শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস পাঠ আবশ্যিক হতে হবে
jugantor
শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস পাঠ আবশ্যিক হতে হবে

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১০ সালে গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতির সূত্রে শুনেছিলাম, দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থী অভিন্ন সিলেবাসে পড়বে। একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে গ্রুপ পছন্দ করবে। পৃথিবীর অনেক দেশ শিক্ষাক্রম অনেকটা এভাবেই সাজায়। সে সময় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেশি দূর আগানো যায়নি। আমাদের দেশে একটি অদ্ভুত ব্যাপার আছে; কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি সমন্বিতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও অধিক ক্ষমতাশালী কারও মনঃপূত না হলে মূল কমিটিকে অন্ধকারে রেখে পকেট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কার্যকর হয়ে যায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত। যেমন জেএসসি ও পিইসি নামের দুটো বিশেষায়িত পাবলিক পরীক্ষা নাকি সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। ২০১১ সালে এনসিটিবিতে নতুন শিক্ষানীতির আলোকে কারিকুলাম তৈরি ও বই লেখার কমিটিতে আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও বিশ্বসভ্যতা নিয়ে মাধ্যমিক ও নিুমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রস্তাবিত খসড়ার জন্য ইংরেজিতে একটি শিরোনাম ঠিক করা হয়-‘বাংলাদেশ অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ’। এর বাংলা নামকরণটি আমি সেই টেবিলেই প্রস্তাব করেছিলাম ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’। এক বাক্যে সবাই গ্রহণ করেছিলেন। এভাবে তখন ইতিহাস পাঠ গুরুত্ব পেয়েছিল দেখে ভালো লেগেছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করতে থাকি, নতুন নতুন অদ্ভুতসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে থাকল। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে এই সভাতেই প্রথম কথা উঠেছিল। আমরা আমাদের জ্ঞানমতে সৃজনশীলের একটি কাঠামো ব্যাখ্যা করেছিলাম; যাতে শিক্ষার্থীরা সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বা তাদের দেখা নদী, খেলার মাঠ, উৎসব, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইত্যাদি দেখে নিজের মতো করে লিখতে পারে। এতে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটবে। অথচ কার্যকর করার ক্ষেত্রে দেখা গেল জটিল এক ধরনের ‘সৃজনশীল’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তা সামাল দিতে মেধাচর্চায় সৃজনশীলতা প্রকাশের চেয়ে শিক্ষার্থী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকও নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন গাইড বইয়ের ওপর। যখন আমরা জ্ঞান বিকাশের প্রয়োজনে কাঠামোবদ্ধ পরীক্ষার ভার কমানোর কথা বলে আসছিলাম, তখনই একদিন চমকে উঠে দেখলাম-এসএসসির আগে আরেকটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন হলো। শুনলাম, একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিই নাকি জেএসসি পরীক্ষার প্রস্তাব করেছে। এরপরে আমাদের আতঙ্কিত করে খবর বেরুলো- এবার পঞ্চম শ্রেণির শিশুরাও পাবলিক পরীক্ষা দেবে। একটি টকশোতে সে সময়ে শিক্ষা সচিব বেশ গর্বভরে বলেছিলেন, পিইসি নাকি তার মেধাবী চিন্তার ফসল। শিশু শিক্ষা নিয়ে এসব ছেলেখেলা সম্ভবত বাংলাদেশেই সম্ভব।

বর্তমান মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ; স্কুল শিক্ষার কারিকুলামে যেসব পরিবর্তন আনার কথা আমরা বলে আসছিলাম, লিখে আসছিলাম অনেকদিন থেকে- অনেকটা সেই আলোকেই সরকার ভাবতে পেরেছে। যে সম্মানিত বিশেষজ্ঞ কমিটি এই প্রস্তাবনা নিয়ে এসেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। এসব কারণে সম্প্রতি স্কুল শিক্ষা কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব আমাদের অনেকটা স্বস্তি দিয়েছে। অবশ্য প্রস্তাবনার কোনো কোনো বিষয় নিয়ে আরও ভাবনার অবকাশ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। এসব প্রসঙ্গে পরে এক সময় লেখার আশা রইল।

জানলাম, চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৮টি বই ও ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে পড়তে হবে ১০টি বই। একটি বড় অস্বস্তি বোধ করছি- যখন অভিন্ন সিলেবাসে পড়াতে প্রস্তাবিত ১০টি বইয়ের তালিকা দেখলাম। যেখানে শিক্ষায় এগিয়ে থাকা দেশগুলো স্কুলশিক্ষা থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত যার যার দেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা পাঠ আবশ্যিক মনে করে; চিকিৎসা বিজ্ঞান বা প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষার্থীরাও অন্তত নিজ দেশের ইতিহাস পড়তে বাধ্য, সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন সিলেবাসে ১০টি বইয়ের প্রস্তাব থাকলেও সেখানে ইতিহাস বই পাঠের কোনো ব্যবস্থা নেই। জ্ঞানমূলক পাঠের বদলে বৃত্তিমূলক পাঠে মনোনিবেশ করলে সেখানে প্রজন্মকে শ্রমিক বানানো যেতে পারে, বড় উদ্ভাবক তৈরি করা কঠিন।

কেউ কেউ বলেন, সমাজ বইয়ে খানিকটা ইতিহাসের ছোঁয়া আছে; তাতেই হবে। অতীতে আমাদের শিশু শিক্ষার কারিকুলামে দেখা যেত, বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের যেন ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিল্পকলা পড়ার আবশ্যকতা নেই। ওসব পড়বে মানবিক শাখার ছেলেমেয়েরা। অথচ ইউরোপে দেখেছি, স্কুল শিক্ষায় তো বটেই; বিজ্ঞানের স্নাতকদেরও নিজ দেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হয়। না হলে স্ব স্ব জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে কেমন করে! পশ্চিম বাংলার কারিকুলামে বহু আগে থেকেই এমন সভ্য সংস্কার হয়েছে।

আমি ১৯৯২ সালের একটি অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে চাই। গবেষণার কাজে তখন কলকাতায় আছি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদিন আমি ইস্টার্ন বাইপাস দিয়ে বাসে উত্তর কলকাতায় ফিরছি। পথে এক স্টপেজ থেকে বেশ কজন স্কুলছাত্রী উঠল। আমার পাশের ফাঁকা সিটটিতে বসল একটি মেয়ে। ওদের স্কুলশিক্ষা জানার জন্য আলাপ শুরু করলাম। খুব সপ্রতিভ মেয়ে। আমি বাংলাদেশ থেকে পিএইচডি গবেষণার জন্য এখানে এসেছি জেনে ওর কৌতূহল বাড়ল। পিএইচডি সম্পর্কে ওর কিছুটা ধারণা রয়েছে। কারণ, ওর পরিবারে তিনজন পিএইচডি করা মানুষ রয়েছেন। মেয়েটি ক্লাস নাইনে পড়ে। ওর কাছেই জানলাম-দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠলে ওরা গ্রুপ ভাগের সুযোগ পাবে। মেয়েটির ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়ার ইচ্ছা। আমাদের দেশে দেখেছি, কারিকুলামের কারণেই বোধ হয় যে শিক্ষার্থী বিজ্ঞান পড়ছে বা ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়বে, তার কলাবিদ্যার বিষয় নিয়ে তেমন আগ্রহ থাকে না। একইভাবে কলাবিদ্যার শিক্ষার্থীর অনাগ্রহ থাকে বিজ্ঞান জানায়।

এ মেয়েটির ক্ষেত্রে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো। আমার গবেষণার বিষয় ইতিহাস এবং মধ্যযুগের বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি জানার পর ওর আগ্রহ বেড়ে গেল। বাকি রাস্তা মেয়েটি বাংলার সুফিধারা ও শ্রী চৈতন্যের নব্যবৈষ্ণব আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে আমাকে বিস্মিত করে তুলল। পরদিন আমি আমার শিক্ষক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর অমলেন্দু দে স্যারকে আমার বিস্ময়ের কথা জানালাম। স্যার মৃদু হাসলেন। নবম-দশম শ্রেণির অভিন্ন সিলেবাসের আলোকে স্যারের লেখা ইতিহাস বইটি আমাকে পড়তে দিলেন। আদ্যোপান্ত পড়ে বুঝলাম এই পাঠ্যবইটি পড়া হলে বাংলা ও ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মূল ধারাক্রম একজন শিশু শিক্ষার্থীকে আলোকিত করবে। দেশাত্মবোধ তাদের উজ্জীবিত করবে।

কিন্তু দুঃখের সঙ্গে দেখেছি, আমাদের দেশে যারা কারিকুলাম তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকেন; বিশেষ করে যারা বাস্তবায়ন করেন, তারা এসব সত্য বিবেচনা করতে চান না। স্কুল সিলেবাসের কারিকুলাম দেখলে, বিশেষ করে সমাজ বইয়ের ইতিহাস নির্বাচন দেখে আমার কখনো মনে হয়নি এই ইতিহাস পড়ে তেমন কোনো লাভ হবে। সেখানে রয়েছে প্রধানত গৎবাঁধা রাজনৈতিক ইতিহাস। বড়জোর মোগল শাসনপর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের পরিধি থাকে সেখানে। পেছনে গেলেও তা এতই গৎবাঁধা যে, পাঠ তেমন আনন্দময় হয় না। হাজার বছরের বাঙালির উজ্জ্বল ঐতিহ্য, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক জীবনের ছোঁয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা এসব বই পড়ে শিক্ষার্থীর পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখা দরকার- পূর্বপুরুষের অমন কৃতিত্বই প্রজন্মের মনে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করে।

কয়টি বই পাঠ্য করা হলো, তা বড় কথা নয়; বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, বিষয়গুলো একদিকে জ্ঞানচর্চার সহায়ক এবং অন্যদিকে বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেও প্রণোদিত করবে কিনা। আমাদের স্কুলশিক্ষায় পাঠদান ও পরীক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন নতুন ধারার শিক্ষাক্রম চালু করার পাশাপাশি। মেধাচর্চায় পড়াটা হওয়া উচিত আনন্দের; অর্থাৎ প্রীতিকর, ভীতিকর নয়। আমরা নীতি নির্ধারণে অকারণে-অনুকরণপ্রিয় হয়ে উঠেছি। কোনো বিদেশি পণ্ডিত তার দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কী ছক আঁকলেন, তাই আমাদের প্রয়োগ করতে হবে কেন! দীর্ঘকাল ধরে আমরা গতানুগতিক ধারায় প্রশ্নপত্র তৈরি করে থাকি। আমরা প্রশ্নগুলোকে ছোট প্রশ্ন, মাঝারি প্রশ্ন, বড় প্রশ্ন এমন নানাভাবে ভাগ করে নিতে পারি। এতে শিক্ষার্থী কোচিং বা গাইড বইনির্ভর না হয়েও মূল বই পড়ার মধ্য দিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে পারবে।

অনেকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানাতে গেলে শিক্ষার্থীকে অনেক বড় সিলেবাসের চাপে পড়তে হবে। এতে তাদের মধ্যে ইতিহাস পাঠের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নেবে। আসলে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে আমাদের সাতপুরোনো ইতিহাসবোধ ও ইতিহাস শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং ইতিহাস গ্রন্থে ইতিহাস উপস্থাপনের দুর্বলতার কারণে। ইতিহাস লিখতে হবে শিক্ষার্থীর বয়স অর্থাৎ ক্লাস বিবেচনায় এবং গল্পের ঢংয়ে সরল উপস্থাপনায়। এসব বই তখনই জীবন্ত হয়, যখন এ ধারার বই রচনায় দক্ষ ইতিহাস লেখকের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। একটি শিক্ষাবর্ষে যে কটি পাঠ নির্ধারিত থাকে, তার ভেতরে থেকেই তিনি বই রচনা করবেন। উদ্ধৃতি, সন, তারিখ আর নামের ছড়াছড়ি কমিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিক গল্পটাকেই তিনি উপজীব্য করবেন। এ ধারার ইতিহাস পাঠ শিক্ষার্থীর কাছে আরও হৃদয়গ্রাহী হবে, যখন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ইতিহাস পাঠকে অনেকটা গল্পবলার আনন্দ নিয়ে উপস্থাপন করবেন। অর্থাৎ ইতিহাস পঠন-পাঠনেও আনতে হবে পরিবর্তন। এ কারণে প্রয়োজনে শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষিত করতে হবে। ছেলেবেলায় স্কুল-কলেজের ইতিহাস পাঠে শেখানো হয়েছে গাদা গাদা লিখতে হবে। একটু পরপর উদ্ধৃতি দিতে হবে। যত বেশি সম্ভব সন তারিখ ব্যবহার করতে হবে। এসবের চাপে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ত শিক্ষার্থীরা। সে কারণেই বলি-ইতিহাস বই এবং পাঠদান আনন্দময় করার গুরুদায়িত্ব পালন করে শিশুমনে ইতিহাস ঐতিহ্যের একটি ছবি আঁকতে হবে। প্রজন্মের মনে দেশাত্মবোধ ছাড়া দেশ এগোবে কেমন করে?

আমরা নতুন কারিকুলামকে স্বাগত জানাই। তবে এমন একটি পরিবর্তন আনার সময় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মানুষদের মতামত প্রদানের সুযোগ রাখার অনুরোধ জানাব। মানতে হবে, স্কুলশিক্ষার প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গণ্ডিবদ্ধ সিদ্ধান্তে যে ফল ভালো হয় না, এর প্রমাণ তো আমরা পেলাম ইতিহাস পাঠকে গুরুত্বহীন করে তোলা দেখে। আশা করি, আমাদের সংশ্লিষ্ট আইন প্রণেতারা সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের দিকেই এগিয়ে যাবেন।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস পাঠ আবশ্যিক হতে হবে

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১০ সালে গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতির সূত্রে শুনেছিলাম, দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থী অভিন্ন সিলেবাসে পড়বে। একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে গ্রুপ পছন্দ করবে। পৃথিবীর অনেক দেশ শিক্ষাক্রম অনেকটা এভাবেই সাজায়। সে সময় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেশি দূর আগানো যায়নি। আমাদের দেশে একটি অদ্ভুত ব্যাপার আছে; কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি সমন্বিতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও অধিক ক্ষমতাশালী কারও মনঃপূত না হলে মূল কমিটিকে অন্ধকারে রেখে পকেট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কার্যকর হয়ে যায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত। যেমন জেএসসি ও পিইসি নামের দুটো বিশেষায়িত পাবলিক পরীক্ষা নাকি সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। ২০১১ সালে এনসিটিবিতে নতুন শিক্ষানীতির আলোকে কারিকুলাম তৈরি ও বই লেখার কমিটিতে আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও বিশ্বসভ্যতা নিয়ে মাধ্যমিক ও নিুমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রস্তাবিত খসড়ার জন্য ইংরেজিতে একটি শিরোনাম ঠিক করা হয়-‘বাংলাদেশ অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ’। এর বাংলা নামকরণটি আমি সেই টেবিলেই প্রস্তাব করেছিলাম ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’। এক বাক্যে সবাই গ্রহণ করেছিলেন। এভাবে তখন ইতিহাস পাঠ গুরুত্ব পেয়েছিল দেখে ভালো লেগেছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করতে থাকি, নতুন নতুন অদ্ভুতসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে থাকল। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে এই সভাতেই প্রথম কথা উঠেছিল। আমরা আমাদের জ্ঞানমতে সৃজনশীলের একটি কাঠামো ব্যাখ্যা করেছিলাম; যাতে শিক্ষার্থীরা সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বা তাদের দেখা নদী, খেলার মাঠ, উৎসব, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইত্যাদি দেখে নিজের মতো করে লিখতে পারে। এতে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটবে। অথচ কার্যকর করার ক্ষেত্রে দেখা গেল জটিল এক ধরনের ‘সৃজনশীল’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তা সামাল দিতে মেধাচর্চায় সৃজনশীলতা প্রকাশের চেয়ে শিক্ষার্থী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকও নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন গাইড বইয়ের ওপর। যখন আমরা জ্ঞান বিকাশের প্রয়োজনে কাঠামোবদ্ধ পরীক্ষার ভার কমানোর কথা বলে আসছিলাম, তখনই একদিন চমকে উঠে দেখলাম-এসএসসির আগে আরেকটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন হলো। শুনলাম, একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিই নাকি জেএসসি পরীক্ষার প্রস্তাব করেছে। এরপরে আমাদের আতঙ্কিত করে খবর বেরুলো- এবার পঞ্চম শ্রেণির শিশুরাও পাবলিক পরীক্ষা দেবে। একটি টকশোতে সে সময়ে শিক্ষা সচিব বেশ গর্বভরে বলেছিলেন, পিইসি নাকি তার মেধাবী চিন্তার ফসল। শিশু শিক্ষা নিয়ে এসব ছেলেখেলা সম্ভবত বাংলাদেশেই সম্ভব।

বর্তমান মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ; স্কুল শিক্ষার কারিকুলামে যেসব পরিবর্তন আনার কথা আমরা বলে আসছিলাম, লিখে আসছিলাম অনেকদিন থেকে- অনেকটা সেই আলোকেই সরকার ভাবতে পেরেছে। যে সম্মানিত বিশেষজ্ঞ কমিটি এই প্রস্তাবনা নিয়ে এসেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। এসব কারণে সম্প্রতি স্কুল শিক্ষা কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব আমাদের অনেকটা স্বস্তি দিয়েছে। অবশ্য প্রস্তাবনার কোনো কোনো বিষয় নিয়ে আরও ভাবনার অবকাশ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। এসব প্রসঙ্গে পরে এক সময় লেখার আশা রইল।

জানলাম, চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৮টি বই ও ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে পড়তে হবে ১০টি বই। একটি বড় অস্বস্তি বোধ করছি- যখন অভিন্ন সিলেবাসে পড়াতে প্রস্তাবিত ১০টি বইয়ের তালিকা দেখলাম। যেখানে শিক্ষায় এগিয়ে থাকা দেশগুলো স্কুলশিক্ষা থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত যার যার দেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা পাঠ আবশ্যিক মনে করে; চিকিৎসা বিজ্ঞান বা প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষার্থীরাও অন্তত নিজ দেশের ইতিহাস পড়তে বাধ্য, সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন সিলেবাসে ১০টি বইয়ের প্রস্তাব থাকলেও সেখানে ইতিহাস বই পাঠের কোনো ব্যবস্থা নেই। জ্ঞানমূলক পাঠের বদলে বৃত্তিমূলক পাঠে মনোনিবেশ করলে সেখানে প্রজন্মকে শ্রমিক বানানো যেতে পারে, বড় উদ্ভাবক তৈরি করা কঠিন।

কেউ কেউ বলেন, সমাজ বইয়ে খানিকটা ইতিহাসের ছোঁয়া আছে; তাতেই হবে। অতীতে আমাদের শিশু শিক্ষার কারিকুলামে দেখা যেত, বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের যেন ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিল্পকলা পড়ার আবশ্যকতা নেই। ওসব পড়বে মানবিক শাখার ছেলেমেয়েরা। অথচ ইউরোপে দেখেছি, স্কুল শিক্ষায় তো বটেই; বিজ্ঞানের স্নাতকদেরও নিজ দেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হয়। না হলে স্ব স্ব জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে কেমন করে! পশ্চিম বাংলার কারিকুলামে বহু আগে থেকেই এমন সভ্য সংস্কার হয়েছে।

আমি ১৯৯২ সালের একটি অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে চাই। গবেষণার কাজে তখন কলকাতায় আছি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদিন আমি ইস্টার্ন বাইপাস দিয়ে বাসে উত্তর কলকাতায় ফিরছি। পথে এক স্টপেজ থেকে বেশ কজন স্কুলছাত্রী উঠল। আমার পাশের ফাঁকা সিটটিতে বসল একটি মেয়ে। ওদের স্কুলশিক্ষা জানার জন্য আলাপ শুরু করলাম। খুব সপ্রতিভ মেয়ে। আমি বাংলাদেশ থেকে পিএইচডি গবেষণার জন্য এখানে এসেছি জেনে ওর কৌতূহল বাড়ল। পিএইচডি সম্পর্কে ওর কিছুটা ধারণা রয়েছে। কারণ, ওর পরিবারে তিনজন পিএইচডি করা মানুষ রয়েছেন। মেয়েটি ক্লাস নাইনে পড়ে। ওর কাছেই জানলাম-দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠলে ওরা গ্রুপ ভাগের সুযোগ পাবে। মেয়েটির ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়ার ইচ্ছা। আমাদের দেশে দেখেছি, কারিকুলামের কারণেই বোধ হয় যে শিক্ষার্থী বিজ্ঞান পড়ছে বা ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়বে, তার কলাবিদ্যার বিষয় নিয়ে তেমন আগ্রহ থাকে না। একইভাবে কলাবিদ্যার শিক্ষার্থীর অনাগ্রহ থাকে বিজ্ঞান জানায়।

এ মেয়েটির ক্ষেত্রে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো। আমার গবেষণার বিষয় ইতিহাস এবং মধ্যযুগের বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি জানার পর ওর আগ্রহ বেড়ে গেল। বাকি রাস্তা মেয়েটি বাংলার সুফিধারা ও শ্রী চৈতন্যের নব্যবৈষ্ণব আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে আমাকে বিস্মিত করে তুলল। পরদিন আমি আমার শিক্ষক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর অমলেন্দু দে স্যারকে আমার বিস্ময়ের কথা জানালাম। স্যার মৃদু হাসলেন। নবম-দশম শ্রেণির অভিন্ন সিলেবাসের আলোকে স্যারের লেখা ইতিহাস বইটি আমাকে পড়তে দিলেন। আদ্যোপান্ত পড়ে বুঝলাম এই পাঠ্যবইটি পড়া হলে বাংলা ও ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মূল ধারাক্রম একজন শিশু শিক্ষার্থীকে আলোকিত করবে। দেশাত্মবোধ তাদের উজ্জীবিত করবে।

কিন্তু দুঃখের সঙ্গে দেখেছি, আমাদের দেশে যারা কারিকুলাম তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকেন; বিশেষ করে যারা বাস্তবায়ন করেন, তারা এসব সত্য বিবেচনা করতে চান না। স্কুল সিলেবাসের কারিকুলাম দেখলে, বিশেষ করে সমাজ বইয়ের ইতিহাস নির্বাচন দেখে আমার কখনো মনে হয়নি এই ইতিহাস পড়ে তেমন কোনো লাভ হবে। সেখানে রয়েছে প্রধানত গৎবাঁধা রাজনৈতিক ইতিহাস। বড়জোর মোগল শাসনপর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের পরিধি থাকে সেখানে। পেছনে গেলেও তা এতই গৎবাঁধা যে, পাঠ তেমন আনন্দময় হয় না। হাজার বছরের বাঙালির উজ্জ্বল ঐতিহ্য, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক জীবনের ছোঁয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা এসব বই পড়ে শিক্ষার্থীর পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখা দরকার- পূর্বপুরুষের অমন কৃতিত্বই প্রজন্মের মনে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করে।

কয়টি বই পাঠ্য করা হলো, তা বড় কথা নয়; বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, বিষয়গুলো একদিকে জ্ঞানচর্চার সহায়ক এবং অন্যদিকে বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেও প্রণোদিত করবে কিনা। আমাদের স্কুলশিক্ষায় পাঠদান ও পরীক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন নতুন ধারার শিক্ষাক্রম চালু করার পাশাপাশি। মেধাচর্চায় পড়াটা হওয়া উচিত আনন্দের; অর্থাৎ প্রীতিকর, ভীতিকর নয়। আমরা নীতি নির্ধারণে অকারণে-অনুকরণপ্রিয় হয়ে উঠেছি। কোনো বিদেশি পণ্ডিত তার দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কী ছক আঁকলেন, তাই আমাদের প্রয়োগ করতে হবে কেন! দীর্ঘকাল ধরে আমরা গতানুগতিক ধারায় প্রশ্নপত্র তৈরি করে থাকি। আমরা প্রশ্নগুলোকে ছোট প্রশ্ন, মাঝারি প্রশ্ন, বড় প্রশ্ন এমন নানাভাবে ভাগ করে নিতে পারি। এতে শিক্ষার্থী কোচিং বা গাইড বইনির্ভর না হয়েও মূল বই পড়ার মধ্য দিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে পারবে।

অনেকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানাতে গেলে শিক্ষার্থীকে অনেক বড় সিলেবাসের চাপে পড়তে হবে। এতে তাদের মধ্যে ইতিহাস পাঠের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নেবে। আসলে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে আমাদের সাতপুরোনো ইতিহাসবোধ ও ইতিহাস শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং ইতিহাস গ্রন্থে ইতিহাস উপস্থাপনের দুর্বলতার কারণে। ইতিহাস লিখতে হবে শিক্ষার্থীর বয়স অর্থাৎ ক্লাস বিবেচনায় এবং গল্পের ঢংয়ে সরল উপস্থাপনায়। এসব বই তখনই জীবন্ত হয়, যখন এ ধারার বই রচনায় দক্ষ ইতিহাস লেখকের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। একটি শিক্ষাবর্ষে যে কটি পাঠ নির্ধারিত থাকে, তার ভেতরে থেকেই তিনি বই রচনা করবেন। উদ্ধৃতি, সন, তারিখ আর নামের ছড়াছড়ি কমিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিক গল্পটাকেই তিনি উপজীব্য করবেন। এ ধারার ইতিহাস পাঠ শিক্ষার্থীর কাছে আরও হৃদয়গ্রাহী হবে, যখন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ইতিহাস পাঠকে অনেকটা গল্পবলার আনন্দ নিয়ে উপস্থাপন করবেন। অর্থাৎ ইতিহাস পঠন-পাঠনেও আনতে হবে পরিবর্তন। এ কারণে প্রয়োজনে শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষিত করতে হবে। ছেলেবেলায় স্কুল-কলেজের ইতিহাস পাঠে শেখানো হয়েছে গাদা গাদা লিখতে হবে। একটু পরপর উদ্ধৃতি দিতে হবে। যত বেশি সম্ভব সন তারিখ ব্যবহার করতে হবে। এসবের চাপে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ত শিক্ষার্থীরা। সে কারণেই বলি-ইতিহাস বই এবং পাঠদান আনন্দময় করার গুরুদায়িত্ব পালন করে শিশুমনে ইতিহাস ঐতিহ্যের একটি ছবি আঁকতে হবে। প্রজন্মের মনে দেশাত্মবোধ ছাড়া দেশ এগোবে কেমন করে?

আমরা নতুন কারিকুলামকে স্বাগত জানাই। তবে এমন একটি পরিবর্তন আনার সময় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মানুষদের মতামত প্রদানের সুযোগ রাখার অনুরোধ জানাব। মানতে হবে, স্কুলশিক্ষার প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গণ্ডিবদ্ধ সিদ্ধান্তে যে ফল ভালো হয় না, এর প্রমাণ তো আমরা পেলাম ইতিহাস পাঠকে গুরুত্বহীন করে তোলা দেখে। আশা করি, আমাদের সংশ্লিষ্ট আইন প্রণেতারা সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের দিকেই এগিয়ে যাবেন।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন