ডিজিটাল বিভক্তি কমিয়ে আনাই মূল চ্যালেঞ্জ
jugantor
ডিজিটাল বিভক্তি কমিয়ে আনাই মূল চ্যালেঞ্জ

  মাছুম বিল্লাহ  

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘Literacy for a human-centred recovery : Narrowing the digital divide’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এর অর্থ দাঁড়ায় মানবকেন্দ্রিক মুক্তি লাভের জন্য সাক্ষরতা : ডিজিটাল বিভক্তিকে কমিয়ে আনা। বৈশ্বিক এ মহামারিকালে বিকল্প উপায়ে লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে- দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, মাঝে মাঝে ব্যক্তি উপস্থিতির সঙ্গে ডিজিটাল লার্নিংও পরিচালনা করা হয়েছে।

কিন্তু সাক্ষরতার জন্য এ ধরনের কর্মসূচি সেভাবে পালন করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা দ্রুত দূরশিক্ষণ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে ডিজিটাল বিভক্তি প্রকট আকার ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে যে বৈষম্য নিয়ে বিষয়টি এগোচ্ছিল, সেটি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অপারগতা, বৈদ্যুতিক বিভ্রাট, বিদ্যুৎ স্বল্পতা, সংযোগ সমস্যা, আর্থসামাজিক অবস্থা- এসব ক্ষেত্রে বৈষম্যের দ্বার খুলেছে অনেক। এ বিভক্তি কমানোর দায়িত্ব কার এবং কিভাবে তা কমাতে হবে সেটি নিয়ে ভাবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এবারকার স্লোগানে সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

তবে এর মধ্যেও সুখবর হচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের বিশাল এক জনগোষ্ঠী দ্রুততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিকে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক ভার্চুয়াল জগৎ, যে জগতের সঙ্গে আমাদের, দরিদ্র মানুষের সে ধরনের পরিচিতি ছিল না। যারা এর সঙ্গে তাল এখনো মেলাতে পারেনি তারা ডিজিটালি নিরক্ষর; ডিজিটাল সাক্ষরতা থেকে দূরে থেকেছে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় যারা এ আধুনিক ডিভাইসগুলোর সঙ্গে পরিচিত নন, ব্যবহার করতে হিমশিম খাচ্ছেন কিংবা ব্যবহার করতে পারছেন না, তারা সবাই ডিজিটালি নিরক্ষর।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিভাবে অনলাইন পরীক্ষা চালু করতে পারে সে বিষয়ে একটি অনলাইন সেমিনার ডাকা হয়েছিল আমেরিকান সেন্টার থেকে গত বছরের অক্টোবরে। আমেরিকা থেকে এক প্রফেসর এতে যোগদান করেছেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। আমরা ৫শর মতো অতিথি অপেক্ষা করছি। আধ ঘণ্টা পর যখন তিনি যোগদান করলেন, তখন বললেন, তিনি এখনো এসব ডিভাইসের সঙ্গে পরিচিত নন, শিগ্গির শিখে ফেলবেন। এটিকে আমরা ‘ডিজিটালি ইললিটারেট’ বলতে পারি।

১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের। এ সময়ে বিশ্ব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল যেমন- নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা। শিক্ষা ও নিরক্ষরতা দূরীকরণের ওপরই দেওয়া হয়েছিল গুরুত্ব, যাতে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়।

সাক্ষরতা হচ্ছে সেই সোনালি হাতিয়ার, যার মাধ্যমে একজন মানুষের ক্ষমতায়ন ঘটে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য অর্জিত হয়। নাম লিখতে পারার, নিজের সম্পর্কে লিখতে পারার মধ্যে সাক্ষরতা আর আটকে নেই। ডিজিটাল সভ্যতার এ যুগে সাক্ষরতাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, তা না হলে বৈশ্বিক অগ্রগতি সমতালে তো নয়ই বরং বহু ব্যবধান নিয়ে এগোবে। ডিজিটালি পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে তাদের একটি রিপোর্টে দেখিয়েছিল, ওই বছর প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৮.৪ শতাংশ এবং যেসব শিশু কখনই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি কিংবা যায়নি, তাদের হার প্রায় দুই শতাংশ। এ হারের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়েছে, সারা দেশে ৮-১৪ বছর বয়সি প্রায় ২.৮ মিলিয়ন শিশু রয়েছে, যারা বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছে অর্থাৎ এ অপার সম্ভাবনাময় শিশুরা নিরক্ষর। সরকার বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তবে দারিদ্র্যের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হয় কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা কখনো প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রোগ্রামের (পিইডিপি-৪) আওতায় ‘আউট অফ স্কুল চিলড্রেন প্রোগ্রাম’ এসব শিশুকে দ্বিতীয় সুযোগ হিসাবে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছে। এর আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথমবার ৮-১৪ বছর বয়সি পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার কথা। এ উদ্দেশ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর এনজিওদের সহায়তায় সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করার কথা। সে কাজটি কিন্তু সেভাবে এগোয়নি করোনার কারণে।

বর্তমানে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো দেশের ছয়টি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, সিলেট ও সুনামগঞ্জ) পাইলট প্রোগ্রাম চালাচ্ছে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য। এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ডিসেম্বরে। তবে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির কারণে এটি হয়তো মার্চ ২০২২ পর্যন্ত গড়াবে। তাতে কি আমরা এই শিশু শিক্ষার্থীদের ডিজিটালি সাক্ষর করতে পারব?

অসহায় ও বঞ্চিত পথশিশুদের জন্য রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের আওতায় দেড় শতাধিক উপজেলায় ২২ হাজারেরও বেশি আনন্দ স্কুলে মোট ৬ লাখ ২৪ হাজার ১০৪ জন পথশিশু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের অনেক স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৮ মাসের করোনাকালীন বন্ধে এসব আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। এর অর্থ হচ্ছে, এখানকার শিশুরা যতটুকু সাক্ষরতা অর্জন করেছিল, চর্চার অভাবে তা ভুলে গেছে। অবস্থা স্বাভাবিক হলে এসব শিশুর কত শতাংশ পড়াশোনায় ফিরে আসবে, তা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আবার যারা আসবে তারাও যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে এবং পড়াশোনা বুঝবে, তাও কিন্তু নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন হবে বিশেষ ব্যবস্থা, যা হারিয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া পড়া ও লেখার দক্ষতা উদ্ধারের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি সে ধরনের কোনো ব্যবস্থার কথা শুনছি বা দেখছি?

পথশিশুদের থাকার স্থায়ী জায়গা নেই, নেই বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর, তারা কে কোথায় কেমন আছে- নেই কোনো খবর। এটি এক সামাজিক অনাচার। এ শিশুরা সমাজে এভাবেই বেড়ে উঠছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত অস্থায়ী কিছু বিদ্যালয়ে তারা সাধারণ মানের কিছু শিক্ষা পেত, যা ইতোমধ্যে ভুলে গেছে কোনো কঠিন কাজ করতে গিয়ে। এদের সাক্ষরতা পুনরুদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?

করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী শিশু, যুবক ও বয়স্কদের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাক্ষরতা ও শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্যকে প্রকট করেছে এ মহামারি। বহু দেশ করোনা মোকাবিলায় যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, সেসবের মধ্যে নিরক্ষরদের জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা, সাক্ষরতা ধরে রাখা কিংবা সাক্ষরতা ভুলে না যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে সাক্ষরতা কর্মসূচি নিয়ে কাজ করা অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এটি সত্য, প্রথমে আক্রান্ত মানুষদের বাঁচাতে হবে, যারা সুস্থ আছে তারা যাতে আক্রান্ত না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরা আক্রান্ত না হয়, অন্যদের আক্রান্ত না করে।

দরিদ্র দেশগুলোর অসহায় ও নিুআয়ের মানুষদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। বস্তুত নানা কারণেই শিক্ষা ও শিক্ষার মার্জিনাল পয়েন্ট অর্থাৎ সাক্ষরতার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। যাদের সাক্ষরতার অবস্থান বহু উপরে ছিল, গত ১৭-১৮ মাসে তাদের অনেকেই সেই যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে অর্থাৎ নিরক্ষতার কাতারে শামিল হয়েছে।

৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমি রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অবস্থা জানার জন্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছি। শিক্ষার্থীদের যখন কোনো সাধারণ বিষয় লিখতে বলা হলো, দেখলাম যা তাদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেখার কথা, তা লিখতে কয়েক মিনিট লগিয়ে দিচ্ছে, তারপরও লিখতে পারছে না। আমি বুঝলাম এবং সংশ্লিষ্টরাও বলল, এতদিন লেখার অভ্যাস নেই বলে এ অবস্থা হয়েছে। এটিই আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা।

মাছুম বিল্লাহ : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত; সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও বাউবি শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com

ডিজিটাল বিভক্তি কমিয়ে আনাই মূল চ্যালেঞ্জ

 মাছুম বিল্লাহ 
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘Literacy for a human-centred recovery : Narrowing the digital divide’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এর অর্থ দাঁড়ায় মানবকেন্দ্রিক মুক্তি লাভের জন্য সাক্ষরতা : ডিজিটাল বিভক্তিকে কমিয়ে আনা। বৈশ্বিক এ মহামারিকালে বিকল্প উপায়ে লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে- দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, মাঝে মাঝে ব্যক্তি উপস্থিতির সঙ্গে ডিজিটাল লার্নিংও পরিচালনা করা হয়েছে।

কিন্তু সাক্ষরতার জন্য এ ধরনের কর্মসূচি সেভাবে পালন করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা দ্রুত দূরশিক্ষণ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে ডিজিটাল বিভক্তি প্রকট আকার ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে যে বৈষম্য নিয়ে বিষয়টি এগোচ্ছিল, সেটি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অপারগতা, বৈদ্যুতিক বিভ্রাট, বিদ্যুৎ স্বল্পতা, সংযোগ সমস্যা, আর্থসামাজিক অবস্থা- এসব ক্ষেত্রে বৈষম্যের দ্বার খুলেছে অনেক। এ বিভক্তি কমানোর দায়িত্ব কার এবং কিভাবে তা কমাতে হবে সেটি নিয়ে ভাবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এবারকার স্লোগানে সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

তবে এর মধ্যেও সুখবর হচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের বিশাল এক জনগোষ্ঠী দ্রুততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিকে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক ভার্চুয়াল জগৎ, যে জগতের সঙ্গে আমাদের, দরিদ্র মানুষের সে ধরনের পরিচিতি ছিল না। যারা এর সঙ্গে তাল এখনো মেলাতে পারেনি তারা ডিজিটালি নিরক্ষর; ডিজিটাল সাক্ষরতা থেকে দূরে থেকেছে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় যারা এ আধুনিক ডিভাইসগুলোর সঙ্গে পরিচিত নন, ব্যবহার করতে হিমশিম খাচ্ছেন কিংবা ব্যবহার করতে পারছেন না, তারা সবাই ডিজিটালি নিরক্ষর।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিভাবে অনলাইন পরীক্ষা চালু করতে পারে সে বিষয়ে একটি অনলাইন সেমিনার ডাকা হয়েছিল আমেরিকান সেন্টার থেকে গত বছরের অক্টোবরে। আমেরিকা থেকে এক প্রফেসর এতে যোগদান করেছেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। আমরা ৫শর মতো অতিথি অপেক্ষা করছি। আধ ঘণ্টা পর যখন তিনি যোগদান করলেন, তখন বললেন, তিনি এখনো এসব ডিভাইসের সঙ্গে পরিচিত নন, শিগ্গির শিখে ফেলবেন। এটিকে আমরা ‘ডিজিটালি ইললিটারেট’ বলতে পারি।

১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের। এ সময়ে বিশ্ব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল যেমন- নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা। শিক্ষা ও নিরক্ষরতা দূরীকরণের ওপরই দেওয়া হয়েছিল গুরুত্ব, যাতে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়।

সাক্ষরতা হচ্ছে সেই সোনালি হাতিয়ার, যার মাধ্যমে একজন মানুষের ক্ষমতায়ন ঘটে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য অর্জিত হয়। নাম লিখতে পারার, নিজের সম্পর্কে লিখতে পারার মধ্যে সাক্ষরতা আর আটকে নেই। ডিজিটাল সভ্যতার এ যুগে সাক্ষরতাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, তা না হলে বৈশ্বিক অগ্রগতি সমতালে তো নয়ই বরং বহু ব্যবধান নিয়ে এগোবে। ডিজিটালি পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে তাদের একটি রিপোর্টে দেখিয়েছিল, ওই বছর প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৮.৪ শতাংশ এবং যেসব শিশু কখনই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি কিংবা যায়নি, তাদের হার প্রায় দুই শতাংশ। এ হারের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়েছে, সারা দেশে ৮-১৪ বছর বয়সি প্রায় ২.৮ মিলিয়ন শিশু রয়েছে, যারা বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছে অর্থাৎ এ অপার সম্ভাবনাময় শিশুরা নিরক্ষর। সরকার বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তবে দারিদ্র্যের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হয় কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা কখনো প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রোগ্রামের (পিইডিপি-৪) আওতায় ‘আউট অফ স্কুল চিলড্রেন প্রোগ্রাম’ এসব শিশুকে দ্বিতীয় সুযোগ হিসাবে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছে। এর আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথমবার ৮-১৪ বছর বয়সি পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার কথা। এ উদ্দেশ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর এনজিওদের সহায়তায় সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করার কথা। সে কাজটি কিন্তু সেভাবে এগোয়নি করোনার কারণে।

বর্তমানে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো দেশের ছয়টি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, সিলেট ও সুনামগঞ্জ) পাইলট প্রোগ্রাম চালাচ্ছে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য। এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ডিসেম্বরে। তবে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির কারণে এটি হয়তো মার্চ ২০২২ পর্যন্ত গড়াবে। তাতে কি আমরা এই শিশু শিক্ষার্থীদের ডিজিটালি সাক্ষর করতে পারব?

অসহায় ও বঞ্চিত পথশিশুদের জন্য রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের আওতায় দেড় শতাধিক উপজেলায় ২২ হাজারেরও বেশি আনন্দ স্কুলে মোট ৬ লাখ ২৪ হাজার ১০৪ জন পথশিশু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের অনেক স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৮ মাসের করোনাকালীন বন্ধে এসব আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। এর অর্থ হচ্ছে, এখানকার শিশুরা যতটুকু সাক্ষরতা অর্জন করেছিল, চর্চার অভাবে তা ভুলে গেছে। অবস্থা স্বাভাবিক হলে এসব শিশুর কত শতাংশ পড়াশোনায় ফিরে আসবে, তা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আবার যারা আসবে তারাও যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে এবং পড়াশোনা বুঝবে, তাও কিন্তু নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন হবে বিশেষ ব্যবস্থা, যা হারিয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া পড়া ও লেখার দক্ষতা উদ্ধারের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি সে ধরনের কোনো ব্যবস্থার কথা শুনছি বা দেখছি?

পথশিশুদের থাকার স্থায়ী জায়গা নেই, নেই বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর, তারা কে কোথায় কেমন আছে- নেই কোনো খবর। এটি এক সামাজিক অনাচার। এ শিশুরা সমাজে এভাবেই বেড়ে উঠছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত অস্থায়ী কিছু বিদ্যালয়ে তারা সাধারণ মানের কিছু শিক্ষা পেত, যা ইতোমধ্যে ভুলে গেছে কোনো কঠিন কাজ করতে গিয়ে। এদের সাক্ষরতা পুনরুদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?

করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী শিশু, যুবক ও বয়স্কদের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাক্ষরতা ও শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্যকে প্রকট করেছে এ মহামারি। বহু দেশ করোনা মোকাবিলায় যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, সেসবের মধ্যে নিরক্ষরদের জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা, সাক্ষরতা ধরে রাখা কিংবা সাক্ষরতা ভুলে না যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে সাক্ষরতা কর্মসূচি নিয়ে কাজ করা অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এটি সত্য, প্রথমে আক্রান্ত মানুষদের বাঁচাতে হবে, যারা সুস্থ আছে তারা যাতে আক্রান্ত না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরা আক্রান্ত না হয়, অন্যদের আক্রান্ত না করে।

দরিদ্র দেশগুলোর অসহায় ও নিুআয়ের মানুষদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। বস্তুত নানা কারণেই শিক্ষা ও শিক্ষার মার্জিনাল পয়েন্ট অর্থাৎ সাক্ষরতার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। যাদের সাক্ষরতার অবস্থান বহু উপরে ছিল, গত ১৭-১৮ মাসে তাদের অনেকেই সেই যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে অর্থাৎ নিরক্ষতার কাতারে শামিল হয়েছে।

৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমি রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অবস্থা জানার জন্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছি। শিক্ষার্থীদের যখন কোনো সাধারণ বিষয় লিখতে বলা হলো, দেখলাম যা তাদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেখার কথা, তা লিখতে কয়েক মিনিট লগিয়ে দিচ্ছে, তারপরও লিখতে পারছে না। আমি বুঝলাম এবং সংশ্লিষ্টরাও বলল, এতদিন লেখার অভ্যাস নেই বলে এ অবস্থা হয়েছে। এটিই আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা।

মাছুম বিল্লাহ : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত; সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও বাউবি শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন