দেশ ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপমুক্ত হোক
jugantor
দেশ ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপমুক্ত হোক

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা শহরে গরিব মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। অলিতে-গলিতে, রাস্তায়-ফুটপাতে এসব মানুষ সাহায্যের জন্য হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন। সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়ালে গাড়ির দরজায় টোকা মেরে সাহায্য প্রার্থনা করেন। সারা দেশ থেকে আগত এসব অসহায় মানুষ নিরুপায় হয়ে রাজধানী শহরে জড়ো হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির পেশা বেছে নিয়েছেন। আর দিনের পর দিন এসব মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।

ঢাকা শহরে এ শ্রেণির ভিক্ষুকের সংখ্যা কত সে বিষয়ে সরকারের হাতে কোনো পরিসংখ্যান আছে কিনা তা জানা নেই, তবে বতর্মান অবস্থায় তাদের সংখ্যা যে অনেক বেড়ে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। আর এ বর্ধিত সংখ্যার দরিদ্র মানুষ যত্রতত্র ভিক্ষার জন্য যখন-তখন যেভাবে হাত পাতেন, তা একটি দেশ ও জাতির জন্য মোটেও সম্মানজনক নয়।

সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়িতে বসা দেশি-বিদেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা গাড়ির দরজা-জানালায় হাত দিয়ে আঘাত করেন, যে বিষয়টি অনেকেরই পছন্দের নয়। গুলশান-১-এর সিগন্যালে বিড়ম্বিত এমন একজন বিদেশিকে বলতে শুনেছি, ‘যিধঃ রং ঃযরং’! একজন ভিক্ষুক তার গাড়ির দরজায় বারবার হাত দিয়ে আঘাত করে ভিক্ষার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তাকে ভীষণভাবে বিরক্ত হতে দেখা গেল। আর এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে।

আমাদের আÍসম্মান রক্ষার্থে এসব বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় জাতি হিসাবে আমরা যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি, তা প্রমাণিত হয় না। যে দেশে শত শত হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়, সেই দেশেরই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়-ফুটপাতে ভিক্ষার জন্য কেন হাত পেতে থাকেন, সে বিষয়টিও ভেবে দেখা প্রয়োজন। অন্যথায় দেশে যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে, সে বিষয়টিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। উন্নয়নের সুফল যে এসব হতদরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, হাজার হাজার মানুষের ভিক্ষাবৃত্তি সেটাই প্রমাণ করে।

রাজধানী ঢাকা শহর ছাড়াও সারা দেশেই ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। তবে রাজধানীতে এদের সংখ্যা এত বেশি যে, রাস্তাঘাটে বের হলে তাদের মুখোমুখি হয়ে অনেক নাগরিকই বিড়ম্বিত হন। কারণ যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এসব অসহায় মানুষকে অনেকের পক্ষেই সবসময় পকেট হাতড়ে টাকা-পয়সা বের করে সাহায্য করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব ঘটনায় অনেকেই মানসিক অতৃপ্তি বা অশান্তি ভোগ করেন।

অথচ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নির্বিকার। তাদের দপ্তর থেকে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করা তথা রাজধানীতে তাদের তৎপরতা বন্ধ করার কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হয় না, যদিও এটি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের আওতাধীন। এ অবস্থায় সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, রাজধানীসহ সারা দেশের ভিক্ষুকদের একটি পরিসংখ্যান সরকারের কাছে বা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে এ বিষয়ে একটি বাজেট প্রণয়ন করে এসব ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হোক।

আমার মনে হয় না, এমন একটি প্রকল্প সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হলে তা পাশ হবে না। দেশের প্রতিটি জেলায় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করে কর্মক্ষম ভিক্ষুককে আলাদা করে নির্দিষ্ট সীমানা প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে তাদের বৃত্তি বা পেশায় নিয়োজিত করলে পেশাদার ভিক্ষুকরা ভয় পাবে এবং এ কাজে তারা নিরুৎসাহিত হবে। আর প্রকৃতপক্ষে যারা কর্মক্ষম নয়, তাদের খাওয়া-পরা, চিকিৎসার ব্যবস্থা সরকারকেই বহন করতে হবে। মোট কথা, যে হারে শহর-বন্দর-নগরে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, তাতে এ বিষয়ে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দেশে-বিদেশে জাতি হিসাবে আমাদের সুনাম বিনষ্ট হবে।

বতর্মানে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর অন্যতম। এদেশে ধনী মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। অথচ সেই দেশটির শহরে-বন্দরে-গ্রামে অজস্র ভিক্ষুক! এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, এখানে সম্পদ বণ্টনের ব্যবধান অত্যন্ত প্রকট। দিন দিন এখানে ধনী আরও ধনসম্পদের মালিক হচ্ছেন, আর গরিব হচ্ছেন আরও গরিব।

দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বেসরকারি দুর্নীতিবাজ, ব্যাংক লুটেরা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রের একটি নেক্সাস এমনভাবে অর্থনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে যে এ জোট ভাঙার শক্তি কারও নেই। আবার দেশের প্রায় সবকিছু প্রাইভেটাইজেশনের কারণে বিভিন্ন করপোরেট হাউজ মোটা অঙ্কের মুনাফা লাভের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে বিধায় সেসব স্থানে কাজ করা মানুষ ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন, যাকে কমিউনিস্টরা আখ্যায়িত করেন শ্রম চুরি বলে। ফলে সরকারি অফিসের বড় বড় দুর্নীতিবাজ থেকে শুরু করে অবৈধ দখলদার, ব্যাংক লুটেরা শ্রেণি, একশ্রেণির করপোরেট হাউজ ইত্যাদি এদেশে ফুলেফেঁপে উঠলেও এসবের ধারেকাছেও সাধারণ মানুষ ভিড়তে পারেন না।

অর্থাৎ সাধারণ মানুষ ওইসব ঘুস, দুর্নীতি, লুটপাটের অংশীদার নন। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব অপকর্ম চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া অন্য কিছু করার নেই। ফলে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিু মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেণির মানুষ লুটেরাদের ধনসম্পদের নিচে চাপা পড়ায় তাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কারণ আগেই বলেছি- ধনী আরও ধনী হচ্ছেন, আর গরিব আরও গরিব। আর দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরই একটি অংশ বেকার, কর্মহীন বা অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা ভিক্ষাবৃত্তির পথে পা বাড়ান। যদিও কেউ কেউ বলবেন, এসব ভিক্ষুকের অনেকেই পেশাদার, অর্থাৎ কর্মক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তারা ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত। তাদের সে কথা স্বীকার করেও বলতে চাই- অতি সহজেই তারা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট পেশাটি বেছে নিয়েছেন, এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। কাজকর্মের অভাবও এজন্য দায়ী।

যাক সে কথা। এখন জনগণের একটি অংশকে এমন নিকৃষ্টতম ও ঘৃণ্য পেশা থেকে বের করে আনাই হবে সময়ের কাজ। আর সেজন্য সরকারসহ সমাজের সব স্তর থেকেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের ধনী সমাজসহ রাজনীতিক, সমাজকর্মী ইত্যাদি সবাইকে এ বিষয়ে সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। নিজ নিজ সংসদীয় এলাকার ভিক্ষুকদের তালিকা করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব করতে পারলে একদিন নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সফলতা আসবে। ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপ থেকে দেশ ও জাতি মুক্ত হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে- দেশের রাস্তায়, ফুটপাতে, অলিতে-গলিতে, গ্রামে-গঞ্জে একশ্রেণির লোক ভিক্ষা করে বেড়াবে আর আমরা অন্য আরেক শ্রেণি চকচকে গাড়ি করে ঘুরে বেড়াব- এমনটি মোটেই মানানসই নয়। সারা দেশে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য ভিক্ষুককে পুনর্বাসন না করে, তাদের অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা না করে দামি দামি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি আমাদের বিবেককে নাড়া দিক- এ লেখাটির মাধ্যমে আমি তেমনটিই প্রত্যাশা করি।

কারণ ওইসব অসহায়-দরিদ্র মানুষ এ দেশ, এ জাতিরই একটি অংশ। আর হিসাব মেলালে দেখা যাবে তারা আমাদেরই কেউ না কেউ। সুতরাং সরকার, ধনী ব্যবসায়ী, সমাজকর্মীসহ সবার প্রতিই আমার উদাত্ত আহ্বান- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের দেশ ভিক্ষাবৃত্তিমুক্ত একটি দেশ হোক। কারণ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা, নেপালের কাঠমান্ডু ইত্যাদি শহরের রাস্তাঘাটে, ফুটপাতে ভিক্ষুক নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় আমাদের দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন আছে। অতঃপর আমাদের দেশ ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপমুক্ত হবে, তেমনটিই প্রত্যাশা রইল।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

দেশ ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপমুক্ত হোক

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা শহরে গরিব মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। অলিতে-গলিতে, রাস্তায়-ফুটপাতে এসব মানুষ সাহায্যের জন্য হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন। সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়ালে গাড়ির দরজায় টোকা মেরে সাহায্য প্রার্থনা করেন। সারা দেশ থেকে আগত এসব অসহায় মানুষ নিরুপায় হয়ে রাজধানী শহরে জড়ো হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির পেশা বেছে নিয়েছেন। আর দিনের পর দিন এসব মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।

ঢাকা শহরে এ শ্রেণির ভিক্ষুকের সংখ্যা কত সে বিষয়ে সরকারের হাতে কোনো পরিসংখ্যান আছে কিনা তা জানা নেই, তবে বতর্মান অবস্থায় তাদের সংখ্যা যে অনেক বেড়ে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। আর এ বর্ধিত সংখ্যার দরিদ্র মানুষ যত্রতত্র ভিক্ষার জন্য যখন-তখন যেভাবে হাত পাতেন, তা একটি দেশ ও জাতির জন্য মোটেও সম্মানজনক নয়।

সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়িতে বসা দেশি-বিদেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা গাড়ির দরজা-জানালায় হাত দিয়ে আঘাত করেন, যে বিষয়টি অনেকেরই পছন্দের নয়। গুলশান-১-এর সিগন্যালে বিড়ম্বিত এমন একজন বিদেশিকে বলতে শুনেছি, ‘যিধঃ রং ঃযরং’! একজন ভিক্ষুক তার গাড়ির দরজায় বারবার হাত দিয়ে আঘাত করে ভিক্ষার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তাকে ভীষণভাবে বিরক্ত হতে দেখা গেল। আর এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে।

আমাদের আÍসম্মান রক্ষার্থে এসব বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় জাতি হিসাবে আমরা যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি, তা প্রমাণিত হয় না। যে দেশে শত শত হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়, সেই দেশেরই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়-ফুটপাতে ভিক্ষার জন্য কেন হাত পেতে থাকেন, সে বিষয়টিও ভেবে দেখা প্রয়োজন। অন্যথায় দেশে যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে, সে বিষয়টিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। উন্নয়নের সুফল যে এসব হতদরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, হাজার হাজার মানুষের ভিক্ষাবৃত্তি সেটাই প্রমাণ করে।

রাজধানী ঢাকা শহর ছাড়াও সারা দেশেই ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। তবে রাজধানীতে এদের সংখ্যা এত বেশি যে, রাস্তাঘাটে বের হলে তাদের মুখোমুখি হয়ে অনেক নাগরিকই বিড়ম্বিত হন। কারণ যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এসব অসহায় মানুষকে অনেকের পক্ষেই সবসময় পকেট হাতড়ে টাকা-পয়সা বের করে সাহায্য করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব ঘটনায় অনেকেই মানসিক অতৃপ্তি বা অশান্তি ভোগ করেন।

অথচ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নির্বিকার। তাদের দপ্তর থেকে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করা তথা রাজধানীতে তাদের তৎপরতা বন্ধ করার কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হয় না, যদিও এটি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের আওতাধীন। এ অবস্থায় সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, রাজধানীসহ সারা দেশের ভিক্ষুকদের একটি পরিসংখ্যান সরকারের কাছে বা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে এ বিষয়ে একটি বাজেট প্রণয়ন করে এসব ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হোক।

আমার মনে হয় না, এমন একটি প্রকল্প সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হলে তা পাশ হবে না। দেশের প্রতিটি জেলায় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করে কর্মক্ষম ভিক্ষুককে আলাদা করে নির্দিষ্ট সীমানা প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে তাদের বৃত্তি বা পেশায় নিয়োজিত করলে পেশাদার ভিক্ষুকরা ভয় পাবে এবং এ কাজে তারা নিরুৎসাহিত হবে। আর প্রকৃতপক্ষে যারা কর্মক্ষম নয়, তাদের খাওয়া-পরা, চিকিৎসার ব্যবস্থা সরকারকেই বহন করতে হবে। মোট কথা, যে হারে শহর-বন্দর-নগরে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, তাতে এ বিষয়ে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দেশে-বিদেশে জাতি হিসাবে আমাদের সুনাম বিনষ্ট হবে।

বতর্মানে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর অন্যতম। এদেশে ধনী মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। অথচ সেই দেশটির শহরে-বন্দরে-গ্রামে অজস্র ভিক্ষুক! এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, এখানে সম্পদ বণ্টনের ব্যবধান অত্যন্ত প্রকট। দিন দিন এখানে ধনী আরও ধনসম্পদের মালিক হচ্ছেন, আর গরিব হচ্ছেন আরও গরিব।

দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বেসরকারি দুর্নীতিবাজ, ব্যাংক লুটেরা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রের একটি নেক্সাস এমনভাবে অর্থনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে যে এ জোট ভাঙার শক্তি কারও নেই। আবার দেশের প্রায় সবকিছু প্রাইভেটাইজেশনের কারণে বিভিন্ন করপোরেট হাউজ মোটা অঙ্কের মুনাফা লাভের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে বিধায় সেসব স্থানে কাজ করা মানুষ ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন, যাকে কমিউনিস্টরা আখ্যায়িত করেন শ্রম চুরি বলে। ফলে সরকারি অফিসের বড় বড় দুর্নীতিবাজ থেকে শুরু করে অবৈধ দখলদার, ব্যাংক লুটেরা শ্রেণি, একশ্রেণির করপোরেট হাউজ ইত্যাদি এদেশে ফুলেফেঁপে উঠলেও এসবের ধারেকাছেও সাধারণ মানুষ ভিড়তে পারেন না।

অর্থাৎ সাধারণ মানুষ ওইসব ঘুস, দুর্নীতি, লুটপাটের অংশীদার নন। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব অপকর্ম চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া অন্য কিছু করার নেই। ফলে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিু মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেণির মানুষ লুটেরাদের ধনসম্পদের নিচে চাপা পড়ায় তাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কারণ আগেই বলেছি- ধনী আরও ধনী হচ্ছেন, আর গরিব আরও গরিব। আর দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরই একটি অংশ বেকার, কর্মহীন বা অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা ভিক্ষাবৃত্তির পথে পা বাড়ান। যদিও কেউ কেউ বলবেন, এসব ভিক্ষুকের অনেকেই পেশাদার, অর্থাৎ কর্মক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তারা ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত। তাদের সে কথা স্বীকার করেও বলতে চাই- অতি সহজেই তারা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট পেশাটি বেছে নিয়েছেন, এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। কাজকর্মের অভাবও এজন্য দায়ী।

যাক সে কথা। এখন জনগণের একটি অংশকে এমন নিকৃষ্টতম ও ঘৃণ্য পেশা থেকে বের করে আনাই হবে সময়ের কাজ। আর সেজন্য সরকারসহ সমাজের সব স্তর থেকেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের ধনী সমাজসহ রাজনীতিক, সমাজকর্মী ইত্যাদি সবাইকে এ বিষয়ে সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। নিজ নিজ সংসদীয় এলাকার ভিক্ষুকদের তালিকা করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব করতে পারলে একদিন নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সফলতা আসবে। ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপ থেকে দেশ ও জাতি মুক্ত হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে- দেশের রাস্তায়, ফুটপাতে, অলিতে-গলিতে, গ্রামে-গঞ্জে একশ্রেণির লোক ভিক্ষা করে বেড়াবে আর আমরা অন্য আরেক শ্রেণি চকচকে গাড়ি করে ঘুরে বেড়াব- এমনটি মোটেই মানানসই নয়। সারা দেশে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য ভিক্ষুককে পুনর্বাসন না করে, তাদের অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা না করে দামি দামি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি আমাদের বিবেককে নাড়া দিক- এ লেখাটির মাধ্যমে আমি তেমনটিই প্রত্যাশা করি।

কারণ ওইসব অসহায়-দরিদ্র মানুষ এ দেশ, এ জাতিরই একটি অংশ। আর হিসাব মেলালে দেখা যাবে তারা আমাদেরই কেউ না কেউ। সুতরাং সরকার, ধনী ব্যবসায়ী, সমাজকর্মীসহ সবার প্রতিই আমার উদাত্ত আহ্বান- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের দেশ ভিক্ষাবৃত্তিমুক্ত একটি দেশ হোক। কারণ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা, নেপালের কাঠমান্ডু ইত্যাদি শহরের রাস্তাঘাটে, ফুটপাতে ভিক্ষুক নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় আমাদের দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন আছে। অতঃপর আমাদের দেশ ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপমুক্ত হবে, তেমনটিই প্রত্যাশা রইল।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন