পরিবর্তনের পথে শিক্ষা
jugantor
পরিবর্তনের পথে শিক্ষা

  অমিত রায় চৌধুরী  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত দশকজুড়েই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা সবার নজরে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও বিবর্তিত সময়ের চাহিদাকে আমলে নিয়ে ভবিষ্যৎ গন্তব্য ঠিক করার চেষ্টা দেখা গেছে। নানারকম পরিবর্তন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষার চরিত্র কেমন হবে তা নির্ধারণের নিরলস প্রয়াস চোখে পড়েছে। সাফল্য বিচার করবে সময়। তবে অনেক কাজ হয়েছে, যা বুঝতে কষ্ট হয় না। অনেক মৌলিক ভাবনার প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রযুক্তি যেভাবে প্রশাসনিক, একাডেমিক, এমনকি আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও বদল এনেছে, তা এক কথায় বৈপ্লবিক। ভর্তি, নিবন্ধন, পরীক্ষা, ফলাফল, বৃত্তি-উপবৃত্তি, ইউআইডি অথবা দাপ্তরিক যোগাযোগ-সব ক্ষেত্রেই নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের সাম্প্রতিক উদ্যোগ এমন অনেক মহৎ প্রচেষ্টারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সবদিক বিবেচনায় ২০২৩ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া কারিকুলামটি ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের আদর্শ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জলবায়ু, শারীরিক ও মানসিক গড়ন, সমসাময়িক বিশ্ব, চাহিদার বাজার, প্রযুক্তির আসন্ন দাপট, বিশ্ব অর্থনীতি, কৌশলগত ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য-সব কিছুকে আমলে নিয়েই এ কারিকুলামটি বিবেচিত হবে। সবখানেই কাঙ্ক্ষিত মানের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন-শিক্ষা আনন্দহীন, স্মৃতিনির্ভর ও কার্যত সনদমুখী। দক্ষতা এখানে যথেষ্ট ম্লান। এখানে একজন ভালো গ্রেড পাচ্ছে; কিন্তু চাকরির বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে বিদেশি জনবলের চাহিদা বাড়ছে। আবার ধনী ব্যবসায়ী, সুবিধাভোগী আমলা ও প্রভাবশালী রাজনীতিকরা নিজের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে বিদেশে পাঠানোর তথাকথিত আভিজাত্য ও স্বার্থপরতার উন্নাসিক চর্চা করেন। বলা বাহুল্য, তারা সমাজ বা পরিবার থেকে দেশপ্রেমের শিক্ষা নেননি। ফলে নব্য ধনিক শ্রেণির এ অংশ দেশে ফেরার কোনো তাড়না অনুভব করেনি। অন্যদিকে দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমেই মিডিওক্রেসির দুর্ভাগ্যজনক চক্রে আবর্তিত হয়েছে। শিক্ষকের মান কিংবা শিক্ষার পরিবেশ কোনোটারই উন্নয়নের চেষ্টা চোখে পড়েনি। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে দেশীয় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই নিচের দিকে নেমেছে।

সামাজিক ও মানব উন্নয়ন সূচকে দেশের অর্জন বিস্ময়কর। দেশের সামনে লক্ষ্য ২০৩০-এ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। একদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, অন্যদিকে বিশ্বজনীন মান অর্জন। লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারলে সব অর্জন ভেস্তে যাবে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, ব্যবস্থার খোলনলচে বদলানো দরকার। শিক্ষাগ্রহণ হবে আনন্দময় পরিবেশে। শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। পরীক্ষার চাপ শিশু নেবে না। ব্যবস্থা হবে বিকেন্দ্রীভূত। শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হবে নানা মাত্রায়। কেবল সামষ্টিক মূল্যায়ন নয়, ধারাবাহিক মূল্যায়ন। শিক্ষার্থীর দেহ, মন ও মেধা বিকাশের গতি প্রকৃতি-সবখানেই নজরদারি চলবে। কল্পনার বিস্তার ঘটবে। শিক্ষার্থীর দক্ষতা ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োগ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা তৈরি হবে। ৪র্থ ও ৫ম শিল্প বিপ্লবোত্তর সময়ে টিকে থাকার ক্ষমতা লাভ করবে।

সবচেয়ে বড় স্বপ্ন-এ শিক্ষার পরিধি থাকবে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, মেগাসিটি থেকে হাওড়-বনাঞ্চল, অভিজাত বসতি থেকে বস্তি সর্বত্রই। জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজে সুযোগের বৈষম্য দূর করবে। সুষম বিকাশ নিশ্চিত হবে। কীভাবে সেটি সম্ভব? প্রথমেই দরকার পরিবেশগত সমতা-যেখানে এ প্রস্তাবিত পদ্ধতি কাজ করে। ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেই। ১০ম ও দ্বাদশ শ্রেণি ছাড়া কোথাও পাবলিক পরীক্ষার ভীতিও নেই। ভালো কথা। কিন্তু সে লেখাপড়া করাবে কে? নিশ্চয়ই শিক্ষক। এখন বুঝতেই হবে তাকে কতটা সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও প্রশিক্ষিত হতে হয়। ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত শতভাগ শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন। ৮ম পর্যন্ত ৬০ শতাংশ ধারাবাহিক, বাকিটা সামষ্টিক মূল্যায়ন। ৯ম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক, বাকিটা বিভিন্ন পদ্ধতিতে সামষ্টিক মূল্যায়ন। আমাদের অভিজ্ঞতা আছে ব্যবহারিক পরীক্ষার। দেখেছি কারিগরি শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিক মূল্যায়ন বা স্নাতক পর্যায়ে ইনকোর্স পত্রের সংযোজন। সে তো মীমাংসিত আপস। ব্যবহারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকনির্ভর পরীক্ষার মাধ্যমে ঢালাও নম্বর বিতরণের ফলে শিক্ষার্থীর যে ক্ষতি হয়েছে, তা চিন্তার অতীত। দক্ষতা বা জ্ঞান অর্জন দূরে থাক, যুগ যুগ ধরে শিক্ষাব্যবস্থায় টিকে থাকা ব্যবহারিক পরীক্ষার রেওয়াজটাই আজ বিলুপ্তির পথে। খুব কম প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে আজ অভ্যন্তরীণ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হয়। এর প্রয়োজন না আছে শিক্ষকের, না আছে শিক্ষার্থীর। আর কোয়ালিটি? এর হাহাকার তো সর্বত্রই। স্কোর, গ্রেড আর বেকারত্ব! এখন প্রশ্ন উঠবে-এসব মূল্যায়ন তো শিক্ষককে করতে হবে। এতদিন যিনি এ কাজ করেছেন কখনো বিবেকের শাসনে, কখনো লোভের তাড়নায়। ছাত্রের ভাগ্য কি এ সম্ভাবনার দোলাচলে ছেড়ে দেওয়া যায়? কখনো আশাও করা যায় না। শুধু শিক্ষক নয়, সব প্রতিষ্ঠানেই এখন কোয়ালিটির সংকট। সেটি তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে চিকিৎসা বা প্রকৌশল, এমনকি রাজনীতিতেও। সবখানেই এ প্রশ্ন এখন প্রবল থেকে প্রবলতর। স্বাধীন রাষ্ট্রের আমলা বলেন-তিনি সেবক, কিন্তু হতে চান ‘স্যার’, যার নিরুচ্চার অর্থ প্রভু। শিক্ষকও হবেন অফিসার, চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী, এমনকি রাজনীতিক-সবাই ‘স্যার’। সম্বোধনের ভাষিক প্রয়োজনে নয়, মনের গভীরে বেড়ে ওঠা কর্তৃত্বের বিলাস। দেখেছি শিক্ষক কষ্ট পান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স নিয়ে। ভালো চেম্বারের অভাব তাকে উদ্বিগ্ন করে; কিন্তু শিক্ষার্থীর অক্ষমতা তাকে পরাজিত করে না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট যদি ক্ষমতা ও লোভের মোহে আক্রান্ত থাকে, তাহলে মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত আমরা কাকে বলব?

সে যাই হোক, প্রস্তাবিত কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন পড়বে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের। কীভাবে সেটি সম্ভব? দরকার হবে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষকের মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি। সামাজিক সম্মানের পাশাপাশি আকর্ষণীয় বেতন। এখানে কোনো আপস নেই। অবকাঠামো হবে উন্নত ও প্রযুক্তিবান্ধব। এরপর দরকার তদারকি। অ্যাসাইনমেন্ট থেকে ধারাবাহিক মূল্যায়ন। যে কোনো কৌশলেই ক্রসচেকিং দরকার। শক্ত সার্ভিল্যান্স। র‌্যান্ডাম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে হলেও তা করতে হবে। দ্বিতীয়-তৃতীয় শিক্ষকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পিয়ার ইভ্যালিউশনও কাজে দিতে পারে। অত্যন্ত ফলদায়ক ও বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেরা মেধাবী সন্তানই যেন শিক্ষক হতে উদ্বুদ্ধ হয়। শিক্ষার চেয়ে বড় বিনিয়োগ আর নেই। অফিসার বানানোর জন্য শিক্ষকের দরকার নেই; নিষ্ঠা, প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার চাই। যারা কর্মরত আছেন, তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ, প্রবৃদ্ধি বা পদোন্নতির সঙ্গে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও সততাকে যুক্ত করা প্রয়োজন। এটা করতে না পারলে বিকেন্দ্রীভূত শিক্ষা প্রশাসন সুফল দেবে না। ভালোকে প্রণোদনা দিতে হবে। যার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাকে অন্য কোথাও ব্যবহার করা যাবে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুত, নিবেদিত ও মেধাবী শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক নিজে উদ্বুদ্ধ না হলে তিনি ছাত্রের অ্যাসাইনমেন্ট পড়বেন না, ফিডব্যাক দেবেন না। আর মনিটরিং দুর্বল হলে শিক্ষার্থীও আগ্রহ হারাবে।

এ অবস্থায় কোচিং বা গৃহশিক্ষকতা কমে আসবে-এভাবে আমরা ভাবছি কেন? পাবলিক পরীক্ষা কমে গেলে বা শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন জারি থাকলে কোচিংয়ের গুরুত্ব কমে আসে-একথা সত্য। প্রশ্নফাঁস, নকল বা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়ার উপদ্রব থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। তবে প্রথমেই বুঝতে হবে-সমাজে চাহিদা না থাকলে কোনো পণ্যের জোগানই সম্ভব হয় না। দেখেছি পদস্থ চাকরি থেকে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক। সবাই অগোচরে খোঁজ করেছেন ভালো টিউটরের। নিজের সন্তানকে যে কোনো পথে উতরে নিতে। কেন তিনি এটা করেছেন? আসলে এটাই এখন সংস্কৃতি। এটাই বাস্তবতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটাই হয়তো অপরিহার্য ছিল। তাহলে ঘাটতি কোথায়? ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। স্কুল-কলেজকে আমরা যদি আরও উন্নত করতে না পারি, ছাত্রছাত্রী যদি আনন্দের সঙ্গে লেখাপড়া করতে না পারে, শিক্ষককে আস্থায় নিতে না পারে, তবে তার আলাদা প্রয়োজন থাকবেই। অন্যদিক থেকেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে-নিয়মিত ক্লাসের বাইরে যদি কোনো ছাত্র মনে করে তার আলাদা সমর্থন প্রয়োজন, তাহলে দোষের কিছু দেখি না। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রেও এ সমর্থনটা জরুরি। তবে কারিকুলাম বাস্তবায়িত হলে কোচিং শিল্পের আকার ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকবে, আর গাইড-নোট বিলুপ্ত হবে-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

শ্রেণিকক্ষকে আকর্ষণীয় করতে, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহ সৃষ্টি করতে বিষয় ও পাঠ্য নির্বাচন খুবই জরুরি। কোন্ বয়সের ছেলেমেয়েরা কোথায় মজা পায়, উৎসাহ পায় তা দেখতে হবে। খেয়াল করেছি, কম বয়সি বাচ্চাদের অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, অনন্ত মহাকাশ, রহস্যময় নক্ষত্র, পাহাড়, সমুদ্র, নদী, গভীর অরণ্য-এসবে সীমাহীন কৌতূহল। কারও উৎসাহ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৃষ্টির অসীম ভুবনে ভেসে বেড়ানোয়। ছোট ছোট যন্ত্রপাতির ব্যবহার, যা দৈনন্দিন জীবনে খুব দরকার, তা সৃষ্টি ও উদ্ভাবনেও তার সমান আনন্দ। বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে নতুন শিক্ষাক্রমে আবশ্যিক করার ভাবনা এসেছে। আগ্রহী শিক্ষার্থী ধর্মশাস্ত্র পড়ুক বা কারিগরি ট্রেড বেছে নিক, তাতে আপত্তি নেই। তবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ, জলবায়ু-সব বিষয়ে সবার প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু থাকুক-এটাই প্রত্যাশা। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদা; যা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে দেশের অতীত ও ঐতিহ্যকে ঘিরে। গোটা বিশ্ব একসময় বাংলাকে ঐশ্বর্য, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র ভেবেছে। আজ সেই ঐশ্বর্য আমাদের আবারও হাতছানি দিচ্ছে। নতুন কারিকুলাম আমাদের জন্য সমৃদ্ধির নতুন বার্তা বয়ে আনুক-এ বিশ্বাস আমরা রাখতেই পারি।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com

পরিবর্তনের পথে শিক্ষা

 অমিত রায় চৌধুরী 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত দশকজুড়েই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা সবার নজরে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও বিবর্তিত সময়ের চাহিদাকে আমলে নিয়ে ভবিষ্যৎ গন্তব্য ঠিক করার চেষ্টা দেখা গেছে। নানারকম পরিবর্তন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষার চরিত্র কেমন হবে তা নির্ধারণের নিরলস প্রয়াস চোখে পড়েছে। সাফল্য বিচার করবে সময়। তবে অনেক কাজ হয়েছে, যা বুঝতে কষ্ট হয় না। অনেক মৌলিক ভাবনার প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রযুক্তি যেভাবে প্রশাসনিক, একাডেমিক, এমনকি আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও বদল এনেছে, তা এক কথায় বৈপ্লবিক। ভর্তি, নিবন্ধন, পরীক্ষা, ফলাফল, বৃত্তি-উপবৃত্তি, ইউআইডি অথবা দাপ্তরিক যোগাযোগ-সব ক্ষেত্রেই নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের সাম্প্রতিক উদ্যোগ এমন অনেক মহৎ প্রচেষ্টারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সবদিক বিবেচনায় ২০২৩ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া কারিকুলামটি ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের আদর্শ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জলবায়ু, শারীরিক ও মানসিক গড়ন, সমসাময়িক বিশ্ব, চাহিদার বাজার, প্রযুক্তির আসন্ন দাপট, বিশ্ব অর্থনীতি, কৌশলগত ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য-সব কিছুকে আমলে নিয়েই এ কারিকুলামটি বিবেচিত হবে। সবখানেই কাঙ্ক্ষিত মানের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন-শিক্ষা আনন্দহীন, স্মৃতিনির্ভর ও কার্যত সনদমুখী। দক্ষতা এখানে যথেষ্ট ম্লান। এখানে একজন ভালো গ্রেড পাচ্ছে; কিন্তু চাকরির বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে বিদেশি জনবলের চাহিদা বাড়ছে। আবার ধনী ব্যবসায়ী, সুবিধাভোগী আমলা ও প্রভাবশালী রাজনীতিকরা নিজের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে বিদেশে পাঠানোর তথাকথিত আভিজাত্য ও স্বার্থপরতার উন্নাসিক চর্চা করেন। বলা বাহুল্য, তারা সমাজ বা পরিবার থেকে দেশপ্রেমের শিক্ষা নেননি। ফলে নব্য ধনিক শ্রেণির এ অংশ দেশে ফেরার কোনো তাড়না অনুভব করেনি। অন্যদিকে দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমেই মিডিওক্রেসির দুর্ভাগ্যজনক চক্রে আবর্তিত হয়েছে। শিক্ষকের মান কিংবা শিক্ষার পরিবেশ কোনোটারই উন্নয়নের চেষ্টা চোখে পড়েনি। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে দেশীয় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই নিচের দিকে নেমেছে।

সামাজিক ও মানব উন্নয়ন সূচকে দেশের অর্জন বিস্ময়কর। দেশের সামনে লক্ষ্য ২০৩০-এ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। একদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, অন্যদিকে বিশ্বজনীন মান অর্জন। লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারলে সব অর্জন ভেস্তে যাবে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, ব্যবস্থার খোলনলচে বদলানো দরকার। শিক্ষাগ্রহণ হবে আনন্দময় পরিবেশে। শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। পরীক্ষার চাপ শিশু নেবে না। ব্যবস্থা হবে বিকেন্দ্রীভূত। শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হবে নানা মাত্রায়। কেবল সামষ্টিক মূল্যায়ন নয়, ধারাবাহিক মূল্যায়ন। শিক্ষার্থীর দেহ, মন ও মেধা বিকাশের গতি প্রকৃতি-সবখানেই নজরদারি চলবে। কল্পনার বিস্তার ঘটবে। শিক্ষার্থীর দক্ষতা ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োগ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা তৈরি হবে। ৪র্থ ও ৫ম শিল্প বিপ্লবোত্তর সময়ে টিকে থাকার ক্ষমতা লাভ করবে।

সবচেয়ে বড় স্বপ্ন-এ শিক্ষার পরিধি থাকবে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, মেগাসিটি থেকে হাওড়-বনাঞ্চল, অভিজাত বসতি থেকে বস্তি সর্বত্রই। জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজে সুযোগের বৈষম্য দূর করবে। সুষম বিকাশ নিশ্চিত হবে। কীভাবে সেটি সম্ভব? প্রথমেই দরকার পরিবেশগত সমতা-যেখানে এ প্রস্তাবিত পদ্ধতি কাজ করে। ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেই। ১০ম ও দ্বাদশ শ্রেণি ছাড়া কোথাও পাবলিক পরীক্ষার ভীতিও নেই। ভালো কথা। কিন্তু সে লেখাপড়া করাবে কে? নিশ্চয়ই শিক্ষক। এখন বুঝতেই হবে তাকে কতটা সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও প্রশিক্ষিত হতে হয়। ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত শতভাগ শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন। ৮ম পর্যন্ত ৬০ শতাংশ ধারাবাহিক, বাকিটা সামষ্টিক মূল্যায়ন। ৯ম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক, বাকিটা বিভিন্ন পদ্ধতিতে সামষ্টিক মূল্যায়ন। আমাদের অভিজ্ঞতা আছে ব্যবহারিক পরীক্ষার। দেখেছি কারিগরি শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিক মূল্যায়ন বা স্নাতক পর্যায়ে ইনকোর্স পত্রের সংযোজন। সে তো মীমাংসিত আপস। ব্যবহারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকনির্ভর পরীক্ষার মাধ্যমে ঢালাও নম্বর বিতরণের ফলে শিক্ষার্থীর যে ক্ষতি হয়েছে, তা চিন্তার অতীত। দক্ষতা বা জ্ঞান অর্জন দূরে থাক, যুগ যুগ ধরে শিক্ষাব্যবস্থায় টিকে থাকা ব্যবহারিক পরীক্ষার রেওয়াজটাই আজ বিলুপ্তির পথে। খুব কম প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে আজ অভ্যন্তরীণ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হয়। এর প্রয়োজন না আছে শিক্ষকের, না আছে শিক্ষার্থীর। আর কোয়ালিটি? এর হাহাকার তো সর্বত্রই। স্কোর, গ্রেড আর বেকারত্ব! এখন প্রশ্ন উঠবে-এসব মূল্যায়ন তো শিক্ষককে করতে হবে। এতদিন যিনি এ কাজ করেছেন কখনো বিবেকের শাসনে, কখনো লোভের তাড়নায়। ছাত্রের ভাগ্য কি এ সম্ভাবনার দোলাচলে ছেড়ে দেওয়া যায়? কখনো আশাও করা যায় না। শুধু শিক্ষক নয়, সব প্রতিষ্ঠানেই এখন কোয়ালিটির সংকট। সেটি তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে চিকিৎসা বা প্রকৌশল, এমনকি রাজনীতিতেও। সবখানেই এ প্রশ্ন এখন প্রবল থেকে প্রবলতর। স্বাধীন রাষ্ট্রের আমলা বলেন-তিনি সেবক, কিন্তু হতে চান ‘স্যার’, যার নিরুচ্চার অর্থ প্রভু। শিক্ষকও হবেন অফিসার, চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী, এমনকি রাজনীতিক-সবাই ‘স্যার’। সম্বোধনের ভাষিক প্রয়োজনে নয়, মনের গভীরে বেড়ে ওঠা কর্তৃত্বের বিলাস। দেখেছি শিক্ষক কষ্ট পান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স নিয়ে। ভালো চেম্বারের অভাব তাকে উদ্বিগ্ন করে; কিন্তু শিক্ষার্থীর অক্ষমতা তাকে পরাজিত করে না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট যদি ক্ষমতা ও লোভের মোহে আক্রান্ত থাকে, তাহলে মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত আমরা কাকে বলব?

সে যাই হোক, প্রস্তাবিত কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন পড়বে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের। কীভাবে সেটি সম্ভব? দরকার হবে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষকের মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি। সামাজিক সম্মানের পাশাপাশি আকর্ষণীয় বেতন। এখানে কোনো আপস নেই। অবকাঠামো হবে উন্নত ও প্রযুক্তিবান্ধব। এরপর দরকার তদারকি। অ্যাসাইনমেন্ট থেকে ধারাবাহিক মূল্যায়ন। যে কোনো কৌশলেই ক্রসচেকিং দরকার। শক্ত সার্ভিল্যান্স। র‌্যান্ডাম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে হলেও তা করতে হবে। দ্বিতীয়-তৃতীয় শিক্ষকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পিয়ার ইভ্যালিউশনও কাজে দিতে পারে। অত্যন্ত ফলদায়ক ও বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেরা মেধাবী সন্তানই যেন শিক্ষক হতে উদ্বুদ্ধ হয়। শিক্ষার চেয়ে বড় বিনিয়োগ আর নেই। অফিসার বানানোর জন্য শিক্ষকের দরকার নেই; নিষ্ঠা, প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার চাই। যারা কর্মরত আছেন, তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ, প্রবৃদ্ধি বা পদোন্নতির সঙ্গে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও সততাকে যুক্ত করা প্রয়োজন। এটা করতে না পারলে বিকেন্দ্রীভূত শিক্ষা প্রশাসন সুফল দেবে না। ভালোকে প্রণোদনা দিতে হবে। যার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাকে অন্য কোথাও ব্যবহার করা যাবে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুত, নিবেদিত ও মেধাবী শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক নিজে উদ্বুদ্ধ না হলে তিনি ছাত্রের অ্যাসাইনমেন্ট পড়বেন না, ফিডব্যাক দেবেন না। আর মনিটরিং দুর্বল হলে শিক্ষার্থীও আগ্রহ হারাবে।

এ অবস্থায় কোচিং বা গৃহশিক্ষকতা কমে আসবে-এভাবে আমরা ভাবছি কেন? পাবলিক পরীক্ষা কমে গেলে বা শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন জারি থাকলে কোচিংয়ের গুরুত্ব কমে আসে-একথা সত্য। প্রশ্নফাঁস, নকল বা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়ার উপদ্রব থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। তবে প্রথমেই বুঝতে হবে-সমাজে চাহিদা না থাকলে কোনো পণ্যের জোগানই সম্ভব হয় না। দেখেছি পদস্থ চাকরি থেকে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক। সবাই অগোচরে খোঁজ করেছেন ভালো টিউটরের। নিজের সন্তানকে যে কোনো পথে উতরে নিতে। কেন তিনি এটা করেছেন? আসলে এটাই এখন সংস্কৃতি। এটাই বাস্তবতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটাই হয়তো অপরিহার্য ছিল। তাহলে ঘাটতি কোথায়? ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। স্কুল-কলেজকে আমরা যদি আরও উন্নত করতে না পারি, ছাত্রছাত্রী যদি আনন্দের সঙ্গে লেখাপড়া করতে না পারে, শিক্ষককে আস্থায় নিতে না পারে, তবে তার আলাদা প্রয়োজন থাকবেই। অন্যদিক থেকেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে-নিয়মিত ক্লাসের বাইরে যদি কোনো ছাত্র মনে করে তার আলাদা সমর্থন প্রয়োজন, তাহলে দোষের কিছু দেখি না। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রেও এ সমর্থনটা জরুরি। তবে কারিকুলাম বাস্তবায়িত হলে কোচিং শিল্পের আকার ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকবে, আর গাইড-নোট বিলুপ্ত হবে-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

শ্রেণিকক্ষকে আকর্ষণীয় করতে, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহ সৃষ্টি করতে বিষয় ও পাঠ্য নির্বাচন খুবই জরুরি। কোন্ বয়সের ছেলেমেয়েরা কোথায় মজা পায়, উৎসাহ পায় তা দেখতে হবে। খেয়াল করেছি, কম বয়সি বাচ্চাদের অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, অনন্ত মহাকাশ, রহস্যময় নক্ষত্র, পাহাড়, সমুদ্র, নদী, গভীর অরণ্য-এসবে সীমাহীন কৌতূহল। কারও উৎসাহ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৃষ্টির অসীম ভুবনে ভেসে বেড়ানোয়। ছোট ছোট যন্ত্রপাতির ব্যবহার, যা দৈনন্দিন জীবনে খুব দরকার, তা সৃষ্টি ও উদ্ভাবনেও তার সমান আনন্দ। বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে নতুন শিক্ষাক্রমে আবশ্যিক করার ভাবনা এসেছে। আগ্রহী শিক্ষার্থী ধর্মশাস্ত্র পড়ুক বা কারিগরি ট্রেড বেছে নিক, তাতে আপত্তি নেই। তবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ, জলবায়ু-সব বিষয়ে সবার প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু থাকুক-এটাই প্রত্যাশা। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদা; যা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে দেশের অতীত ও ঐতিহ্যকে ঘিরে। গোটা বিশ্ব একসময় বাংলাকে ঐশ্বর্য, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র ভেবেছে। আজ সেই ঐশ্বর্য আমাদের আবারও হাতছানি দিচ্ছে। নতুন কারিকুলাম আমাদের জন্য সমৃদ্ধির নতুন বার্তা বয়ে আনুক-এ বিশ্বাস আমরা রাখতেই পারি।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন