রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তো বটেই ক্ষতিপূরণও চাইতে হবে
jugantor
আশেপাশে চারপাশে
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তো বটেই ক্ষতিপূরণও চাইতে হবে

  চপল বাশার  

২৪ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। একই সঙ্গে চার বছর ধরে তারা এ জেলার পরিবেশ, বনাঞ্চল, ভূ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে চলেছে। তাদের কারণে বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের এদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি তারা করেছে, তাতে তাদের প্রতি নমনীয় ও সহানুভূতিশীল থাকার সুযোগ আর নেই। যেভাবেই হোক, তাদের ফেরত পাঠাতে হবে নিজ দেশ মিয়ানমারে। এর বিকল্প নেই। তা না হলে বাংলাদেশের সামনে সমূহ বিপদ।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার কারণেই রোহিঙ্গারা আরাকান ও রাখাইন অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এখানে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পরিবেশের যে ক্ষতি করেছে এবং করে যাচ্ছে, সেজন্য মিয়ানমার সরকার তথা সেখানকার সামরিক জান্তাই দায়ী। কারণ তারাই রোহিঙ্গাদের ঠেলে পাঠিয়েছে বাংলাদেশে। অতএব বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানোর জন্য মিয়ানমারের কাছে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে আমাদের। এজন্য প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়াও উচিত হবে।

গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা দলে দলে সীমান্ত অতিক্রম করে টেকনাফ, উখিয়াসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে থাকে। কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত লাখে। এর আগে থেকেই আরও প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ কক্সবাজারে অবস্থান করছিল। তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য কথাবার্তাও চলছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু ফেরত না নিয়ে আরও সাত লাখ রোহিঙ্গাকে এদেশে ঠেলে পাঠালো মিয়ানমার। ফলে এদেশে আগত রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ লাখে। গত তিন বছরে তারা এখানকার আশ্রয়শিবিরে প্রায় এক লাখ শিশুর জন্ম দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লাখ। জনবহুল এ দেশে এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এখন এক বিরাট বোঝা।

মানবিক কারণে এবং বিশ্ব-মোড়লদের অনুরোধে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে সাময়িক সময়ের জন্য। তাদের জন্য আশ্রয়শিবির তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। খাবারদাবার ও চিকিৎসাও তারা পাচ্ছে। বিনিময়ে তারা তাদের সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছে। এভাবে বাড়তে থাকলে কয়েক বছর পরেই তাদের সংখ্যা হবে ১৫ লাখ। তখন পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা ভাবলে আতঙ্ক জাগে।

রোহিঙ্গাদের কারণেই পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের অঞ্চল এবং দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার আজ ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। রোহিঙ্গারা সরকার নির্ধারিত আশ্রয়শিবির ছেড়ে জেলার দক্ষিণাঞ্চলে পাহাড়ি এলাকা ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ঘরবাড়ি তুলছে বলে খবর রয়েছে। এজন্য তারা ইচ্ছামতো গাছ কাটছে, পাহাড় কেটে সমতল ভূমি করছে ঘর তৈরির জন্য। আশ্চর্যের বিষয়, তারা বিনা বাধায় এসব অপকর্ম করছে। অথচ এদেশে সরকার রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কর্তৃপক্ষ রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা ঘরবাড়ি তৈরি ও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য যে পরিমাণ গাছ কেটেছে, তাতে ৮ হাজারের বেশি একর জমির প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশবিষয়ক সংস্থা আইইউসিএনও রোহিঙ্গা অভিবাসনের কারণে কক্সবাজারে বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে। এ অঞ্চলে এশিয়ান হাতির বসবাস এবং এসব হাতি এখানেই বিচরণ করে দীর্ঘকাল থেকে। কিন্তু বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় হাতির অবাধ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। হাতিগুলো বনে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে লোকালয়ে হামলা করছে। হাতি ছাড়াও অন্যান্য বন্যপ্রাণী ও পাখির বাসস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়ে গেছে। পশুপাখির সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ, ঔষধি গাছ, লতা, গুল্ম, বাঁশ, বেতসহ বহু উদ্ভিদ বিনষ্ট অথবা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কক্সবাজারের ওই এলাকা থেকে। রোহিঙ্গা অভিবাসনের ফলে উখিয়া, টেকনাফসহ কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে পরিবেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে সম্পর্কে ইউএনডিপি এবং বিভিন্ন সংস্থা জরিপ ও গবেষণা করেছে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মোট কথা, বনাঞ্চল ধ্বংস ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাপকভাবে।

গাছ কাটা ছাড়াও নির্বিচারে এসব এলাকায় পাহাড় ও টিলা কেটে ভূমি সমতল করা হয়েছে ঘর বানানোর জন্য। ফলে কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে বিশাল এলাকায় ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে। গাছকাটা ও পাহাড় ধ্বংসের কারণে এ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। রোহিঙ্গাদের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে এ পর্যন্ত ৯ হাজারের বেশি নলকূপ বসাতে হয়েছে। এজন্য ভূগর্ভের পানির স্তর ক্রমেই আরও নিচে নামছে। গাছকাটা, পাহাড় ধ্বংসের কারণে ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন হওয়ায় বেশির ভাগ পাহাড়ি ছড়া এখন প্রায় সারা বছরই পানিশূন্য থাকে। ফলে ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রাকৃতিক সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন হওয়ায় কক্সবাজারের পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটছে। বর্ষাকালে রোহিঙ্গাসহ বেশকিছু স্থানীয় মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত নয়। প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়া ও বন্যার পানির সঙ্গে মিশে নাফ নদীসহ বিভিন্ন সংযোগ খালে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপর।

কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে গত চার বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে লক্ষণীয়ভাবে। এর প্রধান কারণ মাদক ব্যবসা। মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকছে অবৈধভাবে। ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি অংশ এবং মিয়ানমারের মাদক উৎপাদনকারীরা সক্রিয়ভাবে জড়িত। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। অবৈধ হলেও সেসব কারখানায় অবাধে মাদক উৎপাদন চলছে। সেখানকার সামরিক জান্তা এতে বাধা দেয় না। মিয়ানমারে উৎপাদিত মাদক সেদেশে বিক্রি বা ব্যবহার হয় না। ওইসব মাদকের প্রধান বাজার হচ্ছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের পাচারকারীরা বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য বাংলাদেশের ভেতরে পাঠায় নিয়মিতভাবে। মাদক পাচারে সহযোগিতা করে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং এদেশীয় মাদক ব্যবসায়ীরা। স্থল সীমান্ত ছাড়াও সমুদ্রপথে মাদক পাচারের খবর পাওয়া গেছে। চোরাচালান করে আনা ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে মজুত রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতরে মাদকদ্রব্য লুকিয়ে রেখে পরে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। নিবন্ধিত দুটি ক্যাম্পসহ ৩৪টি শরণার্থী ক্যাম্প রয়েছে কক্সবাজারে। এসব ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি যথেষ্ট নয় বলে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল মনে করে।

এ কথা বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে, মিয়ানমার থেকে মাদকের চোরাচালান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে সেসব মজুত রাখা ও এর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এ কারণেই দেশের প্রায় সর্বত্র মাদক ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ-যুবক মাদকাসক্ত হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ কথা স্বীকার করে। মাদক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের অভিযান চলছে, মাদকদ্রব্য আটক করা হচ্ছে, মাদক ব্যবসায়ীরাও ধরা পড়ছে। তারপরও দেশের ভেতরে মাদকদ্রব্য ঢুকছে বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে। মিয়ানমারে উৎপাদিত ইয়াবার প্রায় সবটাই এদেশে পাচার হয়ে আসে কক্সবাজার জেলার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে। আর এতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা রয়েছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশের। সমস্যাটি সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবহিত বলেই মনে হয়। তবে দরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপও অবস্থান করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুক্রবার ভোরে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি মাদ্রাসায় ঘুমন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর দুর্বৃত্তদের বার্স্ট ফায়ারে তিন শিক্ষক ও এক ছাত্রসহ কমপক্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর আশ্রয়শিবিরের ভেতরে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে একদল সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তার নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠনও ছিল। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তুলতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। সন্দেহ করা হয়, প্রত্যাবাসনবিরোধী রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এর পেছনে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হাত থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। কারণ মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় না। সামরিক জান্তার এজেন্টরাও আশ্রয়শিবিরে থাকতে পারে। তদুপরি রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশও মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না।

মানবিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। তাদের লালনপালন করেছে, এখনো করছে। শুরুতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা কথা দিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। রোহিঙ্গাদের জন্য বিদেশি সাহায্য আসছে, বিদেশি সংস্থা ও এনজিওগুলো কক্সবাজারে অফিস খুলে বসেছে রোহিঙ্গাদের সেবা করার জন্য। এনজিওগুলোর দেশি-বিদেশি কর্মকর্তারা সেখানে থেকে মোটা অঙ্কের বেতন নিচ্ছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা তারা আর বলে না। তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই প্রত্যাবাসন নিয়ে।

প্রথমদিকে বলা হতো, বাংলাদেশও বলেছে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এ সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বিদেশি মুরুব্বিরা এটাকে আর আন্তর্জাতিক সমস্যা মনে করছে না। এটা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা, সেভাবেই এর সমাধান করতে হবে। এখন বিরাজমান বাস্তবতা হলো, মিয়ানমার এটাকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যাও মনে করে না। তারা তাদের আগের অবস্থানে রয়েছে। তারা দাবি করে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের লোক, তারা বাংলাদেশেই থাকবে। এটা বাংলাদেশের সমস্যা। অথচ ২০১৭ সালের আগে বাংলাদেশে আশ্রিত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নিয়ে রাখাইনে তাদের নিজ নিজ বাসস্থানে পুনর্বাসিত করেছিল। এখন সে কথা তারা ভুলে গেছে। কারণ মিয়ানমারের ওপর রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ এখন আগের মতো নেই।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার উল্লেখ এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হবে। এ ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাকে পর্যাপ্ত বলার সুযোগ নেই। চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত-কেউই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। তাদের কূটনৈতিক অবস্থান কমবেশি মিয়ানমারের দিকে রয়েছে বললে ভুল হবে না। এটা তাদের স্বার্থের কারণে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে আপাতত একটি পথই খোলা আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সেটা হচ্ছে দৃঢ়, জোরদার ও কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এখন সুসম্পর্ক রয়েছে। বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যে সহযোগিতা বিদ্যমান। বাংলাদেশের বহু প্রকল্পে চীন সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। সুসম্পর্ক যখন আছেই, তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে চীনের সহযোগিতা পাওয়াও সম্ভব, যদি কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থাকে। চীনকে যদি পক্ষে রাখা যায়, তাহলে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে না।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তা শুরুতেই বলা হয়েছে। পরিবেশের যে ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে, আর্থিক হিসাবে এর পরিমাণ বিপুল। শুধু বনজদ্রব্য ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এটা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের হিসাব। পাহাড় কাটা, দূষণ ইত্যাদি হিসাব করলে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে।

পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির জন্য বাংলাদেশ অবশ্যই মিয়ানমারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। এ দাবিটি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও উপস্থাপন করা যাবে। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুটিও আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাধান্য পাবে। মিয়ানমারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জোরদার করতে সহায়ক হবে।

চপল বাশার : লেখক, সাংবাদিক

basharbd@gmail.com

আশেপাশে চারপাশে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তো বটেই ক্ষতিপূরণও চাইতে হবে

 চপল বাশার 
২৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। একই সঙ্গে চার বছর ধরে তারা এ জেলার পরিবেশ, বনাঞ্চল, ভূ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে চলেছে। তাদের কারণে বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের এদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি তারা করেছে, তাতে তাদের প্রতি নমনীয় ও সহানুভূতিশীল থাকার সুযোগ আর নেই। যেভাবেই হোক, তাদের ফেরত পাঠাতে হবে নিজ দেশ মিয়ানমারে। এর বিকল্প নেই। তা না হলে বাংলাদেশের সামনে সমূহ বিপদ।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার কারণেই রোহিঙ্গারা আরাকান ও রাখাইন অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এখানে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পরিবেশের যে ক্ষতি করেছে এবং করে যাচ্ছে, সেজন্য মিয়ানমার সরকার তথা সেখানকার সামরিক জান্তাই দায়ী। কারণ তারাই রোহিঙ্গাদের ঠেলে পাঠিয়েছে বাংলাদেশে। অতএব বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানোর জন্য মিয়ানমারের কাছে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে আমাদের। এজন্য প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়াও উচিত হবে।

গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা দলে দলে সীমান্ত অতিক্রম করে টেকনাফ, উখিয়াসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে থাকে। কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত লাখে। এর আগে থেকেই আরও প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ কক্সবাজারে অবস্থান করছিল। তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য কথাবার্তাও চলছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু ফেরত না নিয়ে আরও সাত লাখ রোহিঙ্গাকে এদেশে ঠেলে পাঠালো মিয়ানমার। ফলে এদেশে আগত রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ লাখে। গত তিন বছরে তারা এখানকার আশ্রয়শিবিরে প্রায় এক লাখ শিশুর জন্ম দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লাখ। জনবহুল এ দেশে এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এখন এক বিরাট বোঝা।

মানবিক কারণে এবং বিশ্ব-মোড়লদের অনুরোধে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে সাময়িক সময়ের জন্য। তাদের জন্য আশ্রয়শিবির তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। খাবারদাবার ও চিকিৎসাও তারা পাচ্ছে। বিনিময়ে তারা তাদের সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছে। এভাবে বাড়তে থাকলে কয়েক বছর পরেই তাদের সংখ্যা হবে ১৫ লাখ। তখন পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা ভাবলে আতঙ্ক জাগে।

রোহিঙ্গাদের কারণেই পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের অঞ্চল এবং দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার আজ ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। রোহিঙ্গারা সরকার নির্ধারিত আশ্রয়শিবির ছেড়ে জেলার দক্ষিণাঞ্চলে পাহাড়ি এলাকা ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ঘরবাড়ি তুলছে বলে খবর রয়েছে। এজন্য তারা ইচ্ছামতো গাছ কাটছে, পাহাড় কেটে সমতল ভূমি করছে ঘর তৈরির জন্য। আশ্চর্যের বিষয়, তারা বিনা বাধায় এসব অপকর্ম করছে। অথচ এদেশে সরকার রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কর্তৃপক্ষ রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা ঘরবাড়ি তৈরি ও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য যে পরিমাণ গাছ কেটেছে, তাতে ৮ হাজারের বেশি একর জমির প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশবিষয়ক সংস্থা আইইউসিএনও রোহিঙ্গা অভিবাসনের কারণে কক্সবাজারে বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে। এ অঞ্চলে এশিয়ান হাতির বসবাস এবং এসব হাতি এখানেই বিচরণ করে দীর্ঘকাল থেকে। কিন্তু বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় হাতির অবাধ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। হাতিগুলো বনে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে লোকালয়ে হামলা করছে। হাতি ছাড়াও অন্যান্য বন্যপ্রাণী ও পাখির বাসস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়ে গেছে। পশুপাখির সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ, ঔষধি গাছ, লতা, গুল্ম, বাঁশ, বেতসহ বহু উদ্ভিদ বিনষ্ট অথবা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কক্সবাজারের ওই এলাকা থেকে। রোহিঙ্গা অভিবাসনের ফলে উখিয়া, টেকনাফসহ কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে পরিবেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে সম্পর্কে ইউএনডিপি এবং বিভিন্ন সংস্থা জরিপ ও গবেষণা করেছে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মোট কথা, বনাঞ্চল ধ্বংস ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাপকভাবে।

গাছ কাটা ছাড়াও নির্বিচারে এসব এলাকায় পাহাড় ও টিলা কেটে ভূমি সমতল করা হয়েছে ঘর বানানোর জন্য। ফলে কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে বিশাল এলাকায় ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে। গাছকাটা ও পাহাড় ধ্বংসের কারণে এ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। রোহিঙ্গাদের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে এ পর্যন্ত ৯ হাজারের বেশি নলকূপ বসাতে হয়েছে। এজন্য ভূগর্ভের পানির স্তর ক্রমেই আরও নিচে নামছে। গাছকাটা, পাহাড় ধ্বংসের কারণে ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন হওয়ায় বেশির ভাগ পাহাড়ি ছড়া এখন প্রায় সারা বছরই পানিশূন্য থাকে। ফলে ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রাকৃতিক সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন হওয়ায় কক্সবাজারের পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটছে। বর্ষাকালে রোহিঙ্গাসহ বেশকিছু স্থানীয় মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত নয়। প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়া ও বন্যার পানির সঙ্গে মিশে নাফ নদীসহ বিভিন্ন সংযোগ খালে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপর।

কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে গত চার বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে লক্ষণীয়ভাবে। এর প্রধান কারণ মাদক ব্যবসা। মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকছে অবৈধভাবে। ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি অংশ এবং মিয়ানমারের মাদক উৎপাদনকারীরা সক্রিয়ভাবে জড়িত। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। অবৈধ হলেও সেসব কারখানায় অবাধে মাদক উৎপাদন চলছে। সেখানকার সামরিক জান্তা এতে বাধা দেয় না। মিয়ানমারে উৎপাদিত মাদক সেদেশে বিক্রি বা ব্যবহার হয় না। ওইসব মাদকের প্রধান বাজার হচ্ছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের পাচারকারীরা বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য বাংলাদেশের ভেতরে পাঠায় নিয়মিতভাবে। মাদক পাচারে সহযোগিতা করে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং এদেশীয় মাদক ব্যবসায়ীরা। স্থল সীমান্ত ছাড়াও সমুদ্রপথে মাদক পাচারের খবর পাওয়া গেছে। চোরাচালান করে আনা ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে মজুত রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতরে মাদকদ্রব্য লুকিয়ে রেখে পরে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। নিবন্ধিত দুটি ক্যাম্পসহ ৩৪টি শরণার্থী ক্যাম্প রয়েছে কক্সবাজারে। এসব ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি যথেষ্ট নয় বলে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল মনে করে।

এ কথা বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে, মিয়ানমার থেকে মাদকের চোরাচালান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে সেসব মজুত রাখা ও এর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এ কারণেই দেশের প্রায় সর্বত্র মাদক ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ-যুবক মাদকাসক্ত হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ কথা স্বীকার করে। মাদক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের অভিযান চলছে, মাদকদ্রব্য আটক করা হচ্ছে, মাদক ব্যবসায়ীরাও ধরা পড়ছে। তারপরও দেশের ভেতরে মাদকদ্রব্য ঢুকছে বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে। মিয়ানমারে উৎপাদিত ইয়াবার প্রায় সবটাই এদেশে পাচার হয়ে আসে কক্সবাজার জেলার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে। আর এতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা রয়েছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশের। সমস্যাটি সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবহিত বলেই মনে হয়। তবে দরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপও অবস্থান করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুক্রবার ভোরে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি মাদ্রাসায় ঘুমন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর দুর্বৃত্তদের বার্স্ট ফায়ারে তিন শিক্ষক ও এক ছাত্রসহ কমপক্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর আশ্রয়শিবিরের ভেতরে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে একদল সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তার নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠনও ছিল। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তুলতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। সন্দেহ করা হয়, প্রত্যাবাসনবিরোধী রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এর পেছনে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হাত থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। কারণ মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় না। সামরিক জান্তার এজেন্টরাও আশ্রয়শিবিরে থাকতে পারে। তদুপরি রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশও মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না।

মানবিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। তাদের লালনপালন করেছে, এখনো করছে। শুরুতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা কথা দিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। রোহিঙ্গাদের জন্য বিদেশি সাহায্য আসছে, বিদেশি সংস্থা ও এনজিওগুলো কক্সবাজারে অফিস খুলে বসেছে রোহিঙ্গাদের সেবা করার জন্য। এনজিওগুলোর দেশি-বিদেশি কর্মকর্তারা সেখানে থেকে মোটা অঙ্কের বেতন নিচ্ছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা তারা আর বলে না। তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই প্রত্যাবাসন নিয়ে।

প্রথমদিকে বলা হতো, বাংলাদেশও বলেছে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এ সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বিদেশি মুরুব্বিরা এটাকে আর আন্তর্জাতিক সমস্যা মনে করছে না। এটা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা, সেভাবেই এর সমাধান করতে হবে। এখন বিরাজমান বাস্তবতা হলো, মিয়ানমার এটাকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যাও মনে করে না। তারা তাদের আগের অবস্থানে রয়েছে। তারা দাবি করে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের লোক, তারা বাংলাদেশেই থাকবে। এটা বাংলাদেশের সমস্যা। অথচ ২০১৭ সালের আগে বাংলাদেশে আশ্রিত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নিয়ে রাখাইনে তাদের নিজ নিজ বাসস্থানে পুনর্বাসিত করেছিল। এখন সে কথা তারা ভুলে গেছে। কারণ মিয়ানমারের ওপর রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ এখন আগের মতো নেই।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার উল্লেখ এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হবে। এ ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাকে পর্যাপ্ত বলার সুযোগ নেই। চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত-কেউই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। তাদের কূটনৈতিক অবস্থান কমবেশি মিয়ানমারের দিকে রয়েছে বললে ভুল হবে না। এটা তাদের স্বার্থের কারণে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে আপাতত একটি পথই খোলা আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সেটা হচ্ছে দৃঢ়, জোরদার ও কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এখন সুসম্পর্ক রয়েছে। বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যে সহযোগিতা বিদ্যমান। বাংলাদেশের বহু প্রকল্পে চীন সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। সুসম্পর্ক যখন আছেই, তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে চীনের সহযোগিতা পাওয়াও সম্ভব, যদি কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থাকে। চীনকে যদি পক্ষে রাখা যায়, তাহলে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে না।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তা শুরুতেই বলা হয়েছে। পরিবেশের যে ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে, আর্থিক হিসাবে এর পরিমাণ বিপুল। শুধু বনজদ্রব্য ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এটা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের হিসাব। পাহাড় কাটা, দূষণ ইত্যাদি হিসাব করলে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে।

পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির জন্য বাংলাদেশ অবশ্যই মিয়ানমারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। এ দাবিটি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও উপস্থাপন করা যাবে। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুটিও আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাধান্য পাবে। মিয়ানমারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জোরদার করতে সহায়ক হবে।

চপল বাশার : লেখক, সাংবাদিক

basharbd@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন