন বা ফলাফল তৈরি করা হয়ে যায়। তাই আমাদের সমাজ বা দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আরও চিন্তাভাবনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে।

অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা যেহেতু আমাদের দেশজ প্রক্রিয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সুফল দিতে পারেনি, তাই ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে। সেক্ষেত্রে টেকসই দেশজ ব্লেন্ডেড লার্নিং প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সবাইকে দ্রুত টিকা দিয়ে, হল খুলে দিয়ে সশরীরে শ্রেণিকক্ষে আসার সুযোগ করে দিলে শিক্ষার ফটক খোলার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাসহ অনেক সমস্যার সমাধান খুব দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

fakrul@ru.ac.bd

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন