সরকারি বেতনভোগীদের সম্পদের হিসাব প্রদান বাধ্যতামূলক হোক
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
সরকারি বেতনভোগীদের সম্পদের হিসাব প্রদান বাধ্যতামূলক হোক

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের বিষয়টি সম্প্রতি গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে আলোচনায় এসেছে। উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১১, ১২ ও ১৩ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের সম্পত্তি অর্জন, বিক্রয় ও সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমে আলোচনায় যেসব বিষয় উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. এটি সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া একটি ভালো উদ্যোগ এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা; খ. সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলে সরকারি চাকরিজীবীদের অনীহা; গ. বিধিমালার দুর্বলতা; ঘ. জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা।

সরকার ১৯৭৯ সালে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা প্রণয়ন করে তা বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশ করে। মেট্রোপলিটন পুলিশের অধস্তন কর্মকর্তাবৃন্দ ও পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার নিুের পুলিশ বাহিনীর সদস্যবৃন্দ, বাংলাদেশ রাইফেলসের অধস্তন কর্মকর্তা, রাইফেলম্যান ও সিগন্যালম্যান, বাংলাদেশ জেলের ডেপুটি জেলার ও সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টরের পদমর্যাদার নিম্নের অধস্তন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্দিষ্টকৃত চাকরি বা পদে অধিষ্ঠিত কর্মচারীবৃন্দ ছাড়া দেশের ভেতরে বা বাইরে অবস্থানরত সব বেসামরিক কর্মচারীর (এখানে ‘কর্মচারী’ বলে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) ক্ষেত্রে এ বিধিমালা প্রযোজ্য।

এ বিধিমালার ১৩ বিধির ১নং উপবিধিতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে চাকরিতে প্রবেশের সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তার অথবা তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন শেয়ার সার্টিফিকেট, সিকিউরিটি, বিমা পলিসি ও দশ হাজার টাকা বা এর অধিক সর্বমোট অলংকারাদিসহ সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সম্পর্কে সরকারের নিকট ঘোষণা দিতে হবে। আর উপবিধি ২-এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে প্রতি পাঁচ বছর পর ডিসেম্বর মাসে সর্বশেষ দাখিলকৃত বিবরণীতে প্রদর্শিত সম্পত্তির হ্রাস-বৃদ্ধির বিবরণী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের নিকট দাখিল করতে হবে। ১১নং বিধিতে একজন সরকারি চাকরিজীবী কর্তৃক তার মূল্যবান স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। আর ১২নং বিধিতে কোনো সরকারি চাকরিজীবী কর্তৃক ইমারত নির্মাণে অর্থের উৎস উল্লেখপূর্বক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতার উল্লেখ রয়েছে।

অনেকে মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীর সম্পত্তির সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তির বিবরণী দাখিলের বাধ্যবাধকতা এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছে। যুগান্তরের ১৪ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে ‘জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। কারণ বিদ্যমান বিধিমালাটি ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সম্পদের হিসাব বলতে শুধু একজনের নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পরিবার ও তার ওপর নির্ভরশীল সবার হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক। মূল সমস্যাটি এখানেই।

কারণ এ ক্ষেত্রে সম্পদের হিসাব নিতে হবে বিপুলসংখ্যক মানুষের, অন্তত ৩০ লাখ ব্যক্তির। এ সক্ষমতা সরকারের আছে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান বিধিমালার সংশোধন বা নতুন একটি আইন করা উচিত।’ এ প্রসঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার আগে দেখা যাক বিধিমালায় সরকারি চাকরিজীবীর পরিবার বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, যারা সরকারি কর্মচারীর পরিবারের সদস্য বলে অন্তর্ভুক্ত, তারা হলেন তার সঙ্গে বসবাসরত অথবা বসবাসরত নন স্ত্রী/স্বামী, সন্তান বা সৎসন্তান এবং তার সঙ্গে বসবাসরত এবং তার ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল তার নিজের বা স্ত্রীর/স্বামীর আত্মীয়স্বজন। অন্যদিকে পেনশন বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীর পরিবার বলতে বোঝায় তার স্ত্রী/স্বামী, সন্তান এবং মৃত ছেলের স্ত্রী ও সন্তানাদি। পেনশন বিধিমালার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপ্তির তুলনায় সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার পরিবারের সদস্যের ব্যাপ্তি কিছুটা বেশি।

এর কারণ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় উল্লিখিত পরিবারের সদস্যরা সরকারি চাকরিজীবীর আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। তাদের সম্পদের উৎস সরকারি চাকরিজীবীর বৈধ বা অবৈধ আয় কিনা তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অসৎ সরকারি কর্মচারীরা অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ তাদের স্পাউস, সন্তান বা আত্মীয়স্বজনের নামে স্থানান্তর করেন-এমন নজিরের অভাব নেই। সেদিক বিবেচনায় পরিবারের সদস্য নির্ধারণে বিদ্যমান সংজ্ঞাটি যথাযথ হয়েছে। পেনশন বিধিমালায় উল্লিখিত পরিবারের সদস্যরা সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুতেই কেবল তার পাওনা আর্থিক সুবিধাদি ভোগ করতে পারেন। আর যে কারণে সরকারি চাকরিজীবীরা সম্পদের হিসাব দাখিলে অনীহা প্রদর্শন করেন, তা হলো বিষয়টিকে সরকারের গুরুত্বসহকারে না দেখা।

সম্পদের হিসাব দাখিল না করার জন্য কোনো সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কোনো নজির আছে বলে জানা নেই। প্রত্যেক বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব দাখিলের ২০০২ সালের বিধানটি বিষয়টির গুরুত্ব বহুলাংশে কমিয়েছে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের এ বিষয়ে অনাগ্রহী করে তুলেছে। প্রতি বছর সম্পদের হিসাব দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে এবং সরকার তা বাস্তবায়নে কঠোর হলে সরকারি চাকরিজীবীরা সম্পদ বিবরণী দাখিলে অভ্যস্ত হয়ে উঠতেন। পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের সুযোগ নিয়ে অনেক পদস্থ কর্মকর্তা চাকরির একেবারে শেষদিকে দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে ওঠেন।

দেশে দুর্নীতির নাটকে তিন কুশীলবের একজন হলেন সরকারি চাকরিজীবী। অন্য দুজন হলেন রাজনীতিক, বিশেষ করে যিনি/যারা প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী পদে নিয়োজিত এবং বেসরকারি খাতের ব্যক্তি। দুর্নীতির মূলে রয়েছে এ তিন পক্ষের যোগসাজশ। প্রতি বছর সম্পদের হিসাব দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে সরকারি চাকরিজীবী ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দুর্নীতি কমে যাবে।

যেসব জনপ্রতিনিধি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত থাকার জন্য সরকার থেকে বেতন-ভাতা পান, বা যেসব জনপ্রতিনিধি সরকার থেকে পারিতোষিক, ভাতা ইত্যাদি পান, সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তাদেরও সম্পদের বিবরণী দাখিলের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া যেসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহে সরকারের আর্থিক সহায়তা চলমান রয়েছে, সেগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সম্পদের বিবরণী দাখিল করার বিধান করতে হবে। আওয়ামী লীগের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনি ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস জনসমক্ষে প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

২০১১ সালের ৪ জুলাই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়-এখন থেকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমমর্যাদার ব্যক্তিদের তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রাপ্ত সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করবেন। এ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ, মিডিয়া উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেনি। এর কারণগুলো হলো- ক. মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের নির্দেশনা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে ছিল না।

খ. সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হিসাব দাখিলের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা সভার সিদ্ধান্তে ছিল না। গ. সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থা অর্থাৎ দুর্নীতি দমন কমিশন বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে এসব সম্পদ বিবরণী পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ ‘ফলোআপ’ করার কোনো নির্দেশনা সিদ্ধান্তে ছিল না। বাস্তবে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের হিসাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেন কিনা, দিলে তার অফিস থেকে সেগুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করা হয় কিনা, করা হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কী ব্যবস্থা নেয়-এসব বিষয়ে কিছু জানা যায় না।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে যা করা প্রয়োজন তা হলো, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ বাতিল করে একটি আইন প্রণয়ন. যেখানে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত বেসামরিক কর্মকর্তা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিবর্গ, সংসদ সদস্য, পুরোপুরি বা আংশিকভাবে সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ) প্রধান নির্বাহী (সিটি মেয়র, পৌর মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান) এবং তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর দাখিল বাধ্যতামূলক বলে বিবেচিত হবে।

আইনে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে যা যা থাকতে পারে সেগুলো হলো-প্রত্যেক বছরের আয় ও সম্পদের হিসাব নির্দিষ্ট ছকে পরবর্তী বছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যে দাখিল করতে হবে। যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের হিসাব দাখিলে ব্যর্থ হবেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান থাকবে। পুরো বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে প্রক্রিয়াকরণের স্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিবর্গ, সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র, পৌর মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর নির্দিষ্ট ছকে দাখিল বাধ্যতামূলক করা হলে এবং অবৈধভাবে সম্পদ আহরণের দায়ে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান করা গেলে তা প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনয়নে এবং দুর্নীতি হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

সরকারি বেতনভোগীদের সম্পদের হিসাব প্রদান বাধ্যতামূলক হোক

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের বিষয়টি সম্প্রতি গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে আলোচনায় এসেছে। উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১১, ১২ ও ১৩ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের সম্পত্তি অর্জন, বিক্রয় ও সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমে আলোচনায় যেসব বিষয় উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. এটি সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া একটি ভালো উদ্যোগ এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা; খ. সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলে সরকারি চাকরিজীবীদের অনীহা; গ. বিধিমালার দুর্বলতা; ঘ. জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা।

সরকার ১৯৭৯ সালে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা প্রণয়ন করে তা বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশ করে। মেট্রোপলিটন পুলিশের অধস্তন কর্মকর্তাবৃন্দ ও পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার নিুের পুলিশ বাহিনীর সদস্যবৃন্দ, বাংলাদেশ রাইফেলসের অধস্তন কর্মকর্তা, রাইফেলম্যান ও সিগন্যালম্যান, বাংলাদেশ জেলের ডেপুটি জেলার ও সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টরের পদমর্যাদার নিম্নের অধস্তন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্দিষ্টকৃত চাকরি বা পদে অধিষ্ঠিত কর্মচারীবৃন্দ ছাড়া দেশের ভেতরে বা বাইরে অবস্থানরত সব বেসামরিক কর্মচারীর (এখানে ‘কর্মচারী’ বলে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) ক্ষেত্রে এ বিধিমালা প্রযোজ্য।

এ বিধিমালার ১৩ বিধির ১নং উপবিধিতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে চাকরিতে প্রবেশের সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তার অথবা তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন শেয়ার সার্টিফিকেট, সিকিউরিটি, বিমা পলিসি ও দশ হাজার টাকা বা এর অধিক সর্বমোট অলংকারাদিসহ সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সম্পর্কে সরকারের নিকট ঘোষণা দিতে হবে। আর উপবিধি ২-এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে প্রতি পাঁচ বছর পর ডিসেম্বর মাসে সর্বশেষ দাখিলকৃত বিবরণীতে প্রদর্শিত সম্পত্তির হ্রাস-বৃদ্ধির বিবরণী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের নিকট দাখিল করতে হবে। ১১নং বিধিতে একজন সরকারি চাকরিজীবী কর্তৃক তার মূল্যবান স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। আর ১২নং বিধিতে কোনো সরকারি চাকরিজীবী কর্তৃক ইমারত নির্মাণে অর্থের উৎস উল্লেখপূর্বক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতার উল্লেখ রয়েছে।

অনেকে মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীর সম্পত্তির সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তির বিবরণী দাখিলের বাধ্যবাধকতা এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছে। যুগান্তরের ১৪ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে ‘জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। কারণ বিদ্যমান বিধিমালাটি ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সম্পদের হিসাব বলতে শুধু একজনের নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পরিবার ও তার ওপর নির্ভরশীল সবার হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক। মূল সমস্যাটি এখানেই।

কারণ এ ক্ষেত্রে সম্পদের হিসাব নিতে হবে বিপুলসংখ্যক মানুষের, অন্তত ৩০ লাখ ব্যক্তির। এ সক্ষমতা সরকারের আছে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান বিধিমালার সংশোধন বা নতুন একটি আইন করা উচিত।’ এ প্রসঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার আগে দেখা যাক বিধিমালায় সরকারি চাকরিজীবীর পরিবার বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, যারা সরকারি কর্মচারীর পরিবারের সদস্য বলে অন্তর্ভুক্ত, তারা হলেন তার সঙ্গে বসবাসরত অথবা বসবাসরত নন স্ত্রী/স্বামী, সন্তান বা সৎসন্তান এবং তার সঙ্গে বসবাসরত এবং তার ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল তার নিজের বা স্ত্রীর/স্বামীর আত্মীয়স্বজন। অন্যদিকে পেনশন বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীর পরিবার বলতে বোঝায় তার স্ত্রী/স্বামী, সন্তান এবং মৃত ছেলের স্ত্রী ও সন্তানাদি। পেনশন বিধিমালার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপ্তির তুলনায় সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার পরিবারের সদস্যের ব্যাপ্তি কিছুটা বেশি।

এর কারণ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় উল্লিখিত পরিবারের সদস্যরা সরকারি চাকরিজীবীর আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। তাদের সম্পদের উৎস সরকারি চাকরিজীবীর বৈধ বা অবৈধ আয় কিনা তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অসৎ সরকারি কর্মচারীরা অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ তাদের স্পাউস, সন্তান বা আত্মীয়স্বজনের নামে স্থানান্তর করেন-এমন নজিরের অভাব নেই। সেদিক বিবেচনায় পরিবারের সদস্য নির্ধারণে বিদ্যমান সংজ্ঞাটি যথাযথ হয়েছে। পেনশন বিধিমালায় উল্লিখিত পরিবারের সদস্যরা সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুতেই কেবল তার পাওনা আর্থিক সুবিধাদি ভোগ করতে পারেন। আর যে কারণে সরকারি চাকরিজীবীরা সম্পদের হিসাব দাখিলে অনীহা প্রদর্শন করেন, তা হলো বিষয়টিকে সরকারের গুরুত্বসহকারে না দেখা।

সম্পদের হিসাব দাখিল না করার জন্য কোনো সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কোনো নজির আছে বলে জানা নেই। প্রত্যেক বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব দাখিলের ২০০২ সালের বিধানটি বিষয়টির গুরুত্ব বহুলাংশে কমিয়েছে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের এ বিষয়ে অনাগ্রহী করে তুলেছে। প্রতি বছর সম্পদের হিসাব দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে এবং সরকার তা বাস্তবায়নে কঠোর হলে সরকারি চাকরিজীবীরা সম্পদ বিবরণী দাখিলে অভ্যস্ত হয়ে উঠতেন। পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের সুযোগ নিয়ে অনেক পদস্থ কর্মকর্তা চাকরির একেবারে শেষদিকে দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে ওঠেন।

দেশে দুর্নীতির নাটকে তিন কুশীলবের একজন হলেন সরকারি চাকরিজীবী। অন্য দুজন হলেন রাজনীতিক, বিশেষ করে যিনি/যারা প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী পদে নিয়োজিত এবং বেসরকারি খাতের ব্যক্তি। দুর্নীতির মূলে রয়েছে এ তিন পক্ষের যোগসাজশ। প্রতি বছর সম্পদের হিসাব দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে সরকারি চাকরিজীবী ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দুর্নীতি কমে যাবে।

যেসব জনপ্রতিনিধি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত থাকার জন্য সরকার থেকে বেতন-ভাতা পান, বা যেসব জনপ্রতিনিধি সরকার থেকে পারিতোষিক, ভাতা ইত্যাদি পান, সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তাদেরও সম্পদের বিবরণী দাখিলের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া যেসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহে সরকারের আর্থিক সহায়তা চলমান রয়েছে, সেগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সম্পদের বিবরণী দাখিল করার বিধান করতে হবে। আওয়ামী লীগের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনি ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস জনসমক্ষে প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

২০১১ সালের ৪ জুলাই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়-এখন থেকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমমর্যাদার ব্যক্তিদের তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রাপ্ত সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করবেন। এ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ, মিডিয়া উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেনি। এর কারণগুলো হলো- ক. মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের নির্দেশনা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে ছিল না।

খ. সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হিসাব দাখিলের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা সভার সিদ্ধান্তে ছিল না। গ. সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থা অর্থাৎ দুর্নীতি দমন কমিশন বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে এসব সম্পদ বিবরণী পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ ‘ফলোআপ’ করার কোনো নির্দেশনা সিদ্ধান্তে ছিল না। বাস্তবে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের হিসাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেন কিনা, দিলে তার অফিস থেকে সেগুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করা হয় কিনা, করা হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কী ব্যবস্থা নেয়-এসব বিষয়ে কিছু জানা যায় না।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে যা করা প্রয়োজন তা হলো, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ বাতিল করে একটি আইন প্রণয়ন. যেখানে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত বেসামরিক কর্মকর্তা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিবর্গ, সংসদ সদস্য, পুরোপুরি বা আংশিকভাবে সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ) প্রধান নির্বাহী (সিটি মেয়র, পৌর মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান) এবং তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর দাখিল বাধ্যতামূলক বলে বিবেচিত হবে।

আইনে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে যা যা থাকতে পারে সেগুলো হলো-প্রত্যেক বছরের আয় ও সম্পদের হিসাব নির্দিষ্ট ছকে পরবর্তী বছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যে দাখিল করতে হবে। যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের হিসাব দাখিলে ব্যর্থ হবেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান থাকবে। পুরো বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে প্রক্রিয়াকরণের স্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ব্যক্তিবর্গ, সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র, পৌর মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর নির্দিষ্ট ছকে দাখিল বাধ্যতামূলক করা হলে এবং অবৈধভাবে সম্পদ আহরণের দায়ে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান করা গেলে তা প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনয়নে এবং দুর্নীতি হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন