বিজ্ঞানমনস্ক ও যুগোপযোগী উদ্যোগ
jugantor
বিজ্ঞানমনস্ক ও যুগোপযোগী উদ্যোগ

  মিহিরকান্তি চৌধুরী  

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষাব্যবস্থা

একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের মধ্যে তার কল্যাণকামিতা নিহিত থাকে। পাকিস্তান প্রথমদিকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থাকলেও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হওয়ার পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কল্যাণে নিবেদিত হতে থাকে। সেন্টো, সিয়াটো, বাগদাদ চুক্তি পার হয়ে ১৯৫৮ সালের শাসনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের ‘অঙ্গরাজ্যে’ পরিণত হয়। এমন একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষার উন্নয়নে কার্যকর কোনো নীতি ছিল না, ছিল না পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা। অনেক সময় বাজেট বরাদ্দের অর্থ শেষ পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় না করে প্রতিরক্ষায় নিয়ে যাওয়া হতো।

ষাটের দশকেও এমন ঘটনা লক্ষণীয়। আর শিক্ষায় পাকিস্তান যা কিছুই করেছে তার সুবিধাভোগের প্রধান কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানে ছিল সবকিছুই; তবে তা রুটিন কার্যক্রম, বিশেষ কিছু নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, শিক্ষক কম, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক আরও কম, অপর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, অর্থ বরাদ্দের অভাব ইত্যাদি। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল না। লাখ লাখ শিশু তাদের পরিবারের অনগ্রসরতা ও দারিদ্র্যের জন্য শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল বেশি। উচ্চশিক্ষা ছিল মুষ্টিমেয় মানুষের ছেলেমেয়েদের জন্য। চেষ্টা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগাম টেনে ধরে উচ্চশিক্ষার গতিরোধ করাও! মাদ্রাসা শিক্ষারও কোনো উন্নয়ন-সংস্কার হয়নি। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার অবস্থাও একই। প্রাক-প্রাথমিক বলতে তো প্রায় কিছুই ছিল না।

পাকিস্তান আমলে শিক্ষা যতটুকু এগিয়েছে, তার একটি হলো ইতোমধ্যে বর্ণিত ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং দ্বিতীয়টি হলো পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা। এসব ফলাফলে বা সার্বিক শিক্ষার গুণমান প্রদানে পাকিস্তান সরকারের কোনো বিশেষ অবদান নেই। শতকরা ১০-১৫ ভাগ ব্যতিক্রম বাদ দিলে পাকিস্তান আমলে ফার্স্ট জেনারেশনের শিক্ষা কোনো লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। দেশের সাধারণ মানুষ অমানবিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতার বাইরে ছিল।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা যুদ্ধ পার করে নতুন দেশ বাংলাদেশের জন্ম হয় এই ভূখণ্ডে। বাঙালি জাতির ভাগ্য উন্নয়নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। শিক্ষা ছাড়া জাতির উন্নতি যে সম্ভব নয়, তা মর্মে মর্মে অনুধাবন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। শুধু তাই নয়, শিক্ষার উন্নতি কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে বিস্তর ভেবেছিলেন। আর এই ভাবনা অনেকটা পঞ্চাশের দশক থেকেই শুরু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু একটি শিক্ষিত জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষাব্যবস্থা। স্বাধীনতার পর অতি কম সময়ের মধ্যে ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের উপযোগী করে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা সরকারিকরণ, সংবিধানে শিক্ষা বাধ্যতামূলক, শিক্ষা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী করার জন্য কাজ করেছেন তিনি। তাকে আর্থিকসহ অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি তার সংকল্পে অটল ছিলেন। শিক্ষার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল বঙ্গবন্ধুর। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের সময়েও তিনি কার্যকর সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার এক দশক আগে এ ধরনের চিন্তা ছিল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একটি বিষয়। বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে গণমুখী ও সম্প্রসারণ করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। সেই লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেন। এটা ছিল দেশের শিক্ষার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ।

যে কোনো দেশে শিক্ষা একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। এখানে অনেক স্টেকহোল্ডার থাকে-শিক্ষার্থী, শিক্ষক (আজকাল প্রাইভেট শিক্ষকও রয়েছেন), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থীর অভিভাবক, শিক্ষার্থীর বন্ধুবান্ধব, প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি, সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়নকারী, শিক্ষা প্রশাসন, রাষ্ট্র ইত্যাদি। যে কোনো এক বা দুই স্টেকের প্রচেষ্টায় কার্যকর কিছু হয় না। প্রচেষ্টায় প্রয়োজন সব পক্ষের সমন্বয়। এ বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার অবর্তমানে সেই অংশীদাররা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্বৈরশাসক থেকে শুরু করে বেসামরিক সরকার কেউই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি, যা নিয়েছেন তা রুটিন কার্যক্রম। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষার উন্নয়নে করোনা মহামারি কাটিয়ে সব অংশীদারকে ঐক্যবদ্ধ করার নতুন, বিজ্ঞানমনস্ক, যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর সফলতাও অবশ্যম্ভাবী।

মিহিরকান্তি চৌধুরী : লেখক ও গবেষক; নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট

বিজ্ঞানমনস্ক ও যুগোপযোগী উদ্যোগ

 মিহিরকান্তি চৌধুরী 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষাব্যবস্থা
প্রতীকী ছবি

একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের মধ্যে তার কল্যাণকামিতা নিহিত থাকে। পাকিস্তান প্রথমদিকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থাকলেও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হওয়ার পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কল্যাণে নিবেদিত হতে থাকে। সেন্টো, সিয়াটো, বাগদাদ চুক্তি পার হয়ে ১৯৫৮ সালের শাসনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের ‘অঙ্গরাজ্যে’ পরিণত হয়। এমন একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষার উন্নয়নে কার্যকর কোনো নীতি ছিল না, ছিল না পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা। অনেক সময় বাজেট বরাদ্দের অর্থ শেষ পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় না করে প্রতিরক্ষায় নিয়ে যাওয়া হতো।

ষাটের দশকেও এমন ঘটনা লক্ষণীয়। আর শিক্ষায় পাকিস্তান যা কিছুই করেছে তার সুবিধাভোগের প্রধান কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানে ছিল সবকিছুই; তবে তা রুটিন কার্যক্রম, বিশেষ কিছু নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, শিক্ষক কম, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক আরও কম, অপর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, অর্থ বরাদ্দের অভাব ইত্যাদি। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল না। লাখ লাখ শিশু তাদের পরিবারের অনগ্রসরতা ও দারিদ্র্যের জন্য শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল বেশি। উচ্চশিক্ষা ছিল মুষ্টিমেয় মানুষের ছেলেমেয়েদের জন্য। চেষ্টা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগাম টেনে ধরে উচ্চশিক্ষার গতিরোধ করাও! মাদ্রাসা শিক্ষারও কোনো উন্নয়ন-সংস্কার হয়নি। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার অবস্থাও একই। প্রাক-প্রাথমিক বলতে তো প্রায় কিছুই ছিল না।

পাকিস্তান আমলে শিক্ষা যতটুকু এগিয়েছে, তার একটি হলো ইতোমধ্যে বর্ণিত ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং দ্বিতীয়টি হলো পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা। এসব ফলাফলে বা সার্বিক শিক্ষার গুণমান প্রদানে পাকিস্তান সরকারের কোনো বিশেষ অবদান নেই। শতকরা ১০-১৫ ভাগ ব্যতিক্রম বাদ দিলে পাকিস্তান আমলে ফার্স্ট জেনারেশনের শিক্ষা কোনো লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। দেশের সাধারণ মানুষ অমানবিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতার বাইরে ছিল।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা যুদ্ধ পার করে নতুন দেশ বাংলাদেশের জন্ম হয় এই ভূখণ্ডে। বাঙালি জাতির ভাগ্য উন্নয়নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। শিক্ষা ছাড়া জাতির উন্নতি যে সম্ভব নয়, তা মর্মে মর্মে অনুধাবন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। শুধু তাই নয়, শিক্ষার উন্নতি কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে বিস্তর ভেবেছিলেন। আর এই ভাবনা অনেকটা পঞ্চাশের দশক থেকেই শুরু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু একটি শিক্ষিত জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষাব্যবস্থা। স্বাধীনতার পর অতি কম সময়ের মধ্যে ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের উপযোগী করে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা সরকারিকরণ, সংবিধানে শিক্ষা বাধ্যতামূলক, শিক্ষা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী করার জন্য কাজ করেছেন তিনি। তাকে আর্থিকসহ অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি তার সংকল্পে অটল ছিলেন। শিক্ষার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল বঙ্গবন্ধুর। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের সময়েও তিনি কার্যকর সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার এক দশক আগে এ ধরনের চিন্তা ছিল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একটি বিষয়। বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে গণমুখী ও সম্প্রসারণ করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। সেই লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেন। এটা ছিল দেশের শিক্ষার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ।

যে কোনো দেশে শিক্ষা একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। এখানে অনেক স্টেকহোল্ডার থাকে-শিক্ষার্থী, শিক্ষক (আজকাল প্রাইভেট শিক্ষকও রয়েছেন), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থীর অভিভাবক, শিক্ষার্থীর বন্ধুবান্ধব, প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি, সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়নকারী, শিক্ষা প্রশাসন, রাষ্ট্র ইত্যাদি। যে কোনো এক বা দুই স্টেকের প্রচেষ্টায় কার্যকর কিছু হয় না। প্রচেষ্টায় প্রয়োজন সব পক্ষের সমন্বয়। এ বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার অবর্তমানে সেই অংশীদাররা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্বৈরশাসক থেকে শুরু করে বেসামরিক সরকার কেউই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি, যা নিয়েছেন তা রুটিন কার্যক্রম। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষার উন্নয়নে করোনা মহামারি কাটিয়ে সব অংশীদারকে ঐক্যবদ্ধ করার নতুন, বিজ্ঞানমনস্ক, যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর সফলতাও অবশ্যম্ভাবী।

মিহিরকান্তি চৌধুরী : লেখক ও গবেষক; নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন