একজন কাদামাটির মানুষ
jugantor
শুভ জন্মদিন
একজন কাদামাটির মানুষ

  দীপু মাহমুদ  

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পাকা ধান কেটে, সোনালি ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে মাঠের মাঝ দিয়ে সার বেঁধে কৃষক যাচ্ছেন। এমন দৃশ্যের চেয়ে আর কোনো সুন্দর দৃশ্য আমি দেখিনি। এর পাশাপাশি যা দেখেছি তা হচ্ছে পুকুরের কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে বিশাল মাছ হাতে নিয়ে একজন হাসছে। মাছ খলবল করছে, লেজ দিয়ে ঘাই মারছে। আর দেখেছি মাচার নিচে ঝুলন্ত সবজির পাশ দিয়ে হাসিমুখে হেঁটে যেতে নারীকে। তারা কৃষক। তারা কৃষানি। তারা ফসল ফলায়। তারা সারা বছর আমাদের খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখেন। আমরা যারা একটু চালাক-চতুর তারা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এসেছি। আমাদের যে বোকাসোকা ভাইটি সে থেকে গেছে গ্রামে। বোকাসোকা বোনটিকেও গ্রামে রেখে এসেছি কোনো একজন বোকাসোকা মানুষের সঙ্গে বিয়ে দেব বলে।

আমরা অফিসে চাকরি করি, আমরা অফিসার; আমরা ব্যবসা করে ব্যবসায়ী হয়েছি। আমার ভাই কৃষক। বোন কৃষানি। তারা ফসল ফলায়। গ্রামে থাকে। আমরা কজন তাদের খবর রাখি? আমরা তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান দিই। কিন্তু পায়ের জুতা খুলে মাঠের কাদায় পা রাখি না।

কথাগুলো বলার বিশেষ কারণ আছে। যেদিন দেখলাম আমরা ভায়ে-ভায়ে, ভায়ে-বোনে, বোনে-বোনে আলাদা হয়ে গেলাম। সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমি আর আমার মতো সুবিধাবাদীরা হলাম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আর আমাদের খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে ভাই, বোন সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে ওঠে, রোদ্দুরের তীব্র ভাপ গায়ে মেখে কাজ করে, যার শরীরের চামড়া পুড়ে গেছে, স্যাঁতসেঁতে পানিতে ভিজে পায়ের নিচে ক্ষত, সে জন্ম থেকে অবহেলিত। তাদের পক্ষে কজন কথা বলি। তারা এক মন ধান বিক্রি করে কন্যার সামান্য আবদার মেটাতে পারেন না। অনেকে অগ্রহায়ণের নবান্নেও এক কেজি মাংস কিনে খেতে পারে না। এ জন্য কষ্ট হয়।

তখন আমি মাধ্যমিকের শেষ ধাপে পড়ি। আমাদের বাড়িতে সাদাকালো টেলিভিশন। আমরা আগ্রহ নিয়ে টেলিভিশন দেখি। একটা মাত্র চ্যানেল, বাংলাদেশ টেলিভিশন। তাতে মাটি ও মানুষ নামে অনুষ্ঠান দেখায়। সেই প্রথম দেখলাম কৃষকদের কেউ মর্যাদা দিয়ে কথা বলছেন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সেখানে একজন মানুষকে দেখলাম, অতি আন্তরিক। নাম শাইখ সিরাজ। তিনি আমার পথ প্রদর্শক হয়ে গেলেন।

তারপর এক সময় টেলিভিশন রঙিন হলো। প্রাইভেট চ্যানেল হলো। চ্যানেল আইতে শুরু হলো হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠান। সেই শাইখ সিরাজ। সেই আন্তরিকতা, মুখে সেই হাসি, খালি পা, প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুর কাছে নিয়ে এসে কাদাভরা মাঠে নেমে গেছেন। কখনো প্যান্ট ভিজে গেছে পানিতে। তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি। কৃষক আর কৃষাণির কাছে গিয়ে বসেছেন গোয়াল ঘরের পাশে। গল্প করছেন। মুখে হাসি।

শাইখ সিরাজকে প্রথম দেখি সাদাকালো টেলিভিশনে। তখন তার শার্টের রং বুঝতে পারিনি। পরে যখন কালার টেলিভিশন এসেছে তখন দেখেছি। গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে সেই গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট ছাড়া তাকে কখনো অন্য কোনো রঙের শার্ট গায়ে দিতে দেখিনি।

এ মানুষটিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি আরও একটা কারণে। আমাদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম টেলিভিশন। এ মাধ্যম বরাবরই রুপালি জগতের মানুষের দখলে। ঈদে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নিয়ে বিশাল আগ্রহ আমাদের। শোবিজ তারকাদের নিয়ে মাতামাতি। হকচকিয়ে গেলাম টেলিভিশন চ্যানেলে কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠান হচ্ছে দেখে। উপস্থাপন করছেন শ্রদ্ধেয় শাইখ সিরাজ। সেই গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট গায়ে, পরনে ধূসর রঙের গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। খালি পা। প্যান্ট গুটিয়ে রেখেছেন খানিকটা ওপরে। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মাঠে ঘুরছেন। কৃষক-কৃষানিদের সঙ্গে কথা বলছেন। কৃষক-কৃষাণিদের জন্য নানা ধরনের খেলার আয়োজন করা হয়েছে। কলাগাছ পোঁতা আছে। কলাগাছ বেয়ে তরতর করে উঠে যেতে হবে ওপরে। নিচে পানি, ওপরে বাঁশ। সেখানে বসে লড়াই করে টিকে থাকতে হবে। স্বামী-স্ত্রী এসেছেন জোড়ায়-জোড়ায়। নৌকা ভরতি পেয়ারা। স্ত্রী দৌড় দিয়ে গিয়ে নৌকা থেকে দুহাত ভরে পেয়ারা এসে স্বামীর হাতে দিচ্ছেন। স্বামী পেয়ারা ছুড়ে দিচ্ছেন উঁচু বাঁশের মাথায় বাঁধা ঝুড়িতে। নির্ধারিত সময় পরে গুনে দেখা হবে কার ঝুড়িতে মোট কয়টা পেয়ারা জমা হয়েছে।

আহা কী আনন্দ, কী আনন্দ! এর আগে কবে কে এমনভাবে ভেবেছে কৃষক আর কৃষানিদের কথা! তাদেরও বলার কিছু কথা আছে। তাদের জীবনেও ঈদ আসে, অনুভূতি প্রকাশের ইচ্ছা হয়। শাইখ সিরাজ গেলেন তাদের কাছে। তাদের কথা শুনলেন। ঈদের অনুষ্ঠানে যুক্ত করলেন কৃষক-কৃষাণিকে। তারাও হয়ে উঠলেন তারকা। কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানে যারা অংশগ্রহণ করেছেন প্রত্যেককে উপহার প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা খেলায় জিতেছেন তারা টেলিভিশন, বাইসাইকেলের মতো দামি পুরস্কার পেয়েছেন।

শাইখ সিরাজ বিপ্লব ঘটালেন শহরেও। আমরা সবুজের জন্য হাহাকার করি। মাটি স্পর্শ করার জন্য আমাদের অন্তর পোড়ে। আমরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলি। শাইখ সিরাজ নগর কৃষিতে যুক্ত করলেন নতুন মাত্রা। ছাদকৃষিকে আরও জনপ্রিয় করে তুললেন শাইখ সিরাজ। অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে সবজি-ফল-ফুলের গাছ। এখন যে কোনো বাড়ির ছাদে দাঁড়ালেই আশপাশের বাড়ির ছাদে দেখা যায় সবুজ গাছগাছালি। চ্যানেল আইর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠান আরও জনপ্রিয় হলো। উষ্ণায়ন থেকে নগরকে রক্ষা করতে যে উদ্যোগ তার প্রচারেও লেগে গেলেন তিনি। মানুষ যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে সে কাজেও ব্যস্ত হলেন। বললেন, যদি ভাড়া বাড়িতে ছাদে জায়গা না পান, একচিলতে বারান্দা থাকে কেবল, তবে সেখানে টবে একটি মরিচ বা লেবুগাছ লাগান।

শাইখ সিরাজ দেখালেন স্বল্প পরিসরে মাছ চাষের বিষয়টিও। যাদের টেলিভিশনে দেখা যায়, তাদের ছোঁয়া যায় না। যেন আকাশের চাঁদ। ভালোবাসা যায়, স্পর্শ করা যায় না। একদিন সেই চাঁদ স্পর্শ করার সুযোগ আমার হয়ে গেল!

তখন শীতকাল। যে নারী আমাকে বিয়ে করেছে, রূপা, সে ছাদে বাগান করেছে। নানাজাতের গাছ আছে সেখানে। একদিন শুনলাম শাইখ সিরাজ আসবেন রূপার ছাদবাগান দেখতে। আমার নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেল। ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়তে থাকল। অদ্ভুত ধরনের নার্ভাস বোধ করতে থাকলাম। কেন জানি না, সারারাত ঘুম হলো না। তিনি এলেন ভোরে। কুয়াশা আচ্ছন্ন ভোর। জানালেন বাসায় আসবেন না। ছাদে কথা বলে চলে যাবেন।

কত কথা জমিয়ে রেখেছি তার সঙ্গে বলব বলে। কখন বলব বুঝতে পারছি না। দৌড়ে ছাদে গেলাম। গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট গায়ে কুয়াশার ভেতর রূপার ছাদ বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন আমার পথপ্রদর্শক শাইখ সিরাজ। হাতে ছোটখাটো কালো ক্যামেরা।

তিনি কথা বলছেন অতি সাধারণভাবে। যেন নিয়মিত আসেন এখানে; আমাদের সঙ্গে দেখা হয়। এক টেবিলে বসে মাছের কাঁটা বেছে ভাত খেতে খেতে আমরা নিয়মিত গল্প করি। মানুষ মাটি দিয়ে বানানো শুনেছি কিন্তু একজন মানুষ কাদামাটির মতো এমন নরম মনের হতে পারেন তা চোখে দেখলাম। তিনি শাইখ সিরাজ।

হাত দুটি ধরে বললাম, ভাই, আমি অত্যন্ত কাঙাল একজন মানুষ। ভালোবাসা পেলে মিইয়ে যাই। মনে কষ্ট পেলে দুঃখ বাড়ে। আপনি একবার আমাদের বাড়ির ভেতরে চলুন। কাঁসার গ্লাসে পানি রেখেছি, আপনি খাবেন।

শাইখ সিরাজের মুখে হাসি। তার চোখ হাসছে। সেখানে স্নেহভরা। তিনি বললেন, কী করেন আপনি? বললাম, লেখালেখি করি। গল্প লিখি, উপন্যাস লিখি। বেশিরভাগ শিশু-কিশোরদের জন্য। আমাকে অবাক করে দিয়ে শাইখ সিরাজ বললেন, চলুন। তিনি বাসায় এলেন। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসলেন না। ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসলেন। চেয়ারের একপাশ ভাঙা। সেটা যাতে দেখা না যায় সে জন্য আড়াল করে রাখা হয়েছে। শাইখ সিরাজ গিয়ে সেই চেয়ারেই বসেছেন। পেরেক বেরিয়ে ছিল খানিকটা। তিনি আরাম করে চেয়ারে বসে থাকলেন। পানি খেলেন। যখন উঠলেন খেয়াল করলাম চেয়ারের বের হয়ে থাকা পেরেকে তার প্যান্ট বিঁধে ছিঁড়ে যায়নি। বুকের ভেতর আটকে রাখা দম ফস করে ছেড়ে দিলাম। শুধু তাকে কী কী বলতে চেয়েছিলাম সেগুলো ভুলে গেলাম। বলা হলো না।

৭ সেপ্টেম্বর শ্রদ্ধেয় শাইখ সিরাজের জন্মদিন। অন্তর থেকে তার জন্য প্রার্থনা করছি, তিনি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। তাকে ঘিরে থাকুক মানুষের মন। কৃষককে যে মর্যাদা তিনি দিয়েছেন তার সহস্রগুণ মর্যাদায় মর্যাদাবান হোন তিনি। সুখে থাকুন, আনন্দে থাকুন।

দীপু মাহমুদ : কথাসাহিত্যিক

শুভ জন্মদিন

একজন কাদামাটির মানুষ

 দীপু মাহমুদ 
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পাকা ধান কেটে, সোনালি ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে মাঠের মাঝ দিয়ে সার বেঁধে কৃষক যাচ্ছেন। এমন দৃশ্যের চেয়ে আর কোনো সুন্দর দৃশ্য আমি দেখিনি। এর পাশাপাশি যা দেখেছি তা হচ্ছে পুকুরের কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে বিশাল মাছ হাতে নিয়ে একজন হাসছে। মাছ খলবল করছে, লেজ দিয়ে ঘাই মারছে। আর দেখেছি মাচার নিচে ঝুলন্ত সবজির পাশ দিয়ে হাসিমুখে হেঁটে যেতে নারীকে। তারা কৃষক। তারা কৃষানি। তারা ফসল ফলায়। তারা সারা বছর আমাদের খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখেন। আমরা যারা একটু চালাক-চতুর তারা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এসেছি। আমাদের যে বোকাসোকা ভাইটি সে থেকে গেছে গ্রামে। বোকাসোকা বোনটিকেও গ্রামে রেখে এসেছি কোনো একজন বোকাসোকা মানুষের সঙ্গে বিয়ে দেব বলে।

আমরা অফিসে চাকরি করি, আমরা অফিসার; আমরা ব্যবসা করে ব্যবসায়ী হয়েছি। আমার ভাই কৃষক। বোন কৃষানি। তারা ফসল ফলায়। গ্রামে থাকে। আমরা কজন তাদের খবর রাখি? আমরা তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান দিই। কিন্তু পায়ের জুতা খুলে মাঠের কাদায় পা রাখি না।

কথাগুলো বলার বিশেষ কারণ আছে। যেদিন দেখলাম আমরা ভায়ে-ভায়ে, ভায়ে-বোনে, বোনে-বোনে আলাদা হয়ে গেলাম। সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমি আর আমার মতো সুবিধাবাদীরা হলাম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আর আমাদের খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে ভাই, বোন সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে ওঠে, রোদ্দুরের তীব্র ভাপ গায়ে মেখে কাজ করে, যার শরীরের চামড়া পুড়ে গেছে, স্যাঁতসেঁতে পানিতে ভিজে পায়ের নিচে ক্ষত, সে জন্ম থেকে অবহেলিত। তাদের পক্ষে কজন কথা বলি। তারা এক মন ধান বিক্রি করে কন্যার সামান্য আবদার মেটাতে পারেন না। অনেকে অগ্রহায়ণের নবান্নেও এক কেজি মাংস কিনে খেতে পারে না। এ জন্য কষ্ট হয়।

তখন আমি মাধ্যমিকের শেষ ধাপে পড়ি। আমাদের বাড়িতে সাদাকালো টেলিভিশন। আমরা আগ্রহ নিয়ে টেলিভিশন দেখি। একটা মাত্র চ্যানেল, বাংলাদেশ টেলিভিশন। তাতে মাটি ও মানুষ নামে অনুষ্ঠান দেখায়। সেই প্রথম দেখলাম কৃষকদের কেউ মর্যাদা দিয়ে কথা বলছেন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সেখানে একজন মানুষকে দেখলাম, অতি আন্তরিক। নাম শাইখ সিরাজ। তিনি আমার পথ প্রদর্শক হয়ে গেলেন।

তারপর এক সময় টেলিভিশন রঙিন হলো। প্রাইভেট চ্যানেল হলো। চ্যানেল আইতে শুরু হলো হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠান। সেই শাইখ সিরাজ। সেই আন্তরিকতা, মুখে সেই হাসি, খালি পা, প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুর কাছে নিয়ে এসে কাদাভরা মাঠে নেমে গেছেন। কখনো প্যান্ট ভিজে গেছে পানিতে। তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি। কৃষক আর কৃষাণির কাছে গিয়ে বসেছেন গোয়াল ঘরের পাশে। গল্প করছেন। মুখে হাসি।

শাইখ সিরাজকে প্রথম দেখি সাদাকালো টেলিভিশনে। তখন তার শার্টের রং বুঝতে পারিনি। পরে যখন কালার টেলিভিশন এসেছে তখন দেখেছি। গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে সেই গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট ছাড়া তাকে কখনো অন্য কোনো রঙের শার্ট গায়ে দিতে দেখিনি।

এ মানুষটিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি আরও একটা কারণে। আমাদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম টেলিভিশন। এ মাধ্যম বরাবরই রুপালি জগতের মানুষের দখলে। ঈদে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নিয়ে বিশাল আগ্রহ আমাদের। শোবিজ তারকাদের নিয়ে মাতামাতি। হকচকিয়ে গেলাম টেলিভিশন চ্যানেলে কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠান হচ্ছে দেখে। উপস্থাপন করছেন শ্রদ্ধেয় শাইখ সিরাজ। সেই গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট গায়ে, পরনে ধূসর রঙের গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। খালি পা। প্যান্ট গুটিয়ে রেখেছেন খানিকটা ওপরে। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মাঠে ঘুরছেন। কৃষক-কৃষানিদের সঙ্গে কথা বলছেন। কৃষক-কৃষাণিদের জন্য নানা ধরনের খেলার আয়োজন করা হয়েছে। কলাগাছ পোঁতা আছে। কলাগাছ বেয়ে তরতর করে উঠে যেতে হবে ওপরে। নিচে পানি, ওপরে বাঁশ। সেখানে বসে লড়াই করে টিকে থাকতে হবে। স্বামী-স্ত্রী এসেছেন জোড়ায়-জোড়ায়। নৌকা ভরতি পেয়ারা। স্ত্রী দৌড় দিয়ে গিয়ে নৌকা থেকে দুহাত ভরে পেয়ারা এসে স্বামীর হাতে দিচ্ছেন। স্বামী পেয়ারা ছুড়ে দিচ্ছেন উঁচু বাঁশের মাথায় বাঁধা ঝুড়িতে। নির্ধারিত সময় পরে গুনে দেখা হবে কার ঝুড়িতে মোট কয়টা পেয়ারা জমা হয়েছে।

আহা কী আনন্দ, কী আনন্দ! এর আগে কবে কে এমনভাবে ভেবেছে কৃষক আর কৃষানিদের কথা! তাদেরও বলার কিছু কথা আছে। তাদের জীবনেও ঈদ আসে, অনুভূতি প্রকাশের ইচ্ছা হয়। শাইখ সিরাজ গেলেন তাদের কাছে। তাদের কথা শুনলেন। ঈদের অনুষ্ঠানে যুক্ত করলেন কৃষক-কৃষাণিকে। তারাও হয়ে উঠলেন তারকা। কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানে যারা অংশগ্রহণ করেছেন প্রত্যেককে উপহার প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা খেলায় জিতেছেন তারা টেলিভিশন, বাইসাইকেলের মতো দামি পুরস্কার পেয়েছেন।

শাইখ সিরাজ বিপ্লব ঘটালেন শহরেও। আমরা সবুজের জন্য হাহাকার করি। মাটি স্পর্শ করার জন্য আমাদের অন্তর পোড়ে। আমরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলি। শাইখ সিরাজ নগর কৃষিতে যুক্ত করলেন নতুন মাত্রা। ছাদকৃষিকে আরও জনপ্রিয় করে তুললেন শাইখ সিরাজ। অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে সবজি-ফল-ফুলের গাছ। এখন যে কোনো বাড়ির ছাদে দাঁড়ালেই আশপাশের বাড়ির ছাদে দেখা যায় সবুজ গাছগাছালি। চ্যানেল আইর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠান আরও জনপ্রিয় হলো। উষ্ণায়ন থেকে নগরকে রক্ষা করতে যে উদ্যোগ তার প্রচারেও লেগে গেলেন তিনি। মানুষ যেন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে সে কাজেও ব্যস্ত হলেন। বললেন, যদি ভাড়া বাড়িতে ছাদে জায়গা না পান, একচিলতে বারান্দা থাকে কেবল, তবে সেখানে টবে একটি মরিচ বা লেবুগাছ লাগান।

শাইখ সিরাজ দেখালেন স্বল্প পরিসরে মাছ চাষের বিষয়টিও। যাদের টেলিভিশনে দেখা যায়, তাদের ছোঁয়া যায় না। যেন আকাশের চাঁদ। ভালোবাসা যায়, স্পর্শ করা যায় না। একদিন সেই চাঁদ স্পর্শ করার সুযোগ আমার হয়ে গেল!

তখন শীতকাল। যে নারী আমাকে বিয়ে করেছে, রূপা, সে ছাদে বাগান করেছে। নানাজাতের গাছ আছে সেখানে। একদিন শুনলাম শাইখ সিরাজ আসবেন রূপার ছাদবাগান দেখতে। আমার নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেল। ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়তে থাকল। অদ্ভুত ধরনের নার্ভাস বোধ করতে থাকলাম। কেন জানি না, সারারাত ঘুম হলো না। তিনি এলেন ভোরে। কুয়াশা আচ্ছন্ন ভোর। জানালেন বাসায় আসবেন না। ছাদে কথা বলে চলে যাবেন।

কত কথা জমিয়ে রেখেছি তার সঙ্গে বলব বলে। কখন বলব বুঝতে পারছি না। দৌড়ে ছাদে গেলাম। গাঢ় শ্যাওলা সবুজ রঙের শার্ট গায়ে কুয়াশার ভেতর রূপার ছাদ বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন আমার পথপ্রদর্শক শাইখ সিরাজ। হাতে ছোটখাটো কালো ক্যামেরা।

তিনি কথা বলছেন অতি সাধারণভাবে। যেন নিয়মিত আসেন এখানে; আমাদের সঙ্গে দেখা হয়। এক টেবিলে বসে মাছের কাঁটা বেছে ভাত খেতে খেতে আমরা নিয়মিত গল্প করি। মানুষ মাটি দিয়ে বানানো শুনেছি কিন্তু একজন মানুষ কাদামাটির মতো এমন নরম মনের হতে পারেন তা চোখে দেখলাম। তিনি শাইখ সিরাজ।

হাত দুটি ধরে বললাম, ভাই, আমি অত্যন্ত কাঙাল একজন মানুষ। ভালোবাসা পেলে মিইয়ে যাই। মনে কষ্ট পেলে দুঃখ বাড়ে। আপনি একবার আমাদের বাড়ির ভেতরে চলুন। কাঁসার গ্লাসে পানি রেখেছি, আপনি খাবেন।

শাইখ সিরাজের মুখে হাসি। তার চোখ হাসছে। সেখানে স্নেহভরা। তিনি বললেন, কী করেন আপনি? বললাম, লেখালেখি করি। গল্প লিখি, উপন্যাস লিখি। বেশিরভাগ শিশু-কিশোরদের জন্য। আমাকে অবাক করে দিয়ে শাইখ সিরাজ বললেন, চলুন। তিনি বাসায় এলেন। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসলেন না। ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসলেন। চেয়ারের একপাশ ভাঙা। সেটা যাতে দেখা না যায় সে জন্য আড়াল করে রাখা হয়েছে। শাইখ সিরাজ গিয়ে সেই চেয়ারেই বসেছেন। পেরেক বেরিয়ে ছিল খানিকটা। তিনি আরাম করে চেয়ারে বসে থাকলেন। পানি খেলেন। যখন উঠলেন খেয়াল করলাম চেয়ারের বের হয়ে থাকা পেরেকে তার প্যান্ট বিঁধে ছিঁড়ে যায়নি। বুকের ভেতর আটকে রাখা দম ফস করে ছেড়ে দিলাম। শুধু তাকে কী কী বলতে চেয়েছিলাম সেগুলো ভুলে গেলাম। বলা হলো না।

৭ সেপ্টেম্বর শ্রদ্ধেয় শাইখ সিরাজের জন্মদিন। অন্তর থেকে তার জন্য প্রার্থনা করছি, তিনি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। তাকে ঘিরে থাকুক মানুষের মন। কৃষককে যে মর্যাদা তিনি দিয়েছেন তার সহস্রগুণ মর্যাদায় মর্যাদাবান হোন তিনি। সুখে থাকুন, আনন্দে থাকুন।

দীপু মাহমুদ : কথাসাহিত্যিক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন