লৌকিকরূপে দেবী দুর্গার প্রকাশ
jugantor
লৌকিকরূপে দেবী দুর্গার প্রকাশ

  ড. সনজিত পাল  

১৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বছর ঘুরে বাঙালির দুয়ারে আবার এসেছে শরৎকাল। বাঙালি মন দশভুজার রাতুর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার বাসনায় উদগ্রীব। বৈশ্বিক মহামারির অবসান হোক, সুস্থ ও সুন্দর হোক এ পৃথিবী। নবচেতনায় জেগে উঠুক মানুষের মন। এই হোক দেবী দুর্গার কাছে আমাদের প্রার্থনা।

মা দুর্গা, যিনি হৈমবতী হিমালয়কন্যা, মাতা মেনকার অতি আদরের ঊমা। তার হৈমবতী রূপ বাঙালি মায়ের হৃদয়কে স্পর্শ করে। বাঙালি সমাজে মেয়ে যেমন শ্বশুরবাড়ি থেকে মায়ের কাছে কিছুদিনের জন্য ফিরে আসে, তেমনি বৎসরান্তে মায়ের ঘরে ফিরে আসেন দেবী দুর্গা।

এ বিশ্বাসে দেবী হয়ে ওঠেন অতি আপনজন। তিনি একা নন, সমগ্র পরিবার। স্বয়ং দুর্গা মাতৃরূপে তার কেন্দ্রস্থলে অধিষ্ঠিতা। দুই পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুই মেয়ে; তাদের দুদিকে গণেশ ও কার্তিক। সমগ্র পরিবারটি মিলিতভাবে মানুষের সব অভাব যেন মোচন করার ক্ষমতা রাখেন। বিদ্যা, সম্পদ, সিদ্ধি, বিপদ থেকে মুক্তি-সবই এখানে মিলবে। দেবীর প্রতিবারই আসা-যাওয়া নিয়ে বাঙালি মনে কখনো আনন্দ আবার কখনো শঙ্কার উদ্ভব হয়। দেবীর আবাহনমন্ত্রে গজে আগমন হলে ‘শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা’ হয়। দেবীর সঙ্গে শস্যের একটা সম্পর্ক তো আছেই।

অনাবৃষ্টিজনিত দুর্ভিক্ষে জীবজগৎ অসহায়। তা দেখে মুনিরা হিমালয়ে গিয়ে দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হলেন। দেবী অপূর্ব দেহকান্তি নিয়ে আবির্ভূতা হলেন। দেবীর চার হাতে বান, পদ্ম, ক্ষুধাতৃষ্ণা জরা নাশক পুষ্প, পল্লব, ফলমূল, শাক, এক মহাধনু। করুণার্দ্র হৃদয়া দেবীর নয়ন থেকে অবিরত অশ্রু বিসর্জনে নয় দিন ধরে নির্জলা পৃথিবীতে খুব বৃষ্টি শুরু হলো। তাতে ভরে গেল নদ-নদী। তৃপ্ত হলো গাছপালা, মানুষ, সব প্রাণিজগৎ। যতদিন না আবার নতুন ফসল উঠল, ততদিন দেবী নিজের হাতের শাক, ফল ইত্যাদি দিয়ে মানুষ, গবাদি পশুর প্রাণ রক্ষা করলেন। তাই দেবী দুর্গাকে ‘শাকাম্ভরী’ বলা হয়।

শারদ ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন হয় বিল্বমূলে। তারপর ‘নবপত্রিকা’ স্নানের মধ্যে দুর্গাপূজার যথার্থ সূচনা। ‘নবপত্রিকা’ বা কলাবউ’য়ে একেকটি দেবীরূপে যাদের কল্পনা করা হয়েছে, তারা সবাই দুর্গার সঙ্গে আরাধিত হন। কলা (ব্রহ্মাণী), কচু (কালি), হলুদ (দুর্গা), জয়ন্তী (কার্তিকী), বেল (শিবা), ডালিম (রক্তদন্তিকা), অশোক (শোকরহিতা), মানকচু (চামুণ্ডা), ধান (লক্ষ্মী)- এই নয়টি গাছ এক করে তৈরি হয় শস্যবধূ। এই শস্যবধূ দেবী দুর্গার প্রতীক। এর মাধ্যমে উর্বরতার দ্যোতনা সূচিত হয়। কলাবউয়ের সাজ, নবপত্রিকার হলুদ সুতার গেরোয় আবৃত হওয়া, বৃক্ষদেবতার আরাধনা, পরবর্তীকালে মহিষাসুরমর্দিনীর বোধনের পদ্ধতি-এসবই যেন ‘বোধনের মিথ বা পুরাবৃত্তের ওপর গড়ে তোলা বহিঃসৌধ।’

দেবীর মহিষাসুর বধের কাহিনি আমাদের অজানা নয়। সব দেবতার দেহ থেকে তেজ নির্গত হয়ে সমবেত হয়ে তা থেকে এক নারীমূর্তির আবির্ভাব হয়। এ নারীমূর্তিই হলেন মায়াশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহামায়া। তিনিই ভগবতীমূর্তি। কাত্যায়নের অভিশাপের কারণে ব্রহ্মাদি দেবতাদের অন্তর্নিহিত তেজ থেকেই এর সৃষ্টি। কাত্যায়ন এর প্রথম পূজো করেন, তাই তিনি কাত্যায়িনী। দশভুজা সিংহবাহিনী।

আশ্বিনের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে সৃষ্ট হন এবং শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে কাত্যায়নীর পূজা নিয়ে দশমীতে মহিষাসুরকে সদলবলে নিহত করেন। তিনিই দুর্গা। দেবীর সিংহবাহিনী রূপের অনেক নাম। তবে কোথাও তিনি চতুর্ভুজা, কোথাও ষড়ভুজা আবার কোথাও দশভুজা। এই দেবী বণিকদের শত্রু গন্ধাসুরকে বৈশাখী পূর্ণিমায় বধ করেন বলে তিনি গন্ধেশ্বরী। ওই দিনই গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজা করা হয়। সংকল্পে থাকে বাণিজ্যবৃদ্ধির কামনা। দেবতা অগ্নি, বায়ু, বরুণ ও চন্দ্রে অহংকারের পতন ঘটিয়েছিলেন বলে তারা দেবীর জ্যোতির্ময়ীর আরাধনা করেন। এ জ্যোতির্ময়ীই দেবী জগদ্ধাত্রী। সিংহবাহিনী, চতুর্ভুজা। নানা অলঙ্কারে ভূষিতা। সাপ এর যজ্ঞোপবীত। বাঁ হাতে শঙ্খ ও ধনুক। ডান হাতে চক্র ও পঞ্চবান।

জীবন সাধনের আরেক নাম জাগরণ। সেজন্যই দুর্গোৎসবে সবার আগে পালিত হয় ‘বোধন’। এই বোধন কার? এই বোধন ঘুমন্ত প্রকৃতির, নিদ্রিত শক্তির। ঊমা পর্বত দুহিতা, হেমবর্ণা। মেনকা স্বপ্ন দেখলেন ঊমার বর্ণ বিবর্ণ হয়েছে। তিনি স্বামীকে অনুরোধ করেন ঊমাকে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে আসতে- এই তো আমাদের শাক্ত-পদাবলির আগমনী-বিজয়ার মূল কথা। কিন্তু এই ঊমা এলেন কোথা থেকে? কেউ বলে এটি ‘ওম্’ ধ্বনির রূপান্তর, কেউ বলে ‘উ’ হল শিব আর ‘মা’ তার স্ত্রী। তবে সাধকগণ ‘ঊমা’ শব্দকে ‘মা’ শব্দের রূপভেদ মনে করেন। সিংহবাহিনী সিবিলী দেবী, যিনি ছিলেন প্রাচীন ব্যাবিলনের মানুষদের ‘উম্মু’ বা ‘মা’, তথা মাতৃকা দেবী; তারই অনুরূপ আর কোনো উপাস্যা দেবী সিন্ধুরাষ্ট্রে অপ্রত্যাশিতা নন। ননা-নাম্নী সিংহারূঢ়া আরও একজন দেবী প্রাচীন ব্যাবিলনে উপাসিতা হতেন; তিনিও রণরঙ্গিনী, পর্বতবাসিকা; তার পতির বাহন ছিল বলীবর্দ। অতএব, ননা, উম্মু, সিবিলীরা সমগোত্রীয়া এবং প্রতিবেশিনী আর কোনো মাতৃকাদেবী এবং দুর্গা তথা মহাদেবী, তথা মহাশক্তিরূপিনী পরস্পর প্রতিতুল্যা হয়েই কল্পিতা হয়েছেন।

এই মাতৃকা সাধনার প্রয়োজন নানা কারণে। যিনি বাড়ির লক্ষ্মী, সন্তানের মা, পুরুষের স্ত্রী, জগতের তিনিই পালয়িত্রী। কালের স্রোতে সৃষ্টির ছন্দ তো তিনিই আনেন। তিনি যে পুরাণ, তন্ত্র, অধ্যাত্মের মধ্যেই বিচরণ করেছেন তা নয়; একেবারে লৌকিক মানসে তার অবাধ যাতায়াত, উজ্জ্বল উপস্থিতি। বৌদ্ধ মহাযানে পর্ণশবরী ও নগ্নশবরী নামে দুই দেবীর উল্লেখ আছে। পর্ণশবরী পর্ণবসন পরিহিতা। তিনি পর্বতবাসিনী এবং অসুরনাশিনী বলেই খ্যাত। তিনি হরিদ্বর্ণা, ত্রিমুখা, ত্রিনেত্রা, ষড়ভুজা, দক্ষিণ ও বাম মুখের রং সাদা ও কালো। নবযৌবনবতী, মুখে ক্রোধ ও হাসি। বাঘের চামড়া পরিহিতা পর্ণশবরী বসন্তরোগ থেকে বাঁচিয়ে তোলেন। তিনি মহামারিকে পদতলে দলিত করেন। আকৃতির দিক থেকে পর্ণশবরীর সঙ্গে হিন্দু দেবদেবীর কোনো সাদৃশ্য নেই। কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে পার্বতীর দেবাদিদেব মহাদেবকে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যার উল্লেখ আছে। তপস্যায় মগ্ন পার্বতী প্রথমে গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা খেয়ে প্রাণ রক্ষা করেন ও পরে তিনি এই পাতাও গ্রহণ করা বন্ধ করেন। তখন তার নাম হয় অপর্ণা। বৌদ্ধ মহাযান অনুসারে যিনি লজ্জা নিবারণের জন্য পাতার বস্ত্র পরিধান করেন, তিনি পর্ণশবরী আর ‘কুমারসম্ভব’ অনুসারে যিনি ওই পাতার বস্ত্রও পরিধান করেন না অর্থাৎ বিবসনা তিনি অপর্ণা। তাই অনেকে অপর্ণা ও পর্ণশবরীকে একই দেবী বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

রাঢ় অঞ্চলের অন্যতম দেবী যোগাদ্যা। তিনিও দশভুজা। জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তিতে এই দেবীর পূজা করা হয়। কবি মুকুন্দ মিশ্র তার বাশুলীমঙ্গল কাব্যে বাশুলী বা বিশালাক্ষ্মী দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। এই কাব্যে দেবী বাশুলী হিমালয় কন্যা ঊমা পার্বতীরই আরেক রূপ। উত্তরবঙ্গে দেবী দুর্গা বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসিদ্ধা। কোথাও দেবী ধনদুর্গা, কোথাও ভাণ্ডালী। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারে দেবী দুর্গা ‘মা গোসানী’ নামে পরিচিত। দিনহাটাতে দেবী দুর্গা ‘বুড়িঠাকুর’ নামে কল্পিত। কোথাও তিনি ‘মন্থনী’ নামে, কোথাও তিনি ‘তিস্তাবুড়ি’ নামে পূজিত হয়ে আসছেন। পূর্ববঙ্গে দুর্গা দেবী ‘রাউল দুর্গা’ বা রাল দুর্গা নামে আরাধিতা হয়ে আসছেন। ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুর্গা দেবী গ্রামদেবী বা বনদুর্গা হিসাবে পূজা পেয়ে থাকে। পৌষ সংক্রান্তির দিন এর পূজা করা হয়। আদিম অরণ্যবাসিনী দেবী বহু রূপান্তরের পর তিনি এখন দুর্গা। মার্কণ্ডেয় পুরাণে তিনি দেবী চণ্ডীকায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন আধ্যাত্মিক মহাত্মের অনুষঙ্গে। পরবর্তীকালে দেবী দুর্গাও দেবী চণ্ডীর মিলিতরূপ-অসুরনাশিনী। এই অসুরনাশিনী দুর্গাই সন্তানাদিসহ পিতৃগৃহে আসে শরতে তিন দিনের জন্য। তার এই আগমনই বাঙালির সর্বজনগ্রাহ্য এক দৃশ্য। শুভ শারদীয়।

ড. সনজিত পাল : সিনিয়র শিক্ষক, সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ

লৌকিকরূপে দেবী দুর্গার প্রকাশ

 ড. সনজিত পাল 
১৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বছর ঘুরে বাঙালির দুয়ারে আবার এসেছে শরৎকাল। বাঙালি মন দশভুজার রাতুর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার বাসনায় উদগ্রীব। বৈশ্বিক মহামারির অবসান হোক, সুস্থ ও সুন্দর হোক এ পৃথিবী। নবচেতনায় জেগে উঠুক মানুষের মন। এই হোক দেবী দুর্গার কাছে আমাদের প্রার্থনা।

মা দুর্গা, যিনি হৈমবতী হিমালয়কন্যা, মাতা মেনকার অতি আদরের ঊমা। তার হৈমবতী রূপ বাঙালি মায়ের হৃদয়কে স্পর্শ করে। বাঙালি সমাজে মেয়ে যেমন শ্বশুরবাড়ি থেকে মায়ের কাছে কিছুদিনের জন্য ফিরে আসে, তেমনি বৎসরান্তে মায়ের ঘরে ফিরে আসেন দেবী দুর্গা।

এ বিশ্বাসে দেবী হয়ে ওঠেন অতি আপনজন। তিনি একা নন, সমগ্র পরিবার। স্বয়ং দুর্গা মাতৃরূপে তার কেন্দ্রস্থলে অধিষ্ঠিতা। দুই পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুই মেয়ে; তাদের দুদিকে গণেশ ও কার্তিক। সমগ্র পরিবারটি মিলিতভাবে মানুষের সব অভাব যেন মোচন করার ক্ষমতা রাখেন। বিদ্যা, সম্পদ, সিদ্ধি, বিপদ থেকে মুক্তি-সবই এখানে মিলবে। দেবীর প্রতিবারই আসা-যাওয়া নিয়ে বাঙালি মনে কখনো আনন্দ আবার কখনো শঙ্কার উদ্ভব হয়। দেবীর আবাহনমন্ত্রে গজে আগমন হলে ‘শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা’ হয়। দেবীর সঙ্গে শস্যের একটা সম্পর্ক তো আছেই।

অনাবৃষ্টিজনিত দুর্ভিক্ষে জীবজগৎ অসহায়। তা দেখে মুনিরা হিমালয়ে গিয়ে দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হলেন। দেবী অপূর্ব দেহকান্তি নিয়ে আবির্ভূতা হলেন। দেবীর চার হাতে বান, পদ্ম, ক্ষুধাতৃষ্ণা জরা নাশক পুষ্প, পল্লব, ফলমূল, শাক, এক মহাধনু। করুণার্দ্র হৃদয়া দেবীর নয়ন থেকে অবিরত অশ্রু বিসর্জনে নয় দিন ধরে নির্জলা পৃথিবীতে খুব বৃষ্টি শুরু হলো। তাতে ভরে গেল নদ-নদী। তৃপ্ত হলো গাছপালা, মানুষ, সব প্রাণিজগৎ। যতদিন না আবার নতুন ফসল উঠল, ততদিন দেবী নিজের হাতের শাক, ফল ইত্যাদি দিয়ে মানুষ, গবাদি পশুর প্রাণ রক্ষা করলেন। তাই দেবী দুর্গাকে ‘শাকাম্ভরী’ বলা হয়।

শারদ ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন হয় বিল্বমূলে। তারপর ‘নবপত্রিকা’ স্নানের মধ্যে দুর্গাপূজার যথার্থ সূচনা। ‘নবপত্রিকা’ বা কলাবউ’য়ে একেকটি দেবীরূপে যাদের কল্পনা করা হয়েছে, তারা সবাই দুর্গার সঙ্গে আরাধিত হন। কলা (ব্রহ্মাণী), কচু (কালি), হলুদ (দুর্গা), জয়ন্তী (কার্তিকী), বেল (শিবা), ডালিম (রক্তদন্তিকা), অশোক (শোকরহিতা), মানকচু (চামুণ্ডা), ধান (লক্ষ্মী)- এই নয়টি গাছ এক করে তৈরি হয় শস্যবধূ। এই শস্যবধূ দেবী দুর্গার প্রতীক। এর মাধ্যমে উর্বরতার দ্যোতনা সূচিত হয়। কলাবউয়ের সাজ, নবপত্রিকার হলুদ সুতার গেরোয় আবৃত হওয়া, বৃক্ষদেবতার আরাধনা, পরবর্তীকালে মহিষাসুরমর্দিনীর বোধনের পদ্ধতি-এসবই যেন ‘বোধনের মিথ বা পুরাবৃত্তের ওপর গড়ে তোলা বহিঃসৌধ।’

দেবীর মহিষাসুর বধের কাহিনি আমাদের অজানা নয়। সব দেবতার দেহ থেকে তেজ নির্গত হয়ে সমবেত হয়ে তা থেকে এক নারীমূর্তির আবির্ভাব হয়। এ নারীমূর্তিই হলেন মায়াশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহামায়া। তিনিই ভগবতীমূর্তি। কাত্যায়নের অভিশাপের কারণে ব্রহ্মাদি দেবতাদের অন্তর্নিহিত তেজ থেকেই এর সৃষ্টি। কাত্যায়ন এর প্রথম পূজো করেন, তাই তিনি কাত্যায়িনী। দশভুজা সিংহবাহিনী।

আশ্বিনের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে সৃষ্ট হন এবং শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে কাত্যায়নীর পূজা নিয়ে দশমীতে মহিষাসুরকে সদলবলে নিহত করেন। তিনিই দুর্গা। দেবীর সিংহবাহিনী রূপের অনেক নাম। তবে কোথাও তিনি চতুর্ভুজা, কোথাও ষড়ভুজা আবার কোথাও দশভুজা। এই দেবী বণিকদের শত্রু গন্ধাসুরকে বৈশাখী পূর্ণিমায় বধ করেন বলে তিনি গন্ধেশ্বরী। ওই দিনই গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজা করা হয়। সংকল্পে থাকে বাণিজ্যবৃদ্ধির কামনা। দেবতা অগ্নি, বায়ু, বরুণ ও চন্দ্রে অহংকারের পতন ঘটিয়েছিলেন বলে তারা দেবীর জ্যোতির্ময়ীর আরাধনা করেন। এ জ্যোতির্ময়ীই দেবী জগদ্ধাত্রী। সিংহবাহিনী, চতুর্ভুজা। নানা অলঙ্কারে ভূষিতা। সাপ এর যজ্ঞোপবীত। বাঁ হাতে শঙ্খ ও ধনুক। ডান হাতে চক্র ও পঞ্চবান।

জীবন সাধনের আরেক নাম জাগরণ। সেজন্যই দুর্গোৎসবে সবার আগে পালিত হয় ‘বোধন’। এই বোধন কার? এই বোধন ঘুমন্ত প্রকৃতির, নিদ্রিত শক্তির। ঊমা পর্বত দুহিতা, হেমবর্ণা। মেনকা স্বপ্ন দেখলেন ঊমার বর্ণ বিবর্ণ হয়েছে। তিনি স্বামীকে অনুরোধ করেন ঊমাকে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে আসতে- এই তো আমাদের শাক্ত-পদাবলির আগমনী-বিজয়ার মূল কথা। কিন্তু এই ঊমা এলেন কোথা থেকে? কেউ বলে এটি ‘ওম্’ ধ্বনির রূপান্তর, কেউ বলে ‘উ’ হল শিব আর ‘মা’ তার স্ত্রী। তবে সাধকগণ ‘ঊমা’ শব্দকে ‘মা’ শব্দের রূপভেদ মনে করেন। সিংহবাহিনী সিবিলী দেবী, যিনি ছিলেন প্রাচীন ব্যাবিলনের মানুষদের ‘উম্মু’ বা ‘মা’, তথা মাতৃকা দেবী; তারই অনুরূপ আর কোনো উপাস্যা দেবী সিন্ধুরাষ্ট্রে অপ্রত্যাশিতা নন। ননা-নাম্নী সিংহারূঢ়া আরও একজন দেবী প্রাচীন ব্যাবিলনে উপাসিতা হতেন; তিনিও রণরঙ্গিনী, পর্বতবাসিকা; তার পতির বাহন ছিল বলীবর্দ। অতএব, ননা, উম্মু, সিবিলীরা সমগোত্রীয়া এবং প্রতিবেশিনী আর কোনো মাতৃকাদেবী এবং দুর্গা তথা মহাদেবী, তথা মহাশক্তিরূপিনী পরস্পর প্রতিতুল্যা হয়েই কল্পিতা হয়েছেন।

এই মাতৃকা সাধনার প্রয়োজন নানা কারণে। যিনি বাড়ির লক্ষ্মী, সন্তানের মা, পুরুষের স্ত্রী, জগতের তিনিই পালয়িত্রী। কালের স্রোতে সৃষ্টির ছন্দ তো তিনিই আনেন। তিনি যে পুরাণ, তন্ত্র, অধ্যাত্মের মধ্যেই বিচরণ করেছেন তা নয়; একেবারে লৌকিক মানসে তার অবাধ যাতায়াত, উজ্জ্বল উপস্থিতি। বৌদ্ধ মহাযানে পর্ণশবরী ও নগ্নশবরী নামে দুই দেবীর উল্লেখ আছে। পর্ণশবরী পর্ণবসন পরিহিতা। তিনি পর্বতবাসিনী এবং অসুরনাশিনী বলেই খ্যাত। তিনি হরিদ্বর্ণা, ত্রিমুখা, ত্রিনেত্রা, ষড়ভুজা, দক্ষিণ ও বাম মুখের রং সাদা ও কালো। নবযৌবনবতী, মুখে ক্রোধ ও হাসি। বাঘের চামড়া পরিহিতা পর্ণশবরী বসন্তরোগ থেকে বাঁচিয়ে তোলেন। তিনি মহামারিকে পদতলে দলিত করেন। আকৃতির দিক থেকে পর্ণশবরীর সঙ্গে হিন্দু দেবদেবীর কোনো সাদৃশ্য নেই। কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে পার্বতীর দেবাদিদেব মহাদেবকে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যার উল্লেখ আছে। তপস্যায় মগ্ন পার্বতী প্রথমে গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা খেয়ে প্রাণ রক্ষা করেন ও পরে তিনি এই পাতাও গ্রহণ করা বন্ধ করেন। তখন তার নাম হয় অপর্ণা। বৌদ্ধ মহাযান অনুসারে যিনি লজ্জা নিবারণের জন্য পাতার বস্ত্র পরিধান করেন, তিনি পর্ণশবরী আর ‘কুমারসম্ভব’ অনুসারে যিনি ওই পাতার বস্ত্রও পরিধান করেন না অর্থাৎ বিবসনা তিনি অপর্ণা। তাই অনেকে অপর্ণা ও পর্ণশবরীকে একই দেবী বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

রাঢ় অঞ্চলের অন্যতম দেবী যোগাদ্যা। তিনিও দশভুজা। জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তিতে এই দেবীর পূজা করা হয়। কবি মুকুন্দ মিশ্র তার বাশুলীমঙ্গল কাব্যে বাশুলী বা বিশালাক্ষ্মী দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। এই কাব্যে দেবী বাশুলী হিমালয় কন্যা ঊমা পার্বতীরই আরেক রূপ। উত্তরবঙ্গে দেবী দুর্গা বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসিদ্ধা। কোথাও দেবী ধনদুর্গা, কোথাও ভাণ্ডালী। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারে দেবী দুর্গা ‘মা গোসানী’ নামে পরিচিত। দিনহাটাতে দেবী দুর্গা ‘বুড়িঠাকুর’ নামে কল্পিত। কোথাও তিনি ‘মন্থনী’ নামে, কোথাও তিনি ‘তিস্তাবুড়ি’ নামে পূজিত হয়ে আসছেন। পূর্ববঙ্গে দুর্গা দেবী ‘রাউল দুর্গা’ বা রাল দুর্গা নামে আরাধিতা হয়ে আসছেন। ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুর্গা দেবী গ্রামদেবী বা বনদুর্গা হিসাবে পূজা পেয়ে থাকে। পৌষ সংক্রান্তির দিন এর পূজা করা হয়। আদিম অরণ্যবাসিনী দেবী বহু রূপান্তরের পর তিনি এখন দুর্গা। মার্কণ্ডেয় পুরাণে তিনি দেবী চণ্ডীকায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন আধ্যাত্মিক মহাত্মের অনুষঙ্গে। পরবর্তীকালে দেবী দুর্গাও দেবী চণ্ডীর মিলিতরূপ-অসুরনাশিনী। এই অসুরনাশিনী দুর্গাই সন্তানাদিসহ পিতৃগৃহে আসে শরতে তিন দিনের জন্য। তার এই আগমনই বাঙালির সর্বজনগ্রাহ্য এক দৃশ্য। শুভ শারদীয়।

ড. সনজিত পাল : সিনিয়র শিক্ষক, সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন