এক নিভৃতচারী শেখ রেহানা
jugantor
জন্মদিনের শুভেচ্ছা
এক নিভৃতচারী শেখ রেহানা

  সালাহউদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু  

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ রেহেনা

বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ তনয়া শেখ রেহানা। একজন নিভৃতচারী। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও অতিসাধারণ। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও সক্রিয় রাজনীতির সম্মুখ সারিতে আসেননি তিনি। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে আড়াল রাখার মধ্য দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন নিভৃত গৃহকোণ। তার যে নির্মোহ জীবনাচারের পরিচয় পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। তিনি মূলধারার রাজনীতিতে কখনো যুক্ত হতে আগ্রহী নন। তবে তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হলেও জনহৈতিষী ও জনকল্যাণকর কাজে সর্বদা নিরলসভাবে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছেন। শেখ রেহানা অসীম সাহস ও সক্ষমতার পরিচয় দেখিয়ে অনেক স্থানে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। পারিবারিক শিক্ষা, বিশেষ করে মায়ের দেওয়া শিক্ষা, ধৈর্য, সাহস, বিচক্ষণতা, অধ্যবসায়, ত্যাগ ও নির্লোভতা তার চলার পথকে সুগম করেছে। সততার কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত শেখ রেহানা তার নিজের নামে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ২০০ কোটি টাকা মূল্যমানের ঢাকার ধানমন্ডির ৬ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাড়িটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের জন্য উৎসর্গ করেন।

শেখ রেহানা একজন সাধারণের মতোই জীবনযাপন করেন। কখনো তিনি অহংকারী মনোবৃত্তি পোষণ করেননি। তিনি মানুষকে প্রগাঢ়ভাবে আদর, মমতা ও ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতে পারেন। দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন নীরবে-নিভৃতে। সংগ্রাম করে যাচ্ছেন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, সুযোগ্য মায়ের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি। মা ফজিলাতুন নেছা মুজিব পর্দার অন্তরালে থেকে বঙ্গবন্ধুকে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। যার অনুপ্রেরণায় শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছিলেন। আর এখন পর্দার অন্তরালে বড় বোন শেখ হাসিনাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শেখ রেহানার ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই শান্তির আলোকবর্তিকা হাতে বিশ্বময় খ্যাতি অর্জন করেছেন শেখ হাসিনা। শেখ রেহানা বেগম মুজিবের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন তার কর্মে এবং যোগ্যতার মাপকাঠিতে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিপৎসংকুল পর্যায়গুলোয় আগলে রাখেন ও সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন। শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানার মধ্যে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ছায়া দেখতে পান। শেখ রেহানা ছাড়া শেখ হাসিনা পরিপূর্ণ নন। শেখ রেহানার জীবনালেখ্য নিয়ে হয়তো বেশি কিছু জানা যায়নি, তবে তার জীবনের গভীরতা অনুধাবন করা যায় ব্যাপকভাবে। আওয়ামী লীগের তিনি কোনো নেতা না হলেও দলের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে তিনি যেন আশা-ভরসার স্থান। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। সেসময় শেখ হাসিনার মুক্তির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে শেখ রেহানা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়াও ১৯৭৯ সালের ১০ মে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত সর্ব ইউরোপীয় বাকশালের এক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল; কিন্তু ভারত থেকে সুদূর সুইডেনে গিয়ে সম্মেলনে যোগদান করা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তখন নেতারা শেখ হাসিনার প্রতিনিধিত্ব করতে শেখ রেহানাকে অনুরোধ করেন। শেখ হাসিনাও টেলিফোনে ছোট বোনকে সম্মেলনে যেতে নিদের্শনা প্রদান করলে শেখ রেহানা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে শেখ হাসিনার প্রেরিত বাণী পাঠ করেন। এটিই ছিল শেখ রেহানার কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে প্রথম বক্তব্য। আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনিই প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে পঁচাত্তরের ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছিলেন।

শেখ রেহানা ১৯৫৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা যখন বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন তিনি বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে জার্মানির কার্লসরুইয়ে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। অতঃপর সেখান থেকে ভারতে চলে যান দুই বোন। শেখ রেহানা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে নিরাপত্তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় যুক্তরাজ্যে বঙ্গবন্ধুর ফুপাতো ভাই মোমিনুল হক খোকা চাচা ও ফুপা জেনারেল মোস্তাফিজ থাকায় সেখানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বিমানের ভাড়া না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিষয়টি জানতে পেরে তিনি টিকিটের টাকা শেখ রেহানার কাছে পাঠালে তিনি তাদের প্রিয় খোকা চাচার কাছে লন্ডনে চলে যান। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার পর থেকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু তিনি।

১৯৭৪ সালে পারিবারিকভাবে শেখ রেহানা ও ড. শফিকের বিবাহের পাকা কথা হয়েছিল। শেখ রেহানা জার্মানি থেকে ফিরে আসার পর বিবাহের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর তার দেশে যাওয়া হয়নি। ড. শফিক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সে সুবাদে তিনি পিএইচডি করার জন্য ব্রিটেনের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত ছিলেন। ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে লন্ডনের কিলবার্নে খোকা চাচার বাড়িতে ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকের সঙ্গে শেখ রেহানার বিবাহ সম্পন্ন হয়। শেখ রেহানার বিবাহে বোন শেখ হাসিনা টিকিটের টাকা জোগাড় করতে পারেননি বলে অনুপস্থিত ছিলেন। বিবাহের পর শফিক সিদ্দিক ও শেখ রেহানাকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হয়েছে। বিবাহের পরপরই স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে। আর্থিক অনটনের কারণে একক বাড়ি ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য তাদের ছিল না। সেসময় আর্থিক কষ্ট ছিল প্রবল।

কণ্টকপূর্ণ ছিল শেখ রেহানার জীবন। তারুণ্যের উষালগ্নে যখন তার উচ্ছলতার স্রোতে ভেসে যাওয়ার কথা, তখনই তাকে হোঁচট খেতে হয়েছে। জীবনের বিস্তীর্ণ পথ তাকে লড়াই করে কাটাতে হয়েছে। বিবাহের পর শফিক সিদ্দিক ও শেখ রেহানাকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সংগ্রাম করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়। কষ্টের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহের দৃষ্টান্ত হিসাবে তিনি পাথেয় হয়ে থাকবেন। শেখ রেহানা পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর দুর্বিষহ জীবনযাপন করেছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি জয় করে তিনি নিজের সন্তানদের সুশিক্ষিত ও রাজনীতিসচেতন করে গড়ে তুলেছেন। তার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. শফিক। শেখ রেহানা দম্পতির এক ছেলে, দুই মেয়ে রয়েছে। তিনি একজন রত্নগর্ভা মা বটে। জ্যেষ্ঠ কন্যা রেজওয়ানা সিদ্দিক টিউলিপ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির এমপি। কনিষ্ঠ কন্যা আজমিনা সিদ্দিক অবন্তি লন্ডনে কন্ট্রোল রিস্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল রিস্ক অ্যানালাইসিস সম্পাদক। পুত্রসন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত।

শেখ রেহানা দলীয় পরিমণ্ডলে ছোট আপা হিসাবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। আজ তার ৬৭তম জন্মদিনে জানাই অপার শ্রদ্ধা।

লেখক: রাজনীতিক

জন্মদিনের শুভেচ্ছা

এক নিভৃতচারী শেখ রেহানা

 সালাহউদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু 
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শেখ রেহেনা
শেখ রেহানা একজন সাধারণের মতোই জীবনযাপন করেন, কখনো তিনি অহংকারী মনোবৃত্তি পোষণ করেননি

বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ তনয়া শেখ রেহানা। একজন নিভৃতচারী। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও অতিসাধারণ। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও সক্রিয় রাজনীতির সম্মুখ সারিতে আসেননি তিনি। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে আড়াল রাখার মধ্য দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন নিভৃত গৃহকোণ। তার যে নির্মোহ জীবনাচারের পরিচয় পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। তিনি মূলধারার রাজনীতিতে কখনো যুক্ত হতে আগ্রহী নন। তবে তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হলেও জনহৈতিষী ও জনকল্যাণকর কাজে সর্বদা নিরলসভাবে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছেন। শেখ রেহানা অসীম সাহস ও সক্ষমতার পরিচয় দেখিয়ে অনেক স্থানে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। পারিবারিক শিক্ষা, বিশেষ করে মায়ের দেওয়া শিক্ষা, ধৈর্য, সাহস, বিচক্ষণতা, অধ্যবসায়, ত্যাগ ও নির্লোভতা তার চলার পথকে সুগম করেছে। সততার কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত শেখ রেহানা তার নিজের নামে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ২০০ কোটি টাকা মূল্যমানের ঢাকার ধানমন্ডির ৬ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাড়িটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের জন্য উৎসর্গ করেন।

শেখ রেহানা একজন সাধারণের মতোই জীবনযাপন করেন। কখনো তিনি অহংকারী মনোবৃত্তি পোষণ করেননি। তিনি মানুষকে প্রগাঢ়ভাবে আদর, মমতা ও ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতে পারেন। দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন নীরবে-নিভৃতে। সংগ্রাম করে যাচ্ছেন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, সুযোগ্য মায়ের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি। মা ফজিলাতুন নেছা মুজিব পর্দার অন্তরালে থেকে বঙ্গবন্ধুকে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। যার অনুপ্রেরণায় শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছিলেন। আর এখন পর্দার অন্তরালে বড় বোন শেখ হাসিনাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শেখ রেহানার ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই শান্তির আলোকবর্তিকা হাতে বিশ্বময় খ্যাতি অর্জন করেছেন শেখ হাসিনা। শেখ রেহানা বেগম মুজিবের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন তার কর্মে এবং যোগ্যতার মাপকাঠিতে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিপৎসংকুল পর্যায়গুলোয় আগলে রাখেন ও সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন। শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানার মধ্যে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ছায়া দেখতে পান। শেখ রেহানা ছাড়া শেখ হাসিনা পরিপূর্ণ নন। শেখ রেহানার জীবনালেখ্য নিয়ে হয়তো বেশি কিছু জানা যায়নি, তবে তার জীবনের গভীরতা অনুধাবন করা যায় ব্যাপকভাবে। আওয়ামী লীগের তিনি কোনো নেতা না হলেও দলের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে তিনি যেন আশা-ভরসার স্থান। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। সেসময় শেখ হাসিনার মুক্তির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে শেখ রেহানা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়াও ১৯৭৯ সালের ১০ মে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত সর্ব ইউরোপীয় বাকশালের এক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল; কিন্তু ভারত থেকে সুদূর সুইডেনে গিয়ে সম্মেলনে যোগদান করা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তখন নেতারা শেখ হাসিনার প্রতিনিধিত্ব করতে শেখ রেহানাকে অনুরোধ করেন। শেখ হাসিনাও টেলিফোনে ছোট বোনকে সম্মেলনে যেতে নিদের্শনা প্রদান করলে শেখ রেহানা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে শেখ হাসিনার প্রেরিত বাণী পাঠ করেন। এটিই ছিল শেখ রেহানার কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে প্রথম বক্তব্য। আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনিই প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে পঁচাত্তরের ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছিলেন।

শেখ রেহানা ১৯৫৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা যখন বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন তিনি বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে জার্মানির কার্লসরুইয়ে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। অতঃপর সেখান থেকে ভারতে চলে যান দুই বোন। শেখ রেহানা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে নিরাপত্তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় যুক্তরাজ্যে বঙ্গবন্ধুর ফুপাতো ভাই মোমিনুল হক খোকা চাচা ও ফুপা জেনারেল মোস্তাফিজ থাকায় সেখানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বিমানের ভাড়া না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিষয়টি জানতে পেরে তিনি টিকিটের টাকা শেখ রেহানার কাছে পাঠালে তিনি তাদের প্রিয় খোকা চাচার কাছে লন্ডনে চলে যান। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার পর থেকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু তিনি।

১৯৭৪ সালে পারিবারিকভাবে শেখ রেহানা ও ড. শফিকের বিবাহের পাকা কথা হয়েছিল। শেখ রেহানা জার্মানি থেকে ফিরে আসার পর বিবাহের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর তার দেশে যাওয়া হয়নি। ড. শফিক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সে সুবাদে তিনি পিএইচডি করার জন্য ব্রিটেনের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত ছিলেন। ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে লন্ডনের কিলবার্নে খোকা চাচার বাড়িতে ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকের সঙ্গে শেখ রেহানার বিবাহ সম্পন্ন হয়। শেখ রেহানার বিবাহে বোন শেখ হাসিনা টিকিটের টাকা জোগাড় করতে পারেননি বলে অনুপস্থিত ছিলেন। বিবাহের পর শফিক সিদ্দিক ও শেখ রেহানাকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হয়েছে। বিবাহের পরপরই স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে। আর্থিক অনটনের কারণে একক বাড়ি ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য তাদের ছিল না। সেসময় আর্থিক কষ্ট ছিল প্রবল।

কণ্টকপূর্ণ ছিল শেখ রেহানার জীবন। তারুণ্যের উষালগ্নে যখন তার উচ্ছলতার স্রোতে ভেসে যাওয়ার কথা, তখনই তাকে হোঁচট খেতে হয়েছে। জীবনের বিস্তীর্ণ পথ তাকে লড়াই করে কাটাতে হয়েছে। বিবাহের পর শফিক সিদ্দিক ও শেখ রেহানাকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সংগ্রাম করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়। কষ্টের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহের দৃষ্টান্ত হিসাবে তিনি পাথেয় হয়ে থাকবেন। শেখ রেহানা পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর দুর্বিষহ জীবনযাপন করেছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি জয় করে তিনি নিজের সন্তানদের সুশিক্ষিত ও রাজনীতিসচেতন করে গড়ে তুলেছেন। তার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. শফিক। শেখ রেহানা দম্পতির এক ছেলে, দুই মেয়ে রয়েছে। তিনি একজন রত্নগর্ভা মা বটে। জ্যেষ্ঠ কন্যা রেজওয়ানা সিদ্দিক টিউলিপ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির এমপি। কনিষ্ঠ কন্যা আজমিনা সিদ্দিক অবন্তি লন্ডনে কন্ট্রোল রিস্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল রিস্ক অ্যানালাইসিস সম্পাদক। পুত্রসন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত।

শেখ রেহানা দলীয় পরিমণ্ডলে ছোট আপা হিসাবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। আজ তার ৬৭তম জন্মদিনে জানাই অপার শ্রদ্ধা।

লেখক: রাজনীতিক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন