উন্নয়নের জন্য চাই পরিবেশবান্ধব কৌশল

  কামরুল ইসলাম চৌধুরী ১৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মতামত

পরিবেশ-প্রকৃতির সুরক্ষা করে যে উন্নয়ন হয় তাকেই বলা হল টেকসই উন্নয়ন। পরিবেশ-প্রকৃতির ক্ষয় না করে যে প্রবৃদ্ধি- সহজ কথায় তাকেই বলে সবুজ প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন অনেকটা তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার গল্পের মতো। দেশে কেউ কেউ প্রাকৃতিক সম্পদের বিনাশ করে চলেছে; মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ, কর্মসংস্থান তাদের কাছে মূল্যহীন।

অনেক সমস্যা-সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বেশকিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রগতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল’ গ্রহণ করেনি, যা পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন এজেন্ডার সঙ্গে মানানসই। সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা, নীতি ও প্রতিষ্ঠান না থাকায় বিগত সময়ে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত না করার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি ও নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের প্রস্তুতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছাতে এবং সম্পূর্ণ দারিদ্র্য বিমোচন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস এজেন্ডার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা, নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত ২০৪১ সালের মধ্যে লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বেশ ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকি রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো অর্জনের ক্ষেত্রেও।

আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই। সবুজ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে দূষণমুক্ত উন্নয়ন, যেখানে নদ-নদীর পানি থাকবে স্বচ্ছ সলীলা। আমাদের ঘর-গৃহস্থালি কলকারখানার দূষিত বর্জ্য পড়বে না বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা কিংবা কর্ণফুলীতে। উন্নয়ন হবে; তবে বনবাদাড় উজাড় করে নয়, খাল-বিল, নদী-নালা দখল করে নয়।

টেকসই উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সব সময়ই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, নদীভাঙন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতার এসব সমস্যার সম্মুখীন। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ঝুঁকি ও নাজুক পরিস্থিতি বাংলাদেশে তীব্রতর হয়েছে। বনাঞ্চলের ক্ষতি, ভূমি ক্ষয়, জলাশয়ের দূষণ এবং অন্যান্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রতিবেশের অবনতি ঘটেছে। পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিটের (পিআরআই) ড. সাদিক আহমেদ এক গবেষণায় সম্প্রতি এসব চ্যালেঞ্জ বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। ইডিজিজি কর্মসূচি বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাগুলো মূল্যায়ন করেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইন, পরিবেশ বিধি, জলাধার আইনসহ বেশকিছু চমৎকার আইন ও নীতি থাকা সত্ত্বেও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই অস্বাভাবিক পরিবেশগত অবনতি পরিলক্ষিত হবে। প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রেও প্রভাবগুলো সক্রিয় থাকবে। এ ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজন হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. কৌশলগত গুরুত্ব আরোপ- বেশকিছু চমৎকার আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সমন্বয় ও সংহতির অভাব রয়েছে এবং পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্দীপনামূলক নীতির ব্যবহার হচ্ছে না।

২. গভর্নেন্স ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা- বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে এবং সামর্থ্যরে অভাব হচ্ছে প্রধান বিষয়।

৩. আর্থিক চ্যালেঞ্জ- পরিবেশ সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ অপর্যাপ্ত।

বাংলাদেশ সবুজ প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটতে চাইলে সবার আগে প্রয়োজন সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল প্রণয়ন। সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এই কৌশল তৈরি করা জরুরি। সবুজ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত দুটি গণমাধ্যম সংলাপেও এ তাগিদ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ইডিজিজি ইউকে-এইড অর্থায়নে এবং অ্যাডাম স্মিথ ইন্টারন্যাশনাল পরিচালিত কর্মসূচির অধীনে কয়েকটি সমীক্ষায় বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধাকরাও এই অভিমত রেখেছেন। তাদের সুপারিশগুলো হল-

সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে পরিবেশগত বিবেচনাসমূহ সমন্বিতকরণ : এটি পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল গ্রহণের ফলে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে। পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হবে এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিতকরণ যা পরিবেশগত সমন্বয়ের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির সম্পৃক্ততা ঘটাবে : খাতভিত্তিক নীতি, কর্মসূচি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবেশগত বিবেচনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এটি বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দূষণমুক্ত প্রযুক্তি এবং বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

নীতিমালা ওপর খাতসমূহের প্রভাব : রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিবেশগত অবনতির বিষয়ে নীতিমালাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ডেল্টা পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণকালে প্রধান নীতিমালা, বিনিয়োগ কর্মসূচি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যাতে এগুলো যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয় তবে দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির উৎসগুলোর সমাধান হবে। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাজস্ব নীতির সমন্বয় ঘটানো হলে বায়ু এবং পানি দূষণ কমাতে সাহায্য করবে। জ্বালানি ভর্তুকি অপসারণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ওপর সবুজ কর আরোপ করা হলে দূষণ নির্গমন হ্রাস পাবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদ মুক্ত হবে। শিল্পকারখানার ওপর দূষণ নির্গমন কর আরোপ করা হলে তারা দূষণমুক্ত প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার : বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নীতিমালা ও কর্মসূচিতে পরিবেশগত সমন্বয় জোরদার করার বিষয়টি এসব পরিকল্পনা ও কর্মসূচির বাস্তবায়ন সফল হওয়ার জন্য জরুরি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বাজেট ও সামর্থ্য বৃদ্ধি সরকারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে। একই সময়ে শীর্ষ পর্যায় থেকে নিচের পর্যায় পর্যন্ত ভূমিকা ও দায়িত্ব, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। ডেল্টা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি এবং এটি শক্তিশালী করাও প্রয়োজন। সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশলের জন্য পরিকল্পনা ও বাজেটে পরিবেশগত বিষয়গুলো সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য।

অর্থায়ন বিকল্পসমূহ : বেসরকারি অর্থায়ন পরিবেশগত সুরক্ষা প্রদান জোরদার করতে পারে। অন্যদিকে, সুবিধাভোগী ও দূষণকারীদের কর পরিশোধের নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আহরণ করা যেতে পারে। জিসিএফ তহবিলের অর্থ লাভ ও ব্যবহার করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় শর্ত ও মানদণ্ড পূরণ করে বাংলাদেশকে প্রস্তুত করতে হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন সুসমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল যেমন অ্যাডাপটেশন ফান্ড, এলডিসিএফ, সিআইএফ, এফআইপি, জিইএফসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ সমন্বয় করতে পারে।

আমরা সবুজ প্রবৃদ্ধি চাই। সবুজ উন্নয়ন চাই। চাই আরও গবেষণা। চাই সবার অংশগ্রহণে একটি সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল প্রণয়ন। একটি সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। এজন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাহলেই আমরা উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারব, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।

কামরুল ইসলাম চৌধুরী : সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম

[email protected]

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter