রোগের পূর্বাভাস হওয়া উচিত জাগতিক তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক
jugantor
রোগের পূর্বাভাস হওয়া উচিত জাগতিক তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক

  আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন  

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যার পূর্বাভাস অতীতে কখনো কোথাও সত্য হয়নি। ইতঃপূর্বের কয়েকটি লেখায় আমরা তথ্যবিশ্লেষণের সাহায্যে তা বলেছি। পূর্বাভাসের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য কোনো দেশে পাওয়া যায় না। কিন্তু তারপরও কিছু বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন। নিচে আমরা সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পরীক্ষা করে করোনা মহামারিসংক্রান্ত বাস্তবতার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। আমাদের এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বা পূর্বাভাস ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারীকে খ্যাতি এনে দিতে পারে না; বিপরীতে এর সম্ভাব্যতা সমালোচনার আওতায় চলে আসে। ভুল মহামারিসংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন ব্যর্থ হতে পারে।

ঈদুলফিতরের সময় চলাফেরার কারণে করোনার উত্থানের পূর্বাভাস

অনেকের মতে, গত মে মাসের মাঝামাঝি ঈদুলফিতরের ছুটিতে অনেক মানুষের চলাচলের কারণে করোনার ধনাÍক পরীক্ষার (টেস্ট পজিটিভের) সংখ্যা বেড়েছে। দ্রষ্টব্য, ১৮ মে থেকে সামগ্রিকভাবে উল্লেখযোগ্য হারে তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায়। পরে অবশ্য বোঝা যায়, এটি ঘটেছিল সার্স সিওভি-২-এর ডেল্টা রূপের কারণে। সম্মানিত পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ওই সময়ে বিশেষত ঢাকা থেকে যাওয়া এবং ফেরত আসার ঘটনাটি ১০ থেকে ১৮ মের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। আমরা জানি, ওই সময় ঢাকায় আলফা ও বিটা ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব ছিল। ঈদুলফিতরের আগে ১০ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত ধনাত্মকের সংখ্যা ছিল ৫,১৭৪ এবং ১৮ থেকে ২১ মে অর্থাৎ ঈদের পরে ছিল ৫,৮৪১। তবে এ সংখ্যা জুনের প্রথম সপ্তাহে লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং প্রতি সপ্তাহ পরপর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে; যা প্রকৃতপক্ষে ঈদুলফিতরের সময়ে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাবের ইঙ্গিত দেয়। আমরা এখানে দুটি বিপরীত দৃশ্য দেখতে পাই। ঈদুলফিতরের আশপাশে ধনাত্মকের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়নি, কিন্তু ঈদুল-আজহার পর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বৈসাদৃশ্যটি দুটি সময়ের মধ্যে দুটি ভিন্ন ভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণতার প্রতিফলন। তাই বলা যায়, ঈদুলফিতরের সময়ের সংক্রমণের জন্য শুধু একটি বড় ধরনের যাওয়া-আসা দায়ী-এ বক্তব্য পুরোপুরি বাস্তব বা সঠিক তথ্য ও তত্ত্বভিত্তিক নয়।

দেশে করোনার সংখ্যা হ্রাস/বৃদ্ধির পূর্বাভাস

একজন বিশেষজ্ঞ দাবি করেছিলেন, করোনার সংখ্যা জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়বে, বিশেষ করে ৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদনের আলোকে আমরা দেখতে পাই, ৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে শনাক্ত রোগীর গড় সংখ্যা ছিল ১০,৭২৭, যা ১১ থেকে ১৬ জুলাই ছিল গড়ে ১১,০৫১। তাই এ দাবির কোনো সত্যতা নেই।

যদি এবারের লকডাউন কার্যকর হতো, তাহলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের পর শনাক্তের সংখ্যা কমে যাওয়া উচিত ছিল, যেহেতু ডেল্টার সুপ্তিকাল চারদিনেরও কম (নমুনা পরীক্ষা এবং প্রতিবেদনসহ ছয় থেকে সাতদিন)। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি, লকডাউনের ষষ্ঠ দিন থেকে বরং এ সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। পূর্বোক্ত দাবির ভিত্তি-জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সংখ্যাটা বাড়বে-আসলে বোধগম্য নয়। যারা দাবি করেন, গণসংক্রমণ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তারা দেখাতে পারবেন না যে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ২১ জুলাইয়ের দুই সপ্তাহ আগে বা এমনকি তিন সপ্তাহ আগে ঘটেছে। এখানে বলে রাখা ভালো, ২১ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে শনাক্তের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কারণ ছুটির সময় পরীক্ষা এবং প্রতিবেদনের সংখ্যা সর্বদা কম থাকে। যা হোক, আমাদের বক্তব্যকে প্রমাণ করার জন্য আমরা চিহ্নিত করতে চাই-শনাক্তের সংখ্যা ২১ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়নি; কিন্তু ২১ জুলাইয়ের পর, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ২৪ জুলাইয়ের পর বেড়েছে ৪ আগস্ট পর্যন্ত।

২৭ জুলাই ওই বিশেষজ্ঞ ধরে নিয়েছিলেন, ঈদুল-আজহার কারণে শুক্রবার থেকে দৈনিক শনাক্তকরণ বৃদ্ধি পাবে অর্থাৎ ৩০ জুলাই থেকে। ১৮ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে ঈদুল আজহার সময়ে ব্যাপক মানুষের চলাচল হয়। সুপ্তিকাল ও পরীক্ষার প্রতিবেদন সময়ের আলোকে শনাক্তের সংখ্যা বাড়া উচিত ছিল ৩০ জুলাই নয়, ২৫ জুলাই থেকে। ধনাত্মকের সংখ্যা ছিল ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাপ্তাহিক ৯৬,২৫০ এবং তারপর ১ থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে ৯৩,৯১২-পতন! ওই বিশেষজ্ঞ আরও বলেছিলেন, সংক্রমণের প্রকৃত সংখ্যা আমরা যা নথিভুক্ত করি তার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। পাছে আমরা ভুলে যাই, বিজ্ঞানীরা একটি স্থায়ী রীতি হিসাবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিকে সত্যায়িত করার জন্য রেফারেন্স উল্লেখ করেন অথবা তাদের অনুমানের ভিত্তি ব্যাখ্যা করেন; যা তিনি করেননি। তিনি ১ আগস্ট বলেন, সংক্রমণ সংখ্যা আগস্টের শেষে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে আমরা এ ভবিষ্যৎ-কথনের কোনো মিল দেখি না।

২৭ জুলাই আরেকজন বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, সংক্রমণের হার দুই সপ্তাহ পর লক্ষণীয় হবে। কিন্তু যদি আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট করোনার ড্যাশবোর্ড থেকে যথাক্রমে দৈনিক ও সাপ্তাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করি, তাহলে বোঝা যায়, প্রতি ছয় বা সাতদিনে ধনাত্মকের সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়; যা পৃথিবীব্যাপী দেখা যায়। এই বিশেষজ্ঞের মতে, ১০ আগস্ট থেকে ধনাত্মকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। যেমনটি আমরা দেখেছি, এ পূর্বাভাসটি অন্য বিশেষজ্ঞের পূর্বাভাসের সঙ্গে বা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

মৃত্যুর পূর্বাভাস

প্রথমে উল্লিখিত বিশেষজ্ঞের মতে, মৃত্যুর সংখ্যা ২১ জুলাইয়ের দিকে বৃদ্ধি পেতে পারে, যার ব্যবধান ধনাত্মক সংখ্যা বৃদ্ধির দিন থেকে তিন সপ্তাহের মতো। যদি ১ জুলাই থেকে ঘোষিত ‘লকডাউন’ সফল হতো, তাহলে ৭ বা ৮ জুলাই থেকে ধনাত্মক পরীক্ষার সংখ্যা কমে যেত এবং পরবর্তীকালে মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ বা ১৫ জুলাই থেকে কমতে থাকত। কিন্তু ২১ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে যেখানে প্রতিদিনে গড়ে ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে ৭ থেকে ২০ জুলাই এবং ২৫ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ২০০ বা তার বেশি মৃত্যু নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ, মৃত্যুর সংখ্যা ২১ জুলাইয়ের অনেক আগে এবং ২৪ জুলাইয়ের পরে বেশি, ২১ জুলাইয়ের কাছাকাছি নয়। ওই বিশেষজ্ঞ পরে বলেছিলেন, আগস্টের মাঝামাঝির পরে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। প্রত্যেকেই দেখেছেন, ১৩ আগস্ট থেকে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে এবং ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। যদি তার প্রথম অভিক্ষেপ সঠিক হতো, (অর্থাৎ ‘ধনাত্মকের সংখ্যা ২১ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে’) তাহলে তার নিজের অনুমান অনুসারে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে (দুই সপ্তাহের ব্যবধানে) মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ত; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু ২৫ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ে থাকার পর কমতে শুরু করে। এরপর তিনি ২৭ জুলাই বলেছিলেন, ৩০ জুলাইয়ের পর নমুনা পরীক্ষায় ধনাত্মকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু আমরা দেখি, ৩০ জুলাইয়ের আগের ছয়দিনে প্রতিদিনের পরীক্ষার ধনাত্মক সংখ্যা ছিল ১৪,৪৮০; কিন্তু ৩০ জুলাইয়ের পর ১৩,৫৯২, যা পরে আরও কমেছে। পরীক্ষার ফলাফল ও মৃত্যুর মধ্যে দুই সপ্তাহের ব্যবধান তাই প্রমাণিত হয় না। এ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, যারা আজ মারা যাচ্ছেন, তারা তিন সপ্তাহ আগে কোনো এক মহামারি তত্ত্ব অনুসারে সংক্রমিত হয়েছিলেন, সেই তত্ত্বটির কোনো রেফারেন্স অবশ্য দেওয়া হয়নি। ৭ আগস্ট ওই বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, মৃত্যুর সংখ্যা আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেশি থাকবে। কিন্তু উপরে যা আলোচনা করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাপ্তাহিক মৃত্যুর সংখ্যার সূত্র এ তত্ত্ব প্রমাণ করে না।

এ বিশেষজ্ঞের ২৭ জুলাইয়ের আরেকটি বক্তব্য হচ্ছে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে কি না তা ৩ আগস্টের পর জানা যাবে। যদি সংক্রমণ বা মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস ৩ আগস্টের পরেই জানা যাবে, তবে একই বিশেষজ্ঞ কীভাবে বলতে পারেন, পরিস্থিতি আগস্টের মাঝামাঝির পরে স্থিতিশীল হবে! অন্য একজন বিশেষজ্ঞ ৩ আগস্ট সাম্প্রতিক মৃত্যুর হার ১.৬ শতাংশ (যা আসলে প্রায় ২.১২ শতাংশ) এবং ধনাত্মক পরীক্ষার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আলোকে বলেছেন, মৃত্যু বাড়বে বা উচ্চপর্যায়ে থাকবে আরও ২০ দিনের জন্য, অর্থাৎ ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যালেন্ডার সপ্তাহের ওপর ভিত্তি করে আমরা দেখতে পাই, ১৩ আগস্টের পর মৃত্যু কমতে শুরু করেছে। এ বিশ্লেষণ আরেকবার প্রমাণ করে, রোগতাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণীগুলো না করাই বরং ভালো।

ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন : চিকিৎসক ও গবেষক

রোগের পূর্বাভাস হওয়া উচিত জাগতিক তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক

 আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন 
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যার পূর্বাভাস অতীতে কখনো কোথাও সত্য হয়নি। ইতঃপূর্বের কয়েকটি লেখায় আমরা তথ্যবিশ্লেষণের সাহায্যে তা বলেছি। পূর্বাভাসের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য কোনো দেশে পাওয়া যায় না। কিন্তু তারপরও কিছু বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন। নিচে আমরা সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পরীক্ষা করে করোনা মহামারিসংক্রান্ত বাস্তবতার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। আমাদের এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বা পূর্বাভাস ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারীকে খ্যাতি এনে দিতে পারে না; বিপরীতে এর সম্ভাব্যতা সমালোচনার আওতায় চলে আসে। ভুল মহামারিসংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন ব্যর্থ হতে পারে।

ঈদুলফিতরের সময় চলাফেরার কারণে করোনার উত্থানের পূর্বাভাস

অনেকের মতে, গত মে মাসের মাঝামাঝি ঈদুলফিতরের ছুটিতে অনেক মানুষের চলাচলের কারণে করোনার ধনাÍক পরীক্ষার (টেস্ট পজিটিভের) সংখ্যা বেড়েছে। দ্রষ্টব্য, ১৮ মে থেকে সামগ্রিকভাবে উল্লেখযোগ্য হারে তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায়। পরে অবশ্য বোঝা যায়, এটি ঘটেছিল সার্স সিওভি-২-এর ডেল্টা রূপের কারণে। সম্মানিত পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ওই সময়ে বিশেষত ঢাকা থেকে যাওয়া এবং ফেরত আসার ঘটনাটি ১০ থেকে ১৮ মের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। আমরা জানি, ওই সময় ঢাকায় আলফা ও বিটা ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব ছিল। ঈদুলফিতরের আগে ১০ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত ধনাত্মকের সংখ্যা ছিল ৫,১৭৪ এবং ১৮ থেকে ২১ মে অর্থাৎ ঈদের পরে ছিল ৫,৮৪১। তবে এ সংখ্যা জুনের প্রথম সপ্তাহে লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং প্রতি সপ্তাহ পরপর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে; যা প্রকৃতপক্ষে ঈদুলফিতরের সময়ে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাবের ইঙ্গিত দেয়। আমরা এখানে দুটি বিপরীত দৃশ্য দেখতে পাই। ঈদুলফিতরের আশপাশে ধনাত্মকের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়নি, কিন্তু ঈদুল-আজহার পর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বৈসাদৃশ্যটি দুটি সময়ের মধ্যে দুটি ভিন্ন ভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণতার প্রতিফলন। তাই বলা যায়, ঈদুলফিতরের সময়ের সংক্রমণের জন্য শুধু একটি বড় ধরনের যাওয়া-আসা দায়ী-এ বক্তব্য পুরোপুরি বাস্তব বা সঠিক তথ্য ও তত্ত্বভিত্তিক নয়।

দেশে করোনার সংখ্যা হ্রাস/বৃদ্ধির পূর্বাভাস

একজন বিশেষজ্ঞ দাবি করেছিলেন, করোনার সংখ্যা জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়বে, বিশেষ করে ৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদনের আলোকে আমরা দেখতে পাই, ৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে শনাক্ত রোগীর গড় সংখ্যা ছিল ১০,৭২৭, যা ১১ থেকে ১৬ জুলাই ছিল গড়ে ১১,০৫১। তাই এ দাবির কোনো সত্যতা নেই।

যদি এবারের লকডাউন কার্যকর হতো, তাহলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের পর শনাক্তের সংখ্যা কমে যাওয়া উচিত ছিল, যেহেতু ডেল্টার সুপ্তিকাল চারদিনেরও কম (নমুনা পরীক্ষা এবং প্রতিবেদনসহ ছয় থেকে সাতদিন)। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি, লকডাউনের ষষ্ঠ দিন থেকে বরং এ সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। পূর্বোক্ত দাবির ভিত্তি-জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সংখ্যাটা বাড়বে-আসলে বোধগম্য নয়। যারা দাবি করেন, গণসংক্রমণ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তারা দেখাতে পারবেন না যে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ২১ জুলাইয়ের দুই সপ্তাহ আগে বা এমনকি তিন সপ্তাহ আগে ঘটেছে। এখানে বলে রাখা ভালো, ২১ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে শনাক্তের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কারণ ছুটির সময় পরীক্ষা এবং প্রতিবেদনের সংখ্যা সর্বদা কম থাকে। যা হোক, আমাদের বক্তব্যকে প্রমাণ করার জন্য আমরা চিহ্নিত করতে চাই-শনাক্তের সংখ্যা ২১ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়নি; কিন্তু ২১ জুলাইয়ের পর, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ২৪ জুলাইয়ের পর বেড়েছে ৪ আগস্ট পর্যন্ত।

২৭ জুলাই ওই বিশেষজ্ঞ ধরে নিয়েছিলেন, ঈদুল-আজহার কারণে শুক্রবার থেকে দৈনিক শনাক্তকরণ বৃদ্ধি পাবে অর্থাৎ ৩০ জুলাই থেকে। ১৮ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে ঈদুল আজহার সময়ে ব্যাপক মানুষের চলাচল হয়। সুপ্তিকাল ও পরীক্ষার প্রতিবেদন সময়ের আলোকে শনাক্তের সংখ্যা বাড়া উচিত ছিল ৩০ জুলাই নয়, ২৫ জুলাই থেকে। ধনাত্মকের সংখ্যা ছিল ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাপ্তাহিক ৯৬,২৫০ এবং তারপর ১ থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে ৯৩,৯১২-পতন! ওই বিশেষজ্ঞ আরও বলেছিলেন, সংক্রমণের প্রকৃত সংখ্যা আমরা যা নথিভুক্ত করি তার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। পাছে আমরা ভুলে যাই, বিজ্ঞানীরা একটি স্থায়ী রীতি হিসাবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিকে সত্যায়িত করার জন্য রেফারেন্স উল্লেখ করেন অথবা তাদের অনুমানের ভিত্তি ব্যাখ্যা করেন; যা তিনি করেননি। তিনি ১ আগস্ট বলেন, সংক্রমণ সংখ্যা আগস্টের শেষে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে আমরা এ ভবিষ্যৎ-কথনের কোনো মিল দেখি না।

২৭ জুলাই আরেকজন বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, সংক্রমণের হার দুই সপ্তাহ পর লক্ষণীয় হবে। কিন্তু যদি আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট করোনার ড্যাশবোর্ড থেকে যথাক্রমে দৈনিক ও সাপ্তাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করি, তাহলে বোঝা যায়, প্রতি ছয় বা সাতদিনে ধনাত্মকের সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়; যা পৃথিবীব্যাপী দেখা যায়। এই বিশেষজ্ঞের মতে, ১০ আগস্ট থেকে ধনাত্মকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। যেমনটি আমরা দেখেছি, এ পূর্বাভাসটি অন্য বিশেষজ্ঞের পূর্বাভাসের সঙ্গে বা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

মৃত্যুর পূর্বাভাস

প্রথমে উল্লিখিত বিশেষজ্ঞের মতে, মৃত্যুর সংখ্যা ২১ জুলাইয়ের দিকে বৃদ্ধি পেতে পারে, যার ব্যবধান ধনাত্মক সংখ্যা বৃদ্ধির দিন থেকে তিন সপ্তাহের মতো। যদি ১ জুলাই থেকে ঘোষিত ‘লকডাউন’ সফল হতো, তাহলে ৭ বা ৮ জুলাই থেকে ধনাত্মক পরীক্ষার সংখ্যা কমে যেত এবং পরবর্তীকালে মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ বা ১৫ জুলাই থেকে কমতে থাকত। কিন্তু ২১ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে যেখানে প্রতিদিনে গড়ে ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে ৭ থেকে ২০ জুলাই এবং ২৫ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ২০০ বা তার বেশি মৃত্যু নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ, মৃত্যুর সংখ্যা ২১ জুলাইয়ের অনেক আগে এবং ২৪ জুলাইয়ের পরে বেশি, ২১ জুলাইয়ের কাছাকাছি নয়। ওই বিশেষজ্ঞ পরে বলেছিলেন, আগস্টের মাঝামাঝির পরে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। প্রত্যেকেই দেখেছেন, ১৩ আগস্ট থেকে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে এবং ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। যদি তার প্রথম অভিক্ষেপ সঠিক হতো, (অর্থাৎ ‘ধনাত্মকের সংখ্যা ২১ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে’) তাহলে তার নিজের অনুমান অনুসারে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে (দুই সপ্তাহের ব্যবধানে) মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ত; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু ২৫ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ে থাকার পর কমতে শুরু করে। এরপর তিনি ২৭ জুলাই বলেছিলেন, ৩০ জুলাইয়ের পর নমুনা পরীক্ষায় ধনাত্মকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু আমরা দেখি, ৩০ জুলাইয়ের আগের ছয়দিনে প্রতিদিনের পরীক্ষার ধনাত্মক সংখ্যা ছিল ১৪,৪৮০; কিন্তু ৩০ জুলাইয়ের পর ১৩,৫৯২, যা পরে আরও কমেছে। পরীক্ষার ফলাফল ও মৃত্যুর মধ্যে দুই সপ্তাহের ব্যবধান তাই প্রমাণিত হয় না। এ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, যারা আজ মারা যাচ্ছেন, তারা তিন সপ্তাহ আগে কোনো এক মহামারি তত্ত্ব অনুসারে সংক্রমিত হয়েছিলেন, সেই তত্ত্বটির কোনো রেফারেন্স অবশ্য দেওয়া হয়নি। ৭ আগস্ট ওই বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, মৃত্যুর সংখ্যা আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেশি থাকবে। কিন্তু উপরে যা আলোচনা করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাপ্তাহিক মৃত্যুর সংখ্যার সূত্র এ তত্ত্ব প্রমাণ করে না।

এ বিশেষজ্ঞের ২৭ জুলাইয়ের আরেকটি বক্তব্য হচ্ছে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে কি না তা ৩ আগস্টের পর জানা যাবে। যদি সংক্রমণ বা মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস ৩ আগস্টের পরেই জানা যাবে, তবে একই বিশেষজ্ঞ কীভাবে বলতে পারেন, পরিস্থিতি আগস্টের মাঝামাঝির পরে স্থিতিশীল হবে! অন্য একজন বিশেষজ্ঞ ৩ আগস্ট সাম্প্রতিক মৃত্যুর হার ১.৬ শতাংশ (যা আসলে প্রায় ২.১২ শতাংশ) এবং ধনাত্মক পরীক্ষার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আলোকে বলেছেন, মৃত্যু বাড়বে বা উচ্চপর্যায়ে থাকবে আরও ২০ দিনের জন্য, অর্থাৎ ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যালেন্ডার সপ্তাহের ওপর ভিত্তি করে আমরা দেখতে পাই, ১৩ আগস্টের পর মৃত্যু কমতে শুরু করেছে। এ বিশ্লেষণ আরেকবার প্রমাণ করে, রোগতাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণীগুলো না করাই বরং ভালো।

ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন : চিকিৎসক ও গবেষক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন