কোন পথে তালেবান?
jugantor
কোন পথে তালেবান?

  খান মাহবুব  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা দখল করে সব দল-উপজাতি নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের কথা বললেও অন্তবর্তীকালীন সরকারটি হয়েছে একচেটিয়া তালেবাননির্ভর। উপ-প্রধানমন্ত্রী আবদুল সালাম হানাফি একজন জাতিগত উজবেক হলেও তিনিও তালেবান। তার পক্ষে সংখ্যালঘুদের দাবি পূরণের সম্ভাবনা কম। প্রায় ৪ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে শতকরা ৩৮-৪২ ভাগ মানুষ জাতিগতভাবে পশতুন হলেও আফগানিস্তানে রয়েছে বহু জাতি ও উপজাতি। সেখানে রয়েছে শক্ত গোত্রীর অবকাঠামো। এসব জাতি ও উপজাতি একধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেছে এতকাল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তালেবান সরকার এককেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। একজন তাজিক ও একজন হাজরা সম্প্রদায়ের মন্ত্রী থাকলেও সরকারে বেশিরভাগই জাতিগত পশতুন। জাতিসংঘের মুখপাত্র ফরহান হক আগেই বলেছিলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, কেবল আলোচনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিষ্পত্তির মাধ্যমেই আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব।’

কে কী বলল সেদিকে নজর থাকলেও নিজেদের সিদ্ধান্তে তালেবানরা অটল। কেবল অপেক্ষা অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে এর ভিত শক্তিশালী করা। তারা জানে, বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ ছাড়া আসন্ন শীত মৌসুমে বিপর্যয় নেমে আসবে। আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আফগানদের ৯০০ কোটি ডলারের সম্পদ মজুদ আছে। এর মধ্যে আছে ১২ লাখ ডলারের স্বর্ণ আর ৩০ কোটি ডলার সমমূল্যের আন্তর্জাতিক মুদ্রা। এসব বৈদেশিক মুদ্রা আপাতত ফেরত দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আফগানিস্তানে বর্তমানে বৈদেশিক রিজার্ভ প্রায় শূন্যের কোঠায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপ্রতুলতা দূর করা এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো তারল্য নেই তালেবানদের হাতে। তাই বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। সব মিলে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নাজুক। শুধু শুকনো ফল, মসলা আর সামান্য কৃষিপণ্য রপ্তানি করে কাক্সিক্ষত বৈদেশিক আয় মিলবে না। দেশটির মাটির নিচে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজসম্পদ মজুদ থাকলেও তা সহসা কোনো কাজে আসবে না। এ অবস্থায় স্বার্থের টানে চীন, রাশিয়া ও বরাবরের বন্ধু পাকিস্তান সরকার হাত বাড়ালেও তা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিদান দিয়েই রক্ষা করতে হবে। তালেবানদের ভূ-রাজনীতির গণিত অনেক কঠিন।

তালেবান শাসনের শুরুতেই গত ৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী শেখ মৌলভী নুরুল্লাহ মুনির বলেছেন, পিএইচডি, মাস্টার্স ডিগ্রির মূল্য তাদের কাছে নেই। যে মোল্লা ও তালেবানরা ক্ষমতায় আছে, তারাই এখন সবার থেকে বড়। এ রকম যুক্তি বিবর্জিত ও দম্ভপূর্ণ বক্তব্য দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড় তুলেছে। ইতোমধ্যে তালেবান সরকার কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইডি ডিগ্রিধারী উপাচার্যকে সরিয়ে একজন সাধারণ বিএ ডিগ্রিধারীকে তার স্থলাভিষিক্ত করলে এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়টির ৭০ জন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। শুধু তাই নয়, অন্তবর্তীকালীন সরকারে পাপ-পুণ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে। এসব বিষয় আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অপ্রচলিত বিধায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা। এছাড়া মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় বন্ধ করে দিয়েছে তালেবান সরকার।

গত ২০ বছরে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকার নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতার উন্নয়নে কাজ করলেও তালেবানরা শরীয়াভিত্তিক সমাজ ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কর্মস্থলে নারী-পুরুষের একত্রে কাজ করার সুযোগ নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির মানবসূচক আরও পতনের সম্মুখীন।

আফগানিস্তানে যখন তালেবান শাসকরা ক্ষমতায়, তখন বিশ্ব রাজনীতির চালচিত্রেও এসেছে পরিবর্তন। কারণ ভূ-রাজনীতি ক্ষেত্রে আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলেও দেশটির অবস্থান মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে। পর্বতসঙ্কুল আফগানিস্তানের মাত্র ৫ শতাংশ এলাকা সমভূমি। ফলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী যুদ্ধ করেও দেশটিকে কব্জা করতে পারেনি। বরং তালেবানরা নতুন করে ক্ষমতায় আসার পর খোদ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগ বলেছে, অন্য কোনো দেশকে হুমকি দিতে যে আফগান মাটি ব্যবহার করা হবে না, তা নিশ্চিত করতে হবে। সত্যি কী বিচিত্র এই রাজনীতি! আমেরিকা এশিয়ায় তার শক্তি সুসংহত করার প্রয়াসে দুই দশক আফগানিস্তানে অবস্থান করে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে নতুন সুরে কথা বলছে।

তালেবানরা যখন ক্ষমতায় ছিল না, তখন তারা পাকিস্তানসহ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ রেখে চলেছিল। কেবল আফিম চাষের মাধ্যমেই তালেবানদের বার্ষিক আয় ছিল ১৬০ কোটি ডলার। ২০১৮ সালে কাতারের দোহায় আফগান সরকারকে বাদ দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বৈঠক ছিল তালেবানদের রাজনৈতিক কূটনীতির বড় বিজয়। তবে আজ ক্ষমতায় আরোহণ করে তালেবানরা অনেক সমস্যার সম্মুখীন। গত ৯ সেপ্টেম্বর তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ তালেবান সরকারের যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তাতে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আধুনিক বিশ্বে যে পদ্ধতিতে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তাতে তাদের পক্ষে বন্ধুরাষ্ট্রের সন্ধান মেলা দুরূহ। রাষ্ট্র পরিচালনায় তালেবানদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে।

টিকে থাকার সংগ্রামে তালেবানরা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে তৎপর। অন্তবর্তীকালীন সরকার যাত্রার শুরুতেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আফগানিস্তানে ব্যবসা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে। সম্প্রতি হাইরাতান বন্দরে তালেবান হেড অফ কাস্টমস মৌলভী সাইদ বলেছেন, বাণিজ্য বাড়াতে তারা শুল্ক কমিয়ে দিচ্ছেন এবং দেশে সম্পদশালী ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করাকে তারা উৎসাহিত করতে চান। এটি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে, আর পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীরা পুরস্কৃত হবেন।

তালেবান সরকারের বড় অংশীদার হাক্কানি নেটওয়ার্ক। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এফবিআই’র তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে তালেবানদের। এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট প্যালেসে আফগান বিজয়ে কার কর্তৃত্ব বেশি তা নিয়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ আবদুল গনি বারাদার এবং শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী হাক্কানি নেটওয়ার্কের খলিল উর রহমান হাক্কানির বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার ঘটনা।

আমি কয়েক বছর আগে আফগানিস্তান সফরে গিয়ে দেখেছি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে পশ্চিমা আধুনিকতার ছোঁয়া। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সহাবস্থান। রাস্তায় দেখেছি হিজাব আবৃত মুখমণ্ডল অনাবৃত নারীদের। তালেবানরা এখন শাসনকার্যে এবং সামাজিক ব্যবস্থায় রক্ষণশীল ব্যবস্থা চালু করবে, নাকি জনগণের যুগের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিজেদের শাসননীতিতে পরিবর্তন আনবে, তা দেখার বিষয়।

ইতিহাস থেকে অনেক জানার, বোঝার ও শেখার সুযোগ আছে। তালেবানদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা। এ ক্ষেত্রে তাদের গতিপথ ও গন্তব্য সময়ানুগ না হলে নিয়তিই তাদের গন্তব্য নির্ধারণ করবে।

খান মাহবুব : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

কোন পথে তালেবান?

 খান মাহবুব 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা দখল করে সব দল-উপজাতি নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের কথা বললেও অন্তবর্তীকালীন সরকারটি হয়েছে একচেটিয়া তালেবাননির্ভর। উপ-প্রধানমন্ত্রী আবদুল সালাম হানাফি একজন জাতিগত উজবেক হলেও তিনিও তালেবান। তার পক্ষে সংখ্যালঘুদের দাবি পূরণের সম্ভাবনা কম। প্রায় ৪ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে শতকরা ৩৮-৪২ ভাগ মানুষ জাতিগতভাবে পশতুন হলেও আফগানিস্তানে রয়েছে বহু জাতি ও উপজাতি। সেখানে রয়েছে শক্ত গোত্রীর অবকাঠামো। এসব জাতি ও উপজাতি একধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেছে এতকাল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তালেবান সরকার এককেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। একজন তাজিক ও একজন হাজরা সম্প্রদায়ের মন্ত্রী থাকলেও সরকারে বেশিরভাগই জাতিগত পশতুন। জাতিসংঘের মুখপাত্র ফরহান হক আগেই বলেছিলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, কেবল আলোচনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিষ্পত্তির মাধ্যমেই আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব।’

কে কী বলল সেদিকে নজর থাকলেও নিজেদের সিদ্ধান্তে তালেবানরা অটল। কেবল অপেক্ষা অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে এর ভিত শক্তিশালী করা। তারা জানে, বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ ছাড়া আসন্ন শীত মৌসুমে বিপর্যয় নেমে আসবে। আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আফগানদের ৯০০ কোটি ডলারের সম্পদ মজুদ আছে। এর মধ্যে আছে ১২ লাখ ডলারের স্বর্ণ আর ৩০ কোটি ডলার সমমূল্যের আন্তর্জাতিক মুদ্রা। এসব বৈদেশিক মুদ্রা আপাতত ফেরত দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আফগানিস্তানে বর্তমানে বৈদেশিক রিজার্ভ প্রায় শূন্যের কোঠায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপ্রতুলতা দূর করা এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো তারল্য নেই তালেবানদের হাতে। তাই বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। সব মিলে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নাজুক। শুধু শুকনো ফল, মসলা আর সামান্য কৃষিপণ্য রপ্তানি করে কাক্সিক্ষত বৈদেশিক আয় মিলবে না। দেশটির মাটির নিচে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজসম্পদ মজুদ থাকলেও তা সহসা কোনো কাজে আসবে না। এ অবস্থায় স্বার্থের টানে চীন, রাশিয়া ও বরাবরের বন্ধু পাকিস্তান সরকার হাত বাড়ালেও তা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিদান দিয়েই রক্ষা করতে হবে। তালেবানদের ভূ-রাজনীতির গণিত অনেক কঠিন।

তালেবান শাসনের শুরুতেই গত ৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী শেখ মৌলভী নুরুল্লাহ মুনির বলেছেন, পিএইচডি, মাস্টার্স ডিগ্রির মূল্য তাদের কাছে নেই। যে মোল্লা ও তালেবানরা ক্ষমতায় আছে, তারাই এখন সবার থেকে বড়। এ রকম যুক্তি বিবর্জিত ও দম্ভপূর্ণ বক্তব্য দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড় তুলেছে। ইতোমধ্যে তালেবান সরকার কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইডি ডিগ্রিধারী উপাচার্যকে সরিয়ে একজন সাধারণ বিএ ডিগ্রিধারীকে তার স্থলাভিষিক্ত করলে এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়টির ৭০ জন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। শুধু তাই নয়, অন্তবর্তীকালীন সরকারে পাপ-পুণ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে। এসব বিষয় আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অপ্রচলিত বিধায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা। এছাড়া মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় বন্ধ করে দিয়েছে তালেবান সরকার।

গত ২০ বছরে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকার নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতার উন্নয়নে কাজ করলেও তালেবানরা শরীয়াভিত্তিক সমাজ ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কর্মস্থলে নারী-পুরুষের একত্রে কাজ করার সুযোগ নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির মানবসূচক আরও পতনের সম্মুখীন।

আফগানিস্তানে যখন তালেবান শাসকরা ক্ষমতায়, তখন বিশ্ব রাজনীতির চালচিত্রেও এসেছে পরিবর্তন। কারণ ভূ-রাজনীতি ক্ষেত্রে আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলেও দেশটির অবস্থান মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে। পর্বতসঙ্কুল আফগানিস্তানের মাত্র ৫ শতাংশ এলাকা সমভূমি। ফলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী যুদ্ধ করেও দেশটিকে কব্জা করতে পারেনি। বরং তালেবানরা নতুন করে ক্ষমতায় আসার পর খোদ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগ বলেছে, অন্য কোনো দেশকে হুমকি দিতে যে আফগান মাটি ব্যবহার করা হবে না, তা নিশ্চিত করতে হবে। সত্যি কী বিচিত্র এই রাজনীতি! আমেরিকা এশিয়ায় তার শক্তি সুসংহত করার প্রয়াসে দুই দশক আফগানিস্তানে অবস্থান করে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে নতুন সুরে কথা বলছে।

তালেবানরা যখন ক্ষমতায় ছিল না, তখন তারা পাকিস্তানসহ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ রেখে চলেছিল। কেবল আফিম চাষের মাধ্যমেই তালেবানদের বার্ষিক আয় ছিল ১৬০ কোটি ডলার। ২০১৮ সালে কাতারের দোহায় আফগান সরকারকে বাদ দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বৈঠক ছিল তালেবানদের রাজনৈতিক কূটনীতির বড় বিজয়। তবে আজ ক্ষমতায় আরোহণ করে তালেবানরা অনেক সমস্যার সম্মুখীন। গত ৯ সেপ্টেম্বর তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ তালেবান সরকারের যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তাতে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আধুনিক বিশ্বে যে পদ্ধতিতে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তাতে তাদের পক্ষে বন্ধুরাষ্ট্রের সন্ধান মেলা দুরূহ। রাষ্ট্র পরিচালনায় তালেবানদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে।

টিকে থাকার সংগ্রামে তালেবানরা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে তৎপর। অন্তবর্তীকালীন সরকার যাত্রার শুরুতেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আফগানিস্তানে ব্যবসা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে। সম্প্রতি হাইরাতান বন্দরে তালেবান হেড অফ কাস্টমস মৌলভী সাইদ বলেছেন, বাণিজ্য বাড়াতে তারা শুল্ক কমিয়ে দিচ্ছেন এবং দেশে সম্পদশালী ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করাকে তারা উৎসাহিত করতে চান। এটি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে, আর পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীরা পুরস্কৃত হবেন।

তালেবান সরকারের বড় অংশীদার হাক্কানি নেটওয়ার্ক। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এফবিআই’র তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে তালেবানদের। এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট প্যালেসে আফগান বিজয়ে কার কর্তৃত্ব বেশি তা নিয়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ আবদুল গনি বারাদার এবং শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী হাক্কানি নেটওয়ার্কের খলিল উর রহমান হাক্কানির বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার ঘটনা।

আমি কয়েক বছর আগে আফগানিস্তান সফরে গিয়ে দেখেছি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে পশ্চিমা আধুনিকতার ছোঁয়া। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সহাবস্থান। রাস্তায় দেখেছি হিজাব আবৃত মুখমণ্ডল অনাবৃত নারীদের। তালেবানরা এখন শাসনকার্যে এবং সামাজিক ব্যবস্থায় রক্ষণশীল ব্যবস্থা চালু করবে, নাকি জনগণের যুগের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিজেদের শাসননীতিতে পরিবর্তন আনবে, তা দেখার বিষয়।

ইতিহাস থেকে অনেক জানার, বোঝার ও শেখার সুযোগ আছে। তালেবানদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা। এ ক্ষেত্রে তাদের গতিপথ ও গন্তব্য সময়ানুগ না হলে নিয়তিই তাদের গন্তব্য নির্ধারণ করবে।

খান মাহবুব : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন