রাজনীতির নানা মারপ্যাঁচ
jugantor
রাজনীতির নানা মারপ্যাঁচ

  ড. মো. কামরুজ্জামান  

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতির আভিধানিক অর্থ রাজ্য বা রাষ্ট্রপরিচালনার কৌশল। গ্রিক শব্দ ‘পলিটিকোস’ থেকে ইংরেজিতে ‘পলিটিক্স’। বাংলায় যেটাকে আমরা রাজনীতি বলে থাকি। যার অর্থ হলো, প্রজাদের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার নিয়ম-নীতি, যা ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাজনীতিকরা গ্রহণ করে থাকেন। আর এর সহজ ও ছোট্ট অর্থ হলো সমাজসেবা। এটি বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর পন্থা হচ্ছে সংগঠন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে ওই সেবাটা নিশ্চিত করা অধিকতর সহজ। রাষ্ট্রের মূলনীতি অনুযায়ী, রাজনীতি মূলত নগর ও সমাজ পরিচালনার এক অহিংস পদ্ধতি।

একাডেমিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সরকারবিষয়ক বিজ্ঞান হিসাবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। রাজা, রাষ্ট্র ও সরকারবিষয়ক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এটি জড়িত। রাজনীতির একাডেমিক অধ্যয়নকে বিজ্ঞানও বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে এটি নেগেটিভ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। রাজনীতি একটি মহৎ কাজ। আবেগ এখানে মূল্যহীন। প্রাচীন গ্রিসে রাজনীতি বলতে নগররাষ্ট্র ও তার শাসনব্যবস্থার বস্তুগত ও দর্শনগত অধ্যয়নকে বোঝাত।

সাধারণ অর্থে রাজনীতি বলতে সেসব নীতিমালাকে বলা হয়, যা অনুসরণের মাধ্যমে একটি জাতি বা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। যাকে বলা হয় দেশের মূল চালিকাশক্তি। যার মাধ্যমে দেশকে নির্মাণ করা যায়। দেশের মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়। সংকীর্ণ অর্থে, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং কৌশলকে রাজনীতি বলে। যার মধ্যে ন্যায়নীতিবিবর্জিত লড়াইও অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমানে ন্যায়নীতিবিবর্জিত উপায়ে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা লাভকেও মানুষ রাজনীতি মনে করে থাকেন। এটি এখন আর ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবার, গ্রাম ও সমাজে এটি প্রবেশ করেছে। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে রাজনীতির মহড়া। আইন-আদালত, অফিস ও ব্যাংক-বিমাও জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে। খেলার মাঠ, সমিতি ও সংঘের ভেতরেও বিস্তার লাভ করেছে এটি। জালের মতো এটি ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম-শহরের অলিগলিতে। অ্যারিস্টটলের মতে, রাজনীতি হলো নগর-রাষ্ট্র পরিচালনা ও নাগরিক সম্পর্কিত জ্ঞান বা শৃঙ্খলা।

সুতরাং একটি দেশের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন বিভাগ ইত্যাদির মধ্যে একাডেমিক ও প্রায়োগিক রাজনীতি বিদ্যমান রয়েছে। তার মতে, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনীতি পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং যেদিন থেকে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে, সেদিন থেকেই রাজনীতির উৎপত্তি হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, রাজনীতি হলো সমাজের বৈধ শৃঙ্খলারক্ষাকারী কিংবা পরিবর্তন আনয়নকারী ব্যবস্থা। রাজনীতির উল্লেখিত সংজ্ঞা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, রাজনীতি অতি পবিত্র এক শব্দ, যা মানুষের সার্বিক জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন।

রাজনীতি ছাড়া কোনো দেশ, সমাজ ও সংঘ পরিচালিত হতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে এটি একটি নেগেটিভ অর্থবোধক শব্দে রূপান্তর লাভ করেছে। বিশ্বমোড়লদের ক্ষমতা দখলের অনৈতিক বাসনা এটিকে দূষিত করেছে। জবরদখল, দেশদখল ও নীতিহীনতা রাজনীতিকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। দাঙ্গাবাজি আর ধান্দাবাজির কারণে রাজনীতি এখন কলুষিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে তাই এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে আলাপচারিতায় একে অপরকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ‘আমার সঙ্গে রাজনীতি করিস না’, ‘আমি রাজনীতি পছন্দ করি না’ ইত্যাদি।

রাজনীতিকের অনৈতিক চতুরতা রাজনীতিকে নিন্দিত করেছে। রাজনীতিকদের কুরুচিপূর্ণ ভাষাও এটিকে মন্দ নীতিতে চিত্রিত করেছে। কিছু কিছু রাজনীতিকের শব্দচয়ন তাদের মনুষ্যত্ব ও রুচিবোধকে নেতিবাচক অর্থে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে নব্বইয়ের পরে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ অসুস্থ রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে এটি লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তদুপরি এটি দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশের মূল ধারার বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা অনৈতিক ক্ষমতাবলে বলীয়ান। রাজনীতির স্রষ্টার চেয়ে রাজনীতির প্রয়োগকারীরা এখন অধিক ক্ষমতাশালী। শাস্ত্রে বর্ণিত রাষ্ট্রনীতির বাইরে প্রচলিত রাষ্ট্রনীতির শক্তিতে তারা অনেকগুণ প্রভাবশালী।

এসব প্রভাবশালীই রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারক। তাদের ক্ষমতার দাপটে দলের সজ্জন হিসাবে পরিচিত নিষ্ঠাবান নেতারা দলে এবং দেশে উপেক্ষিত। মূলধারার রাজনীতি ছাত্র রাজনীতিকেও এখন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। জাতীয় রাজনীতিতে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি এদেশে বেশি পুরোনো না হলেও একেবারে নতুনও নয়। ছাত্ররাজনীতিকে ব্যবহারের ইতিহাসও প্রায় তিন যুগের কাছাকাছি। বৃহৎ সব রাজনৈতিক দল তাদের পেশিশক্তি বৃদ্ধির জন্য রাজপথ দখলে রাখার চেষ্টা চালায়। আর এ দখলদারিত্বে ছাত্রশক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে নব্বই সাল থেকে। দলীয় সিদ্ধান্তকে জাতীয় সিদ্ধান্তে রূপদান করার চেষ্টাও এ দেশে নতুন নয়। এক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতি লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি তারাও রাজপথে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। বিনিময়ে তারা পেয়েছে বাহবা ও হাততালি। তাদের আবেগপূর্ণ তারুণ্য এ বাহবায় সিক্ত ও পুলকিত হয়েছে। শাস্ত্রীয় রাজনীতি রাস্তায় নেমে আসার ফলে কোমলমতি ছাত্ররা অর্থনৈতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে। অনৈতিক এ সুযোগ-সুবিধা পেয়ে ছাত্ররা তখন ছাত্রস্বার্থ বাদ দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতিতে মনোযোগ দেওয়া শুরু করেছে। ক্লাস ও লেখাপড়ায় তারা অমনোযোগী হয়ে পড়েছে।

অল্প বয়সেই সম্পদের মোহ তাদের নেশাগ্রস্ত করেছে। রাজনৈতিক নেতাদের অর্থ ও ক্ষমতার জৌলুস তাদের লোভী করে তুলেছে। বড় নেতা হওয়ার ধান্দা তাদের মাথা নষ্ট করে ফেলেছে। তারা তখন ভাবতে শুরু করেছে, লেখাপড়া করে আর কী-ই বা হবে? একটা সরকারি চাকরি করে কয় টাকা আয় করা যাবে? ব্যস! ওখানেই শেষ। এ বয়স থেকেই সে হয়ে পড়ে রাজপথের সাহসী সৈনিক।

নীতিভ্রষ্টতা আর আদর্শহীনতা রাজনীতিকে এখন পেটনীতিতে রূপান্তর করেছে। ফলে জন্ম নিয়েছে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মতো অনেক রাজনীতিক। শহরের অলিতেগলিতে আর গ্রামের আনাচে-কানাচে গ্যাং কালচারও এ অসুস্থ রাজনীতিরই ফসল। সত্যিকারের সম্ভ্রান্ত মানুষদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান রাজনীতি। নিরীহ তরুণ-তরুণী এ নীতিকে তাই এখন এড়িয়ে চলে। অথচ রাজা ও রাষ্ট্রবিষয়ক কাজ যুগশ্রেষ্ঠনীতি হিসাবে পরিচিত। মহৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে উপমহাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল গঠনের ইতিহাস অতি পুরোনো।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঞ্চিত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা। আর লক্ষ্য ছিল সমাজ পরিবর্তন ও বিপ্লব। প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার জায়গায় ভিন্ন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা ছিল তাদের একমাত্র প্রয়াস। আর এ লক্ষ্য অর্জনে তাদের ব্যয় করতে হয়েছিল নিজ পকেটের টাকা। তাদের ব্যয় করতে হয়েছিল অনেক মেধা, সময় ও শ্রম। কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণে সর্বপ্রথম তারাই ছিলেন ওই আদর্শের মূর্ত প্রতীক। তারা গঠন করেছিলেন কাঙ্ক্ষিত আদর্শে নিবেদিত সুবিশাল একদল কর্মীবাহিনী। আর এ দলের নেতা হিসাবে তারা ছিলেন গতিশীল ও দূরদর্শী। সমসাময়িক সব বিষয় সম্পর্কে ছিলেন তারা পূর্ণ সচেতন। ভিন্ন আদর্শ মোকাবিলা করার জন্য নেতাদের ছিল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার ক্ষমতা।

বিরোধী রাজনীতিকদের ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ার বিষয়টি ছিল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ। এটি নেতার জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। এ পরীক্ষায়ও তারা ছিলেন পরীক্ষিত সফল নেতা। সামান্যতেই তারা ভেঙে পড়তেন না। চরম সংকট মুহূর্তেও তারা ছিলেন অটল-অবিচল। তাদের ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা। আর এসব দলের কর্মীরা ছিল নির্ভীক, সাহসী ও ধৈর্যশীল। দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তারা জানতেন, নেতৃত্বের লোভ দলকে ধ্বংস করে দেয়। তারা জানতেন, অনৈতিক সব লালসা ও লাইফস্টাইলের বাসনা দলকে নিঃশেষ করে ফেলে।

তাই তারা সহজ-সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে দলকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে নিয়েছেন। তারা ক্ষমতালোভী আর নির্বাচনমুখী না হয়ে গণমুখী কর্মকাণ্ডে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন। তারা শুধু জনগণের অধিকার, চাহিদা ও স্বাধিকারের জন্য কাজ করেছেন। বড়লোকের সন্তান এ আন্দোলন করতে গিয়ে গরিব হয়েছেন। জেল খেটেছেন, জরিমানা দিয়েছেন। দিতে হয়েছে রক্ত। ব্যক্তিস্বার্থে কখনো তারা রাজনীতি করেননি। ক্ষমতায় না থেকেও তারা ছিলেন প্রবল ক্ষমতার অধিকারী। স্রষ্টায় বিশ্বাস, কর্মে নিষ্ঠা ও জনগণের সমর্থন ছিল তাদের পাথেয়। জনগণ ছিল তাদের পাহারাদার।

বাংলাদেশে এক্ষেত্রে জ্বলন্ত উদাহরণ হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্ষমতায় না থেকেই তিনি ছিলেন প্রবল ক্ষমতাধর। দেশের জনগণই ছিল তার বড় শক্তি। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন তাকে পরবর্তী সময়ে এ দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল। তাই বলা যায়, একটি আদর্শ রাজনৈতিক দল ভোটের জন্য রাজনীতি করে না। তারা নির্বাচনমুখী না হয়ে গণমুখী হয়। ক্ষমতায় যাওয়া তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে না। উদ্দেশ্য থাকে জনগণের সেবা। আর এ সমর্থন যাচাই করতেই একটি আদর্শ রাজনৈতিক দল ভোটে অংশগ্রহণ করে থাকে।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.kûaman@gmail.com

রাজনীতির নানা মারপ্যাঁচ

 ড. মো. কামরুজ্জামান 
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতির আভিধানিক অর্থ রাজ্য বা রাষ্ট্রপরিচালনার কৌশল। গ্রিক শব্দ ‘পলিটিকোস’ থেকে ইংরেজিতে ‘পলিটিক্স’। বাংলায় যেটাকে আমরা রাজনীতি বলে থাকি। যার অর্থ হলো, প্রজাদের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার নিয়ম-নীতি, যা ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাজনীতিকরা গ্রহণ করে থাকেন। আর এর সহজ ও ছোট্ট অর্থ হলো সমাজসেবা। এটি বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর পন্থা হচ্ছে সংগঠন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে ওই সেবাটা নিশ্চিত করা অধিকতর সহজ। রাষ্ট্রের মূলনীতি অনুযায়ী, রাজনীতি মূলত নগর ও সমাজ পরিচালনার এক অহিংস পদ্ধতি।

একাডেমিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সরকারবিষয়ক বিজ্ঞান হিসাবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। রাজা, রাষ্ট্র ও সরকারবিষয়ক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এটি জড়িত। রাজনীতির একাডেমিক অধ্যয়নকে বিজ্ঞানও বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে এটি নেগেটিভ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। রাজনীতি একটি মহৎ কাজ। আবেগ এখানে মূল্যহীন। প্রাচীন গ্রিসে রাজনীতি বলতে নগররাষ্ট্র ও তার শাসনব্যবস্থার বস্তুগত ও দর্শনগত অধ্যয়নকে বোঝাত।

সাধারণ অর্থে রাজনীতি বলতে সেসব নীতিমালাকে বলা হয়, যা অনুসরণের মাধ্যমে একটি জাতি বা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। যাকে বলা হয় দেশের মূল চালিকাশক্তি। যার মাধ্যমে দেশকে নির্মাণ করা যায়। দেশের মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়। সংকীর্ণ অর্থে, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং কৌশলকে রাজনীতি বলে। যার মধ্যে ন্যায়নীতিবিবর্জিত লড়াইও অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমানে ন্যায়নীতিবিবর্জিত উপায়ে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা লাভকেও মানুষ রাজনীতি মনে করে থাকেন। এটি এখন আর ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবার, গ্রাম ও সমাজে এটি প্রবেশ করেছে। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে রাজনীতির মহড়া। আইন-আদালত, অফিস ও ব্যাংক-বিমাও জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে। খেলার মাঠ, সমিতি ও সংঘের ভেতরেও বিস্তার লাভ করেছে এটি। জালের মতো এটি ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম-শহরের অলিগলিতে। অ্যারিস্টটলের মতে, রাজনীতি হলো নগর-রাষ্ট্র পরিচালনা ও নাগরিক সম্পর্কিত জ্ঞান বা শৃঙ্খলা।

সুতরাং একটি দেশের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন বিভাগ ইত্যাদির মধ্যে একাডেমিক ও প্রায়োগিক রাজনীতি বিদ্যমান রয়েছে। তার মতে, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনীতি পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং যেদিন থেকে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে, সেদিন থেকেই রাজনীতির উৎপত্তি হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, রাজনীতি হলো সমাজের বৈধ শৃঙ্খলারক্ষাকারী কিংবা পরিবর্তন আনয়নকারী ব্যবস্থা। রাজনীতির উল্লেখিত সংজ্ঞা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, রাজনীতি অতি পবিত্র এক শব্দ, যা মানুষের সার্বিক জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন।

রাজনীতি ছাড়া কোনো দেশ, সমাজ ও সংঘ পরিচালিত হতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে এটি একটি নেগেটিভ অর্থবোধক শব্দে রূপান্তর লাভ করেছে। বিশ্বমোড়লদের ক্ষমতা দখলের অনৈতিক বাসনা এটিকে দূষিত করেছে। জবরদখল, দেশদখল ও নীতিহীনতা রাজনীতিকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। দাঙ্গাবাজি আর ধান্দাবাজির কারণে রাজনীতি এখন কলুষিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে তাই এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে আলাপচারিতায় একে অপরকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ‘আমার সঙ্গে রাজনীতি করিস না’, ‘আমি রাজনীতি পছন্দ করি না’ ইত্যাদি।

রাজনীতিকের অনৈতিক চতুরতা রাজনীতিকে নিন্দিত করেছে। রাজনীতিকদের কুরুচিপূর্ণ ভাষাও এটিকে মন্দ নীতিতে চিত্রিত করেছে। কিছু কিছু রাজনীতিকের শব্দচয়ন তাদের মনুষ্যত্ব ও রুচিবোধকে নেতিবাচক অর্থে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে নব্বইয়ের পরে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ অসুস্থ রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে এটি লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তদুপরি এটি দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশের মূল ধারার বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা অনৈতিক ক্ষমতাবলে বলীয়ান। রাজনীতির স্রষ্টার চেয়ে রাজনীতির প্রয়োগকারীরা এখন অধিক ক্ষমতাশালী। শাস্ত্রে বর্ণিত রাষ্ট্রনীতির বাইরে প্রচলিত রাষ্ট্রনীতির শক্তিতে তারা অনেকগুণ প্রভাবশালী।

এসব প্রভাবশালীই রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারক। তাদের ক্ষমতার দাপটে দলের সজ্জন হিসাবে পরিচিত নিষ্ঠাবান নেতারা দলে এবং দেশে উপেক্ষিত। মূলধারার রাজনীতি ছাত্র রাজনীতিকেও এখন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। জাতীয় রাজনীতিতে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি এদেশে বেশি পুরোনো না হলেও একেবারে নতুনও নয়। ছাত্ররাজনীতিকে ব্যবহারের ইতিহাসও প্রায় তিন যুগের কাছাকাছি। বৃহৎ সব রাজনৈতিক দল তাদের পেশিশক্তি বৃদ্ধির জন্য রাজপথ দখলে রাখার চেষ্টা চালায়। আর এ দখলদারিত্বে ছাত্রশক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে নব্বই সাল থেকে। দলীয় সিদ্ধান্তকে জাতীয় সিদ্ধান্তে রূপদান করার চেষ্টাও এ দেশে নতুন নয়। এক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতি লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি তারাও রাজপথে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। বিনিময়ে তারা পেয়েছে বাহবা ও হাততালি। তাদের আবেগপূর্ণ তারুণ্য এ বাহবায় সিক্ত ও পুলকিত হয়েছে। শাস্ত্রীয় রাজনীতি রাস্তায় নেমে আসার ফলে কোমলমতি ছাত্ররা অর্থনৈতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে। অনৈতিক এ সুযোগ-সুবিধা পেয়ে ছাত্ররা তখন ছাত্রস্বার্থ বাদ দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতিতে মনোযোগ দেওয়া শুরু করেছে। ক্লাস ও লেখাপড়ায় তারা অমনোযোগী হয়ে পড়েছে।

অল্প বয়সেই সম্পদের মোহ তাদের নেশাগ্রস্ত করেছে। রাজনৈতিক নেতাদের অর্থ ও ক্ষমতার জৌলুস তাদের লোভী করে তুলেছে। বড় নেতা হওয়ার ধান্দা তাদের মাথা নষ্ট করে ফেলেছে। তারা তখন ভাবতে শুরু করেছে, লেখাপড়া করে আর কী-ই বা হবে? একটা সরকারি চাকরি করে কয় টাকা আয় করা যাবে? ব্যস! ওখানেই শেষ। এ বয়স থেকেই সে হয়ে পড়ে রাজপথের সাহসী সৈনিক।

নীতিভ্রষ্টতা আর আদর্শহীনতা রাজনীতিকে এখন পেটনীতিতে রূপান্তর করেছে। ফলে জন্ম নিয়েছে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মতো অনেক রাজনীতিক। শহরের অলিতেগলিতে আর গ্রামের আনাচে-কানাচে গ্যাং কালচারও এ অসুস্থ রাজনীতিরই ফসল। সত্যিকারের সম্ভ্রান্ত মানুষদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান রাজনীতি। নিরীহ তরুণ-তরুণী এ নীতিকে তাই এখন এড়িয়ে চলে। অথচ রাজা ও রাষ্ট্রবিষয়ক কাজ যুগশ্রেষ্ঠনীতি হিসাবে পরিচিত। মহৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে উপমহাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল গঠনের ইতিহাস অতি পুরোনো।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঞ্চিত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা। আর লক্ষ্য ছিল সমাজ পরিবর্তন ও বিপ্লব। প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার জায়গায় ভিন্ন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা ছিল তাদের একমাত্র প্রয়াস। আর এ লক্ষ্য অর্জনে তাদের ব্যয় করতে হয়েছিল নিজ পকেটের টাকা। তাদের ব্যয় করতে হয়েছিল অনেক মেধা, সময় ও শ্রম। কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণে সর্বপ্রথম তারাই ছিলেন ওই আদর্শের মূর্ত প্রতীক। তারা গঠন করেছিলেন কাঙ্ক্ষিত আদর্শে নিবেদিত সুবিশাল একদল কর্মীবাহিনী। আর এ দলের নেতা হিসাবে তারা ছিলেন গতিশীল ও দূরদর্শী। সমসাময়িক সব বিষয় সম্পর্কে ছিলেন তারা পূর্ণ সচেতন। ভিন্ন আদর্শ মোকাবিলা করার জন্য নেতাদের ছিল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার ক্ষমতা।

বিরোধী রাজনীতিকদের ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ার বিষয়টি ছিল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ। এটি নেতার জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। এ পরীক্ষায়ও তারা ছিলেন পরীক্ষিত সফল নেতা। সামান্যতেই তারা ভেঙে পড়তেন না। চরম সংকট মুহূর্তেও তারা ছিলেন অটল-অবিচল। তাদের ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা। আর এসব দলের কর্মীরা ছিল নির্ভীক, সাহসী ও ধৈর্যশীল। দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তারা জানতেন, নেতৃত্বের লোভ দলকে ধ্বংস করে দেয়। তারা জানতেন, অনৈতিক সব লালসা ও লাইফস্টাইলের বাসনা দলকে নিঃশেষ করে ফেলে।

তাই তারা সহজ-সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে দলকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে নিয়েছেন। তারা ক্ষমতালোভী আর নির্বাচনমুখী না হয়ে গণমুখী কর্মকাণ্ডে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন। তারা শুধু জনগণের অধিকার, চাহিদা ও স্বাধিকারের জন্য কাজ করেছেন। বড়লোকের সন্তান এ আন্দোলন করতে গিয়ে গরিব হয়েছেন। জেল খেটেছেন, জরিমানা দিয়েছেন। দিতে হয়েছে রক্ত। ব্যক্তিস্বার্থে কখনো তারা রাজনীতি করেননি। ক্ষমতায় না থেকেও তারা ছিলেন প্রবল ক্ষমতার অধিকারী। স্রষ্টায় বিশ্বাস, কর্মে নিষ্ঠা ও জনগণের সমর্থন ছিল তাদের পাথেয়। জনগণ ছিল তাদের পাহারাদার।

বাংলাদেশে এক্ষেত্রে জ্বলন্ত উদাহরণ হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্ষমতায় না থেকেই তিনি ছিলেন প্রবল ক্ষমতাধর। দেশের জনগণই ছিল তার বড় শক্তি। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন তাকে পরবর্তী সময়ে এ দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল। তাই বলা যায়, একটি আদর্শ রাজনৈতিক দল ভোটের জন্য রাজনীতি করে না। তারা নির্বাচনমুখী না হয়ে গণমুখী হয়। ক্ষমতায় যাওয়া তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে না। উদ্দেশ্য থাকে জনগণের সেবা। আর এ সমর্থন যাচাই করতেই একটি আদর্শ রাজনৈতিক দল ভোটে অংশগ্রহণ করে থাকে।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.kûaman@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন