দেববাদ, দেবী দুর্গা ও তার পূজা
jugantor
দেববাদ, দেবী দুর্গা ও তার পূজা

  নিরঞ্জন অধিকারী  

১৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সনাতন ধর্মের প্রচলিত নাম হিন্দুধর্ম। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বহু দেব-দেবীর পূজা করে থাকেন। এ কারণে মনে হতে পারে হিন্দুরা বহু ঈশ্বরবাদী। প্রকৃতপক্ষে এ কথা সত্য নয়-হিন্দুধর্ম দর্শনসম্মতও নয়। হিন্দুরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী।

হিন্দুদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ বেদ-এ বলা হয়েছে, ‘একং সদ্ বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি।’ এককে বা এক ঈশ্বরকে জ্ঞানী ব্রাহ্মণগণ বা মনীষীগণ বহুরূপে বিবেচনা করেন। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থের একটি শাখা হচ্ছে উপনিষদ। একটি উপনিষদে বলা হয়েছে, একমেবাদ্বিতীয়ম্’-অর্থাৎ ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, দ্বিতীয় কোনো ঈশ্বর নেই। তাহলে দেব-দেবীদের অবস্থান কী?

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও বিশ্বাস করে ঈশ্বর নিরাকার। তবে তিনি যেহেতু সর্বশক্তিমান, তাই তিনি ইচ্ছা করলে এবং প্রয়োজনে সাকার রূপ ধারণ করতে পারেন। হিন্দুরা সর্বশক্তি স্রষ্টা, পালনকর্তা। তবে ঈশ্বরের নিরাকার অবস্থাকে হিন্দু ধর্মদর্শনে ব্রহ্ম বলা হয়। ব্রহ্মের কাজ সৃষ্টি করা, পালন করা এবং ধ্বংস করে ভারসাম্য রক্ষা করা। এ ধ্বংস করে ভারসাম্য রক্ষাকে বলে লয়। সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়-এ তিনের কর্ত্তা ব্রহ্ম। ব্রহ্ম যে রূপে সৃষ্টি করেন, তাকে বলা হয় ব্রহ্মা। যে রূপে পালন করেন তার নাম বিষ্ণু। এবং যে রূপে ধ্বংস করে লয় বা ভারসাম্য রক্ষা করেন, তার নাম শিব বা মহাদেব। নিরাকাররূপে তিনি নির্গুণ। প্রয়োজনে তিনি সগুণ ও সাকার হতে পারেন। ব্রহ্ম যে রূপে জীব ও জগতের ওপর প্রভুত্ব করেন, তার নাম ঈশ্বর। ‘ঈশ্’ ধাতু+বরচ্ প্রত্যয়=ঈশ্বর। ‘ঈশ্’ ধাতুর অর্থ হচ্ছে প্রভুত্ব করা। ব্রহ্ম জীব ও স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল-এ ত্রিজগতের ওপর যিনি প্রভুত্ব করেন, তখন তাকে বলা হয় ঈশ্বর। ব্রহ্ম ত্রিজগৎ ও জীবের মঙ্গল করেন, তাই তাকে বলা হয় ভগবান। আবার ঈশ্বরের কোনো গুণ বা শক্তিকে যখন বিশেষ প্রয়োজনে ঈশ্বর নিজেই আকার দান করেন, তখন তাকে দেব বা দেবী, একসঙ্গে দেবতা বলা হয়। যেমন-শক্তির দেবী দুর্গা, ধনৈশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী, বিদ্যার দেবী সরস্বতী, সিদ্ধি বা সাফল্যের দেব গণেশ, বীরত্বের দেব কার্তিক। আবার ঈশ্বর জীব সৃষ্টি করে যখন নিজেই তার মধ্যে বাস করেন, তখন তাকে জীবাত্মা বলা হয়। ঈশ্বর পরমাত্মা, মানুষসহ সব প্রাণী জীবাত্মা।

দেব-দেবী ও মানুষ ছাড়া মানুষের মতো আরও প্রাণীর কথা পুরাণ নামক ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়। তারা হলো অসুর, রাক্ষস, গন্ধর্ব ও কিন্নার। অসুররাও শক্তিধর। দেবতারা অমর, কিন্তু অসুরেরা মানুষের মতো মরণশীল। যক্ষ, বঙ্গ বা রাক্ষস, গন্ধর্ব ও কিন্নরেরাও মরণশীল। দেবতাদের রাজা ‘ইন্দ্র’। তার রাজ্যের নাম স্বর্গ। আর অসুরেরা বাস করে পাতাল রাজ্যে। এই যে বর্ণনা দিচ্ছি, এগুলো সবই কিন্তু পৌরাণিক। পুরাণ নামক ধর্মগ্রন্থে এসব কথা ও নানা বিবরণ বিধৃত রয়েছে। বিষ্ণুদেব যেখানে থাকেন, তার নাম বৈকুণ্ঠ। শিব বা মহাদেব যেখানে থাকেন, তার নাম কৈলাস।

মানুষ জীবিতাবস্থায় বৈকুণ্ঠ, স্বর্গ বা কৈলাসে যেতে পারে না। যদি মানুষ ধর্মপালন ও পুণ্য কাজ করে, তাহলে স্বর্গে যেতে পারে। আর পাপ করলে যেতে হয় নরকে। মানুষ বৈকুণ্ঠ ও কৈলাসে যথাক্রমে বিষ্ণু ও শিবের ইচ্ছা ও দয়া ছাড়া যেতে পারে না। স্বর্গ ও নরক ভোগেরও নির্দিষ্ট সীমা আছে। পাপ ও পুণ্যের পরিমাণ অনুসারে তা নির্ধারিত হয়। নির্ধারিত সময় স্বর্গ ও নরক ভোগের পর আবার পৃথিবীতে জন্ম নিতে হয়। আবার মৃত্যু। আবার জন্ম। আবার মৃত্যু। এভাবে জন্মমৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ মানুষ। একেই বলে সংসার। তবে হ্যাঁ! বহু পুণ্যের ফলে আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ থাকতে হয় না। আর পৃথিবীতে বারবার আসতে-যেতে হয় না। তখন জীবাত্মা পরমাত্মায় বা জীব পরমব্রহ্মে লীন হয়ে যায়। একেই বলে মোক্ষ বা চূড়ান্ত মুক্তি। বৌদ্ধ ধর্মে একেই বলে ‘নির্বাণ’। ‘বাণ’ মানে তৃষ্ণা- ভোগের আকাঙ্ক্ষা। ভোগের আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বা সংসারে আবদ্ধ থাকতে হয়।

আবার দেবতাদের প্রসঙ্গে আসি। মানুষ যেমন প্রশংসা পেলে খুশি হয়, উপঢৌকনে আনন্দ লাভ করে, তেমনই দেব-দেবীরাও প্রশংসা বা শ্রদ্ধা পেলে, উপঢৌকন পেলে খুশি হন। মানুষ যেমন পুষ্প-পত্র ফুল বা পাতা ভালোবাসে, তেমনই দেবতারাও পুষ্প ও পত্রে সন্তুষ্ট হন। আহার্য নিবেদন করলে খুশি হন। দেবতাদের দেখা যায় না, তাদের আহার করতে দেখা যায় না, তাদের উদ্দেশ্যে ভোজ্যবস্তু নিবেদন করা হয় বলেই তাকে বলে নৈবেদ্য। আসলে দেবতাদের নিবেদিত ভোজ্যবস্তু ভক্তরা বা মানুষরাই গ্রহণ করে। দেব-দেবীদের পূজার এ-ও একটি প্রধান তাৎপর্য।

এবারে দেবী দুর্গার প্রসঙ্গে আসি। দেবী দুর্গা শক্তির দেবী। অর্থাৎ তিনি ব্রহ্মার ‘শক্তি’ রূপে। ব্রহ্মের শক্তি যে দেবীরূপে আকার পেয়েছে তার নাম পরমা শক্তি, পরমা প্রকৃতি, মহাদেবী। তাকে আদ্যা শক্তিও বলা হয়। তিনি সব মায়ার অধিশ্বরী। আমাদের যে মায়া, মোহ স্নেহ, তা মহামায়ার মায়া। এই মায়ার অধীশ্বরী বলে তাকে বলা হয় যোগমায়া। এই যোগমায়ার নাম রূপ, স্বরূপে যদিও তিনি এক। বীরের মধ্যে তিনিই ‘শক্তি’ রূপে বিরাজ করেন। মায়ায় আচ্ছন্ন করেন। আবার তিনিই মায়াপাশ থেকে জীবকে মুক্ত করেন। তাই তিনি ভক্তি-মুক্তি-প্রদায়িনী।

দেবী দুর্গার পূজা উপলক্ষ্যে সমাজের সব মানুষ উৎসবে মেতে ওঠে। সেখানে অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও উৎসবে শামিল হয়। দুর্গাপূজা পরিণত হয় এক মিলন উৎসবে। দেবী দুর্গার সঙ্গে আসেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। এ যেন সন্তানাদি নিয়ে মেয়ের নাইওরে-বাপের বাড়িতে আসা। মেয়ে বাবার বাড়ি আসে। চার দিন থাকে। তারপর আবার শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। স্বামী শিবও স্ত্রী ছাড়া থাকতে পারেন না। তিনিও লুকিয়ে চলে আসেন। তাই দুর্গাপূজায় চালিতে উপরের দিকে কোনো এক জায়গায় শিবের মূর্তি রাখা হয়। বাঙালি জীবনের এটি একটি উজ্জ্বল চিত্র।

দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে দেবী দুর্গার মৃণ্ময়ী প্রতিমা তৈরির মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মালাকার, ঢাকীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে কাজ পান। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে মেলা বসে। মেলার বিকিকিনির মধ্য দিয়েও দুর্গাপূজার একটি অর্থনৈতিক তাৎপর্য প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শিল্পচর্চার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। পেশাদার শিল্পীরাও বাঞ্ছিত সম্মানী পান। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে সাহিত্যবিষয়ক স্মরণিকা এবং দৈনিক-মাসিক পত্রিকাদিতে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এতে করে প্রবীণ লেখকের মূল্যবান লেখা পাই। নবীন লেখকরাও নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দুর্গপূজার বহুমুখী তাৎপর্য রয়েছে। শরতের শুভ্র আকাশে ভাসে সাদা মেঘের ভেলা। কাশবন শন্শন্ করে শোনায় উৎসবের আনন্দ-ধ্বনি। আর হলুদবৃন্তে শুভ্র শিউলি মনকে পবিত্র আনন্দে অভিসিক্ত করে।

নিরঞ্জন অধিকারী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি

দেববাদ, দেবী দুর্গা ও তার পূজা

 নিরঞ্জন অধিকারী 
১৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সনাতন ধর্মের প্রচলিত নাম হিন্দুধর্ম। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বহু দেব-দেবীর পূজা করে থাকেন। এ কারণে মনে হতে পারে হিন্দুরা বহু ঈশ্বরবাদী। প্রকৃতপক্ষে এ কথা সত্য নয়-হিন্দুধর্ম দর্শনসম্মতও নয়। হিন্দুরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী।

হিন্দুদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ বেদ-এ বলা হয়েছে, ‘একং সদ্ বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি।’ এককে বা এক ঈশ্বরকে জ্ঞানী ব্রাহ্মণগণ বা মনীষীগণ বহুরূপে বিবেচনা করেন। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থের একটি শাখা হচ্ছে উপনিষদ। একটি উপনিষদে বলা হয়েছে, একমেবাদ্বিতীয়ম্’-অর্থাৎ ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, দ্বিতীয় কোনো ঈশ্বর নেই। তাহলে দেব-দেবীদের অবস্থান কী?

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও বিশ্বাস করে ঈশ্বর নিরাকার। তবে তিনি যেহেতু সর্বশক্তিমান, তাই তিনি ইচ্ছা করলে এবং প্রয়োজনে সাকার রূপ ধারণ করতে পারেন। হিন্দুরা সর্বশক্তি স্রষ্টা, পালনকর্তা। তবে ঈশ্বরের নিরাকার অবস্থাকে হিন্দু ধর্মদর্শনে ব্রহ্ম বলা হয়। ব্রহ্মের কাজ সৃষ্টি করা, পালন করা এবং ধ্বংস করে ভারসাম্য রক্ষা করা। এ ধ্বংস করে ভারসাম্য রক্ষাকে বলে লয়। সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়-এ তিনের কর্ত্তা ব্রহ্ম। ব্রহ্ম যে রূপে সৃষ্টি করেন, তাকে বলা হয় ব্রহ্মা। যে রূপে পালন করেন তার নাম বিষ্ণু। এবং যে রূপে ধ্বংস করে লয় বা ভারসাম্য রক্ষা করেন, তার নাম শিব বা মহাদেব। নিরাকাররূপে তিনি নির্গুণ। প্রয়োজনে তিনি সগুণ ও সাকার হতে পারেন। ব্রহ্ম যে রূপে জীব ও জগতের ওপর প্রভুত্ব করেন, তার নাম ঈশ্বর। ‘ঈশ্’ ধাতু+বরচ্ প্রত্যয়=ঈশ্বর। ‘ঈশ্’ ধাতুর অর্থ হচ্ছে প্রভুত্ব করা। ব্রহ্ম জীব ও স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল-এ ত্রিজগতের ওপর যিনি প্রভুত্ব করেন, তখন তাকে বলা হয় ঈশ্বর। ব্রহ্ম ত্রিজগৎ ও জীবের মঙ্গল করেন, তাই তাকে বলা হয় ভগবান। আবার ঈশ্বরের কোনো গুণ বা শক্তিকে যখন বিশেষ প্রয়োজনে ঈশ্বর নিজেই আকার দান করেন, তখন তাকে দেব বা দেবী, একসঙ্গে দেবতা বলা হয়। যেমন-শক্তির দেবী দুর্গা, ধনৈশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী, বিদ্যার দেবী সরস্বতী, সিদ্ধি বা সাফল্যের দেব গণেশ, বীরত্বের দেব কার্তিক। আবার ঈশ্বর জীব সৃষ্টি করে যখন নিজেই তার মধ্যে বাস করেন, তখন তাকে জীবাত্মা বলা হয়। ঈশ্বর পরমাত্মা, মানুষসহ সব প্রাণী জীবাত্মা।

দেব-দেবী ও মানুষ ছাড়া মানুষের মতো আরও প্রাণীর কথা পুরাণ নামক ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়। তারা হলো অসুর, রাক্ষস, গন্ধর্ব ও কিন্নার। অসুররাও শক্তিধর। দেবতারা অমর, কিন্তু অসুরেরা মানুষের মতো মরণশীল। যক্ষ, বঙ্গ বা রাক্ষস, গন্ধর্ব ও কিন্নরেরাও মরণশীল। দেবতাদের রাজা ‘ইন্দ্র’। তার রাজ্যের নাম স্বর্গ। আর অসুরেরা বাস করে পাতাল রাজ্যে। এই যে বর্ণনা দিচ্ছি, এগুলো সবই কিন্তু পৌরাণিক। পুরাণ নামক ধর্মগ্রন্থে এসব কথা ও নানা বিবরণ বিধৃত রয়েছে। বিষ্ণুদেব যেখানে থাকেন, তার নাম বৈকুণ্ঠ। শিব বা মহাদেব যেখানে থাকেন, তার নাম কৈলাস।

মানুষ জীবিতাবস্থায় বৈকুণ্ঠ, স্বর্গ বা কৈলাসে যেতে পারে না। যদি মানুষ ধর্মপালন ও পুণ্য কাজ করে, তাহলে স্বর্গে যেতে পারে। আর পাপ করলে যেতে হয় নরকে। মানুষ বৈকুণ্ঠ ও কৈলাসে যথাক্রমে বিষ্ণু ও শিবের ইচ্ছা ও দয়া ছাড়া যেতে পারে না। স্বর্গ ও নরক ভোগেরও নির্দিষ্ট সীমা আছে। পাপ ও পুণ্যের পরিমাণ অনুসারে তা নির্ধারিত হয়। নির্ধারিত সময় স্বর্গ ও নরক ভোগের পর আবার পৃথিবীতে জন্ম নিতে হয়। আবার মৃত্যু। আবার জন্ম। আবার মৃত্যু। এভাবে জন্মমৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ মানুষ। একেই বলে সংসার। তবে হ্যাঁ! বহু পুণ্যের ফলে আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ থাকতে হয় না। আর পৃথিবীতে বারবার আসতে-যেতে হয় না। তখন জীবাত্মা পরমাত্মায় বা জীব পরমব্রহ্মে লীন হয়ে যায়। একেই বলে মোক্ষ বা চূড়ান্ত মুক্তি। বৌদ্ধ ধর্মে একেই বলে ‘নির্বাণ’। ‘বাণ’ মানে তৃষ্ণা- ভোগের আকাঙ্ক্ষা। ভোগের আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বা সংসারে আবদ্ধ থাকতে হয়।

আবার দেবতাদের প্রসঙ্গে আসি। মানুষ যেমন প্রশংসা পেলে খুশি হয়, উপঢৌকনে আনন্দ লাভ করে, তেমনই দেব-দেবীরাও প্রশংসা বা শ্রদ্ধা পেলে, উপঢৌকন পেলে খুশি হন। মানুষ যেমন পুষ্প-পত্র ফুল বা পাতা ভালোবাসে, তেমনই দেবতারাও পুষ্প ও পত্রে সন্তুষ্ট হন। আহার্য নিবেদন করলে খুশি হন। দেবতাদের দেখা যায় না, তাদের আহার করতে দেখা যায় না, তাদের উদ্দেশ্যে ভোজ্যবস্তু নিবেদন করা হয় বলেই তাকে বলে নৈবেদ্য। আসলে দেবতাদের নিবেদিত ভোজ্যবস্তু ভক্তরা বা মানুষরাই গ্রহণ করে। দেব-দেবীদের পূজার এ-ও একটি প্রধান তাৎপর্য।

এবারে দেবী দুর্গার প্রসঙ্গে আসি। দেবী দুর্গা শক্তির দেবী। অর্থাৎ তিনি ব্রহ্মার ‘শক্তি’ রূপে। ব্রহ্মের শক্তি যে দেবীরূপে আকার পেয়েছে তার নাম পরমা শক্তি, পরমা প্রকৃতি, মহাদেবী। তাকে আদ্যা শক্তিও বলা হয়। তিনি সব মায়ার অধিশ্বরী। আমাদের যে মায়া, মোহ স্নেহ, তা মহামায়ার মায়া। এই মায়ার অধীশ্বরী বলে তাকে বলা হয় যোগমায়া। এই যোগমায়ার নাম রূপ, স্বরূপে যদিও তিনি এক। বীরের মধ্যে তিনিই ‘শক্তি’ রূপে বিরাজ করেন। মায়ায় আচ্ছন্ন করেন। আবার তিনিই মায়াপাশ থেকে জীবকে মুক্ত করেন। তাই তিনি ভক্তি-মুক্তি-প্রদায়িনী।

দেবী দুর্গার পূজা উপলক্ষ্যে সমাজের সব মানুষ উৎসবে মেতে ওঠে। সেখানে অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও উৎসবে শামিল হয়। দুর্গাপূজা পরিণত হয় এক মিলন উৎসবে। দেবী দুর্গার সঙ্গে আসেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। এ যেন সন্তানাদি নিয়ে মেয়ের নাইওরে-বাপের বাড়িতে আসা। মেয়ে বাবার বাড়ি আসে। চার দিন থাকে। তারপর আবার শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। স্বামী শিবও স্ত্রী ছাড়া থাকতে পারেন না। তিনিও লুকিয়ে চলে আসেন। তাই দুর্গাপূজায় চালিতে উপরের দিকে কোনো এক জায়গায় শিবের মূর্তি রাখা হয়। বাঙালি জীবনের এটি একটি উজ্জ্বল চিত্র।

দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে দেবী দুর্গার মৃণ্ময়ী প্রতিমা তৈরির মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মালাকার, ঢাকীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে কাজ পান। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে মেলা বসে। মেলার বিকিকিনির মধ্য দিয়েও দুর্গাপূজার একটি অর্থনৈতিক তাৎপর্য প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শিল্পচর্চার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। পেশাদার শিল্পীরাও বাঞ্ছিত সম্মানী পান। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে সাহিত্যবিষয়ক স্মরণিকা এবং দৈনিক-মাসিক পত্রিকাদিতে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এতে করে প্রবীণ লেখকের মূল্যবান লেখা পাই। নবীন লেখকরাও নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দুর্গপূজার বহুমুখী তাৎপর্য রয়েছে। শরতের শুভ্র আকাশে ভাসে সাদা মেঘের ভেলা। কাশবন শন্শন্ করে শোনায় উৎসবের আনন্দ-ধ্বনি। আর হলুদবৃন্তে শুভ্র শিউলি মনকে পবিত্র আনন্দে অভিসিক্ত করে।

নিরঞ্জন অধিকারী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন