স্বদেশ ভাবনা

জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে ইসির ক্ষমতা কতটা

  আবদুল লতিফ মন্ডল ১৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মতামত

জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে মর্মে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের গোলটেবিল আলোচনা সভায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা।

তিনি বলেন, অতীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন হতে পারে। একই দিনে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা সিইসির উপর্যুক্ত মন্তব্যের প্রতি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, সেনা মোতায়েনের ক্ষমতা ইসির হাতে নেই।

তিনি আরও বলেন, ইসির দায়িত্ব আর সরকারের দায়িত্ব সংবিধান ঠিক করে রেখেছে। এখানে সংবিধানবহির্ভূত কিছু করার সুযোগ নেই। নির্বাচনকালীন ইসি দায়িত্ব পালন করবে, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইসির অধীনে চলে যাবে। কিন্তু সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে, ইসির অধীনে যাবে না। ইসি যদি মনে করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, সে অবস্থায় নির্বাচন কমিশন সরকারকে সেনা মোতায়েনের অনুরোধ করতে পারে।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ইসি সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে থাকলে সেনা মোতায়েনে ইসির ক্ষমতা নেই বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। অনেকে মনে করছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হোক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে এমন সদিচ্ছার অভাব রয়েছে এবং ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। এমতাবস্থায় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ক্ষমতা ইসির আছে কিনা তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

এ যাবৎ বাংলাদেশে ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাসদস্যরা নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ, আনসার ও বিডিআরের পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং কিছু এলাকায় নৌবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

‘ইনস্ট্রাকশন রিগার্ডিং এইড টু সিভিল পাওয়ার’ অনুসারে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও মেট্রোপলিটন এলাকার পুলিশ কমিশনার পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সেনা ও নৌবাহিনী ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিলেন। উপজেলা পর্যায়ে কমপক্ষে দুই প্লাটুন করে সেনা ও নৌবাহিনীর সেনাদলকে আট দিনের জন্য মোতায়েনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এ বাহিনীকে নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত শুধু ‘শো অব ফোর্স’-এর জন্য ব্যবহার করার সুযোগ ছিল।

নির্বাচনের দিন ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালনের সুযোগ হিসেবে প্রতিটি দলের সঙ্গে একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ১৯৯১ সালের মতোই ‘ইনস্ট্রাকশন রিগার্ডিং এইড টু সিভিল পাওয়ার’ অনুযায়ী সেনা ও নৌবাহিনী মোতায়েন করা হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই অর্থাৎ ৮ আগস্ট ২০০১ তারিখে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে অনুচ্ছেদ ২-এ 'clause (xia)'-এর পর নতুন 'clause (xiaa)' সন্নিবেশিত করা হয়। নতুন সন্নিবেশিত clauseটি ছিল এরূপ : ''clause (xiaa)' 'lwa enforcing agency' means aû Police Force, Ansar Force (আনসার বাহিনী), Battalion Ansar, Bangladesh Rifles, Coast †uard Force (কোস্টগার্ড বাহিনী), and the Defence Services of Bangladesh.'' ওই নির্বাচনে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা শুধু নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি, বরং তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়। ২০০৮ সালের ১৯ আগস্ট জারিকৃত রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আরপিওতে আরও কয়েকটি সংশোধনী আনা হয়। সংশোধিত অধ্যাদেশের 'lwa enforcing agency'-র সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনীর অন্তর্ভুক্তি অব্যাহত রাখা হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে সশস্ত্রবাহিনী নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা পালন করে।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালে আরপিওতে সংশোধনী এনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্রবাহিনীকে বাদ দেয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রায় একক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সশস্ত্রবাহিনী।

মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ইসির দায়িত্ব আর সরকারের দায়িত্ব সংবিধান নির্ধারণ করে দিয়েছে। হ্যাঁ, সংবিধান ইসির দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার-তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং নির্বাচন কমিশন এই সংবিধান ও আইনানুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন [অনুচ্ছেদ ১১৯(১)]। সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা হল সরকারের কাজ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৬-এ বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে। এখানে সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষ বলতে সরকারকে বোঝানো হয়েছে, কারণ সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সমষ্টি হল সরকার।

প্রখ্যাত আইনজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম (প্রয়াত) তার 'Constitutional Lwa of Bangladesh' গ্রন্থে 'Election Commission' শিরোনামে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, সংবিধানের লক্ষ্য হল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো আইন কমিশনের হাতকে খাটো করতে চাইলে তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তিনি লিখেছেন, ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৯(১) অনুচ্ছেদের ভাষার বহুলাংশে মিল রয়েছে।

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি একটি সংসদীয় আসনের নির্বাচন পুনঃঅনুষ্ঠানের বিষয়ে কমিশনের দেয়া আদেশের বিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলার উদাহরণ দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, একটি সংসদীয় আসনের কতিপয় ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের সময় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ায় ভোট গণনার শেষ পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্নির্বাচনের আদেশ দেন। নির্বাচনে জয়লাভে নিশ্চিত এমন প্রার্থী কমিশনের পুনর্নির্বাচনের আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি সুপ্রিম কোর্ট এ মর্মে নিষ্পত্তি করেন যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা কমিশনের দায়িত্ব ছিল এবং সে দায়িত্ব পালনে পুনর্নির্বাচনের আদেশ প্রদান কমিশনের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা ছিল।

আমাদের আরপিওতে কমিশনের ক্ষমতার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। আরপিওর ৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'The Commission may require aû person or authority to perform such function or render such assistance for the purposes of this Order as it may direct', যার অর্থ দাঁড়ায়- আরপিওর উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজন এমন কোনো কাজ সম্পাদনে বা সহায়তা প্রদানে কমিশন যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারে। এ ক্ষমতাবলে কমিশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং এতে সরকারের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন দেখা যায় না।

একাদশ সংসদ নির্বাচনকে আইনানুগ ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠানে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ নিতে গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও নারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে। এসব বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি জোরেশোরে উত্থাপিত হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী গুটিকয়েক দল ছাড়া জাতীয় সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ অন্যসব দল সংসদ নির্বাচনের সময় সেনা মোতায়েন এবং তাদের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা পালনের পক্ষে মত দেয়। সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও নারী প্রতিনিধিদের অধিকাংশই নির্বাচনে সশস্ত্রবাহিনীর নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনের পক্ষে মত দেন।

সবশেষে যা বলতে চাই তা হল, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন এবং তাদের দায়িত্বের পরিধি নির্ধারণের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক। এ প্রসঙ্গে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসির দেয়া বক্তব্য পুনরুল্লেখ করতে চাই। সিইসি তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। কেউ চাইল বা না চাইল তার ওপর নির্ভর করে কিছু হবে না। পরিবেশ পরিস্থিতিতে যদি প্রয়োজন মনে করি, সবই করব। দরকার মনে না করলে সেনাবাহিনী আসবে না। এটা সম্পূর্ণভাবে ইসির ওপর ছেড়ে দিতে হবে।’ সেনা মোতায়েনের ক্ষমতা ইসির নেই- এরূপ বক্তব্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির হাতকে খাটো করার চেষ্টা করুক জনগণ তা চায় না।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter