দুর্গাপূজায় রাষ্ট্রীয় ভাবনা
jugantor
দুর্গাপূজায় রাষ্ট্রীয় ভাবনা

  স্বামী জ্ঞানপ্রকাশানন্দ  

১৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সনাতন ধর্মে বারো মাসে তেরো পার্বণ বলে একটি কথা প্রচলিত। সনাতন ধর্মের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা। দুর্গাপূজার পরপরই লক্ষ্মীপূজা, কার্তিকপূজা, সরস্বতীপূজা, গণেশপূজা হয়ে থাকে। তাই দুর্গাপূজার বিষয়ে একটু জানা থাকলে অন্যসব পূজারও কিছু কিছু জ্ঞান লাভ হয়।

আর এ দুর্গাপূজাকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় ভাবনায় দেখা যায়? বৈদিক সূক্তে দেবী বলেছেন-‘অহং রাষ্ট্রী’। রাষ্ট্র ঈ প্রত্যয়যোগে স্ত্রী লিঙ্গে রাষ্ট্রী। অর্থাৎ আমি বিশ্ব সমাজের অধীশ্বরী। এই বিশ্ব সমাজ বলতে কী বোঝায়, আর অধীশ্বরী বলতেই বা কী বোঝায়, তা জানার জন্য একটু বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

আমরা জানি, আধুনিক বিশ্বের মূল স্তম্ভ হলো মানুষ। মানুষ সধারণত বাস করে গৃহে। পিতা-মাতা, ভ্রাতা-ভগ্নী এদের নিয়ে একটি পরিবার। সমাজ হলো পরস্পর সহযোগিতা ও সহানুভূতির সঙ্গে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠী, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বাস করে। এদের মধ্যে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা-শিশু, ভালো-মন্দ বিভিন্ন প্রকার মানুষ থাকে। আর বিশ্ব সমাজ হলো বিশ্বের অন্তর্গত জীব-জগৎ-গাছপালা প্রাণী সকল। প্রাণীজগতে পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ এদেরও আলাদা আলাদা সমাজ রয়েছে। একপর্যায়ে বৃক্ষরাজি, উদ্ভিদ, জলজ, অ-জলজ সবই এক প্রকার প্রাণিসম্পদ। প্রাচীন ঋষিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন গাছেরও প্রাণ আছে।

এবার দেখব অধীশ্বরী বলতে কী বোঝায়? ব্যাকরণগতভাবে দেখা যায় অধি+ঈশ্বর, এর সঙ্গে স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে হয় অধীশ্বরী। অর্থাৎ মালিক বা অধিপতি বা সম্রাজ্ঞী। এ শুধু আমরা জাগতিক অর্থেই ব্যবহার করি। বিভিন্ন নামে আমরা সম্বোধন করি। ঈশ্বর বা ঈশ্বরী বা দুর্গা বা গড্ ইত্যাদি একই সৃষ্টিকর্তার বিভিন্ন নামমাত্র। তিনি দেবীরূপে, মাতৃরূপে, শক্তিরূপে, জ্ঞানরূপে সবকিছুতেই বর্তমান। তাই তিনি বিশ্ব সমাজের অধিষ্ঠাত্রী বা অধীশ্বরী। আমরা দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখছি মা দুর্গা, তার দুই কন্যা অর্থাৎ লক্ষ্মী-সরস্বতী, দুই পুত্র কার্তিক-গণেশ এদের নিয়ে যেন পিত্রালয়ে বেড়াতে এসেছেন। পুত্র-কন্যা নিয়ে মা তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন, এটি আমাদের বাঙালির সমাজজীবনের একটি প্রতিচ্ছবি। তাই দুর্গাপূজা বাঙালির মধ্যেই বেশি প্রচলিত।

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতি আনন্দে মেতে ওঠে। এ উৎসবে যোগদান করেন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই। এতে থাকে না কোনো জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদ। বর্তমানে এটি বাঙালির একটি জাতীয় উৎসব।

দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখা যায় দেবীদুর্গা একা নয়। তার শক্তি হিসাবে এই চার শক্তি সঙ্গে নিয়ে আসেন-জ্ঞানশক্তি, ধনশক্তি, গোত্রশক্তি, জনশক্তি। একটি রাষ্ট্রেরও এই চারটি শক্তি থাকা প্রয়োজন। না হলে সে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। তাই শ্রীশ্রী দুর্গাপূজার এই সামগ্রিক রূপটিই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় জ্ঞান। বস্তুত দুর্গা প্রতিমাই জাতীয় প্রতিমার প্রতীক। দুর্গাপূজার চিত্রে আমরা দেখতে পাই দেবী দুর্গা মাতারূপে মধ্যমণি। তার দক্ষিণে লক্ষ্মী দেবী ধনশক্তি বা বশ্যশক্তি ও গণেশ অর্থাৎ গণশক্তি বা শ্রমশক্তি বা শূদ্র। আর বামদিকে সরস্বতী দেবী অর্থাৎ জ্ঞানশক্তি বা ব্রহ্মণ্যশক্তি এবং কার্তিক গোত্র-বীর্যের অর্থাৎ পরাক্রমশালী শক্তির প্রতীক বা সেনাশক্তি।

মা দুর্গার পায়ের নিচে অসুর। দেবী ত্রিশূল দিয়ে তার বুক বিদীর্ণ করছেন। দেবী দুর্গাকে রাষ্ট্র কল্পনায় দেখা যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জ্ঞান ও অর্থের প্রয়োজন। তাছাড়া রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন দক্ষ সেনাবাহিনীর। অন্যদিকে রাষ্ট্রের উৎপাদনের চাকা সচল রাখে শ্রমশক্তি বা জনগণ। আর জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র হয়ে পড়ে অস্তিত্বহীন।

লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ এ যেন সনাতন ধর্মের চারটি বর্ণেরও প্রতীক। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। ব্রাহ্মণ যিনি জ্ঞান দান করেন অর্থাৎ শিক্ষাদান করেন। ক্ষত্রিয় বা সেনাবাহিনী দেশ রক্ষা করেন। বৈশ্য যারা ব্যবসা করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত দ্রব্যাদির সরবরাহ ও জোগানের সামাঞ্জস্য বিধান করে জনসাধারণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব পূরণ করেন। একটি সামাজিক ও অর্থনেতিক উন্নতির চিন্তাভাবনার চিত্র ফুটে উঠেছে দুর্গাপূজায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের অজ্ঞতাজনিত কারণে আমরা ব্রাহ্মণকে বলি উঁচু বা শ্রেষ্ঠ বর্ণ আর শূদ্রকে বলি নীচু বা নীচুবর্ণের বা ছোট জাত। অথচ কেউই ছোট বা অবহেলার নয়।

একটি রাষ্ট্রে শুধু মানুষই বসবাস করে না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পশু-পাখি, সরীসৃপসহ সব ধরনের প্রাণী সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেছেন। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে-শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর বাহন পশুরাজ সিংহ। লক্ষ্মীদেবীর বাহন প্যাঁচা, সরস্বতী দেবীর বাহন রাজহংস, কার্তিকের ময়ূর এবং গণেশের বাহন ছোট্ট ইঁদুর।

দেবী দুর্গার বাহন হিসাবে সিংহকে বাছাই করার একটি বিশেষ কারণ হয়তো অসুর তার রূপ পরিবর্তন করে কখনো পশুরূপে আবির্ভূত হতো। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে সে মহিষরূপে অবতীর্ণ। মানবের সঙ্গে মানবের যেমন যুদ্ধ চলে, তেমনই পশুর সঙ্গে পশুর যুদ্ধই স্বাভাবিক। এ কারণেই হয়তো মহিষের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সিংহের প্রয়োজন। আর সিংহ পশুদের মধ্যে শক্তিশালী; তাই দেবী দুর্গা বাহন হিসাবে সিংহকে বেছে নিয়েছেন। দেবী সরস্বতীর বাহন রাজহংস। রাজহংস জল আর দুধমিশ্রিত থাকলে তা থেকে দুধটুকু খাবে, জল ত্যাগ করবে। সংসারে সার অসার দুটিই আছে। জ্ঞানী সারটুকু নেবে সংসার থেকে, অসারটুকু পরিত্যাগ করবে। এজন্য বীণাপাণি দেবীর বাহন রাজহংস। সরস্বতী দেবীর গায়ের রং শুভ্র। হংসও শুভ্র অর্থাৎ পবিত্রতার প্রতীক। দেবী সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। তাই দেবী সরস্বতী বাহন হিসাবে রাজহংসকেই বেছে নিয়েছেন।

দেব সেনাপতি কার্তিক শৌর্য-বীর্যে প্রবল পরাক্রম ক্ষত্রিয় শক্তির প্রতীক। দেবতারা যখন অসুরদের দ্বারা পরাজিত হয়ে স্বর্গরাজ্য ছেড়ে মর্তে এলেন-সেই স্বর্গরাজ্য উদ্ধার করেন কার্তিক তার প্রবল যুদ্ধ পরাক্রম দ্বারা। কার্তিক সেনাপতি, যোদ্ধা। এ কার্তিক অন্যান্য পশু-পাখি বাহন না করে ময়ূরকে কেন বেছে নিলেন? সেক্ষেত্রে মনে হয় ময়ূরের চারটি খুব সুন্দর গুণ রয়েছে, যা কার্তিকের ক্ষত্রিয় হিসাবে গ্রহণযোগ্য। ১. যুদ্ধ ক্ষত্রিয়ের প্রধান বৃত্তি। শত্রু জয় তার স্বধর্ম। ২. ময়ূর অনলস। ব্রাহ্মমুহূর্তে সে জনগণকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। সে অতন্দ্র প্রহরী, সতর্ক। একজন যোদ্ধা সেও ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে জেগে তার যুদ্ধবিদ্যা অনুশীলন করে। ৩. ময়ূর বিচরণ করে দল বেঁধে, একাকী নয়। খাবারও সবাইকে নিয়ে খায়-সহভোজন। ৪. ক্ষত্রিয় আপদগতা স্ত্রীকে রক্ষা করে। তেমনই ময়ূরও তার স্ত্রীকে রক্ষা করে। ক্ষত্রিয়ের কর্মে ও ময়ূরের কর্মে অনেক সামাঞ্জস্য দেখা যায়।

সিদ্ধিদাতা গণেশ হলো জনগণের প্রতিনিধি। শ্রম ও শূদ্রের প্রতীক। আমরা দেখেছি, গণেশের মাথাটি হাতির। তার বাহন ছোট মুষিক। হাতি পশু হিসাবে বড় জাতের হলেও জাতভাই ছোট মুষিককে ত্যাগ করে না। আবার দেখা যায় ইঁদুরের দুটি দাঁত খুবই ধারালো। এই ধারালো দাঁত দিয়ে সে মোটা রশির জালও ছেদন করতে পারে। তেমনই মানবের দুটি দাঁত যেন বিবেক ও বৈরাগ্য। এ বিবেক বৈরাগ্যরূপ দাঁত দিয়ে সংসারবন্ধন ছেদন করে মানবমুক্তি লাভ করতে পারে। এসব কারণেই গণেশ বাহন হিসাবে পছন্দ করেছেন তার এই ছোট মুষিক বা ইঁদুরকে।

ধনসম্পদের দেবী-লক্ষ্মীদেবীর বাহন পেচক। পেচক দিনে অন্ধ, রাতে দেখে। সচরাচর আমরা জাগতিক অনেক ঘটনাই দেখতে পাই প্রকাশ্যে। কিন্তু এর পশ্চাতে অদৃশ্য থেকে কার নির্দেশে কী কারণে এসব ঘটনা ঘটেছে, তা জানতে পারি না। প্রকৃত হোতা আড়ালেই থাকে। পেচক সাক্ষ্য দেয়-আপাত যা দেখছ তার সবই সঠিক নয়। আরও গভীরে প্রবেশ কর। সবকিছুরই কারণে যেতে হয়। তখন প্রকৃত অবস্থার স্বরূপ জানা যায়।

দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখা যায় দেব-দেবীদের সঙ্গে তাদের বাহন পশু, পাখি, সরীসৃপজাতীয় প্রাণী। এর তাৎপর্য হিসাবে দেখা যায়, ধরায় এগুলো প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রয়োজন। এগুলোর অভাব হলে প্রকৃতির বিপর্যয় দেখা দিয়ে মানুষ বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই পশুপাখি রক্ষণাবেক্ষণের আইন করা হয়েছে।

দুর্গাপূজার কাঠামোতে আরেকটি চিত্র দেখা যায়, গণেশের পাশে একটি কলা-বউ সাজানো রয়েছে। একটি কলাগাছের সঙ্গে নয়টি চারাগাছ বেঁধে কাপড় পরানো হয়। একে বলা হয় নবপত্রিকা। এরা মা দুর্গার প্রতিনিধি। সনাতন ধর্মে পূজার আনুষ্ঠানিকতা প্রকৃতিগত। যে প্রকৃতি আমাদের বাঁচায় তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উপায় হলো তার পূজা বা আরাধনা। নয়টি চারাগাছ হলো-কদলী, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল, দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধান। দেবী দুর্গার প্রতিভূস্বরূপ এদের অর্চনা করা হয়। অর্থাৎ এদের মধ্যেও তিনি বর্তমান। এক কথায়, গাছপালা ও উদ্ভিদজগৎ ছাড়া রাষ্ট্র হবে মরুভূমি। তাই উদ্ভিদ রক্ষণাবেক্ষণের আইন আছে প্রতিটি দেশে।

একদিকে মানবসমাজ, অপরদিকে পশু-পাখি-বৃক্ষাদি যা কিছু আমাদের গোচরীভূত, সবকিছুর মধ্যে দেবী দুর্গা বর্তমান। অর্থাৎ বিশ্বের যা কিছু সব তার থেকে সৃষ্টি এবং তাতেই লয়। তিনি মাতৃস্বরূপা। জন্মভূমিও মাতৃসমা। কাজেই দেবী দুর্গার ঘোষণা- ‘অহং রাষ্ট্রী’ অর্থাৎ আমি বিশ্ব সমাজের অধীশ্বরী-যা যথার্থই প্রণিধানযোগ্য।

স্বামী জ্ঞানপ্রকাশানন্দ : অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ আশ্রম ও রামকৃষ্ণ মিশন, যশোর

দুর্গাপূজায় রাষ্ট্রীয় ভাবনা

 স্বামী জ্ঞানপ্রকাশানন্দ 
১৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সনাতন ধর্মে বারো মাসে তেরো পার্বণ বলে একটি কথা প্রচলিত। সনাতন ধর্মের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা। দুর্গাপূজার পরপরই লক্ষ্মীপূজা, কার্তিকপূজা, সরস্বতীপূজা, গণেশপূজা হয়ে থাকে। তাই দুর্গাপূজার বিষয়ে একটু জানা থাকলে অন্যসব পূজারও কিছু কিছু জ্ঞান লাভ হয়।

আর এ দুর্গাপূজাকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় ভাবনায় দেখা যায়? বৈদিক সূক্তে দেবী বলেছেন-‘অহং রাষ্ট্রী’। রাষ্ট্র ঈ প্রত্যয়যোগে স্ত্রী লিঙ্গে রাষ্ট্রী। অর্থাৎ আমি বিশ্ব সমাজের অধীশ্বরী। এই বিশ্ব সমাজ বলতে কী বোঝায়, আর অধীশ্বরী বলতেই বা কী বোঝায়, তা জানার জন্য একটু বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

আমরা জানি, আধুনিক বিশ্বের মূল স্তম্ভ হলো মানুষ। মানুষ সধারণত বাস করে গৃহে। পিতা-মাতা, ভ্রাতা-ভগ্নী এদের নিয়ে একটি পরিবার। সমাজ হলো পরস্পর সহযোগিতা ও সহানুভূতির সঙ্গে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠী, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বাস করে। এদের মধ্যে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা-শিশু, ভালো-মন্দ বিভিন্ন প্রকার মানুষ থাকে। আর বিশ্ব সমাজ হলো বিশ্বের অন্তর্গত জীব-জগৎ-গাছপালা প্রাণী সকল। প্রাণীজগতে পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ এদেরও আলাদা আলাদা সমাজ রয়েছে। একপর্যায়ে বৃক্ষরাজি, উদ্ভিদ, জলজ, অ-জলজ সবই এক প্রকার প্রাণিসম্পদ। প্রাচীন ঋষিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন গাছেরও প্রাণ আছে।

এবার দেখব অধীশ্বরী বলতে কী বোঝায়? ব্যাকরণগতভাবে দেখা যায় অধি+ঈশ্বর, এর সঙ্গে স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে হয় অধীশ্বরী। অর্থাৎ মালিক বা অধিপতি বা সম্রাজ্ঞী। এ শুধু আমরা জাগতিক অর্থেই ব্যবহার করি। বিভিন্ন নামে আমরা সম্বোধন করি। ঈশ্বর বা ঈশ্বরী বা দুর্গা বা গড্ ইত্যাদি একই সৃষ্টিকর্তার বিভিন্ন নামমাত্র। তিনি দেবীরূপে, মাতৃরূপে, শক্তিরূপে, জ্ঞানরূপে সবকিছুতেই বর্তমান। তাই তিনি বিশ্ব সমাজের অধিষ্ঠাত্রী বা অধীশ্বরী। আমরা দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখছি মা দুর্গা, তার দুই কন্যা অর্থাৎ লক্ষ্মী-সরস্বতী, দুই পুত্র কার্তিক-গণেশ এদের নিয়ে যেন পিত্রালয়ে বেড়াতে এসেছেন। পুত্র-কন্যা নিয়ে মা তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন, এটি আমাদের বাঙালির সমাজজীবনের একটি প্রতিচ্ছবি। তাই দুর্গাপূজা বাঙালির মধ্যেই বেশি প্রচলিত।

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতি আনন্দে মেতে ওঠে। এ উৎসবে যোগদান করেন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই। এতে থাকে না কোনো জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদ। বর্তমানে এটি বাঙালির একটি জাতীয় উৎসব।

দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখা যায় দেবীদুর্গা একা নয়। তার শক্তি হিসাবে এই চার শক্তি সঙ্গে নিয়ে আসেন-জ্ঞানশক্তি, ধনশক্তি, গোত্রশক্তি, জনশক্তি। একটি রাষ্ট্রেরও এই চারটি শক্তি থাকা প্রয়োজন। না হলে সে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। তাই শ্রীশ্রী দুর্গাপূজার এই সামগ্রিক রূপটিই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় জ্ঞান। বস্তুত দুর্গা প্রতিমাই জাতীয় প্রতিমার প্রতীক। দুর্গাপূজার চিত্রে আমরা দেখতে পাই দেবী দুর্গা মাতারূপে মধ্যমণি। তার দক্ষিণে লক্ষ্মী দেবী ধনশক্তি বা বশ্যশক্তি ও গণেশ অর্থাৎ গণশক্তি বা শ্রমশক্তি বা শূদ্র। আর বামদিকে সরস্বতী দেবী অর্থাৎ জ্ঞানশক্তি বা ব্রহ্মণ্যশক্তি এবং কার্তিক গোত্র-বীর্যের অর্থাৎ পরাক্রমশালী শক্তির প্রতীক বা সেনাশক্তি।

মা দুর্গার পায়ের নিচে অসুর। দেবী ত্রিশূল দিয়ে তার বুক বিদীর্ণ করছেন। দেবী দুর্গাকে রাষ্ট্র কল্পনায় দেখা যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জ্ঞান ও অর্থের প্রয়োজন। তাছাড়া রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন দক্ষ সেনাবাহিনীর। অন্যদিকে রাষ্ট্রের উৎপাদনের চাকা সচল রাখে শ্রমশক্তি বা জনগণ। আর জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র হয়ে পড়ে অস্তিত্বহীন।

লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ এ যেন সনাতন ধর্মের চারটি বর্ণেরও প্রতীক। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। ব্রাহ্মণ যিনি জ্ঞান দান করেন অর্থাৎ শিক্ষাদান করেন। ক্ষত্রিয় বা সেনাবাহিনী দেশ রক্ষা করেন। বৈশ্য যারা ব্যবসা করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত দ্রব্যাদির সরবরাহ ও জোগানের সামাঞ্জস্য বিধান করে জনসাধারণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব পূরণ করেন। একটি সামাজিক ও অর্থনেতিক উন্নতির চিন্তাভাবনার চিত্র ফুটে উঠেছে দুর্গাপূজায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের অজ্ঞতাজনিত কারণে আমরা ব্রাহ্মণকে বলি উঁচু বা শ্রেষ্ঠ বর্ণ আর শূদ্রকে বলি নীচু বা নীচুবর্ণের বা ছোট জাত। অথচ কেউই ছোট বা অবহেলার নয়।

একটি রাষ্ট্রে শুধু মানুষই বসবাস করে না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পশু-পাখি, সরীসৃপসহ সব ধরনের প্রাণী সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেছেন। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে-শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর বাহন পশুরাজ সিংহ। লক্ষ্মীদেবীর বাহন প্যাঁচা, সরস্বতী দেবীর বাহন রাজহংস, কার্তিকের ময়ূর এবং গণেশের বাহন ছোট্ট ইঁদুর।

দেবী দুর্গার বাহন হিসাবে সিংহকে বাছাই করার একটি বিশেষ কারণ হয়তো অসুর তার রূপ পরিবর্তন করে কখনো পশুরূপে আবির্ভূত হতো। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে সে মহিষরূপে অবতীর্ণ। মানবের সঙ্গে মানবের যেমন যুদ্ধ চলে, তেমনই পশুর সঙ্গে পশুর যুদ্ধই স্বাভাবিক। এ কারণেই হয়তো মহিষের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সিংহের প্রয়োজন। আর সিংহ পশুদের মধ্যে শক্তিশালী; তাই দেবী দুর্গা বাহন হিসাবে সিংহকে বেছে নিয়েছেন। দেবী সরস্বতীর বাহন রাজহংস। রাজহংস জল আর দুধমিশ্রিত থাকলে তা থেকে দুধটুকু খাবে, জল ত্যাগ করবে। সংসারে সার অসার দুটিই আছে। জ্ঞানী সারটুকু নেবে সংসার থেকে, অসারটুকু পরিত্যাগ করবে। এজন্য বীণাপাণি দেবীর বাহন রাজহংস। সরস্বতী দেবীর গায়ের রং শুভ্র। হংসও শুভ্র অর্থাৎ পবিত্রতার প্রতীক। দেবী সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। তাই দেবী সরস্বতী বাহন হিসাবে রাজহংসকেই বেছে নিয়েছেন।

দেব সেনাপতি কার্তিক শৌর্য-বীর্যে প্রবল পরাক্রম ক্ষত্রিয় শক্তির প্রতীক। দেবতারা যখন অসুরদের দ্বারা পরাজিত হয়ে স্বর্গরাজ্য ছেড়ে মর্তে এলেন-সেই স্বর্গরাজ্য উদ্ধার করেন কার্তিক তার প্রবল যুদ্ধ পরাক্রম দ্বারা। কার্তিক সেনাপতি, যোদ্ধা। এ কার্তিক অন্যান্য পশু-পাখি বাহন না করে ময়ূরকে কেন বেছে নিলেন? সেক্ষেত্রে মনে হয় ময়ূরের চারটি খুব সুন্দর গুণ রয়েছে, যা কার্তিকের ক্ষত্রিয় হিসাবে গ্রহণযোগ্য। ১. যুদ্ধ ক্ষত্রিয়ের প্রধান বৃত্তি। শত্রু জয় তার স্বধর্ম। ২. ময়ূর অনলস। ব্রাহ্মমুহূর্তে সে জনগণকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। সে অতন্দ্র প্রহরী, সতর্ক। একজন যোদ্ধা সেও ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে জেগে তার যুদ্ধবিদ্যা অনুশীলন করে। ৩. ময়ূর বিচরণ করে দল বেঁধে, একাকী নয়। খাবারও সবাইকে নিয়ে খায়-সহভোজন। ৪. ক্ষত্রিয় আপদগতা স্ত্রীকে রক্ষা করে। তেমনই ময়ূরও তার স্ত্রীকে রক্ষা করে। ক্ষত্রিয়ের কর্মে ও ময়ূরের কর্মে অনেক সামাঞ্জস্য দেখা যায়।

সিদ্ধিদাতা গণেশ হলো জনগণের প্রতিনিধি। শ্রম ও শূদ্রের প্রতীক। আমরা দেখেছি, গণেশের মাথাটি হাতির। তার বাহন ছোট মুষিক। হাতি পশু হিসাবে বড় জাতের হলেও জাতভাই ছোট মুষিককে ত্যাগ করে না। আবার দেখা যায় ইঁদুরের দুটি দাঁত খুবই ধারালো। এই ধারালো দাঁত দিয়ে সে মোটা রশির জালও ছেদন করতে পারে। তেমনই মানবের দুটি দাঁত যেন বিবেক ও বৈরাগ্য। এ বিবেক বৈরাগ্যরূপ দাঁত দিয়ে সংসারবন্ধন ছেদন করে মানবমুক্তি লাভ করতে পারে। এসব কারণেই গণেশ বাহন হিসাবে পছন্দ করেছেন তার এই ছোট মুষিক বা ইঁদুরকে।

ধনসম্পদের দেবী-লক্ষ্মীদেবীর বাহন পেচক। পেচক দিনে অন্ধ, রাতে দেখে। সচরাচর আমরা জাগতিক অনেক ঘটনাই দেখতে পাই প্রকাশ্যে। কিন্তু এর পশ্চাতে অদৃশ্য থেকে কার নির্দেশে কী কারণে এসব ঘটনা ঘটেছে, তা জানতে পারি না। প্রকৃত হোতা আড়ালেই থাকে। পেচক সাক্ষ্য দেয়-আপাত যা দেখছ তার সবই সঠিক নয়। আরও গভীরে প্রবেশ কর। সবকিছুরই কারণে যেতে হয়। তখন প্রকৃত অবস্থার স্বরূপ জানা যায়।

দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখা যায় দেব-দেবীদের সঙ্গে তাদের বাহন পশু, পাখি, সরীসৃপজাতীয় প্রাণী। এর তাৎপর্য হিসাবে দেখা যায়, ধরায় এগুলো প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রয়োজন। এগুলোর অভাব হলে প্রকৃতির বিপর্যয় দেখা দিয়ে মানুষ বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই পশুপাখি রক্ষণাবেক্ষণের আইন করা হয়েছে।

দুর্গাপূজার কাঠামোতে আরেকটি চিত্র দেখা যায়, গণেশের পাশে একটি কলা-বউ সাজানো রয়েছে। একটি কলাগাছের সঙ্গে নয়টি চারাগাছ বেঁধে কাপড় পরানো হয়। একে বলা হয় নবপত্রিকা। এরা মা দুর্গার প্রতিনিধি। সনাতন ধর্মে পূজার আনুষ্ঠানিকতা প্রকৃতিগত। যে প্রকৃতি আমাদের বাঁচায় তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উপায় হলো তার পূজা বা আরাধনা। নয়টি চারাগাছ হলো-কদলী, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল, দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধান। দেবী দুর্গার প্রতিভূস্বরূপ এদের অর্চনা করা হয়। অর্থাৎ এদের মধ্যেও তিনি বর্তমান। এক কথায়, গাছপালা ও উদ্ভিদজগৎ ছাড়া রাষ্ট্র হবে মরুভূমি। তাই উদ্ভিদ রক্ষণাবেক্ষণের আইন আছে প্রতিটি দেশে।

একদিকে মানবসমাজ, অপরদিকে পশু-পাখি-বৃক্ষাদি যা কিছু আমাদের গোচরীভূত, সবকিছুর মধ্যে দেবী দুর্গা বর্তমান। অর্থাৎ বিশ্বের যা কিছু সব তার থেকে সৃষ্টি এবং তাতেই লয়। তিনি মাতৃস্বরূপা। জন্মভূমিও মাতৃসমা। কাজেই দেবী দুর্গার ঘোষণা- ‘অহং রাষ্ট্রী’ অর্থাৎ আমি বিশ্ব সমাজের অধীশ্বরী-যা যথার্থই প্রণিধানযোগ্য।

স্বামী জ্ঞানপ্রকাশানন্দ : অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ আশ্রম ও রামকৃষ্ণ মিশন, যশোর

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন