পুঁজিবাজার নিয়ে সাবধানে কথা বলা উচিত
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
পুঁজিবাজার নিয়ে সাবধানে কথা বলা উচিত

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে অনেকেই অনেক ধরনের কথাবার্তা বলে থাকেন। অনেকেই আবার যেনতেনভাবে যা খুশি বলে ফেলেন। অথচ আমাদের সবারই জানা আছে, বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর পুঁজিবাজারই অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি স্থান। এখানে যখন-তখন যা খুশি বলার সুযোগ নেই। কারণ তা করা হলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের অত্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিচার করা হবে! পুঁজিবাজারকে একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডও বলা হয়ে থাকে। একটি দেশের পুঁজিবাজার শক্তিশালী মানেই সে দেশটির অর্থনীতিও শক্তিশালী। অর্থনৈতিক শক্তি বা দুর্বলতার ব্যারোমিটার বলতে পুঁজিবাজারকেই বোঝায়।

বর্তমান অবস্থায় আমাদের দেশের পুঁজিবাজার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং নেপালের পুঁজিবাজার সেসব দেশের জিডিপিতে যে পরিমাণ অবদান রাখে, আমাদের দেশের পুঁজিবাজার তার ধারেকাছেও নেই। পুঁজিবাজার নিয়ে আমাদের দেশের একশ্রেণির মানুষ সব সময় নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন এবং এ বিষয়ে তারা অপপ্রচারও চালান। যদিও ওই শ্রেণির ব্যক্তি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন বা সেখানে ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসান গুনেছেন, তেমনটিও নয়। শুধু অন্যদের সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে দেখে বা কেউ অন্য ব্যবসা অপেক্ষা ব্যবসা হিসাবে পুঁজিবাজারকে বেছে নিয়েছেন-এমনটি দেখেও অনেকে নাক সিটকান। অথচ এটি একটি হালাল ব্যবসা। কারণ এখানে লাভ-লোকসান আছে। তাছাড়া ইসলামি শরিয়া আইনের দেশ সৌদি আরবের রিয়াদ স্টক এক্সচেঞ্জ পৃথিবীর অন্যতম নামকরা একটি পুঁজিবাজার।

যাক সে কথা। আমাদের দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আলোচনা করাই আমার আজকের লেখাটি উদ্দেশ্য বিধায় সেই বিষয়ে ফিরে আসি। আমাদের দেশ এখনো বেকার সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষিত যুবক সেই কাতারে শামিল হচ্ছেন। অধিক জনসংখ্যার এই দেশটিতে এসব শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশই প্রতিবছর কর্মহীন অবস্থায় থেকে যায়। সরকারি-বেসরকারি কোনো ক্ষেত্রেই তাদের কর্মসংস্থান সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় এসব বেকার জনগোষ্ঠীর একটি অংশের পুঁজিবাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক ইত্যাদিতে কাজ খুঁজে পেয়েছেন। আর পুঁজিবাজারের বিকাশের সঙ্গেই এসব জনগোষ্ঠীর পরিবারের রুটিরুজির প্রশ্নটি জড়িত। তাছাড়া যেসব শিক্ষিত যুবক চাকরি নামক সোনার হরিণের সন্ধান পাননি, তাদের অনেকেই কিছু সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে বা পারিবারিক কিছু সঞ্চয় থাকলে তা নিয়ে পুঁজিবাজারে ব্যবসায় শুরু করেছেন। অধিকন্তু আমাদের দেশের এক কোটির অধিক প্রবাসী, যারা নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের একটি অংশকেও এ বাজারে বিনিয়োগ করতে দেখা যায়। আবার বিদেশ থেকে সরাসরিও তাদের অনেকে বিনিয়োগ করে থাকেন। সৌদি আরবে কর্মরত রবিউল নামক এমন একজন প্রবাসীকে আমি জানি ও চিনি। এভাবে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেকেই সরাসরি অনলাইনে ট্রেডিং করে থাকেন। এদেশের অনেক গৃহবধূ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার একটি অংশও তাদের সঞ্চয়ের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। আর বতর্মান অবস্থায় ব্যাংকের সঞ্চয়ী আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সে সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছে।

এ তো গেল এক ধরনের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর কথা। এবার মাঝারি বা বড় বিনিয়োগকারীদের কথাও বলা প্রয়োজন। এমন অনেককে জানি বা চিনি, যাদের অনেকে পঞ্চাশ ষাট বা তদূর্র্ধ্ব বয়সে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে ভালো অঙ্কের অর্থের মালিক হয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা অবসরে গিয়ে এককালীন উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আনুতোষিক পেয়েছেন, তাদের অনেকে সেসব অর্থের একটি অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। আবার অনেক মাঝারি বা বড় ব্যবসায়ীও তাদের ব্যবসায়ের টাকা অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের জুতসই বা অনুকূল পরিবেশ না পেয়ে তাদের ব্যবসা পুঁজিবাজারমুখী করে ফেলেছেন। আর বলা বাহুল্য, তাদের এসব বিনিয়োগ কোনো বেআইনি বা অবৈধ কার্যক্রম নয়। সুতরাং সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী এসব ব্যবসায়ীকে সুরক্ষা প্রদানসহ তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করা উচিত। অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতো তাদেরও সম্মানের চোখে দেখা উচিত। কারণ আগেই উল্লেখ করেছি, পুঁজিবাজারের ব্যবসা সম্পূর্ণ হালাল এবং কোনোভাবে কোনো আইনেই তা অবৈধ বা আইনবহির্ভূত ব্যবসা নয়। অথচ এ ব্যবসা বা ব্যবসায়ীদের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখে থাকেন বা ফটকা ব্যবসায়ী ইত্যাদি বলে থাকেন। এটা তাদের অভ্যাস বা এ বিষয়ে তাদের যথেষ্ট শিক্ষার অভাব বলেই মনে করি। কারণ ফটকা ব্যবসায়ী বললে এক্ষেত্রে অনেককেই তা বলা যায়। যেমন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের নামে যারা ওভার ইনভয়েসিং-আন্ডার ইনভয়েসিং করে টাকা রোজগার করেন বা বিদেশে টাকা পাচার করেন, নিঃসন্দেহে তারা ফটকা ব্যবসায়ী। উদাহরণ দিলে এখানে আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে; কিন্তু আমার মনে হয় তার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ দেশের মানুষ সব জানেন এবং বোঝেন। আমি শুধু পুঁজিবাজারের ব্যবসা নিয়ে যারা উন্নাসিকতা প্রকাশ করেন, তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতেই বিষয়টির অবতারণা করলাম।

পুঁজিবাজার নিয়ে আজকের লেখাটি লিখতে গিয়ে এতৎসংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সম্পর্কেও কিছু বলা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। কারণ এ সরকারি সংস্থা দুটি পুঁজিবাজারের ভালো-মন্দ নিয়ে কী করছেন সে বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতঃপূর্বে বিএসইসির একজন চেয়ারম্যান পর পর দুই দফা এক্সটেনশন নিয়ে অর্থাৎ তৃতীয় মেয়াদ পর্যন্ত চেয়ারটি আঁকড়ে রেখে কী করে গিয়েছেন আমরা সবাই তা জানি। সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান কী করছেন সে বিষয়টিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গতস্য শোচনা নাস্তি! আর সে দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান চেয়ারম্যানের কার্যকলাপকে ‘So far so good’ কথাটি বলাই যায়। কারণ তার আগমনের পর গৃহীত বিভিন্ন কার্যকলাপে পুঁজিবাজার অনেকটাই গতিশীল হয়েছে। তবে সে তুলনায় ডিএসই গতিশীল হয়েছে বা অধিকতর কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সে কথা বলা চলে না। কারণ এ লেখাটি লেখার জন্য কয়দিন আগে, আমি ডিএসই’র কোম্পানি ইনফরমেশন পেজে গিয়ে অনেক কোম্পানিরই ইনফরমেশন আপডেট দেখতে পেলাম না। যেমন BATBC কোম্পানির ৩০ জুন ২০২১ তারিখে সমাপ্ত ২য় প্রান্তিকের লাভ-লোকসান, ইপিএস ইত্যাদি কোনোকিছুই এ সেপ্টেম্বরেও হালনাগাদ করা হয়নি। লেখার প্রয়োজনে এ বিষয়ে কোম্পানিটির কোম্পানি সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিও নিস্পৃহতা প্রদর্শন করলেন। বোঝা গেল, এ বিষয়ে ডিএসই চোখ বন্ধ করে থাকে বলে এসব কোম্পানিও এক ধরনের ইনডেমনিটি ভোগ করে। অন্যথায় জুনে সমাপ্ত প্রান্তিকের ইনফরমেশন প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এতদিনে পার হয়ে গেলেও তা না করে ডিএসই এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারত না। এক্ষেত্রে অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়েছে বলে মনে করি। এখানে আরও একটি ঘটনার উদাহরণ দেওয়া প্রয়োজন। আর তা হলো, বিএসইসি কর্তৃক প্রদত্ত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি। আমার নিজ জেলা পাবনার একজন বিনিয়োগকারী ফোন করে জানালেন, ‘রিং সাইন’ কোম্পানির বিষয়ে বিএসইসির একটি প্রেস রিলিজে ভালো সংবাদ দেখে কেনার পরই দাম কমে গেল! আপনারা লেখালেখি করেন, বিষয়টি একটু দেখবেন? ভদ্রলোক আমার খুব কাছের ব্যক্তি বলে আমি সঙ্গে সঙ্গেই কোম্পানিটির ইনফরমেশন পেজে গিয়ে দেখলাম, সেখানকার প্রেস রিলিজের লাল হরফে 'New' লেখা শব্দটি লাফানো অবস্থায় দেখানো হচ্ছে! আর প্রেস রিলিজে বলা হয়েছে, অনিয়মকারী আগের মালিকরা টাকা পরিশোধ না করে শেয়ার গ্রহণ করায় তাদের শাস্তি দেওয়া হবে এবং টাকাও আদায় করা হবে! তাছাড়া কোম্পানিটি এখন উৎপাদনে গিয়ে ভালো করছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দেখে মনে হলো, সত্যিই তো ভালো খবর, তাহলে শেয়ার দর ১৫/৫০ টাকা থেকে ১৪ টাকায় নেমে গেল কেন? প্রেস রিলিজে যেহেতু চেয়ারম্যানের রেফারেন্স আছে, তাই এ বিষয়ে তাকে ফোন করায় তিনি বললেন, ‘আগের মালিকদের অবৈধ সব শেয়ার বাতিল করা হবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, কবে তা করা হবে? জুন মাসে প্রেস রিলিজ দিয়ে লাল হরফের শব্দটির লাফালাফিতে বিনিয়োগকারীদের অবস্থা কী হবে সে বিষয়টি ভাবা হচ্ছে না কেন? আমার মনে হয়, এ নিয়ে আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। বিএসইসি’র চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলেই আমার ধারণা।

পরিশেষে ভুল তথ্য দিয়ে একটি লেখাসংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই। গত ২৮ আগস্ট দেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় একজন স্বনামধন্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষক লিখেছেন, ‘ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে ডিএসই-সিএসইর সূচক’। ২৩ আগস্ট ডিএসই সূচক ছিল ৬ হাজার ৮৬২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হয়েছে! কিন্তু তার লেখায় উল্লিখিত তথ্যটি ভুল। কারণ অতীতে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইর সূচক ছিল ৮৯১৮ দশমিক ৫১। আর সেদিন লেনদেন হয়েছিল ৩২৪৯ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। সুতরাং সূচক ও লেনদেন সংক্রান্ত দুটি তথ্যই তার লেখায় ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। হতে পারে তিনি কোনো ভুল খবরের ওপর ভিত্তি করে লেখাটি লিখেছেন। তিনি সেই ভুল খবরটিকে যাচাই করে অর্থাৎ ইন্টারনেটে একটু সার্চ দিয়ে যদি লেখাটি লিখতেন তাহলে হয়তো এমনটি হতো না। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। তিনি যেহেতু একজন অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফলে বেশির ভাগ লোকই তার কথা বিশ্বাস করেছেন। আর শেয়ারবাজারের পেছনে লেগে থাকার একশ্রেণির লোক তো আছেই! ২০১০ সালের পর আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা কতগুণ বেশি হয়েছে তা আমাদের সবারই জানা। আর এ সময়ের মধ্যে লিস্টেড কোম্পানির সংখ্যাও কতগুণ বেড়েছে তাও আমরা জানি। আর সে অবস্থায় ১১ বছর আগে প্রায় ৯ হাজারে পৌঁছা সূচক এতদিনে ১৮ হাজারে পৌঁছা উচিত বলেই মনে হয়। কারণ এতদিনে বাজার মূলধনও কয়েক লাখ কোটি টাকা বেড়ে যাওয়া উচিত। অতএব, সবকিছু বিবেচনা করে পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক কোনোকিছু বলার আগে আমাদের দশবার ভাবা উচিত। কারণ দেশ সবদিক থেকে অগ্রসর হয়েছে এবং হচ্ছে, পুঁজিবাজার পিছিয়ে থাকবে এমনটি ভাবা ঠিক নয়।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

পুঁজিবাজার নিয়ে সাবধানে কথা বলা উচিত

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে অনেকেই অনেক ধরনের কথাবার্তা বলে থাকেন। অনেকেই আবার যেনতেনভাবে যা খুশি বলে ফেলেন। অথচ আমাদের সবারই জানা আছে, বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর পুঁজিবাজারই অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি স্থান। এখানে যখন-তখন যা খুশি বলার সুযোগ নেই। কারণ তা করা হলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের অত্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিচার করা হবে! পুঁজিবাজারকে একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডও বলা হয়ে থাকে। একটি দেশের পুঁজিবাজার শক্তিশালী মানেই সে দেশটির অর্থনীতিও শক্তিশালী। অর্থনৈতিক শক্তি বা দুর্বলতার ব্যারোমিটার বলতে পুঁজিবাজারকেই বোঝায়।

বর্তমান অবস্থায় আমাদের দেশের পুঁজিবাজার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং নেপালের পুঁজিবাজার সেসব দেশের জিডিপিতে যে পরিমাণ অবদান রাখে, আমাদের দেশের পুঁজিবাজার তার ধারেকাছেও নেই। পুঁজিবাজার নিয়ে আমাদের দেশের একশ্রেণির মানুষ সব সময় নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন এবং এ বিষয়ে তারা অপপ্রচারও চালান। যদিও ওই শ্রেণির ব্যক্তি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন বা সেখানে ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসান গুনেছেন, তেমনটিও নয়। শুধু অন্যদের সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে দেখে বা কেউ অন্য ব্যবসা অপেক্ষা ব্যবসা হিসাবে পুঁজিবাজারকে বেছে নিয়েছেন-এমনটি দেখেও অনেকে নাক সিটকান। অথচ এটি একটি হালাল ব্যবসা। কারণ এখানে লাভ-লোকসান আছে। তাছাড়া ইসলামি শরিয়া আইনের দেশ সৌদি আরবের রিয়াদ স্টক এক্সচেঞ্জ পৃথিবীর অন্যতম নামকরা একটি পুঁজিবাজার।

যাক সে কথা। আমাদের দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আলোচনা করাই আমার আজকের লেখাটি উদ্দেশ্য বিধায় সেই বিষয়ে ফিরে আসি। আমাদের দেশ এখনো বেকার সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষিত যুবক সেই কাতারে শামিল হচ্ছেন। অধিক জনসংখ্যার এই দেশটিতে এসব শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশই প্রতিবছর কর্মহীন অবস্থায় থেকে যায়। সরকারি-বেসরকারি কোনো ক্ষেত্রেই তাদের কর্মসংস্থান সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় এসব বেকার জনগোষ্ঠীর একটি অংশের পুঁজিবাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক ইত্যাদিতে কাজ খুঁজে পেয়েছেন। আর পুঁজিবাজারের বিকাশের সঙ্গেই এসব জনগোষ্ঠীর পরিবারের রুটিরুজির প্রশ্নটি জড়িত। তাছাড়া যেসব শিক্ষিত যুবক চাকরি নামক সোনার হরিণের সন্ধান পাননি, তাদের অনেকেই কিছু সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে বা পারিবারিক কিছু সঞ্চয় থাকলে তা নিয়ে পুঁজিবাজারে ব্যবসায় শুরু করেছেন। অধিকন্তু আমাদের দেশের এক কোটির অধিক প্রবাসী, যারা নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের একটি অংশকেও এ বাজারে বিনিয়োগ করতে দেখা যায়। আবার বিদেশ থেকে সরাসরিও তাদের অনেকে বিনিয়োগ করে থাকেন। সৌদি আরবে কর্মরত রবিউল নামক এমন একজন প্রবাসীকে আমি জানি ও চিনি। এভাবে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেকেই সরাসরি অনলাইনে ট্রেডিং করে থাকেন। এদেশের অনেক গৃহবধূ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার একটি অংশও তাদের সঞ্চয়ের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। আর বতর্মান অবস্থায় ব্যাংকের সঞ্চয়ী আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সে সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছে।

এ তো গেল এক ধরনের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর কথা। এবার মাঝারি বা বড় বিনিয়োগকারীদের কথাও বলা প্রয়োজন। এমন অনেককে জানি বা চিনি, যাদের অনেকে পঞ্চাশ ষাট বা তদূর্র্ধ্ব বয়সে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে ভালো অঙ্কের অর্থের মালিক হয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা অবসরে গিয়ে এককালীন উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আনুতোষিক পেয়েছেন, তাদের অনেকে সেসব অর্থের একটি অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। আবার অনেক মাঝারি বা বড় ব্যবসায়ীও তাদের ব্যবসায়ের টাকা অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের জুতসই বা অনুকূল পরিবেশ না পেয়ে তাদের ব্যবসা পুঁজিবাজারমুখী করে ফেলেছেন। আর বলা বাহুল্য, তাদের এসব বিনিয়োগ কোনো বেআইনি বা অবৈধ কার্যক্রম নয়। সুতরাং সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী এসব ব্যবসায়ীকে সুরক্ষা প্রদানসহ তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করা উচিত। অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতো তাদেরও সম্মানের চোখে দেখা উচিত। কারণ আগেই উল্লেখ করেছি, পুঁজিবাজারের ব্যবসা সম্পূর্ণ হালাল এবং কোনোভাবে কোনো আইনেই তা অবৈধ বা আইনবহির্ভূত ব্যবসা নয়। অথচ এ ব্যবসা বা ব্যবসায়ীদের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখে থাকেন বা ফটকা ব্যবসায়ী ইত্যাদি বলে থাকেন। এটা তাদের অভ্যাস বা এ বিষয়ে তাদের যথেষ্ট শিক্ষার অভাব বলেই মনে করি। কারণ ফটকা ব্যবসায়ী বললে এক্ষেত্রে অনেককেই তা বলা যায়। যেমন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের নামে যারা ওভার ইনভয়েসিং-আন্ডার ইনভয়েসিং করে টাকা রোজগার করেন বা বিদেশে টাকা পাচার করেন, নিঃসন্দেহে তারা ফটকা ব্যবসায়ী। উদাহরণ দিলে এখানে আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে; কিন্তু আমার মনে হয় তার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ দেশের মানুষ সব জানেন এবং বোঝেন। আমি শুধু পুঁজিবাজারের ব্যবসা নিয়ে যারা উন্নাসিকতা প্রকাশ করেন, তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতেই বিষয়টির অবতারণা করলাম।

পুঁজিবাজার নিয়ে আজকের লেখাটি লিখতে গিয়ে এতৎসংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সম্পর্কেও কিছু বলা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। কারণ এ সরকারি সংস্থা দুটি পুঁজিবাজারের ভালো-মন্দ নিয়ে কী করছেন সে বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতঃপূর্বে বিএসইসির একজন চেয়ারম্যান পর পর দুই দফা এক্সটেনশন নিয়ে অর্থাৎ তৃতীয় মেয়াদ পর্যন্ত চেয়ারটি আঁকড়ে রেখে কী করে গিয়েছেন আমরা সবাই তা জানি। সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান কী করছেন সে বিষয়টিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গতস্য শোচনা নাস্তি! আর সে দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান চেয়ারম্যানের কার্যকলাপকে ‘So far so good’ কথাটি বলাই যায়। কারণ তার আগমনের পর গৃহীত বিভিন্ন কার্যকলাপে পুঁজিবাজার অনেকটাই গতিশীল হয়েছে। তবে সে তুলনায় ডিএসই গতিশীল হয়েছে বা অধিকতর কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সে কথা বলা চলে না। কারণ এ লেখাটি লেখার জন্য কয়দিন আগে, আমি ডিএসই’র কোম্পানি ইনফরমেশন পেজে গিয়ে অনেক কোম্পানিরই ইনফরমেশন আপডেট দেখতে পেলাম না। যেমন BATBC কোম্পানির ৩০ জুন ২০২১ তারিখে সমাপ্ত ২য় প্রান্তিকের লাভ-লোকসান, ইপিএস ইত্যাদি কোনোকিছুই এ সেপ্টেম্বরেও হালনাগাদ করা হয়নি। লেখার প্রয়োজনে এ বিষয়ে কোম্পানিটির কোম্পানি সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিও নিস্পৃহতা প্রদর্শন করলেন। বোঝা গেল, এ বিষয়ে ডিএসই চোখ বন্ধ করে থাকে বলে এসব কোম্পানিও এক ধরনের ইনডেমনিটি ভোগ করে। অন্যথায় জুনে সমাপ্ত প্রান্তিকের ইনফরমেশন প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এতদিনে পার হয়ে গেলেও তা না করে ডিএসই এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারত না। এক্ষেত্রে অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়েছে বলে মনে করি। এখানে আরও একটি ঘটনার উদাহরণ দেওয়া প্রয়োজন। আর তা হলো, বিএসইসি কর্তৃক প্রদত্ত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি। আমার নিজ জেলা পাবনার একজন বিনিয়োগকারী ফোন করে জানালেন, ‘রিং সাইন’ কোম্পানির বিষয়ে বিএসইসির একটি প্রেস রিলিজে ভালো সংবাদ দেখে কেনার পরই দাম কমে গেল! আপনারা লেখালেখি করেন, বিষয়টি একটু দেখবেন? ভদ্রলোক আমার খুব কাছের ব্যক্তি বলে আমি সঙ্গে সঙ্গেই কোম্পানিটির ইনফরমেশন পেজে গিয়ে দেখলাম, সেখানকার প্রেস রিলিজের লাল হরফে 'New' লেখা শব্দটি লাফানো অবস্থায় দেখানো হচ্ছে! আর প্রেস রিলিজে বলা হয়েছে, অনিয়মকারী আগের মালিকরা টাকা পরিশোধ না করে শেয়ার গ্রহণ করায় তাদের শাস্তি দেওয়া হবে এবং টাকাও আদায় করা হবে! তাছাড়া কোম্পানিটি এখন উৎপাদনে গিয়ে ভালো করছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দেখে মনে হলো, সত্যিই তো ভালো খবর, তাহলে শেয়ার দর ১৫/৫০ টাকা থেকে ১৪ টাকায় নেমে গেল কেন? প্রেস রিলিজে যেহেতু চেয়ারম্যানের রেফারেন্স আছে, তাই এ বিষয়ে তাকে ফোন করায় তিনি বললেন, ‘আগের মালিকদের অবৈধ সব শেয়ার বাতিল করা হবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, কবে তা করা হবে? জুন মাসে প্রেস রিলিজ দিয়ে লাল হরফের শব্দটির লাফালাফিতে বিনিয়োগকারীদের অবস্থা কী হবে সে বিষয়টি ভাবা হচ্ছে না কেন? আমার মনে হয়, এ নিয়ে আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। বিএসইসি’র চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলেই আমার ধারণা।

পরিশেষে ভুল তথ্য দিয়ে একটি লেখাসংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই। গত ২৮ আগস্ট দেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় একজন স্বনামধন্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষক লিখেছেন, ‘ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে ডিএসই-সিএসইর সূচক’। ২৩ আগস্ট ডিএসই সূচক ছিল ৬ হাজার ৮৬২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হয়েছে! কিন্তু তার লেখায় উল্লিখিত তথ্যটি ভুল। কারণ অতীতে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইর সূচক ছিল ৮৯১৮ দশমিক ৫১। আর সেদিন লেনদেন হয়েছিল ৩২৪৯ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। সুতরাং সূচক ও লেনদেন সংক্রান্ত দুটি তথ্যই তার লেখায় ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। হতে পারে তিনি কোনো ভুল খবরের ওপর ভিত্তি করে লেখাটি লিখেছেন। তিনি সেই ভুল খবরটিকে যাচাই করে অর্থাৎ ইন্টারনেটে একটু সার্চ দিয়ে যদি লেখাটি লিখতেন তাহলে হয়তো এমনটি হতো না। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। তিনি যেহেতু একজন অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফলে বেশির ভাগ লোকই তার কথা বিশ্বাস করেছেন। আর শেয়ারবাজারের পেছনে লেগে থাকার একশ্রেণির লোক তো আছেই! ২০১০ সালের পর আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা কতগুণ বেশি হয়েছে তা আমাদের সবারই জানা। আর এ সময়ের মধ্যে লিস্টেড কোম্পানির সংখ্যাও কতগুণ বেড়েছে তাও আমরা জানি। আর সে অবস্থায় ১১ বছর আগে প্রায় ৯ হাজারে পৌঁছা সূচক এতদিনে ১৮ হাজারে পৌঁছা উচিত বলেই মনে হয়। কারণ এতদিনে বাজার মূলধনও কয়েক লাখ কোটি টাকা বেড়ে যাওয়া উচিত। অতএব, সবকিছু বিবেচনা করে পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক কোনোকিছু বলার আগে আমাদের দশবার ভাবা উচিত। কারণ দেশ সবদিক থেকে অগ্রসর হয়েছে এবং হচ্ছে, পুঁজিবাজার পিছিয়ে থাকবে এমনটি ভাবা ঠিক নয়।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন