অনন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
jugantor
অনন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

  এম বি আখতার  

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দিনাজপুরের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহিম একটি আদর্শিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম। আদর্শিক মতপার্থক্য ও মতভেদ থাকলেও এম আব্দুর রহিমের জীবদ্দশায় রাজনৈতিক মতপ্রকাশের শৈলী, রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সংস্কৃতির চর্চা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গণতান্ত্রিক অনুশীলনগুলো ছিল রাজনীতিবিদদের কাছে অনুকরণীয়, অনুসরণীয়।

মরহুম অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহিম রাজনৈতিক, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনকে এমনভাবে পরিচালনা করেছিলেন, যা অনেকের কাছে অকল্পনীয় মনে হলেও তেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসুক- সাধারণ মানুষ এমনটিই আশা করেন। আজ এম আব্দুর রহিমের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। এদিনে তার বিদেহী আত্মর প্রতি শ্রদ্ধা ও শান্তি কামনা করছি।

১৯৭৮ সালে ছাত্রলীগে যোগদান, তারপর থেকেই দিনাজপুর মালদহপট্টির দোতলায় (বর্তমান আইএফআইসি ব্যাংকের পাশের ভাঙা ভবন) ছাত্রলীগের অফিসে নিয়মিত যাতায়াত। সে সময় ছাত্রলীগে অনেক তরুণ সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে, শেখ শেখ শেখ মুজিব লও লও লও সালাম- এ রকম অনেক স্লোগানে স্থানীয় কলেজ ক্যাম্পাসসহ দিনাজপুর শহরের রাজপথ প্রকম্পিত রাখতাম।

ছাত্রলীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সে সময়ের নতুন ও আগ্রাসী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সঙ্গে। ইনায়েতুর রহিম, দেবাশীষ ও হেলালের আবেগ মিশ্রিত বক্তৃতা, মার্শাল, রতন, সোহাগ, মোসাদ্দেক, তহিদুল, মালেক, শংকর আর স্বপনের স্লোগানে মুখরিত ছিল দিনাজপুরের প্রাঙ্গণ। ছাত্রলীগের তরুণদের ছায়ার মতো আগলে রাখতেন রাশভারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তৎকালীন দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম আব্দুর রহিম (আমরা চাচা ডাকতাম)।

১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে কয়েকজন প্রথমবারের মতো রহিম চাচার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম। আমাদের বলা হয়েছিল- তিনি খুবই গম্ভীর মানুষ, সাবধানে কথা বলো। দেখা হলো, প্রথমেই জানতে চাইলেন- কেন ছাত্রলীগে যোগদান করেছি? মনে মনে একটু রাগ হলো; কারণ সে সময় রাস্তায় জয়বাংলা স্লোগান দিতেই যেখানে অনেকে ভয় পেত, সেখানে ছাত্রলীগে যোগদান করেছি- এতে তিনি উৎসাহিত না করে জানতে চাইছেন, কেন ছাত্রলীগে যোগদান করেছি? উত্তর দিলাম। তিনি খুব আস্তে আস্তে বললেন- ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, উনসত্তরের গণআন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা নিয়ে পড়বে, তাহলে বুঝতে পারবে কেন ছাত্রলীগে যোগদান গর্বের বিষয়।

সত্তরের শেষ ও আশির দশকের প্রথম দিকে যারা ছাত্রলীগ করতাম, তাদের পকেটে ২-৫ টাকা থাকলেই একটা ভাব তৈরি হতো; অথচ অনেকের কাছে সে টাকাও থাকত না। রাজনীতি করলে, নেতৃত্ব দিলে কিছু খরচ করতে হবে, কর্মীদের কমপক্ষে সিঙ্গারা, ২ কাপ চা ৪ ভাগ করে খাওয়াতে হবে; অথচ পারতাম না। তাই আওয়ামী লীগের বড় ভাই কিংবা নেতাদের কাছে সহযোগিতা চাইতে হতো। দু-একজন নেতা ছিলেন, তাদের কাছে সহযোগিতা চাইলে খুব সহজেই ৫-১০-৫০ টাকা পাওয়া যেত; কিন্তু মনে হতো, তাহলে তাদের ইচ্ছানুসারে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে হবে। সে সময় ছাত্রলীগের কর্মী ও নেতাদের যে বিষয়টি খুব প্রভাবিত করেছিল, তা হলো- ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন নয়; সহযোগী সংগঠন। অতএব, সমমর্যাদায় কাজ করব।

রহিম চাচার কাছেও এ ধরনের বার্তা সব সময়ই পেতাম। তিনি বলতেন- ছাত্রলীগ কারও পকেটের সংগঠন নয়; কাজ করতে হবে, রাজনীতি করতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সামনে নিয়ে ছাত্রদের স্বার্থে। আর্থিক সহযোগিতা চাইলে বলতেন, ‘বাপুরে আমিও চাই তোমাদের সহযোগিতা করতে; কিন্তু এত টাকা (২০-৫০ টাকাকেই তিনি বলতেন এত টাকা) তো জোগাড় করা মুশকিল, দেখি কী করতে পারি। রিকশায় বা বাসে করে দূরে কোথাও (যেমন, পাশের থানা বিরল, বোঁচাগঞ্জ, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর) যাওয়ার কথা বললেই বলতেন- ইনায়েতুর, মালেকের সাইকেল আছে; আর কয়েকটি জোগাড় করে ডাবল করে যাও। ট্রেনে যাও, রেল শ্রমিক নেতাদের বলে দেব। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বলব, তোমাদের নাস্তা খাওয়াবে। হয়তো তিনি সেই টাকা দিতে পারতেন কিন্তু ছাত্ররা অর্থের কাছে কলুষিত হোক- এমনটি চাইতেন না বিধায় এ পরামর্শগুলো দিতেন। তিনি সব সময় পড়ালেখার পাশাপাশি সৎভাবে ছাত্র রাজনীতি করার কথা বলতেন।

১৯৮০ সালের সম্ভবত জুন মাস। আমি তখন ছাত্রলীগ দিনাজপুর জেলা শাখার কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক। জেলা শাখার সম্মেলনের আগে সদস্য সংগ্রহ ও প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট (রানীগঞ্জ বাজার) যেতে হবে। আমি ও ইনায়েতুর যাব; টাকা দরকার। ভয়ে ভয়ে রহিম চাচার কাছে গেলাম। বিস্তারিত জানালাম। তিনি চেম্বারে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন।

মনে হলো, আমার কথা শুনছেন না। কথা শেষ করে রহিম চাচার টেবিলের সামনে যে চৌকি ছিল, সেখানে চুপচাপ বসে আছি। তার সামনে বেশি কথা বলা যেত না। বেশি কথা বললে তিনি ইংরেজি পেপার হাতে দিয়ে ট্রান্সলেশন করতে বলতেন। না পারলে বকা দিতেন। তাই প্রয়োজনের বেশি কথা বলতাম না। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, সাদা কাগজের ওপর কিছু লিখতে শুরু করেছেন। ভাবলাম, হয়তো কোর্টের কোনো কাজ করছেন। পরপর দুটি কাগজে কিছু লিখলেন।

এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ‘দুটো চিঠি দিচ্ছি, একটা ফুলবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের একজন পরিবহণ শ্রমিক নেতার নামে; আর অন্যটি ঘোড়াঘাটের সেই সময় কোনো একজন ন্যাপ নেতার নামে। তুমি ও ইনায়েতুর সাইকেল নিয়ে যাও (ইনায়েতুরের ডাবল রোলের চেইন কভারসহ ফনিক্স সাইকেল ছিল)। শ্রমিক নেতাকে বলে দিয়েছি- তোমাদের একজনের ভাড়া নেবে; সাইকেল ছাদে নিয়ে যাবে, ভাড়া লাগবে না।

বিরামপুরে (দিনাজপুর থেকে প্রায় ৫৫ কিমি. দূরে এক উপজেলা) নেমে সাইকেল নিয়ে নবাবগঞ্জ (বিরামপুর থেকে প্রায় ১৫ কিমি.) যাবা; তারপর রানীগঞ্জ, ঘোড়াঘাট (নবাবগঞ্জ থেকে প্রায় ১৬ কিমি. হবে) চলে যাওয়া অনেক সহজ। ছাত্রলীগ করলে কষ্ট করতে হবে। স্থানীয় ন্যাপ নেতা (নাম মনে নেই, নামের শেষে চৌধুরী ছিল) তোমাদের দুদিনের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করবেন, আসার সময় বাস ভাড়া দেবেন।

আমরা কিন্তু সেভাবেই গেছি। ঘোড়াঘাটে বৈঠকখানায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল; এক চৌকিতে দুজন ঘুমিয়েছি। তিনবেলা ভালো তরকারি দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম, এটি খুব মনে আছে। রহিম চাচা তার ছেলের জন্য হয়তো বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করতে পারতেন, মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেদিন সেটি করেননি। একজন সাধারণ কর্মীর মতো আমাদের সাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।

পরে ইনায়েতুর রংপুর কারমাইকেল কলেজে পরপর দুবার ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল। তখন ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের খুব দুঃসময়। পরে সে ছোট ভাই ও বাবার অনুপ্রেরণায় ছাত্ররাজনীতিতে সততা, ত্যাগ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছিল।

আজকের রাজনৈতিক অঙ্গনে কষ্ট বা ত্যাগ স্বীকার করার খুব একটা প্রয়োজন হয় না। অথচ আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুসহ পৃথিবীর সব প্রগতিশীল নেতা রাজনৈতিক জীবনে কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রাজনীতিতে সাধারণ এবং অবহেলিত মানুষের জন্য ভাবতে হয়। পারিবারিক জীবনযাপন খুব সাধারণভাবে করতে হয়। রহিম চাচার সঙ্গে কাজ না করলে, তার পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলে হয়তো বুঝতে পারতাম না- সৎভাবে জীবনযাপন করেও রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা যায়।

এ রকম অনেক উদহারণ আমার মনে আছে, যা স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। একদিন রহিম চাচা কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন- স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু অনেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্টজনদের গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডিতে প্লট ও বাড়ি দিয়েছিলেন; যাদের ঢাকায় কোনো বাড়ি ছিল না, থাকার জায়গা ছিল না। বঙ্গবন্ধু চাচাকেও গুলশানে একটি বাড়ি নেওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধু, আপনার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করেছি; গুলশানে বাড়ি বা ঢাকায় প্লট নেওয়ার জন্য নয়। বঙ্গবন্ধু তখন আওয়ামী লীগের সভাপতি আর রহিম চাচা সহ-সভাপতি ছিলেন।

১৯৯৫ সালের আগস্টের প্রথম দিকে দিনাজপুর উপশহর হাফেজিয়া মাদ্রাসায় কোনো এক জানাজায় রহিম চাচার সঙ্গে দেখা। সালাম দেওয়ার পর জানতে চাইলেন, ‘আখতার তোমাকে অনেক দিন দেখি না। কোথায় আছো, কী করছো।’ বললাম, চাচা আমি ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রায় ১ বছর ছিলাম। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন- বাপুরে! তুমি বিলেত ঘুরে এসেছ, আমি খুব খুশি হয়েছি। ছাত্রলীগের ছেলেরা ভালো কিছু করলে আমার ভালো লাগে।

এমন একজন বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা, বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা দলের অন্যতম সদস্য, দিনাজপুর জেলা রাজনীতির দিকপাল, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং অসম্ভব বড় মনের মানুষটি আমার মতো সাধারণ ছেলেকে অনেক মানুষের সামনে জড়িয়ে ধরলেন, বাড়িতে চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন- সত্যিই সেদিন আমি অনেক বেশি গর্ভ অনুভব করেছিলাম; ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সার্থকতা অনুভব করেছিলাম। তার রাজনৈতিক শিষ্টাচার, কর্মীদের প্রতি ভালোবাসা, নিজ সন্তান ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ভেদাভেদ না রাখা, সর্বোপরি তার রাজনৈতিক সততার উদাহরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের মধ্যে সঞ্চারিত হোক- মরহুম এম আব্দুর রহিমের মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই কামনা করছি।

এম বি আখতার : উন্নয়নকর্মী ও বিশ্লেষক

অনন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

 এম বি আখতার 
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দিনাজপুরের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহিম একটি আদর্শিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম। আদর্শিক মতপার্থক্য ও মতভেদ থাকলেও এম আব্দুর রহিমের জীবদ্দশায় রাজনৈতিক মতপ্রকাশের শৈলী, রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সংস্কৃতির চর্চা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গণতান্ত্রিক অনুশীলনগুলো ছিল রাজনীতিবিদদের কাছে অনুকরণীয়, অনুসরণীয়।

মরহুম অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহিম রাজনৈতিক, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনকে এমনভাবে পরিচালনা করেছিলেন, যা অনেকের কাছে অকল্পনীয় মনে হলেও তেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসুক- সাধারণ মানুষ এমনটিই আশা করেন। আজ এম আব্দুর রহিমের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। এদিনে তার বিদেহী আত্মর প্রতি শ্রদ্ধা ও শান্তি কামনা করছি।

১৯৭৮ সালে ছাত্রলীগে যোগদান, তারপর থেকেই দিনাজপুর মালদহপট্টির দোতলায় (বর্তমান আইএফআইসি ব্যাংকের পাশের ভাঙা ভবন) ছাত্রলীগের অফিসে নিয়মিত যাতায়াত। সে সময় ছাত্রলীগে অনেক তরুণ সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে, শেখ শেখ শেখ মুজিব লও লও লও সালাম- এ রকম অনেক স্লোগানে স্থানীয় কলেজ ক্যাম্পাসসহ দিনাজপুর শহরের রাজপথ প্রকম্পিত রাখতাম।

ছাত্রলীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সে সময়ের নতুন ও আগ্রাসী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সঙ্গে। ইনায়েতুর রহিম, দেবাশীষ ও হেলালের আবেগ মিশ্রিত বক্তৃতা, মার্শাল, রতন, সোহাগ, মোসাদ্দেক, তহিদুল, মালেক, শংকর আর স্বপনের স্লোগানে মুখরিত ছিল দিনাজপুরের প্রাঙ্গণ। ছাত্রলীগের তরুণদের ছায়ার মতো আগলে রাখতেন রাশভারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তৎকালীন দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম আব্দুর রহিম (আমরা চাচা ডাকতাম)।

১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে কয়েকজন প্রথমবারের মতো রহিম চাচার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম। আমাদের বলা হয়েছিল- তিনি খুবই গম্ভীর মানুষ, সাবধানে কথা বলো। দেখা হলো, প্রথমেই জানতে চাইলেন- কেন ছাত্রলীগে যোগদান করেছি? মনে মনে একটু রাগ হলো; কারণ সে সময় রাস্তায় জয়বাংলা স্লোগান দিতেই যেখানে অনেকে ভয় পেত, সেখানে ছাত্রলীগে যোগদান করেছি- এতে তিনি উৎসাহিত না করে জানতে চাইছেন, কেন ছাত্রলীগে যোগদান করেছি? উত্তর দিলাম। তিনি খুব আস্তে আস্তে বললেন- ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, উনসত্তরের গণআন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা নিয়ে পড়বে, তাহলে বুঝতে পারবে কেন ছাত্রলীগে যোগদান গর্বের বিষয়।

সত্তরের শেষ ও আশির দশকের প্রথম দিকে যারা ছাত্রলীগ করতাম, তাদের পকেটে ২-৫ টাকা থাকলেই একটা ভাব তৈরি হতো; অথচ অনেকের কাছে সে টাকাও থাকত না। রাজনীতি করলে, নেতৃত্ব দিলে কিছু খরচ করতে হবে, কর্মীদের কমপক্ষে সিঙ্গারা, ২ কাপ চা ৪ ভাগ করে খাওয়াতে হবে; অথচ পারতাম না। তাই আওয়ামী লীগের বড় ভাই কিংবা নেতাদের কাছে সহযোগিতা চাইতে হতো। দু-একজন নেতা ছিলেন, তাদের কাছে সহযোগিতা চাইলে খুব সহজেই ৫-১০-৫০ টাকা পাওয়া যেত; কিন্তু মনে হতো, তাহলে তাদের ইচ্ছানুসারে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে হবে। সে সময় ছাত্রলীগের কর্মী ও নেতাদের যে বিষয়টি খুব প্রভাবিত করেছিল, তা হলো- ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন নয়; সহযোগী সংগঠন। অতএব, সমমর্যাদায় কাজ করব।

রহিম চাচার কাছেও এ ধরনের বার্তা সব সময়ই পেতাম। তিনি বলতেন- ছাত্রলীগ কারও পকেটের সংগঠন নয়; কাজ করতে হবে, রাজনীতি করতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সামনে নিয়ে ছাত্রদের স্বার্থে। আর্থিক সহযোগিতা চাইলে বলতেন, ‘বাপুরে আমিও চাই তোমাদের সহযোগিতা করতে; কিন্তু এত টাকা (২০-৫০ টাকাকেই তিনি বলতেন এত টাকা) তো জোগাড় করা মুশকিল, দেখি কী করতে পারি। রিকশায় বা বাসে করে দূরে কোথাও (যেমন, পাশের থানা বিরল, বোঁচাগঞ্জ, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর) যাওয়ার কথা বললেই বলতেন- ইনায়েতুর, মালেকের সাইকেল আছে; আর কয়েকটি জোগাড় করে ডাবল করে যাও। ট্রেনে যাও, রেল শ্রমিক নেতাদের বলে দেব। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বলব, তোমাদের নাস্তা খাওয়াবে। হয়তো তিনি সেই টাকা দিতে পারতেন কিন্তু ছাত্ররা অর্থের কাছে কলুষিত হোক- এমনটি চাইতেন না বিধায় এ পরামর্শগুলো দিতেন। তিনি সব সময় পড়ালেখার পাশাপাশি সৎভাবে ছাত্র রাজনীতি করার কথা বলতেন।

১৯৮০ সালের সম্ভবত জুন মাস। আমি তখন ছাত্রলীগ দিনাজপুর জেলা শাখার কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক। জেলা শাখার সম্মেলনের আগে সদস্য সংগ্রহ ও প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট (রানীগঞ্জ বাজার) যেতে হবে। আমি ও ইনায়েতুর যাব; টাকা দরকার। ভয়ে ভয়ে রহিম চাচার কাছে গেলাম। বিস্তারিত জানালাম। তিনি চেম্বারে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন।

মনে হলো, আমার কথা শুনছেন না। কথা শেষ করে রহিম চাচার টেবিলের সামনে যে চৌকি ছিল, সেখানে চুপচাপ বসে আছি। তার সামনে বেশি কথা বলা যেত না। বেশি কথা বললে তিনি ইংরেজি পেপার হাতে দিয়ে ট্রান্সলেশন করতে বলতেন। না পারলে বকা দিতেন। তাই প্রয়োজনের বেশি কথা বলতাম না। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, সাদা কাগজের ওপর কিছু লিখতে শুরু করেছেন। ভাবলাম, হয়তো কোর্টের কোনো কাজ করছেন। পরপর দুটি কাগজে কিছু লিখলেন।

এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ‘দুটো চিঠি দিচ্ছি, একটা ফুলবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের একজন পরিবহণ শ্রমিক নেতার নামে; আর অন্যটি ঘোড়াঘাটের সেই সময় কোনো একজন ন্যাপ নেতার নামে। তুমি ও ইনায়েতুর সাইকেল নিয়ে যাও (ইনায়েতুরের ডাবল রোলের চেইন কভারসহ ফনিক্স সাইকেল ছিল)। শ্রমিক নেতাকে বলে দিয়েছি- তোমাদের একজনের ভাড়া নেবে; সাইকেল ছাদে নিয়ে যাবে, ভাড়া লাগবে না।

বিরামপুরে (দিনাজপুর থেকে প্রায় ৫৫ কিমি. দূরে এক উপজেলা) নেমে সাইকেল নিয়ে নবাবগঞ্জ (বিরামপুর থেকে প্রায় ১৫ কিমি.) যাবা; তারপর রানীগঞ্জ, ঘোড়াঘাট (নবাবগঞ্জ থেকে প্রায় ১৬ কিমি. হবে) চলে যাওয়া অনেক সহজ। ছাত্রলীগ করলে কষ্ট করতে হবে। স্থানীয় ন্যাপ নেতা (নাম মনে নেই, নামের শেষে চৌধুরী ছিল) তোমাদের দুদিনের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করবেন, আসার সময় বাস ভাড়া দেবেন।

আমরা কিন্তু সেভাবেই গেছি। ঘোড়াঘাটে বৈঠকখানায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল; এক চৌকিতে দুজন ঘুমিয়েছি। তিনবেলা ভালো তরকারি দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম, এটি খুব মনে আছে। রহিম চাচা তার ছেলের জন্য হয়তো বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করতে পারতেন, মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেদিন সেটি করেননি। একজন সাধারণ কর্মীর মতো আমাদের সাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।

পরে ইনায়েতুর রংপুর কারমাইকেল কলেজে পরপর দুবার ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল। তখন ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের খুব দুঃসময়। পরে সে ছোট ভাই ও বাবার অনুপ্রেরণায় ছাত্ররাজনীতিতে সততা, ত্যাগ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছিল।

আজকের রাজনৈতিক অঙ্গনে কষ্ট বা ত্যাগ স্বীকার করার খুব একটা প্রয়োজন হয় না। অথচ আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুসহ পৃথিবীর সব প্রগতিশীল নেতা রাজনৈতিক জীবনে কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রাজনীতিতে সাধারণ এবং অবহেলিত মানুষের জন্য ভাবতে হয়। পারিবারিক জীবনযাপন খুব সাধারণভাবে করতে হয়। রহিম চাচার সঙ্গে কাজ না করলে, তার পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলে হয়তো বুঝতে পারতাম না- সৎভাবে জীবনযাপন করেও রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা যায়।

এ রকম অনেক উদহারণ আমার মনে আছে, যা স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। একদিন রহিম চাচা কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন- স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু অনেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্টজনদের গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডিতে প্লট ও বাড়ি দিয়েছিলেন; যাদের ঢাকায় কোনো বাড়ি ছিল না, থাকার জায়গা ছিল না। বঙ্গবন্ধু চাচাকেও গুলশানে একটি বাড়ি নেওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধু, আপনার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করেছি; গুলশানে বাড়ি বা ঢাকায় প্লট নেওয়ার জন্য নয়। বঙ্গবন্ধু তখন আওয়ামী লীগের সভাপতি আর রহিম চাচা সহ-সভাপতি ছিলেন।

১৯৯৫ সালের আগস্টের প্রথম দিকে দিনাজপুর উপশহর হাফেজিয়া মাদ্রাসায় কোনো এক জানাজায় রহিম চাচার সঙ্গে দেখা। সালাম দেওয়ার পর জানতে চাইলেন, ‘আখতার তোমাকে অনেক দিন দেখি না। কোথায় আছো, কী করছো।’ বললাম, চাচা আমি ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রায় ১ বছর ছিলাম। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন- বাপুরে! তুমি বিলেত ঘুরে এসেছ, আমি খুব খুশি হয়েছি। ছাত্রলীগের ছেলেরা ভালো কিছু করলে আমার ভালো লাগে।

এমন একজন বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা, বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা দলের অন্যতম সদস্য, দিনাজপুর জেলা রাজনীতির দিকপাল, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং অসম্ভব বড় মনের মানুষটি আমার মতো সাধারণ ছেলেকে অনেক মানুষের সামনে জড়িয়ে ধরলেন, বাড়িতে চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন- সত্যিই সেদিন আমি অনেক বেশি গর্ভ অনুভব করেছিলাম; ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সার্থকতা অনুভব করেছিলাম। তার রাজনৈতিক শিষ্টাচার, কর্মীদের প্রতি ভালোবাসা, নিজ সন্তান ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ভেদাভেদ না রাখা, সর্বোপরি তার রাজনৈতিক সততার উদাহরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের মধ্যে সঞ্চারিত হোক- মরহুম এম আব্দুর রহিমের মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই কামনা করছি।

এম বি আখতার : উন্নয়নকর্মী ও বিশ্লেষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন