স্বাস্থ্য খাতে বেশি গুরুত্ব দিন
jugantor
স্বাস্থ্য খাতে বেশি গুরুত্ব দিন

  মনজু আরা বেগম  

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দমবন্ধ এক পরিবেশে প্রতিনিয়ত আমাদের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। সুস্থ থাকলে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যু হবে, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব ‘করোনা’ পৃথিবীজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে পরিবেশ, অর্থনীতি সমাজ সংসার।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো পৃথিবীতে হানাহানি করার জন্য অ্যাটম বোমা, আনবিক বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্র তৈরি করছে; কিন্তু বিগত দেড় বছর ধরে চলা এ অণুজীবের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা এখনো কেউ আবিষ্কার করতে পারছে না।

ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে; কিন্তু এটি আদৌ কোনো কাজ করছে বলে মনে হয় না। কারণ, করোনার ডাবল ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েও করোনায় আক্রান্তদের মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছে এবং যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত উন্নতির পরও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। মুখে মাক্স পরে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

করোনার ভয়ে পারিবারিক, সামাজিক যোগাযোগসহ সব ধরনের যোগাযোগ, আনুষ্ঠানিকতা প্রায় বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে সব সময় একটা আশঙ্কা কাজ করে। এটি এমনই এক রোগ, যা পারিবারিক, সামাজিক বন্ধনগুলোকে নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবারের স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসার সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে হত্যা করছে। রক্তের সম্পর্কগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে। চোখের সামনে তরতাজা প্রাণগুলো নিমেষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। রোগীকে বাঁচানোর জন্য স্বজনরা মরিয়া হয়ে ছুটছে এ হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে। এ সুযোগে সুযোগ সন্ধানীরা বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

শুধু করোনায় আক্রান্ত রোগীই নন, অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীরাও হাসপাতালে জায়গা বা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। মানুষের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালগুলো তাদের রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। আইসিইউতে রাখা রোগীর বিল আসছে লাখ লাখ টাকা। বিরাট অঙ্কের বিলের ভয়ে রোগীকে হাসপাতালে নিতেও স্বজনরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্ত পরিবারের মানুষ। করোনার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।

করোনা আমাদের অর্থনৈতিকভাবে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে। দারিদ্র্যের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। আয়বৈষম্য বেড়েছে। জীবনযাত্রার মানের অবনতি হয়েছে। অনেকের আয় রোজগার নেই; তার ওপর ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। বাজারে প্রতিটি পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি জনজীবন বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। তারপরও চড়া মূল্য দিয়ে যে পণ্যগুলো কেনা হচ্ছে, তার প্রায় সবটাই ভেজালে ভরা।

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যেসব খাবার যোগ হচ্ছে, এর অধিকাংশই বিষ মিশ্রিত এবং খাওয়ার অনুপযোগী এবং স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বাজারে এমন কোনো পণ্য নেই, যাতে ভেজাল নেই। সুন্দর চোখ ধাঁধানো রঙিন মোড়কে চমৎকার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয়ের কারসাজি করে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, আটা ময়দা, চিনি, লবণ, তেল, চাল, ডাল, প্রসাধনসামগ্রী, ওষুধসহ সবকিছুতেই ভেজাল।

সবচেয়ে কষ্টদায়ক হলো-সুস্থ থাকার জন্য, জীবন বাঁচানোর তাগিদে চড়া দামে যে ওষুধগুলো ক্রয় করা হচ্ছে, সেগুলোয়ও ভেজাল। এসব ওষুধ খেয়ে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আমরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। জেনেশুনে বিষপান করছি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলছি। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য, শরীরে পুষ্টির জন্য, বুদ্ধিবৃত্তির জন্য আমাদের সন্তানদের ভালোবেসে যে খাবার মুখে তুলে দিচ্ছি, এর অধিকাংশই বিষমিশ্রিত খাবার।

এসব খাদ্যদ্রব্যে যেসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে; এর কারণে ক্যানসার, কিডনি ফেইলিউর, হার্ট ফেইলিউর, লিভারসহ নানারকম জটিল রোগব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধছে। ক্যানসারও মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্তের জন্য চিকিৎসা এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। দেশে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার লোভে বিএসটিআই-এর লেবেল লাগিয়ে সংঘবদ্ধভাবে দিনের পর দিন এসব কাজ করে যাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর খুব জোরেশোরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এ অভিযানটা অব্যাহত থাকেনি।

বর্তমান সরকার মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও এটি ধারাবাহিকভাবে না করায় এ অশুভ চক্রটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শুধু খাদ্যদ্রব্যই নয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে শতকোটি টাকার একটি কীটনাশক ফ্যাক্টরিতে শুধু ইটের গুঁড়া আর মাটি দিয়ে বিএসটিআইয়ের সিল লাগিয়ে, নামিদামি ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে চমৎকার মোড়কে কীটনাশক/সার তৈরি করা হচ্ছে, যা সারা দেশে কৃষকরা ফসলের মাঠে ব্যবহার করছে। এরা দেশ ও সমাজের শত্রু। এসব দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না।

বিএসটিআই নামে যে প্রতিষ্ঠানটির এসব দেখভাল করার কথা, তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না, তা মনিটরিং ও মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। তারা যদি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারে, তাহলে কি কারণে করতে পারছেন না, সেটা উদ্ঘাটন করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি। প্রকৃত অর্থে ভেজাল মেশানোর শাস্তি অত্যন্ত লঘু হওয়ায় এ চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গুরু পাপে লঘুদণ্ড হওয়ায় অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা আশু প্রয়োজন।

গত ৪ সেপ্টেম্বর যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে ‘ব্র্যান্ডের নকল ওষুধ তৈরি চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেফতার’। এরা ডেমরা এলাকায় নকল ওষুধ তৈরির কারখানা বসিয়ে করোনা ও ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল ওষুধ তৈরি করছিল। এসব ওষুধ সুন্দর মোড়কে নামিদামি ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে মিটফোর্ড থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এ চক্রটি সারা দেশে এসব নকল ওষুধ ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছে।

যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে মাঝে মাঝে দুর্নীতির বহু তথ্য আমরা জানতে পারি। হাসপাতাল, পাসপোর্ট, বিআরটিএসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে দালালের দৌরাত্ম্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর র‌্যাব সারা দেশে অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক দালালকে গ্রেফতার করেছে।

র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেছে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এভাবে যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সারা দেশে ভেজালবিরোধী অভিযান চলে, তাহলে আমরা ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাব-এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। করোনার কারণে স্বাস্থ্য খাতে বেশি জোর দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির কথা আমাদের অজানা নয়। দেশের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। জেলা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় বেহালদশা। এখানে ডাক্তার আছে তো যন্ত্রপাতি নেই; আবার যন্ত্রপাতি আছে তো দক্ষ অপারেটর নেই।

ফলে অনেক দামিদামি মেশিনপত্র দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব দেখভালের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও দায়িত্বে অবহেলার জন্য তিরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা না করলে এ খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি চলতেই থাকবে। এ অবস্থা থেকে আমরা পরিত্রাণ চাই। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন এবং ভেজালরোধসহ চলমান ভয়াবহ এ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চাই। আমরা সুস্থভাবে বাঁচতে চাই।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

monjuara2006@yahoo.com

স্বাস্থ্য খাতে বেশি গুরুত্ব দিন

 মনজু আরা বেগম 
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দমবন্ধ এক পরিবেশে প্রতিনিয়ত আমাদের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। সুস্থ থাকলে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যু হবে, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব ‘করোনা’ পৃথিবীজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে পরিবেশ, অর্থনীতি সমাজ সংসার।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো পৃথিবীতে হানাহানি করার জন্য অ্যাটম বোমা, আনবিক বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্র তৈরি করছে; কিন্তু বিগত দেড় বছর ধরে চলা এ অণুজীবের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা এখনো কেউ আবিষ্কার করতে পারছে না।

ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে; কিন্তু এটি আদৌ কোনো কাজ করছে বলে মনে হয় না। কারণ, করোনার ডাবল ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েও করোনায় আক্রান্তদের মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছে এবং যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত উন্নতির পরও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। মুখে মাক্স পরে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

করোনার ভয়ে পারিবারিক, সামাজিক যোগাযোগসহ সব ধরনের যোগাযোগ, আনুষ্ঠানিকতা প্রায় বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে সব সময় একটা আশঙ্কা কাজ করে। এটি এমনই এক রোগ, যা পারিবারিক, সামাজিক বন্ধনগুলোকে নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবারের স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসার সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে হত্যা করছে। রক্তের সম্পর্কগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে। চোখের সামনে তরতাজা প্রাণগুলো নিমেষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। রোগীকে বাঁচানোর জন্য স্বজনরা মরিয়া হয়ে ছুটছে এ হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে। এ সুযোগে সুযোগ সন্ধানীরা বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

শুধু করোনায় আক্রান্ত রোগীই নন, অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীরাও হাসপাতালে জায়গা বা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। মানুষের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালগুলো তাদের রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। আইসিইউতে রাখা রোগীর বিল আসছে লাখ লাখ টাকা। বিরাট অঙ্কের বিলের ভয়ে রোগীকে হাসপাতালে নিতেও স্বজনরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্ত পরিবারের মানুষ। করোনার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।

করোনা আমাদের অর্থনৈতিকভাবে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে। দারিদ্র্যের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। আয়বৈষম্য বেড়েছে। জীবনযাত্রার মানের অবনতি হয়েছে। অনেকের আয় রোজগার নেই; তার ওপর ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। বাজারে প্রতিটি পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি জনজীবন বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। তারপরও চড়া মূল্য দিয়ে যে পণ্যগুলো কেনা হচ্ছে, তার প্রায় সবটাই ভেজালে ভরা।

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যেসব খাবার যোগ হচ্ছে, এর অধিকাংশই বিষ মিশ্রিত এবং খাওয়ার অনুপযোগী এবং স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বাজারে এমন কোনো পণ্য নেই, যাতে ভেজাল নেই। সুন্দর চোখ ধাঁধানো রঙিন মোড়কে চমৎকার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয়ের কারসাজি করে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, আটা ময়দা, চিনি, লবণ, তেল, চাল, ডাল, প্রসাধনসামগ্রী, ওষুধসহ সবকিছুতেই ভেজাল।

সবচেয়ে কষ্টদায়ক হলো-সুস্থ থাকার জন্য, জীবন বাঁচানোর তাগিদে চড়া দামে যে ওষুধগুলো ক্রয় করা হচ্ছে, সেগুলোয়ও ভেজাল। এসব ওষুধ খেয়ে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আমরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। জেনেশুনে বিষপান করছি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলছি। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য, শরীরে পুষ্টির জন্য, বুদ্ধিবৃত্তির জন্য আমাদের সন্তানদের ভালোবেসে যে খাবার মুখে তুলে দিচ্ছি, এর অধিকাংশই বিষমিশ্রিত খাবার।

এসব খাদ্যদ্রব্যে যেসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে; এর কারণে ক্যানসার, কিডনি ফেইলিউর, হার্ট ফেইলিউর, লিভারসহ নানারকম জটিল রোগব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধছে। ক্যানসারও মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্তের জন্য চিকিৎসা এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। দেশে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার লোভে বিএসটিআই-এর লেবেল লাগিয়ে সংঘবদ্ধভাবে দিনের পর দিন এসব কাজ করে যাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর খুব জোরেশোরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এ অভিযানটা অব্যাহত থাকেনি।

বর্তমান সরকার মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও এটি ধারাবাহিকভাবে না করায় এ অশুভ চক্রটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শুধু খাদ্যদ্রব্যই নয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে শতকোটি টাকার একটি কীটনাশক ফ্যাক্টরিতে শুধু ইটের গুঁড়া আর মাটি দিয়ে বিএসটিআইয়ের সিল লাগিয়ে, নামিদামি ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে চমৎকার মোড়কে কীটনাশক/সার তৈরি করা হচ্ছে, যা সারা দেশে কৃষকরা ফসলের মাঠে ব্যবহার করছে। এরা দেশ ও সমাজের শত্রু। এসব দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না।

বিএসটিআই নামে যে প্রতিষ্ঠানটির এসব দেখভাল করার কথা, তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না, তা মনিটরিং ও মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। তারা যদি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারে, তাহলে কি কারণে করতে পারছেন না, সেটা উদ্ঘাটন করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি। প্রকৃত অর্থে ভেজাল মেশানোর শাস্তি অত্যন্ত লঘু হওয়ায় এ চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গুরু পাপে লঘুদণ্ড হওয়ায় অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা আশু প্রয়োজন।

গত ৪ সেপ্টেম্বর যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে ‘ব্র্যান্ডের নকল ওষুধ তৈরি চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেফতার’। এরা ডেমরা এলাকায় নকল ওষুধ তৈরির কারখানা বসিয়ে করোনা ও ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল ওষুধ তৈরি করছিল। এসব ওষুধ সুন্দর মোড়কে নামিদামি ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে মিটফোর্ড থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এ চক্রটি সারা দেশে এসব নকল ওষুধ ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছে।

যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে মাঝে মাঝে দুর্নীতির বহু তথ্য আমরা জানতে পারি। হাসপাতাল, পাসপোর্ট, বিআরটিএসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে দালালের দৌরাত্ম্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর র‌্যাব সারা দেশে অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক দালালকে গ্রেফতার করেছে।

র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেছে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এভাবে যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সারা দেশে ভেজালবিরোধী অভিযান চলে, তাহলে আমরা ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাব-এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। করোনার কারণে স্বাস্থ্য খাতে বেশি জোর দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির কথা আমাদের অজানা নয়। দেশের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। জেলা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় বেহালদশা। এখানে ডাক্তার আছে তো যন্ত্রপাতি নেই; আবার যন্ত্রপাতি আছে তো দক্ষ অপারেটর নেই।

ফলে অনেক দামিদামি মেশিনপত্র দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব দেখভালের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও দায়িত্বে অবহেলার জন্য তিরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা না করলে এ খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি চলতেই থাকবে। এ অবস্থা থেকে আমরা পরিত্রাণ চাই। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন এবং ভেজালরোধসহ চলমান ভয়াবহ এ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চাই। আমরা সুস্থভাবে বাঁচতে চাই।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

monjuara2006@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন