ওষুধ পরিণত হয়েছে লাভজনক পণ্যে!
jugantor
ওষুধ পরিণত হয়েছে লাভজনক পণ্যে!

  ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ  

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর যেসব রোগে আক্রান্ত হই তার অনেকগুলোর প্রতিরোধ বা প্রতিকারে ওষুধের প্রয়োজন নেই-এ কথাটি আমাদের অধিকাংশ চিকিৎসক মানতে নারাজ। তাদের মতো অনেকেরই ধারণা- All ills need pills (সব রোগে ওষুধ দরকার)। বর্তমান বিশ্বের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মুনাফার হাতিয়ার হিসাবে ওষুধকে নিছক পণ্য হিসাবে গণ্য করে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জনে নেমেছে বিশ্বের ওষুধ কোম্পানিগুলো।

কিন্তু ওষুধের ক্ষতিকর ও প্রাণঘাতী প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যেক বিশেষজ্ঞ, প্রগতিবাদী চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, বিজ্ঞানী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকে ‘No pill for every ill’ (সব রোগে ওষুধের প্রয়োজন নেই) শীর্ষক স্লোগানটি সর্বজনীনভাবে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।

প্রতিনিয়তই আমার মনে কতগুলো প্রশ্নের উদয় হয়। রোগাক্রান্ত রোগীদের জন্য আমাদের চিকিৎসকরা প্রতিদিন, প্রতিমাসে বা প্রতিবছর গড়ে কী পরিমাণ প্রেসক্রিপশন লিখে থাকেন, প্রেসক্রিপশনে সর্বনিু বা সর্বোচ্চ কয়টি ওষুধ লিখে থাকেন, প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধের কয়টি প্রয়োজনীয়, কয়টি অপ্রয়োজনীয়, কয়টি নিরাপদ বা কয়টি বিপজ্জনক। অথবা আমরা নিজেরাই প্রেসক্রিপশন ছাড়া যত ওষুধ কিনে সেবন করি বা গ্রহণ করি, তার কয়টি প্রয়োজনীয় বা নিরাপদ।

অন্যদিকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া নির্বিচারে ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যে হারে সারা দেশে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক ওষুধ বেচাকেনা হচ্ছে তা দেখার বা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব প্রশাসন বা সরকার নিচ্ছে না কেন। শত চেষ্টা করেও আমি এসব প্রশ্নের উত্তর পাইনি। পাওয়া হয়তো সম্ভবও নয়। কারণ আমাদের দেশে এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা প্রকাশে সংশ্লিষ্টদের কোনো আগ্রহ নেই, ব্যবস্থাও নেই।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য আমি কিছু গবেষণা ও জরিপ চালিয়েছি। তবে তা দেশের ভয়াবহ সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে অতি নগণ্য। উন্নত বিশ্বে এসব বিষয়ের ওপর গবেষণা হয়, জরিপ হয়, তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত এবং সময়মতো প্রচার মাধ্যমগুলোতে তা প্রচারিতও হয়।

মেডিকেল নিউজ টুডের সূত্রমতে ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকরা তাদের রোগীর জন্য ৪২০ কোটি প্রেসক্রিপশন লিখেছিলেন। হিসাব করে দেখা গেছে, গড়ে মাথাপিছু ১৩টি প্রেসক্রিপশন লেখা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রতিমাসে প্রতিজনের জন্য একটি করে নতুন প্রেসক্রিপশন। কিন্তু এত বিশালসংখ্যক প্রেসক্রিপশনে কী পরিমাণ ওষুধ লেখা হয়েছিল তার হিসাব পাওয়া যায়নি।

তবে যুক্তরাজ্যে প্রত্যেক নাগরিক তাদের জীবদ্দশায় গড়ে প্রায় ১৪ হাজার প্রেসক্রিপশন ড্রাগ গ্রহণ করে থাকেন। ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার) ড্রাগ ধরা হলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাজার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সারা জীবনে যে বিশাল পরিমাণ ওষুধ সেবন করি, শরীর তা কীভাবে গ্রহণ করে বা মানবদেহে এসব ওষুধের প্রভাব কীরকম হতে পারে? এসব প্রশ্নের জবাব প্রায়ই সুখকর হয় না।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ওষুধ জীবন রক্ষাকারী বস্তু। কার্যকর ও নিরাপদ ওষুধের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর লক্ষ-কোটি মানুষ অসংখ্য জটিল ও দুরারোগ্য রোগ থেকে মুক্তিলাভ করছে। তাই আধুনিক ওষুধের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু পাশাপাশি এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাপী প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে রোগীদের যেসব ওষুধ প্রদান করা হয় তার বিরাট একটি অংশজুড়ে থাকে হয় ভুল, অপ্রয়োজনীয় নতুবা মারাত্মক বিপজ্জনক ওষুধ।

চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে যখন ওষুধ লিখে থাকেন, তখন তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। তাদের নিশ্চিত হতে হয় যে, প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধটি নিরাপদ ও কার্যকর। কারণ ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাবের চেয়ে উপকারিতা ও উপযোগিতা রোগীর শারীরিক নিরাপত্তার জন্য বিশেষ আবশ্যক। এ রিস্ক-বেনিফিট রেশিও বা অনুপাতের কথা চিকিৎসকরা অনেক ক্ষেত্রে বুঝে উঠতে পারেন না বা বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হন বলে রোগীকে ভুগতে হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়, এমনকি মৃত্যুবরণও করতে হয়ে।

যেসব ওষুধ কিনতে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন লাগে, সেগুলোকে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ হিসাবে অবিহিত করা হয়। মাত্রাতিরিক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া এবং মিথস্ক্রিয়ার (Drug Interaction) কারণে প্রেসক্রিপশন ড্রাগকে পশ্চিমা বিশ্বে সাক্ষাৎ যমদূতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ রোগী প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অযাচিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে মারা যায়। ওইসব ওষুধ প্রয়োগে সতর্ক হলে বা প্রয়োগ না করা হলে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হয়তো অতি সহজে এড়ানো যেত।

আমরা সবাই জানি ও মানি এবং আমি আগেই বলেছি, চিকিৎসকদের সুচিন্তিত সুচিকিৎসার জন্য আমরা আরোগ্য লাভে অনেক ক্ষেত্রেই সুফল পেয়ে থাকি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা অনেকেই জানি না যে, চিকিৎসার জন্য রোগীকে প্রদত্ত ওষুধের কারণে সৃষ্টি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়াকে নতুন রোগ হিসাবে আখ্যায়িত করে চিকিৎসকরা তার প্রতিকারে ও প্রতিরোধে দ্বিতীয়বার ভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করে থাকেন।

দ্বিতীয়বার প্রদত্ত ওষুধ যে রোগীর জন্য নিরাপদ হবে তারও নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে রোগীকে অকারণে একাধিকবার ভুগতে হয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য হাসপাতালে থাকতে হয়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে মরতেও হয়। এসব পরিস্থিতিতে প্রয়োজন চিকিৎসকের সুচিন্তিত ও অভিজ্ঞ সিদ্ধান্ত। প্রথমে প্রদত্ত ওষুধ নিরাপদ নয় বলে প্রতীয়মান হলে চিকিৎসককে অবশ্যই সেই ওষুধের মাত্রা কমাতে হবে, দরকার হলে সেই ওষুধ প্রত্যাহার করে নিতে হবে, নতুবা নিরাপদ বিকল্প ওষুধ প্রদান করার কথা ভাবতে হবে।

ওষুধের কারণে সৃষ্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে পারকিনসনিজম, যৌন অক্ষমতা, অনিদ্রা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও জটিল মানসিক রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিপজ্জনক অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হৃদরোগ, রক্তক্ষরণ, স্ট্রোক, অঙ্গহানি বা বিকলঙ্গতা, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস অন্যতম।

অনিদ্রা, অবসাদ, পেটের ব্যথা, দুশ্চিন্তা, ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, মৃদু ডায়বেটিসজাতীয় সমস্যাগুলো প্রতিরোধ বা প্রতিকারে ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পন্থার কথা কি আমাদের চিকিৎসকরা গুরুত্বসহকারে কখনো ভাবেন, না আমরা নিজেরা ভাবি? বিশ্বব্যাপী ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকরা ডিপ্রেশন বা অবসাদকে মহা ভয়ংকর রোগ হিসাবে আখ্যায়িত করে লক্ষ-কোটি টাকার ওষুধ আবিষ্কার, উৎপাদন, বিপণন ও প্রেসক্রাইব করছেন।

কিন্তু আসলেই অবসাদগ্রস্ততা কি কোনো জটিল রোগ, যার জন্য শত রকমের ওষুধের দরকার হবে? প্রিয় পাঠক, আপনারা হয়তো জানেন না, বিশ্বে লাখ লাখ রোগীকে অবসাদের ক্ষতিকর ওষুধ প্রদান করার কারণে তারা আরও অবসাদগ্রস্ত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন, নতুবা অন্যান্য জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

আরও একটি সমস্যার কথা বলি। কেউ যদি প্রচুর ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার ও জাঙ্কফুড খেয়ে এবং শারীরিক পরিশ্রম না করে মোটা হয়ে যায়, তাকে কোন যুক্তিতে ওষুধ দিয়ে ওজন কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়? বরং কম ক্যালরি গ্রহণ, জাঙ্কফুড বর্জন ও প্রচুর শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ওজন কমানোর পরামর্শ দেওয়াটা কি অধিক যুক্তিযুক্ত ও নিরাপদ নয়?

যুক্তরাষ্ট্রে মুটিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসমস্যা মোকাবিলায় ২০০৩ সালে ১১৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়; কিন্তু কাজের কাজ বেশি কিছু হয়নি। উলটো ওজন কমানোর ওষুধগুলোর কারণে বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কোনো বয়স্ক রোগীর যদি একাধিক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা বা রোগ থাকে, তাহলে তাকে একাধিক ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ইডিমা, কোলেস্টেরলের আধিক্য, অস্টিওপোরোসিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, অবসাদগ্রস্ততা বা উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের ৬ থেকে ৯টি ওষুধ প্রদান করা জরুরি বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত অনেক রোগীকে ১২ থেকে ১৫টি ওষুধ প্রদান করতে দেখা যায়।

চিকিৎসকের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব রোগীর প্রদত্ত সব ওষুধই প্রয়োজনীয়। এসব ক্ষেত্রে ওষুধের সংখ্যা নিয়ে বির্তকের অবকাশ না থাকলেও এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়া নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক ও যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। এমন হওয়া বিচিত্র নয় যে, এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে, এমনকি রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

তাই যারা এত বেশিসংখ্যক ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন, তাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনোরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককে জানাতে হবে। এ সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্য একটি কেস স্টাডি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব। এটি কাল্পনিক নয়, সত্য ঘটনা।

এক বয়স্ক রোগী উচ্চরক্তচাপ, করোনারি রক্তনালির সমস্যা, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা), কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউর, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, আলসার ও কাশিতে ভুগছিলেন। প্রত্যেক রোগের জন্য রোগীকে আলাদা-আলাদাভাবে সর্বসাকুল্যে ১২টি ওষুধ প্রদান করা হয়েছিল। ওষুধের মধ্যে ছিল-উচ্চরক্তচাপের জন্য মেটোপ্রোলল, ডাইইউরেটিক ফ্রুসেমাইড, কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউরের জন্য ডিজিটালিস, রক্তজমাট প্রতিরোধ করার জন্য ওয়ারফেরিন, অ্যাসপিরিন, কোলেস্টেরল কমানোর জন্য অ্যাটরভ্যাস্টেটিন, আর্থ্রাইটিসের ব্যথা-বেদনা উপশমের জন্য সেলেকক্সিব, মানসিক দুশ্চিন্তার জন্য প্যারোক্সেটিন, ঘুমের জন্য ডায়াজেপাম, গায়ের ব্যথার জন্য আইবোপ্রোফেন, কাশির জন্য কফমিকচার এবং অ্যান্টিবায়োটিক লেভোফ্লক্সাসিন। এতগুলো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়ার কারণে একদিন রোগী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে দেখতে পান, ওষুধগুলোর বেশ কয়েকটি একে অপরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

অসংগতিগুলো অতি সহজে বর্ণনা করা যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, সেলেকক্সিব ও আইবোপ্রোফেন একসঙ্গে দেওয়া ঠিক হয়নি। কারণ বর্ণিত প্রতিটি ওষুধ এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে পাকস্থলি ও অন্ত্রে আলসার তৈরি করতে পারে, যা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক ঘটনা। রোগীর ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ ঘটেছিল। রক্তজমাট বন্ধ করার ওষুধ ওয়ারফেরিন ও অ্যান্টিবায়োটিক লেভোফ্লক্সাসিন কোনোমতেই একসঙ্গে দেওয়া যাবে না। এ দুটো ওষুধের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার কারণে রক্তক্ষরণের মতো মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। কারণ ওয়ারফেরিন ও লেভোফ্লক্সাসিন মিথস্ক্রিয়ার কারণে রক্তে প্রোথ্রোম্বিনের পরিমাণ কমে গেলে রক্ত জমাট বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে রোগীর মৃত্যু হতে পারত। এছাড়াও লেভোফ্লক্সাসিন রক্তে এনজাইমের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে ফেলার কারণে অ্যাসপিরিন মেটাবলিজমে (রাসায়নিক রূপান্তর) বিঘ্ন ঘটিয়েছিল।

বিশ্বব্যাপী জরিপে দেখা যায়-অজ্ঞতাবশত প্রেসক্রিপশনে একাধিক ওষুধ প্রদানের কারণে ড্রাগ-ইন্টারঅ্যাকশন বা মিথস্ক্রিয়ায় বহু রোগী হয়তো মারা যায় নতুবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গৃহীত একাধিক ওষুধ একই মেটাবলিক গতিপথ ব্যবহার করে বলে এক ওষুধের সঙ্গে অন্য ওষুধের প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। ফলে রক্তে এক বা একাধিক ওষুধের পরিমাণ বা মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে বেড়ে যায়। ওষুধ যত বেশি সময় রক্ত বা শরীরে অবস্থান করবে, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও সমভাবে বেড়ে যাবে। এ পরিস্থিতি কোনোমতেই কাম্য নয়।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভয়ংকর সংক্রামক রোগ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, অভাবনীয় দ্রুতগতিতে প্রতিবছর গড়ে একটি করে নতুন রোগ আবির্ভূত হচ্ছে, যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের সবার কাছে অত্যন্ত পরিচিত ওষুধ। অ্যান্টিবায়োটিক এমনই একটি ওষুধ, যার অপব্যবহার, অতি বেশি অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কোনোরকমেই কাম্য নয়। অথচ বিশ্বজুড়ে উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বিচার অপব্যবহার চলে আসছে।

চিকিৎসকরা অনেক সময় জেনেশুনেই যুক্তিহীনভাবে তাদের প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে থাকেন। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে খুব কম চিকিৎসকই পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেন। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য তারা একই প্রেসক্রিপশনে একাধিক পদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করে থাকেন। প্রদত্ত একাধিক পদের অ্যান্টিবায়োটিকের একটিও কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর নাও হতে পারে। উলটো জীবাণু এসব অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি অতি সহজে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে উঠতে পারে।

নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক অপপ্রয়োগের ফলে জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যপ্রণালিকে অকার্যকর বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের নতুন স্ট্রেইনে রূপান্তরিত করে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে নিষ্ফল করে দেয়। জীবাণুর এ রেজিস্ট্যান্ট স্ট্রেইন আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে কাবু না হয়ে বহাল তবিয়তে জীবদেহে অবস্থান ও বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। এ অবস্থায় রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। তখন চিকিৎসকরা বিকল্প ওষুধ ও চিকিৎসার অভাবে অসহায় হয়ে পড়েন।

উন্নত বিশ্বে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ কিনতে হলে প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন বাধ্যতামূলক। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওসব দেশে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ কেনা রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন ড্রাগের ওপর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রেসক্রিপশন ড্রাগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার জন্য সরকারের কাছে আমি বহুবার সুপারিশ করেছি। এটি করা গেলে ওষুধের নির্বিচার অপব্যবহার অনেকাংশে কমে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

ওষুধ প্রস্তুতকারক, ওষুধ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকরা রোগীকে সব সময় সব তথ্য বা পরামর্শ দিতে পারেন না। অনেক সময় পর্যাপ্ত তথ্য প্রদানের সময় থাকে না, বা সময় থাকলেও ইচ্ছা করেই সব তথ্য বা পরামর্শ প্রদানের প্রয়োজন মনে করেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী চিকিৎসকদের কাছে যথাযথ গুরুত্ব পান না। অনেক সময় আবার চিকিৎসকরা রোগীর অসুবিধার কথা, বিশেষ করে ওষুধ গ্রহণের ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা আমলে নেন না।

সম্প্রতি রয়টার্স হেলথ সার্ভিস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫০ জন রোগী, যারা কোলেস্টেরল কমানোর জন্য স্ট্যাটিন গ্রুপের ওষুধ গ্রহণ করেন, তাদের অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন, তাদের চিকিৎসকরা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে অবহিত হওয়ার পরও আমলে নেননি।

অনেক চিকিৎসক আমলে নিলেও রোগীকে ভ্রান্তভাবে বলেছেন, ওষুধের সঙ্গে বর্ণিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে রোগী বা তার পরিচর্যাকারীকে ওষুধ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য অবশ্যই জানতে হবে। ওষুধ সম্পর্কে এসব প্রয়োজনীয় তথ্য না জানলে ওষুধ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষতি যা হওয়ার তা সম্পূর্ণ রোগীরই হবে। তাহলে রোগী যাবে কোথায়?

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

drmuniruddin@gmail.com

ওষুধ পরিণত হয়েছে লাভজনক পণ্যে!

 ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ 
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর যেসব রোগে আক্রান্ত হই তার অনেকগুলোর প্রতিরোধ বা প্রতিকারে ওষুধের প্রয়োজন নেই-এ কথাটি আমাদের অধিকাংশ চিকিৎসক মানতে নারাজ। তাদের মতো অনেকেরই ধারণা- All ills need pills (সব রোগে ওষুধ দরকার)। বর্তমান বিশ্বের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মুনাফার হাতিয়ার হিসাবে ওষুধকে নিছক পণ্য হিসাবে গণ্য করে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জনে নেমেছে বিশ্বের ওষুধ কোম্পানিগুলো।

কিন্তু ওষুধের ক্ষতিকর ও প্রাণঘাতী প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যেক বিশেষজ্ঞ, প্রগতিবাদী চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, বিজ্ঞানী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকে ‘No pill for every ill’ (সব রোগে ওষুধের প্রয়োজন নেই) শীর্ষক স্লোগানটি সর্বজনীনভাবে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।

প্রতিনিয়তই আমার মনে কতগুলো প্রশ্নের উদয় হয়। রোগাক্রান্ত রোগীদের জন্য আমাদের চিকিৎসকরা প্রতিদিন, প্রতিমাসে বা প্রতিবছর গড়ে কী পরিমাণ প্রেসক্রিপশন লিখে থাকেন, প্রেসক্রিপশনে সর্বনিু বা সর্বোচ্চ কয়টি ওষুধ লিখে থাকেন, প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধের কয়টি প্রয়োজনীয়, কয়টি অপ্রয়োজনীয়, কয়টি নিরাপদ বা কয়টি বিপজ্জনক। অথবা আমরা নিজেরাই প্রেসক্রিপশন ছাড়া যত ওষুধ কিনে সেবন করি বা গ্রহণ করি, তার কয়টি প্রয়োজনীয় বা নিরাপদ।

অন্যদিকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া নির্বিচারে ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যে হারে সারা দেশে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক ওষুধ বেচাকেনা হচ্ছে তা দেখার বা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব প্রশাসন বা সরকার নিচ্ছে না কেন। শত চেষ্টা করেও আমি এসব প্রশ্নের উত্তর পাইনি। পাওয়া হয়তো সম্ভবও নয়। কারণ আমাদের দেশে এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা প্রকাশে সংশ্লিষ্টদের কোনো আগ্রহ নেই, ব্যবস্থাও নেই।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য আমি কিছু গবেষণা ও জরিপ চালিয়েছি। তবে তা দেশের ভয়াবহ সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে অতি নগণ্য। উন্নত বিশ্বে এসব বিষয়ের ওপর গবেষণা হয়, জরিপ হয়, তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত এবং সময়মতো প্রচার মাধ্যমগুলোতে তা প্রচারিতও হয়।

মেডিকেল নিউজ টুডের সূত্রমতে ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকরা তাদের রোগীর জন্য ৪২০ কোটি প্রেসক্রিপশন লিখেছিলেন। হিসাব করে দেখা গেছে, গড়ে মাথাপিছু ১৩টি প্রেসক্রিপশন লেখা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রতিমাসে প্রতিজনের জন্য একটি করে নতুন প্রেসক্রিপশন। কিন্তু এত বিশালসংখ্যক প্রেসক্রিপশনে কী পরিমাণ ওষুধ লেখা হয়েছিল তার হিসাব পাওয়া যায়নি।

তবে যুক্তরাজ্যে প্রত্যেক নাগরিক তাদের জীবদ্দশায় গড়ে প্রায় ১৪ হাজার প্রেসক্রিপশন ড্রাগ গ্রহণ করে থাকেন। ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার) ড্রাগ ধরা হলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাজার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সারা জীবনে যে বিশাল পরিমাণ ওষুধ সেবন করি, শরীর তা কীভাবে গ্রহণ করে বা মানবদেহে এসব ওষুধের প্রভাব কীরকম হতে পারে? এসব প্রশ্নের জবাব প্রায়ই সুখকর হয় না।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ওষুধ জীবন রক্ষাকারী বস্তু। কার্যকর ও নিরাপদ ওষুধের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর লক্ষ-কোটি মানুষ অসংখ্য জটিল ও দুরারোগ্য রোগ থেকে মুক্তিলাভ করছে। তাই আধুনিক ওষুধের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু পাশাপাশি এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাপী প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে রোগীদের যেসব ওষুধ প্রদান করা হয় তার বিরাট একটি অংশজুড়ে থাকে হয় ভুল, অপ্রয়োজনীয় নতুবা মারাত্মক বিপজ্জনক ওষুধ।

চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে যখন ওষুধ লিখে থাকেন, তখন তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। তাদের নিশ্চিত হতে হয় যে, প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধটি নিরাপদ ও কার্যকর। কারণ ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাবের চেয়ে উপকারিতা ও উপযোগিতা রোগীর শারীরিক নিরাপত্তার জন্য বিশেষ আবশ্যক। এ রিস্ক-বেনিফিট রেশিও বা অনুপাতের কথা চিকিৎসকরা অনেক ক্ষেত্রে বুঝে উঠতে পারেন না বা বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হন বলে রোগীকে ভুগতে হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়, এমনকি মৃত্যুবরণও করতে হয়ে।

যেসব ওষুধ কিনতে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন লাগে, সেগুলোকে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ হিসাবে অবিহিত করা হয়। মাত্রাতিরিক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া এবং মিথস্ক্রিয়ার (Drug Interaction) কারণে প্রেসক্রিপশন ড্রাগকে পশ্চিমা বিশ্বে সাক্ষাৎ যমদূতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ রোগী প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অযাচিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে মারা যায়। ওইসব ওষুধ প্রয়োগে সতর্ক হলে বা প্রয়োগ না করা হলে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হয়তো অতি সহজে এড়ানো যেত।

আমরা সবাই জানি ও মানি এবং আমি আগেই বলেছি, চিকিৎসকদের সুচিন্তিত সুচিকিৎসার জন্য আমরা আরোগ্য লাভে অনেক ক্ষেত্রেই সুফল পেয়ে থাকি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা অনেকেই জানি না যে, চিকিৎসার জন্য রোগীকে প্রদত্ত ওষুধের কারণে সৃষ্টি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়াকে নতুন রোগ হিসাবে আখ্যায়িত করে চিকিৎসকরা তার প্রতিকারে ও প্রতিরোধে দ্বিতীয়বার ভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করে থাকেন।

দ্বিতীয়বার প্রদত্ত ওষুধ যে রোগীর জন্য নিরাপদ হবে তারও নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে রোগীকে অকারণে একাধিকবার ভুগতে হয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য হাসপাতালে থাকতে হয়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে মরতেও হয়। এসব পরিস্থিতিতে প্রয়োজন চিকিৎসকের সুচিন্তিত ও অভিজ্ঞ সিদ্ধান্ত। প্রথমে প্রদত্ত ওষুধ নিরাপদ নয় বলে প্রতীয়মান হলে চিকিৎসককে অবশ্যই সেই ওষুধের মাত্রা কমাতে হবে, দরকার হলে সেই ওষুধ প্রত্যাহার করে নিতে হবে, নতুবা নিরাপদ বিকল্প ওষুধ প্রদান করার কথা ভাবতে হবে।

ওষুধের কারণে সৃষ্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে পারকিনসনিজম, যৌন অক্ষমতা, অনিদ্রা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও জটিল মানসিক রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিপজ্জনক অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হৃদরোগ, রক্তক্ষরণ, স্ট্রোক, অঙ্গহানি বা বিকলঙ্গতা, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস অন্যতম।

অনিদ্রা, অবসাদ, পেটের ব্যথা, দুশ্চিন্তা, ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, মৃদু ডায়বেটিসজাতীয় সমস্যাগুলো প্রতিরোধ বা প্রতিকারে ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পন্থার কথা কি আমাদের চিকিৎসকরা গুরুত্বসহকারে কখনো ভাবেন, না আমরা নিজেরা ভাবি? বিশ্বব্যাপী ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকরা ডিপ্রেশন বা অবসাদকে মহা ভয়ংকর রোগ হিসাবে আখ্যায়িত করে লক্ষ-কোটি টাকার ওষুধ আবিষ্কার, উৎপাদন, বিপণন ও প্রেসক্রাইব করছেন।

কিন্তু আসলেই অবসাদগ্রস্ততা কি কোনো জটিল রোগ, যার জন্য শত রকমের ওষুধের দরকার হবে? প্রিয় পাঠক, আপনারা হয়তো জানেন না, বিশ্বে লাখ লাখ রোগীকে অবসাদের ক্ষতিকর ওষুধ প্রদান করার কারণে তারা আরও অবসাদগ্রস্ত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন, নতুবা অন্যান্য জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

আরও একটি সমস্যার কথা বলি। কেউ যদি প্রচুর ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার ও জাঙ্কফুড খেয়ে এবং শারীরিক পরিশ্রম না করে মোটা হয়ে যায়, তাকে কোন যুক্তিতে ওষুধ দিয়ে ওজন কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়? বরং কম ক্যালরি গ্রহণ, জাঙ্কফুড বর্জন ও প্রচুর শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ওজন কমানোর পরামর্শ দেওয়াটা কি অধিক যুক্তিযুক্ত ও নিরাপদ নয়?

যুক্তরাষ্ট্রে মুটিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসমস্যা মোকাবিলায় ২০০৩ সালে ১১৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়; কিন্তু কাজের কাজ বেশি কিছু হয়নি। উলটো ওজন কমানোর ওষুধগুলোর কারণে বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কোনো বয়স্ক রোগীর যদি একাধিক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা বা রোগ থাকে, তাহলে তাকে একাধিক ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ইডিমা, কোলেস্টেরলের আধিক্য, অস্টিওপোরোসিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, অবসাদগ্রস্ততা বা উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের ৬ থেকে ৯টি ওষুধ প্রদান করা জরুরি বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত অনেক রোগীকে ১২ থেকে ১৫টি ওষুধ প্রদান করতে দেখা যায়।

চিকিৎসকের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব রোগীর প্রদত্ত সব ওষুধই প্রয়োজনীয়। এসব ক্ষেত্রে ওষুধের সংখ্যা নিয়ে বির্তকের অবকাশ না থাকলেও এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়া নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক ও যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। এমন হওয়া বিচিত্র নয় যে, এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে, এমনকি রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

তাই যারা এত বেশিসংখ্যক ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন, তাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনোরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককে জানাতে হবে। এ সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্য একটি কেস স্টাডি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব। এটি কাল্পনিক নয়, সত্য ঘটনা।

এক বয়স্ক রোগী উচ্চরক্তচাপ, করোনারি রক্তনালির সমস্যা, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা), কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউর, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, আলসার ও কাশিতে ভুগছিলেন। প্রত্যেক রোগের জন্য রোগীকে আলাদা-আলাদাভাবে সর্বসাকুল্যে ১২টি ওষুধ প্রদান করা হয়েছিল। ওষুধের মধ্যে ছিল-উচ্চরক্তচাপের জন্য মেটোপ্রোলল, ডাইইউরেটিক ফ্রুসেমাইড, কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউরের জন্য ডিজিটালিস, রক্তজমাট প্রতিরোধ করার জন্য ওয়ারফেরিন, অ্যাসপিরিন, কোলেস্টেরল কমানোর জন্য অ্যাটরভ্যাস্টেটিন, আর্থ্রাইটিসের ব্যথা-বেদনা উপশমের জন্য সেলেকক্সিব, মানসিক দুশ্চিন্তার জন্য প্যারোক্সেটিন, ঘুমের জন্য ডায়াজেপাম, গায়ের ব্যথার জন্য আইবোপ্রোফেন, কাশির জন্য কফমিকচার এবং অ্যান্টিবায়োটিক লেভোফ্লক্সাসিন। এতগুলো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়ার কারণে একদিন রোগী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে দেখতে পান, ওষুধগুলোর বেশ কয়েকটি একে অপরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

অসংগতিগুলো অতি সহজে বর্ণনা করা যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, সেলেকক্সিব ও আইবোপ্রোফেন একসঙ্গে দেওয়া ঠিক হয়নি। কারণ বর্ণিত প্রতিটি ওষুধ এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে পাকস্থলি ও অন্ত্রে আলসার তৈরি করতে পারে, যা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক ঘটনা। রোগীর ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ ঘটেছিল। রক্তজমাট বন্ধ করার ওষুধ ওয়ারফেরিন ও অ্যান্টিবায়োটিক লেভোফ্লক্সাসিন কোনোমতেই একসঙ্গে দেওয়া যাবে না। এ দুটো ওষুধের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার কারণে রক্তক্ষরণের মতো মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। কারণ ওয়ারফেরিন ও লেভোফ্লক্সাসিন মিথস্ক্রিয়ার কারণে রক্তে প্রোথ্রোম্বিনের পরিমাণ কমে গেলে রক্ত জমাট বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে রোগীর মৃত্যু হতে পারত। এছাড়াও লেভোফ্লক্সাসিন রক্তে এনজাইমের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে ফেলার কারণে অ্যাসপিরিন মেটাবলিজমে (রাসায়নিক রূপান্তর) বিঘ্ন ঘটিয়েছিল।

বিশ্বব্যাপী জরিপে দেখা যায়-অজ্ঞতাবশত প্রেসক্রিপশনে একাধিক ওষুধ প্রদানের কারণে ড্রাগ-ইন্টারঅ্যাকশন বা মিথস্ক্রিয়ায় বহু রোগী হয়তো মারা যায় নতুবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গৃহীত একাধিক ওষুধ একই মেটাবলিক গতিপথ ব্যবহার করে বলে এক ওষুধের সঙ্গে অন্য ওষুধের প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। ফলে রক্তে এক বা একাধিক ওষুধের পরিমাণ বা মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে বেড়ে যায়। ওষুধ যত বেশি সময় রক্ত বা শরীরে অবস্থান করবে, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও সমভাবে বেড়ে যাবে। এ পরিস্থিতি কোনোমতেই কাম্য নয়।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভয়ংকর সংক্রামক রোগ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, অভাবনীয় দ্রুতগতিতে প্রতিবছর গড়ে একটি করে নতুন রোগ আবির্ভূত হচ্ছে, যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের সবার কাছে অত্যন্ত পরিচিত ওষুধ। অ্যান্টিবায়োটিক এমনই একটি ওষুধ, যার অপব্যবহার, অতি বেশি অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কোনোরকমেই কাম্য নয়। অথচ বিশ্বজুড়ে উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বিচার অপব্যবহার চলে আসছে।

চিকিৎসকরা অনেক সময় জেনেশুনেই যুক্তিহীনভাবে তাদের প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে থাকেন। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে খুব কম চিকিৎসকই পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেন। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য তারা একই প্রেসক্রিপশনে একাধিক পদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করে থাকেন। প্রদত্ত একাধিক পদের অ্যান্টিবায়োটিকের একটিও কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর নাও হতে পারে। উলটো জীবাণু এসব অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি অতি সহজে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে উঠতে পারে।

নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক অপপ্রয়োগের ফলে জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যপ্রণালিকে অকার্যকর বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের নতুন স্ট্রেইনে রূপান্তরিত করে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে নিষ্ফল করে দেয়। জীবাণুর এ রেজিস্ট্যান্ট স্ট্রেইন আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে কাবু না হয়ে বহাল তবিয়তে জীবদেহে অবস্থান ও বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। এ অবস্থায় রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। তখন চিকিৎসকরা বিকল্প ওষুধ ও চিকিৎসার অভাবে অসহায় হয়ে পড়েন।

উন্নত বিশ্বে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ কিনতে হলে প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন বাধ্যতামূলক। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওসব দেশে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ কেনা রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন ড্রাগের ওপর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রেসক্রিপশন ড্রাগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার জন্য সরকারের কাছে আমি বহুবার সুপারিশ করেছি। এটি করা গেলে ওষুধের নির্বিচার অপব্যবহার অনেকাংশে কমে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

ওষুধ প্রস্তুতকারক, ওষুধ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকরা রোগীকে সব সময় সব তথ্য বা পরামর্শ দিতে পারেন না। অনেক সময় পর্যাপ্ত তথ্য প্রদানের সময় থাকে না, বা সময় থাকলেও ইচ্ছা করেই সব তথ্য বা পরামর্শ প্রদানের প্রয়োজন মনে করেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী চিকিৎসকদের কাছে যথাযথ গুরুত্ব পান না। অনেক সময় আবার চিকিৎসকরা রোগীর অসুবিধার কথা, বিশেষ করে ওষুধ গ্রহণের ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা আমলে নেন না।

সম্প্রতি রয়টার্স হেলথ সার্ভিস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫০ জন রোগী, যারা কোলেস্টেরল কমানোর জন্য স্ট্যাটিন গ্রুপের ওষুধ গ্রহণ করেন, তাদের অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন, তাদের চিকিৎসকরা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে অবহিত হওয়ার পরও আমলে নেননি।

অনেক চিকিৎসক আমলে নিলেও রোগীকে ভ্রান্তভাবে বলেছেন, ওষুধের সঙ্গে বর্ণিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে রোগী বা তার পরিচর্যাকারীকে ওষুধ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য অবশ্যই জানতে হবে। ওষুধ সম্পর্কে এসব প্রয়োজনীয় তথ্য না জানলে ওষুধ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষতি যা হওয়ার তা সম্পূর্ণ রোগীরই হবে। তাহলে রোগী যাবে কোথায়?

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

drmuniruddin@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন