নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে স্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে স্বাভাবিক নির্বাচন বলতে বোঝানো হয়েছে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে-সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েরই হোক। শাসক দল ছাড়া অন্যসব রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে মোটামুটি একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত ৪ সেপ্টেম্বর সিলেট-৩ উপনির্বাচনে স্বল্পসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপির কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। রিটার্নিং অফিসারের বক্তব্যের বরাত দিয়ে কোনো কোনো পত্রিকায় বলা হয়, ওই উপনির্বাচনে কম-বেশি ৩০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন।

জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ বিল-২০২১-এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা বলেছেন, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। তারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটাররা যদি ভোটকেন্দ্রে না যান, তাহলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দিয়ে কী হবে? এর আগে জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছিলেন, নির্বাচন নিয়ে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

উপজেলা নির্বাচনেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটারদের আনা যায় না। এটি শুধু নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক। দেশের মানুষ কেন নির্বাচনবিমুখ হয়ে পড়েছে এবং এ বিপজ্জনক অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার প্রথম দুদশকে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। এসব নির্বাচনে দলীয় সরকারগুলো তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে। এসব নির্বাচনে ইসির ভূমিকা ছিল গৌণ, মুখ্য হয়ে উঠেছিল দলীয় সরকারের ভূমিকা।

এসব নির্বাচনের ফল ছিল এক অর্থে পূর্বনির্ধারিত। ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ায় তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। এসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল যথাক্রমে ৫৫.৪, ৭৫.০০, ৭৪.৯৬ ও ৮৭.১৩ শতাংশ।

নির্বাচনের ওপর ভোটারদের ফিরে পাওয়া বিশ্বাস বেশিদিন স্থায়িত্ব পায়নি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের জুনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে বিএনপির শাসনামলে প্রবর্তিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করে। উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর দাবিতে ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সময়কালে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দুর্বার আন্দোলন ও জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের মার্চে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে।

জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা আটটি দল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। এতে ওই নির্বাচন অনেকটা একদলীয় রূপ নেয়।

এ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের গুটিকয়েক সহযোগী দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার ফলে দেশের মোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৭ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান মাত্র ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জন। অন্যরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নেমে আসে ৪০ শতাংশে। এতে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ভোটগ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এসব ঘটেছে। ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন দেশের জনগণ।

নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়ম নিরসনে ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যদিও পরবর্তীকালে ২০১৯ সালের ৮ মার্চ রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ওই নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে অপারগতা স্বীকার করতে দেখা যায়। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই। কী কারণে, কাদের কারণে এগুলো হচ্ছে, কারা দায়ী তা বলারও সুযোগ নেই। একাদশ সাধারণ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মে গণতন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার এখন পর্যন্ত ধোঁয়াশায় রয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ তুলে অন্যতম বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, আট দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং আরও কয়েকটি বিরোধী দল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরপরই অর্থাৎ ২০১৯ সালের শুরুতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়রের শূন্যপদে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। একই বছরের ১০ মার্চ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে গড়ে ভোট পড়ে ৩৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।

কিছুদিন পর বিএনপি উপনির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ শুরু করলেও বর্তমান ইসি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানে যোগ্য নয় এমন যুক্তিতে তারা পুনরায় এসব নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ওই সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত বহাল আছে।

এখন প্রশ্ন হলো-ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে কী করা দরকার? যে বিষয়টিতে জাতীয় মতৈক্য রয়েছে তা হলো, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে। এজন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক. দলীয় সরকারগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, বিশেষ করে দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত এবং ২০১১ সালে বিলুপ্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে জাতীয় নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা যেতে পারে। খ. জাতীয় সংসদ বহাল রেখে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে এমন কোনো দেশে এরূপ ব্যবস্থা নেই। উপরের ‘ক’ ও ‘খ’ প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বা যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে।

গ. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অবসান ঘটিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ২০১৫ সালে যে আইন পাশ করা হয়েছে তা বাতিল করতে হবে এবং এসব প্রতিষ্ঠানে যেসব পদ নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণের বিধান ছিল তা পুনর্বহাল করতে হবে। ঘ. ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে বাস্তবে নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। সেই হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।

দলবাজ কর্মকর্তাদের নির্বাচনের সব কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। ঙ. সংবিধান ও আইনের বিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন এমনভাবে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেবে, যাতে জনগণের মনে বিশ্বাস জন্মে যে, সরকার নয়, কমিশনই নির্বাচন পরিচালনা করছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে এযাবৎ খুব কম নির্বাচন কমিশনই এ কাজটি সঠিকভাবে করতে পেরেছে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে স্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে স্বাভাবিক নির্বাচন বলতে বোঝানো হয়েছে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে-সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েরই হোক। শাসক দল ছাড়া অন্যসব রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে মোটামুটি একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত ৪ সেপ্টেম্বর সিলেট-৩ উপনির্বাচনে স্বল্পসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপির কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। রিটার্নিং অফিসারের বক্তব্যের বরাত দিয়ে কোনো কোনো পত্রিকায় বলা হয়, ওই উপনির্বাচনে কম-বেশি ৩০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন।

জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ বিল-২০২১-এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা বলেছেন, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। তারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটাররা যদি ভোটকেন্দ্রে না যান, তাহলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দিয়ে কী হবে? এর আগে জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছিলেন, নির্বাচন নিয়ে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

উপজেলা নির্বাচনেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটারদের আনা যায় না। এটি শুধু নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক। দেশের মানুষ কেন নির্বাচনবিমুখ হয়ে পড়েছে এবং এ বিপজ্জনক অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার প্রথম দুদশকে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। এসব নির্বাচনে দলীয় সরকারগুলো তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে। এসব নির্বাচনে ইসির ভূমিকা ছিল গৌণ, মুখ্য হয়ে উঠেছিল দলীয় সরকারের ভূমিকা।

এসব নির্বাচনের ফল ছিল এক অর্থে পূর্বনির্ধারিত। ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ায় তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। এসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল যথাক্রমে ৫৫.৪, ৭৫.০০, ৭৪.৯৬ ও ৮৭.১৩ শতাংশ।

নির্বাচনের ওপর ভোটারদের ফিরে পাওয়া বিশ্বাস বেশিদিন স্থায়িত্ব পায়নি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের জুনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে বিএনপির শাসনামলে প্রবর্তিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করে। উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর দাবিতে ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সময়কালে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দুর্বার আন্দোলন ও জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের মার্চে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে।

জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা আটটি দল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। এতে ওই নির্বাচন অনেকটা একদলীয় রূপ নেয়।

এ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের গুটিকয়েক সহযোগী দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার ফলে দেশের মোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৭ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান মাত্র ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জন। অন্যরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নেমে আসে ৪০ শতাংশে। এতে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ভোটগ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এসব ঘটেছে। ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন দেশের জনগণ।

নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়ম নিরসনে ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যদিও পরবর্তীকালে ২০১৯ সালের ৮ মার্চ রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ওই নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে অপারগতা স্বীকার করতে দেখা যায়। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই। কী কারণে, কাদের কারণে এগুলো হচ্ছে, কারা দায়ী তা বলারও সুযোগ নেই। একাদশ সাধারণ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মে গণতন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার এখন পর্যন্ত ধোঁয়াশায় রয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ তুলে অন্যতম বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, আট দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং আরও কয়েকটি বিরোধী দল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরপরই অর্থাৎ ২০১৯ সালের শুরুতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়রের শূন্যপদে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। একই বছরের ১০ মার্চ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে গড়ে ভোট পড়ে ৩৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।

কিছুদিন পর বিএনপি উপনির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ শুরু করলেও বর্তমান ইসি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানে যোগ্য নয় এমন যুক্তিতে তারা পুনরায় এসব নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ওই সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত বহাল আছে।

এখন প্রশ্ন হলো-ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে কী করা দরকার? যে বিষয়টিতে জাতীয় মতৈক্য রয়েছে তা হলো, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে। এজন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক. দলীয় সরকারগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, বিশেষ করে দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত এবং ২০১১ সালে বিলুপ্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে জাতীয় নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা যেতে পারে। খ. জাতীয় সংসদ বহাল রেখে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে এমন কোনো দেশে এরূপ ব্যবস্থা নেই। উপরের ‘ক’ ও ‘খ’ প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বা যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে।

গ. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অবসান ঘটিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ২০১৫ সালে যে আইন পাশ করা হয়েছে তা বাতিল করতে হবে এবং এসব প্রতিষ্ঠানে যেসব পদ নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণের বিধান ছিল তা পুনর্বহাল করতে হবে। ঘ. ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে বাস্তবে নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। সেই হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।

দলবাজ কর্মকর্তাদের নির্বাচনের সব কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। ঙ. সংবিধান ও আইনের বিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন এমনভাবে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেবে, যাতে জনগণের মনে বিশ্বাস জন্মে যে, সরকার নয়, কমিশনই নির্বাচন পরিচালনা করছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে এযাবৎ খুব কম নির্বাচন কমিশনই এ কাজটি সঠিকভাবে করতে পেরেছে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন