এমসিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশ
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
এমসিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশ

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

২৪ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন’ (এমসিসি) সম্প্রতি ২০২২ সালের জন্য বাংলাদেশের মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ড গঠনের পর এটি পরিচালনার জন্য ২০০৪ সালে এমসিসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মূলত স্কোর কার্ডের উন্নতির ভিত্তিতে কোনো দেশকে এ ফান্ডে যুক্ত করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ফান্ডে অন্তর্ভুক্তির জন্য কোনো দেশকে ২০টি সূচকে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এগুলো হলো-রাজনৈতিক অধিকার, বেসামরিক মানুষের স্বাধীনতা, সরকারের কার্যকারিতা, তথ্যের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্বনীতি, মূল্যস্ফীতি, আইনের গুণগতমান, বাণিজ্যনীতি, অর্থনীতিতে নারী ও পুরুষের সমতা, জমির অধিকার, ঋণপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা, ব্যবসার শুরু, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়, প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সার্বিক সরকারি ব্যয়, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, টিকা দেওয়ার হার, মেয়েদের শিক্ষার হার এবং শিশু স্বাস্থ্য। মূল্যায়নে চারটি সূচক গ্রিন বা সবুজ (ভালো) জোনে রয়েছে।

সেগুলো হলো-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টিকা দেওয়ার হার, ব্যবসা শুরু এবং মেয়েদের শিক্ষা হার। অন্য ১৬টি সূচকে বাংলাদেশ রেড বা লাল (খারাপ) জোনে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, গত ১৮ বছরের মধ্যে এই প্রথম এত বেশি রেড সূচকভুক্ত হলো দেশ। এর আগে ২০২১ সালের প্রতিবেদনে রেড জোনে ছিল ১৩টি সূচক, ২০২০ সালে ছিল ১২টি, ২০১৯ সালে ১১টি, ২০১৮ সালে ৭টি এবং ২০১৭ সালে ছিল ১০টি সূচক।

বাংলাদেশকে নিয়ে এমসিসির মূল্যায়নে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, এ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এমসিসি সরকারের কাছ থেকে কোনো তথ্য নেয়নি। তারা নিজেদের মতো করে মূল্যায়ন করেছে। আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে আমাদের মতো করেই। তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বিষয়গুলো দেখা হবে। এখান থেকে শিক্ষণীয় থাকলে সেগুলো গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় অতিরঞ্জিত করে দেখায়। এখানে তাদের আবেগ বেশি থাকে। তবে তারা যেসব বিষয় রেড জোনে দেখিয়েছে, সেগুলোর বেশ কয়েকটি ঠিক আছে। যেমন দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্র তো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেসব বিষয়ে দুর্বলতা আছে, সেগুলোতে নজর দেওয়া জরুরি। কিন্তু একেবারেই উড়িয়ে দিলে হবে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এ প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, সরকারের পক্ষে হয়তো বলা হবে, দুর্নীতি কিছু হলেও উন্নয়ন তো ঠিকই হচ্ছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কথা হলো, শুধু উন্নয়ন ভালো হলেই তো চলবে না। দুর্নীতির ব্যাপকতা শুধু উন্নয়নের বিষয় নয়, এটি জনকল্যাণেরও বিষয়। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। তথ্য অধিকার আইন থাকলেও তেমনভাবে কার্যকর নয়। এসব দিক বিবেচনায় সার্বিকভাবে বলা যায়, আন্তর্জাতিক এ মূল্যায়ন এবং দেশীয় বিভিন্ন সংস্থা যেমন সানেম, সিপিডি ও বিআইডিএসের মতো সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন মিলিয়ে দেখতে হবে। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মতো সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন মিলিয়ে দেখতে হবে। এসব মূল্যায়নের সঙ্গে যদি মিল থাকে, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এখন রেড জোনে পড়া ১৬টি সূচকের অধিক গুরুত্ব বহনকারী কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেড সূচকগুলোর প্রথমে রয়েছে রাজনৈতিক অধিকার। রাজনৈতিক অধিকার বিষয়টি মূল্যায়নে যেসব ফ্যাক্টর বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতা এবং স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ, সরকারের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অধিকার। মোট ৪০ নম্বরের মধ্যে ১৭ পেলে কোনো দেশকে এ সূচকে উত্তীর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। গত ৬ বছর ধরে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন-সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় সরকার যে পর্যায়েই হোক-অনুপস্থিত। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। জনগণ ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। উপনির্বাচনে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার অবিশ্বাস্যভাবে কমেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। মাঠের প্রধান বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের কারণে শাসক দলের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৫, যা ন্যূনতম পাশ নম্বরের চেয়ে কম। এ সূচকে বাংলাদেশের রেড জোনে পড়া মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়।

বেসামরিক মানুষের স্বাধীনতা নির্ধারণে যেসব বিষয় বিবেচনায় আসে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক অধিকার। সংবিধান প্রদত্ত এসব মৌলিক অধিকারের কার্যকারিতা বহুলাংশে খর্ব করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে গণমাধ্যমে কর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। এ সূচকে পাশের জন্য ৬০ নম্বরের মধ্যে ন্যূনতম ২৫ পেতে হয়। বাংলাদেশ তা পায়নি।

তথ্যের স্বাধীনতা সূচকে যা বিবেচ্য তা হলো, সমাজে তথ্যের অবাধ প্রবাহে সরকার কর্তৃক গৃহীত আইনগত ও বাস্তব পদক্ষেপ এবং এতে রয়েছে-গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জাতীয় তথ্য আইন এবং সামাজিক গণমাধ্যম অথবা ইন্টারনেট বন্ধে গৃহীত সরকারি ব্যবস্থাদি। এ সূচকে বাংলাদেশ মিডিয়ান স্কোর ফর্মুলায় প্রয়োজনীয় স্কোর করতে না পারায় রেড জোনে পড়েছে।

সরকারের কার্যকারিতা সূচকে অবস্থান নির্ধারণী ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে রয়েছে-জনসেবার গুণগত মান, বেসামরিক কর্মচারীদের (কর্মচারী বলতে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) দক্ষতা ও তাদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা এবং ভালো নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা। দেশের জনগণ মনে করে ব্যাপক দুর্নীতি ও প্রশাসন দলীয়করণের ফলে দেশে জনসেবার গুণগত মান হ্রাস পেয়েছে। নব্বইয়ের দশকে প্রশাসনে দলীয়করণের যে বীজ রোপিত হয়, তা এখন মহিরুহে পরিণত হয়েছে। একনাগাড়ে একযুগের বেশি সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় সরকারি কর্মচারীরা শাসক দলের আদর্শ ও ভাবধারার অনুসারী হয়ে উঠেছেন। এ সূচকেও সফলতা অর্জনে বাংলাদেশ মিডিয়ান স্কোর ফর্মুলায় প্রয়োজনীয় স্কোর করতে পারেনি।

আইনের শাসনের চারটি মূলনীতি হলো- ক. দায়বদ্ধতা: সরকারি, বেসরকারি উভয় খাতের আইনের নিকট দায়বদ্ধ থাকা। খ. ন্যায়ভিত্তিক আইন: প্রণীত আইন হবে স্বচ্ছ, গণমাধ্যমে প্রকাশে মাধ্যমে যা জনগণের গোচরে আনতে হবে। আইন মানুষের জীবন ও ধনসম্পদ ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে। বৈশ্বিক আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের অবনমন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) ‘Rule of Law Index ২০২১’ বা আইনের শাসন সূচক ২০২১-এ বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে এসে ঠেকেছে (১৩৯ দেশের মধ্যে ১২৪তম)।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল টানা পাঁচ বছর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। এর মধ্যে ২০০১ সাল ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষ বছর। অপরদিকে ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়কাল। বর্তমানে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন না হলেও বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর সারিতে রয়েছে। দুর্নীতির জন্য চিহ্নিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. সরকারি প্রভাবের কারণে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের বিচারকাজ বিলম্বিত হওয়া; খ. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দুর্নীতির চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করা; গ. নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ না হওয়া; ঘ. দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় ইতস্ততা। আর দুর্নীতির নাটকে যারা কুশীলব তারা হলেন- ক. রাজনীতিক, খ. সরকারি কর্মচারী, গ. বেসরকারি খাত, বিশেষ করে ব্যবসায়ী। উচ্চমাত্রার দুর্নীতি হ্রাসে ব্যর্থতা দেশকে বৈশ্বিক আইনের শাসন সূচকে নিচে নিয়ে আসার একটি বড় কারণ। এ সূচকে ন্যূনতম পাশ নম্বর পেতে ব্যর্থ হয়েছে দেশ। এমসিসির মূল্যায়নে রেড জোনে থাকা ১৬টি সূচকের অন্যান্য সূচকেও বাংলাদেশ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ন্যূনতম পয়েন্ট পায়নি।

অন্য কয়েকটি বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে এমসিসির মূল্যায়নে। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে গবেষণা করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২০’-এ বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। ফ্রিডম রেটিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ‘পার্টলি ফ্রি’ বা আংশিক মুক্ত ক্যাটাগরিতে। বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২০’ অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নিচের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। এরকম আরও উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ডে (এমসিএফ) অন্তর্ভুক্তির জন্য কোনো দেশকে কমপক্ষে ১০টি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়। তাছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা বেসামরিক মানুষের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সূচকে অবশ্যই উত্তীর্ণ হতে হবে। সূচকে উন্নতির জন্য অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ‘পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট’ সবচেয়ে জরুরি। এমসিসির মূল্যায়ন সূচকে উন্নতি একদিকে বাংলাদেশকে যেমন এমসিএফে অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তা করবে, তেমনি অন্যদিকে অন্যান্য বৈশ্বিক সূচকে দেশটির অবস্থানের উন্নতি ঘটবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

এমসিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশ

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
২৪ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন’ (এমসিসি) সম্প্রতি ২০২২ সালের জন্য বাংলাদেশের মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ড গঠনের পর এটি পরিচালনার জন্য ২০০৪ সালে এমসিসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মূলত স্কোর কার্ডের উন্নতির ভিত্তিতে কোনো দেশকে এ ফান্ডে যুক্ত করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ফান্ডে অন্তর্ভুক্তির জন্য কোনো দেশকে ২০টি সূচকে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এগুলো হলো-রাজনৈতিক অধিকার, বেসামরিক মানুষের স্বাধীনতা, সরকারের কার্যকারিতা, তথ্যের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্বনীতি, মূল্যস্ফীতি, আইনের গুণগতমান, বাণিজ্যনীতি, অর্থনীতিতে নারী ও পুরুষের সমতা, জমির অধিকার, ঋণপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা, ব্যবসার শুরু, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়, প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সার্বিক সরকারি ব্যয়, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, টিকা দেওয়ার হার, মেয়েদের শিক্ষার হার এবং শিশু স্বাস্থ্য। মূল্যায়নে চারটি সূচক গ্রিন বা সবুজ (ভালো) জোনে রয়েছে।

সেগুলো হলো-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টিকা দেওয়ার হার, ব্যবসা শুরু এবং মেয়েদের শিক্ষা হার। অন্য ১৬টি সূচকে বাংলাদেশ রেড বা লাল (খারাপ) জোনে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, গত ১৮ বছরের মধ্যে এই প্রথম এত বেশি রেড সূচকভুক্ত হলো দেশ। এর আগে ২০২১ সালের প্রতিবেদনে রেড জোনে ছিল ১৩টি সূচক, ২০২০ সালে ছিল ১২টি, ২০১৯ সালে ১১টি, ২০১৮ সালে ৭টি এবং ২০১৭ সালে ছিল ১০টি সূচক।

বাংলাদেশকে নিয়ে এমসিসির মূল্যায়নে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, এ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এমসিসি সরকারের কাছ থেকে কোনো তথ্য নেয়নি। তারা নিজেদের মতো করে মূল্যায়ন করেছে। আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে আমাদের মতো করেই। তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বিষয়গুলো দেখা হবে। এখান থেকে শিক্ষণীয় থাকলে সেগুলো গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় অতিরঞ্জিত করে দেখায়। এখানে তাদের আবেগ বেশি থাকে। তবে তারা যেসব বিষয় রেড জোনে দেখিয়েছে, সেগুলোর বেশ কয়েকটি ঠিক আছে। যেমন দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্র তো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেসব বিষয়ে দুর্বলতা আছে, সেগুলোতে নজর দেওয়া জরুরি। কিন্তু একেবারেই উড়িয়ে দিলে হবে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এ প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, সরকারের পক্ষে হয়তো বলা হবে, দুর্নীতি কিছু হলেও উন্নয়ন তো ঠিকই হচ্ছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কথা হলো, শুধু উন্নয়ন ভালো হলেই তো চলবে না। দুর্নীতির ব্যাপকতা শুধু উন্নয়নের বিষয় নয়, এটি জনকল্যাণেরও বিষয়। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। তথ্য অধিকার আইন থাকলেও তেমনভাবে কার্যকর নয়। এসব দিক বিবেচনায় সার্বিকভাবে বলা যায়, আন্তর্জাতিক এ মূল্যায়ন এবং দেশীয় বিভিন্ন সংস্থা যেমন সানেম, সিপিডি ও বিআইডিএসের মতো সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন মিলিয়ে দেখতে হবে। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মতো সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন মিলিয়ে দেখতে হবে। এসব মূল্যায়নের সঙ্গে যদি মিল থাকে, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এখন রেড জোনে পড়া ১৬টি সূচকের অধিক গুরুত্ব বহনকারী কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেড সূচকগুলোর প্রথমে রয়েছে রাজনৈতিক অধিকার। রাজনৈতিক অধিকার বিষয়টি মূল্যায়নে যেসব ফ্যাক্টর বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতা এবং স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ, সরকারের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অধিকার। মোট ৪০ নম্বরের মধ্যে ১৭ পেলে কোনো দেশকে এ সূচকে উত্তীর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। গত ৬ বছর ধরে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন-সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় সরকার যে পর্যায়েই হোক-অনুপস্থিত। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। জনগণ ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। উপনির্বাচনে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার অবিশ্বাস্যভাবে কমেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। মাঠের প্রধান বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের কারণে শাসক দলের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৫, যা ন্যূনতম পাশ নম্বরের চেয়ে কম। এ সূচকে বাংলাদেশের রেড জোনে পড়া মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়।

বেসামরিক মানুষের স্বাধীনতা নির্ধারণে যেসব বিষয় বিবেচনায় আসে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক অধিকার। সংবিধান প্রদত্ত এসব মৌলিক অধিকারের কার্যকারিতা বহুলাংশে খর্ব করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে গণমাধ্যমে কর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। এ সূচকে পাশের জন্য ৬০ নম্বরের মধ্যে ন্যূনতম ২৫ পেতে হয়। বাংলাদেশ তা পায়নি।

তথ্যের স্বাধীনতা সূচকে যা বিবেচ্য তা হলো, সমাজে তথ্যের অবাধ প্রবাহে সরকার কর্তৃক গৃহীত আইনগত ও বাস্তব পদক্ষেপ এবং এতে রয়েছে-গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জাতীয় তথ্য আইন এবং সামাজিক গণমাধ্যম অথবা ইন্টারনেট বন্ধে গৃহীত সরকারি ব্যবস্থাদি। এ সূচকে বাংলাদেশ মিডিয়ান স্কোর ফর্মুলায় প্রয়োজনীয় স্কোর করতে না পারায় রেড জোনে পড়েছে।

সরকারের কার্যকারিতা সূচকে অবস্থান নির্ধারণী ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে রয়েছে-জনসেবার গুণগত মান, বেসামরিক কর্মচারীদের (কর্মচারী বলতে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) দক্ষতা ও তাদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা এবং ভালো নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা। দেশের জনগণ মনে করে ব্যাপক দুর্নীতি ও প্রশাসন দলীয়করণের ফলে দেশে জনসেবার গুণগত মান হ্রাস পেয়েছে। নব্বইয়ের দশকে প্রশাসনে দলীয়করণের যে বীজ রোপিত হয়, তা এখন মহিরুহে পরিণত হয়েছে। একনাগাড়ে একযুগের বেশি সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় সরকারি কর্মচারীরা শাসক দলের আদর্শ ও ভাবধারার অনুসারী হয়ে উঠেছেন। এ সূচকেও সফলতা অর্জনে বাংলাদেশ মিডিয়ান স্কোর ফর্মুলায় প্রয়োজনীয় স্কোর করতে পারেনি।

আইনের শাসনের চারটি মূলনীতি হলো- ক. দায়বদ্ধতা: সরকারি, বেসরকারি উভয় খাতের আইনের নিকট দায়বদ্ধ থাকা। খ. ন্যায়ভিত্তিক আইন: প্রণীত আইন হবে স্বচ্ছ, গণমাধ্যমে প্রকাশে মাধ্যমে যা জনগণের গোচরে আনতে হবে। আইন মানুষের জীবন ও ধনসম্পদ ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে। বৈশ্বিক আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের অবনমন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) ‘Rule of Law Index ২০২১’ বা আইনের শাসন সূচক ২০২১-এ বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে এসে ঠেকেছে (১৩৯ দেশের মধ্যে ১২৪তম)।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল টানা পাঁচ বছর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। এর মধ্যে ২০০১ সাল ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষ বছর। অপরদিকে ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়কাল। বর্তমানে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন না হলেও বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর সারিতে রয়েছে। দুর্নীতির জন্য চিহ্নিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. সরকারি প্রভাবের কারণে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের বিচারকাজ বিলম্বিত হওয়া; খ. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দুর্নীতির চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করা; গ. নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ না হওয়া; ঘ. দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় ইতস্ততা। আর দুর্নীতির নাটকে যারা কুশীলব তারা হলেন- ক. রাজনীতিক, খ. সরকারি কর্মচারী, গ. বেসরকারি খাত, বিশেষ করে ব্যবসায়ী। উচ্চমাত্রার দুর্নীতি হ্রাসে ব্যর্থতা দেশকে বৈশ্বিক আইনের শাসন সূচকে নিচে নিয়ে আসার একটি বড় কারণ। এ সূচকে ন্যূনতম পাশ নম্বর পেতে ব্যর্থ হয়েছে দেশ। এমসিসির মূল্যায়নে রেড জোনে থাকা ১৬টি সূচকের অন্যান্য সূচকেও বাংলাদেশ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ন্যূনতম পয়েন্ট পায়নি।

অন্য কয়েকটি বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে এমসিসির মূল্যায়নে। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে গবেষণা করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২০’-এ বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। ফ্রিডম রেটিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ‘পার্টলি ফ্রি’ বা আংশিক মুক্ত ক্যাটাগরিতে। বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২০’ অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নিচের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। এরকম আরও উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ডে (এমসিএফ) অন্তর্ভুক্তির জন্য কোনো দেশকে কমপক্ষে ১০টি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়। তাছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা বেসামরিক মানুষের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সূচকে অবশ্যই উত্তীর্ণ হতে হবে। সূচকে উন্নতির জন্য অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ‘পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট’ সবচেয়ে জরুরি। এমসিসির মূল্যায়ন সূচকে উন্নতি একদিকে বাংলাদেশকে যেমন এমসিএফে অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তা করবে, তেমনি অন্যদিকে অন্যান্য বৈশ্বিক সূচকে দেশটির অবস্থানের উন্নতি ঘটবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন