প্রিয় শিক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ
jugantor
প্রিয় শিক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলে আমরা বিশ্বাস করি, এবার তা কার্যকর হবে। দেড় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রশ্নে একটি আশার টিমটিমে আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কদিন পরপর কেবল ছুটি বাড়ানোর নোটিশই দেখেছি। হয়তো এ নীতিতে মন্ত্রণালয় চেয়েছে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাঙা রাখতে। এ ছাড়া সরকার কী বা করতে পারত! কোভিডের যে আচরণ, তাতে বড় ঝুঁকি নেওয়া কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। তবুও মাঝে মাঝে আমাদের মনে হয়েছে, বারবার ছুটি বৃদ্ধির খেলায় না মেতে যদি বলা যেত সংক্রমণের হার এত শতাংশের মধ্যে নেমে এলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে, তাতে এক ধরনের স্থায়ী মানসিক প্রস্তুতি রাখা সম্ভব হতো। বড় সংকট তৈরি হলো অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বিবেচনা করে। যখন মিল-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের বদ্ধ অর্গল খুলে যেতে লাগল তখন। এসব দেখে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই ধৈর্যহারা হয়ে যেতে লাগল। আর্থিক কষ্টে থাকা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা হতাশায় নিমজ্জিত হতে থাকলেন। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে লাগল। দেশের নানা অঞ্চলে অভিভাকরা মানববন্ধন করতে লাগলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে। তবে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি একাধিকবার জানিয়েছেন, অনেক অভিভাবক তাকে অনুরোধ করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে। অবশ্য সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবেচনায় অভিভাবকদেরও তো রকমভেদ রয়েছে! বিরোধী দল এ সুযোগ নিতে ছাড়েনি। সেদিন বিএনপি মহাসচিব বলছিলেন, সরকার ছাত্র আন্দোলনের ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে না। সাধারণ মানুষ অনেকের মধ্যেও এ ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই নাকি নিজেদের নিরাপদে রাখার জন্য এমন খেলা খেলছে সরকার।

যাই হোক, কোভিড সংক্রমণ কিছুটা কমে আসায় এবং ধীরে ধীরে ভ্যাকসিন গ্রহণের হার বাড়তে থাকায় সরকার হয়তো সাহসী হতে পেরেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে। বলা হচ্ছে, ১২ সেপ্টেম্বরের পর আর ছুটি বাড়ানো হবে না। অর্থাৎ ধাপে ধাপে হলেও স্কুল খুলতে যাচ্ছে। আর ঘোষণা মতে অক্টোবরে খুলবে বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রছাত্রীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। জানানো হচ্ছে, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্যও ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে ব্যবস্থাপনায় বোধহয় কিছুটা ঘাটতি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে কোন কেন্দ্রে টিকা দিতে চায়। ঢাকার আজিমপুরে এবং ময়মনসিংহে বসবাসকারী আমাদের দুজন ছাত্রী জানালো ওরা নিজেদের কাছাকাছি কেন্দ্রের নাম জানিয়ে প্রায় এক মাস আগে নিবন্ধন করেছে, কিন্তু এখনো টিকা নেওয়ার মেসেজ আসেনি। তাই ওরা শঙ্কিত, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেলে টিকা ছাড়া ক্লাস করবে কেমন করে! শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেকেই ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ভ্যাকসিন নিয়েছেন। বাকিদেরও বিশেষ তদারকিতে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা আমার জানামতে টিকা নিচ্ছেন। এসবের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খেলার একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে আমি একটি আশঙ্কা এড়াতে পারছি না। শিক্ষার্থীদের কি স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করানো সম্ভব হবে? আমি বিশ্বাস করি, বাধ্য করার পদ্ধতি প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। উদ্বুদ্ধ করা বা আত্মচৈতন্যে ফিরিয়ে আনাটাই হবে বড় কাজ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেককে কাছে থেকে দেখে এবং তরুণ-তরুণীদের পথে-ঘাটে চলাফেরা করতে দেখে ভীষণ অসচেতন বা ‘বীর নারী, বীর পুরুষ’ বলেই মনে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যা কাম্য হতে পারে না।

আমি দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে মেস করে অনেক ছাত্রছাত্রী অবস্থান করছে অনেকদিন থেকেই। এ পথে চলাফেরা করতে গিয়ে প্রায়ই দেখি খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই মাস্ক পরে চলাফেরা করছে। বিকালে অনেক ছাত্রছাত্রীই ক্যাম্পাসে এসে আড্ডা দেয়, সেখানেও একই অবস্থা। ডেকে জিজ্ঞেস করলেই অনেকটা একই উত্তর, এখানে তেমন সংক্রমণ নেই। অথচ মেসে বসবাস করা কোনো কোনো শিক্ষার্থীর কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার দুঃসংবাদও মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। ক্যাম্পাসও কোভিডমুক্ত নয়। শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন-অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীদের অভিজ্ঞতাও একই। আমি এ ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য একাধিকবার আমার কলামে লিখেছি। ব্যক্তিগতভাবেও চেষ্টা করছি। কিন্তু ফলাফল তেমন ভালো নয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন এবং সাধারণ যুক্তিতে আমরাও বুঝি, টিকা শতভাগ নিরাপত্তা দিতে পারে না। সব মানুষের শারীরিক গঠন এবং দেহ অভ্যন্তরের শক্তি একই রকম হবে না। টিকা নেওয়ার কারণে রোগ-প্রতিরোধ শক্তিও সবার দেহে একইভাবে তৈরি হতে পারে না। তাই ভাইরাসের জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে তা যে কোনো সময়েই বিপত্তি ঘটাতে পারে। এ কারণেই বলা হয়, প্রবেশপথ বন্ধ করাটাই জরুরি। এ বিচারে মাস্ক পরাটাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে প্রত্যেকের সার্বক্ষণিক মাস্ক পরাটা নিশ্চিত করা জরুরি।

আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের অনেকের মনস্তত্ত্ব এখন আমি ঠিক বুঝতে পারি না। যুগ যুগ ধরে তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন কবি-সাহিত্যিকরা। আমাদের কাছাকাছি বয়সিরা স্মরণ করতে পারবেন, পাকিস্তানি শাসনকালে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দেড় দশক এ দেশের সর্বত্র পাড়া-মহল্লায় তরুণরা অনেক ক্লাব গড়ে তুলত। টেলিভিশন চ্যানেল এবং মোবাইলের যুগ ছিল না তখন। তরুণদের আড্ডা ও খেলাধুলা এসব ক্লাবকে ঘিরেই হতো। ক্লাবের সভ্য তরুণরা এ ক্লাবকে কেন্দ্র করে নানা সামাজিক কাজে নিজেদের যুক্ত রাখতেন। ছোটখাটো সমস্যায় প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন না। পুকুর-ডোবার কচুরিপানা পরিষ্কার করা অথবা ভেঙে যাওয়া মাটির রাস্তা স্বেচ্ছাশ্রমে ঠিক করে দেওয়া সামাজিক কর্তব্য হিসাবেই তারা মনে করতেন। সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রও ছিল এসব ক্লাব। অথচ যখন প্রত্যাশা করছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের গ্রাম-মহল্লার কম সচেতন মানুষদের উদ্বুদ্ধ করতে একই অঞ্চলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা স্বউদ্যোগে যূথবদ্ধভাবে পথে নামবে, মাস্ক বিতরণ করবে, তখন তারাই মাস্ক না পরে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি মৌখিকভাবে এবং আমার লেখায় একাধিকবার বলার চেষ্টা করেছি, এ উদ্যোগ নিলে মাস্ক সরবরাহ করে ওদের পাশে থাকব। কিন্তু কোনো ফল পাইনি।

এমন অসচেতনতা বহাল রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি বেশিদিন খোলা রাখা সম্ভব হবে? শিক্ষার্থীসহ সব নাগরিকের এ বোধটিকে জাগ্রত রাখা উচিত-অসচেতনতা অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে একজন নিজেই শুধু আক্রান্ত হবেন না-নিজের বন্ধুদেরও আক্রান্ত করবেন। আক্রান্ত করবেন পরিবারকে, সমাজের মানুষকে। স্বাস্থ্যবিধি মান্য করার ফলাফল কি আমরা দেখছি না? এই যে কয়েক প্রস্থ লকডাউন গেল, আমরা তেমন কঠিনভাবে লকডাউন কার্যকর করতে পারিনি। তারপরও তো লকডাউন-উত্তর সময়ে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। আর আমরা দায়িত্ববান নাগরিকের মতো যদি লকডাউন আরও বেশি কার্যকর করতে পারতাম, তবে নিশ্চয়ই ফলাফল আরও স্বস্তির হতো। আবার কোভিডের মধ্যে ঈদে ঘরে ফেরার ভয়ংকর পাগলামির পর আমরা দেখেছি আশঙ্কা সত্য হয়েছে। হুহু করে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাহলে তো ইতিবাচক-নেতিবাচক দুরকম ফলাফলই আমরা দেখেছি।

ক্যাম্পাসে মাস্কবিহীন ছাত্রছাত্রীকে যখন প্রশ্ন করি-তোমাদের মাস্ক কোথায়, তখন প্রায়ই ওদের সরল উক্তি থাকে-ক্যাম্পাসের মুক্ত পরিবেশে কোভিড নেই। কিন্তু মরণঘাতী ভাইরাস কি ওদের সরল উক্তির কোনো মূল্য দেবে? দেড় বছর আগে করোনা সংক্রমণ যখন ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনো অনেকে বিশ্বাস করত করোনা বিত্তবানদের রোগ। খেটেখাওয়া দরিদ্রদের করোনা হবে না। আর গ্রাম তো করোনামুক্ত এলাকা। কিন্তু ধীরে ধীরে এ ধারণা পালটাতে থাকে। এটি তো ঠিক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও দেখানো হয়েছে-রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম, বিশেষ করে কায়িক শ্রমের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকেন না; ঘরে এসি, গাড়িতে এসি এবং পেশাস্থলে এসির ঠাণ্ডায় বসবাস এবং সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি নেওয়ার সুযোগ যাদের কম, তারাই আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন বেশি। সে তুলনায় খেটেখাওয়া শ্রমজীবী মানুষ কম আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু এক সময় অবস্থা পালটে যেতে থাকে। নানা উৎসব উপলক্ষ্যে দলে দলে মানুষের গ্রামে যাওয়া এবং এ সূত্রে কোভিড ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকে। ভুল ধারণায় শ্রমজীবী মানুষ অসতর্কভাবে চলাফেরা করায় এখন তারাও কোভিডের থাবা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। কোভিডে এখন বয়সিরা যেমন আক্রান্ত হচ্ছেন, কিশোর-তরুণও বাদ যাচ্ছে না। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেল, এখন কোভিড আক্রান্ত প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষই গ্রামে বসবাসকারী।

আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে শিক্ষার্থীসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানার শপথ নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতাও করতে হবে। হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মচারীরা নিজ দায়িত্বে মাস্ক পরে এলেও মাস্কের বন্দোবস্ত রাখতে হবে প্রতিষ্ঠানেও। শিক্ষকদের সতর্ক থাকতে হবে ছাত্রছাত্রীর শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি যাতে নিশ্চিত থাকে। অনেকেই বলেন, এ গরমে মাস্ক মুখে রাখতে পারি না। মানুষ অভ্যাসের দাস। আমি আমাকে দিয়েই প্রমাণ পাই। আমি ভীষণ সেনসেটিভ ধরনের মানুষ। ঠাণ্ডায় নাক বন্ধ হলে মনে হয় এক্ষুনি শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাব। মাস্ক পরে থাকব কী করে তা নিয়ে বেশ ভাবনা ছিল। কিন্তু কোভিডের চোখ রাঙানিতে মাস্ক তুলে নিতে হলো মুখে। প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। সারা দিন মাস্ক মুখে থাকলেও এখন টের পাই না। এ সত্যটি তো স্পষ্ট, ভাইরাসের জীবাণু দেহে প্রবেশের দুটি মাত্র পথ খোলা। একটি মুখ, অন্যটি নাক। এ দুই পথই যদি মাস্ক দিয়ে বন্ধ রাখি, তবে বন্ধ হয়ে গেল জীবাণু প্রবেশের পথ।

আমরা যেমন দেশ থেকে, বিশ্ব থেকে করোনামুক্তি প্রার্থনা করি, তেমনি চাই আমাদের দেশে সংক্রমণ কমে যাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। সামনের শুভযাত্রায় কোনো বাধা ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসুক। এ কারণেই প্রিয় শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, তোমরা যদি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চল, তবে আমরা সবাই স্বস্তি পাব।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

প্রিয় শিক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলে আমরা বিশ্বাস করি, এবার তা কার্যকর হবে। দেড় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রশ্নে একটি আশার টিমটিমে আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কদিন পরপর কেবল ছুটি বাড়ানোর নোটিশই দেখেছি। হয়তো এ নীতিতে মন্ত্রণালয় চেয়েছে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাঙা রাখতে। এ ছাড়া সরকার কী বা করতে পারত! কোভিডের যে আচরণ, তাতে বড় ঝুঁকি নেওয়া কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। তবুও মাঝে মাঝে আমাদের মনে হয়েছে, বারবার ছুটি বৃদ্ধির খেলায় না মেতে যদি বলা যেত সংক্রমণের হার এত শতাংশের মধ্যে নেমে এলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে, তাতে এক ধরনের স্থায়ী মানসিক প্রস্তুতি রাখা সম্ভব হতো। বড় সংকট তৈরি হলো অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বিবেচনা করে। যখন মিল-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের বদ্ধ অর্গল খুলে যেতে লাগল তখন। এসব দেখে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই ধৈর্যহারা হয়ে যেতে লাগল। আর্থিক কষ্টে থাকা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা হতাশায় নিমজ্জিত হতে থাকলেন। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে লাগল। দেশের নানা অঞ্চলে অভিভাকরা মানববন্ধন করতে লাগলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে। তবে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি একাধিকবার জানিয়েছেন, অনেক অভিভাবক তাকে অনুরোধ করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে। অবশ্য সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবেচনায় অভিভাবকদেরও তো রকমভেদ রয়েছে! বিরোধী দল এ সুযোগ নিতে ছাড়েনি। সেদিন বিএনপি মহাসচিব বলছিলেন, সরকার ছাত্র আন্দোলনের ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে না। সাধারণ মানুষ অনেকের মধ্যেও এ ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই নাকি নিজেদের নিরাপদে রাখার জন্য এমন খেলা খেলছে সরকার।

যাই হোক, কোভিড সংক্রমণ কিছুটা কমে আসায় এবং ধীরে ধীরে ভ্যাকসিন গ্রহণের হার বাড়তে থাকায় সরকার হয়তো সাহসী হতে পেরেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে। বলা হচ্ছে, ১২ সেপ্টেম্বরের পর আর ছুটি বাড়ানো হবে না। অর্থাৎ ধাপে ধাপে হলেও স্কুল খুলতে যাচ্ছে। আর ঘোষণা মতে অক্টোবরে খুলবে বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রছাত্রীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। জানানো হচ্ছে, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্যও ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে ব্যবস্থাপনায় বোধহয় কিছুটা ঘাটতি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে কোন কেন্দ্রে টিকা দিতে চায়। ঢাকার আজিমপুরে এবং ময়মনসিংহে বসবাসকারী আমাদের দুজন ছাত্রী জানালো ওরা নিজেদের কাছাকাছি কেন্দ্রের নাম জানিয়ে প্রায় এক মাস আগে নিবন্ধন করেছে, কিন্তু এখনো টিকা নেওয়ার মেসেজ আসেনি। তাই ওরা শঙ্কিত, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেলে টিকা ছাড়া ক্লাস করবে কেমন করে! শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেকেই ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ভ্যাকসিন নিয়েছেন। বাকিদেরও বিশেষ তদারকিতে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা আমার জানামতে টিকা নিচ্ছেন। এসবের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খেলার একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে আমি একটি আশঙ্কা এড়াতে পারছি না। শিক্ষার্থীদের কি স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করানো সম্ভব হবে? আমি বিশ্বাস করি, বাধ্য করার পদ্ধতি প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। উদ্বুদ্ধ করা বা আত্মচৈতন্যে ফিরিয়ে আনাটাই হবে বড় কাজ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেককে কাছে থেকে দেখে এবং তরুণ-তরুণীদের পথে-ঘাটে চলাফেরা করতে দেখে ভীষণ অসচেতন বা ‘বীর নারী, বীর পুরুষ’ বলেই মনে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যা কাম্য হতে পারে না।

আমি দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে মেস করে অনেক ছাত্রছাত্রী অবস্থান করছে অনেকদিন থেকেই। এ পথে চলাফেরা করতে গিয়ে প্রায়ই দেখি খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই মাস্ক পরে চলাফেরা করছে। বিকালে অনেক ছাত্রছাত্রীই ক্যাম্পাসে এসে আড্ডা দেয়, সেখানেও একই অবস্থা। ডেকে জিজ্ঞেস করলেই অনেকটা একই উত্তর, এখানে তেমন সংক্রমণ নেই। অথচ মেসে বসবাস করা কোনো কোনো শিক্ষার্থীর কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার দুঃসংবাদও মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। ক্যাম্পাসও কোভিডমুক্ত নয়। শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন-অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীদের অভিজ্ঞতাও একই। আমি এ ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য একাধিকবার আমার কলামে লিখেছি। ব্যক্তিগতভাবেও চেষ্টা করছি। কিন্তু ফলাফল তেমন ভালো নয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন এবং সাধারণ যুক্তিতে আমরাও বুঝি, টিকা শতভাগ নিরাপত্তা দিতে পারে না। সব মানুষের শারীরিক গঠন এবং দেহ অভ্যন্তরের শক্তি একই রকম হবে না। টিকা নেওয়ার কারণে রোগ-প্রতিরোধ শক্তিও সবার দেহে একইভাবে তৈরি হতে পারে না। তাই ভাইরাসের জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে তা যে কোনো সময়েই বিপত্তি ঘটাতে পারে। এ কারণেই বলা হয়, প্রবেশপথ বন্ধ করাটাই জরুরি। এ বিচারে মাস্ক পরাটাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে প্রত্যেকের সার্বক্ষণিক মাস্ক পরাটা নিশ্চিত করা জরুরি।

আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের অনেকের মনস্তত্ত্ব এখন আমি ঠিক বুঝতে পারি না। যুগ যুগ ধরে তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন কবি-সাহিত্যিকরা। আমাদের কাছাকাছি বয়সিরা স্মরণ করতে পারবেন, পাকিস্তানি শাসনকালে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দেড় দশক এ দেশের সর্বত্র পাড়া-মহল্লায় তরুণরা অনেক ক্লাব গড়ে তুলত। টেলিভিশন চ্যানেল এবং মোবাইলের যুগ ছিল না তখন। তরুণদের আড্ডা ও খেলাধুলা এসব ক্লাবকে ঘিরেই হতো। ক্লাবের সভ্য তরুণরা এ ক্লাবকে কেন্দ্র করে নানা সামাজিক কাজে নিজেদের যুক্ত রাখতেন। ছোটখাটো সমস্যায় প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন না। পুকুর-ডোবার কচুরিপানা পরিষ্কার করা অথবা ভেঙে যাওয়া মাটির রাস্তা স্বেচ্ছাশ্রমে ঠিক করে দেওয়া সামাজিক কর্তব্য হিসাবেই তারা মনে করতেন। সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রও ছিল এসব ক্লাব। অথচ যখন প্রত্যাশা করছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের গ্রাম-মহল্লার কম সচেতন মানুষদের উদ্বুদ্ধ করতে একই অঞ্চলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা স্বউদ্যোগে যূথবদ্ধভাবে পথে নামবে, মাস্ক বিতরণ করবে, তখন তারাই মাস্ক না পরে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি মৌখিকভাবে এবং আমার লেখায় একাধিকবার বলার চেষ্টা করেছি, এ উদ্যোগ নিলে মাস্ক সরবরাহ করে ওদের পাশে থাকব। কিন্তু কোনো ফল পাইনি।

এমন অসচেতনতা বহাল রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি বেশিদিন খোলা রাখা সম্ভব হবে? শিক্ষার্থীসহ সব নাগরিকের এ বোধটিকে জাগ্রত রাখা উচিত-অসচেতনতা অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে একজন নিজেই শুধু আক্রান্ত হবেন না-নিজের বন্ধুদেরও আক্রান্ত করবেন। আক্রান্ত করবেন পরিবারকে, সমাজের মানুষকে। স্বাস্থ্যবিধি মান্য করার ফলাফল কি আমরা দেখছি না? এই যে কয়েক প্রস্থ লকডাউন গেল, আমরা তেমন কঠিনভাবে লকডাউন কার্যকর করতে পারিনি। তারপরও তো লকডাউন-উত্তর সময়ে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। আর আমরা দায়িত্ববান নাগরিকের মতো যদি লকডাউন আরও বেশি কার্যকর করতে পারতাম, তবে নিশ্চয়ই ফলাফল আরও স্বস্তির হতো। আবার কোভিডের মধ্যে ঈদে ঘরে ফেরার ভয়ংকর পাগলামির পর আমরা দেখেছি আশঙ্কা সত্য হয়েছে। হুহু করে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাহলে তো ইতিবাচক-নেতিবাচক দুরকম ফলাফলই আমরা দেখেছি।

ক্যাম্পাসে মাস্কবিহীন ছাত্রছাত্রীকে যখন প্রশ্ন করি-তোমাদের মাস্ক কোথায়, তখন প্রায়ই ওদের সরল উক্তি থাকে-ক্যাম্পাসের মুক্ত পরিবেশে কোভিড নেই। কিন্তু মরণঘাতী ভাইরাস কি ওদের সরল উক্তির কোনো মূল্য দেবে? দেড় বছর আগে করোনা সংক্রমণ যখন ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনো অনেকে বিশ্বাস করত করোনা বিত্তবানদের রোগ। খেটেখাওয়া দরিদ্রদের করোনা হবে না। আর গ্রাম তো করোনামুক্ত এলাকা। কিন্তু ধীরে ধীরে এ ধারণা পালটাতে থাকে। এটি তো ঠিক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও দেখানো হয়েছে-রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম, বিশেষ করে কায়িক শ্রমের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকেন না; ঘরে এসি, গাড়িতে এসি এবং পেশাস্থলে এসির ঠাণ্ডায় বসবাস এবং সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি নেওয়ার সুযোগ যাদের কম, তারাই আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন বেশি। সে তুলনায় খেটেখাওয়া শ্রমজীবী মানুষ কম আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু এক সময় অবস্থা পালটে যেতে থাকে। নানা উৎসব উপলক্ষ্যে দলে দলে মানুষের গ্রামে যাওয়া এবং এ সূত্রে কোভিড ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকে। ভুল ধারণায় শ্রমজীবী মানুষ অসতর্কভাবে চলাফেরা করায় এখন তারাও কোভিডের থাবা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। কোভিডে এখন বয়সিরা যেমন আক্রান্ত হচ্ছেন, কিশোর-তরুণও বাদ যাচ্ছে না। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেল, এখন কোভিড আক্রান্ত প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষই গ্রামে বসবাসকারী।

আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে শিক্ষার্থীসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানার শপথ নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতাও করতে হবে। হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মচারীরা নিজ দায়িত্বে মাস্ক পরে এলেও মাস্কের বন্দোবস্ত রাখতে হবে প্রতিষ্ঠানেও। শিক্ষকদের সতর্ক থাকতে হবে ছাত্রছাত্রীর শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি যাতে নিশ্চিত থাকে। অনেকেই বলেন, এ গরমে মাস্ক মুখে রাখতে পারি না। মানুষ অভ্যাসের দাস। আমি আমাকে দিয়েই প্রমাণ পাই। আমি ভীষণ সেনসেটিভ ধরনের মানুষ। ঠাণ্ডায় নাক বন্ধ হলে মনে হয় এক্ষুনি শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাব। মাস্ক পরে থাকব কী করে তা নিয়ে বেশ ভাবনা ছিল। কিন্তু কোভিডের চোখ রাঙানিতে মাস্ক তুলে নিতে হলো মুখে। প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। সারা দিন মাস্ক মুখে থাকলেও এখন টের পাই না। এ সত্যটি তো স্পষ্ট, ভাইরাসের জীবাণু দেহে প্রবেশের দুটি মাত্র পথ খোলা। একটি মুখ, অন্যটি নাক। এ দুই পথই যদি মাস্ক দিয়ে বন্ধ রাখি, তবে বন্ধ হয়ে গেল জীবাণু প্রবেশের পথ।

আমরা যেমন দেশ থেকে, বিশ্ব থেকে করোনামুক্তি প্রার্থনা করি, তেমনি চাই আমাদের দেশে সংক্রমণ কমে যাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। সামনের শুভযাত্রায় কোনো বাধা ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসুক। এ কারণেই প্রিয় শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, তোমরা যদি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চল, তবে আমরা সবাই স্বস্তি পাব।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন