জ্বালানি তেল ও করোনায় মৃত্যুহার
jugantor
জ্বালানি তেল ও করোনায় মৃত্যুহার

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম  

২৭ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ অস্থিরতা দিন দিন চরমে উঠে তেলনির্ভর সব শিল্প, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা তো বটেই, নিত্যপণ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে। ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালাদের ব্যবহৃত অকটেন, গ্যাস ইত্যাদির মূল্য বাড়েনি। তাই তারা এখনো চুপ করে থাকলেও বাজারে গিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখে মাথা গরম করা শুরু করে দিয়েছেন। সরকারি ডিপো থেকে জ্বালানি ভরে গাড়ি ব্যবহারকারী কর্তারা তো কখনোই এ বিষয়ে মাথা ঘামাননি, এখনো ঘামানোর দরকার বোধ করছেন না। কারণ, তারা গাড়ি, তেল, ড্রাইভার, মেইনটেন্যান্স সবকিছুর জন্য বড় অঙ্কের ভর্তুকি বা ভাতা পান। তেলের দাম বৃদ্ধিতে শুধু মরণদশা তাদের, যারা নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। প্রান্তিক কৃষক ও দিনমজুরদের দুর্দশার কথা সবার কর্ণগোচর হয় না।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মোটেও এ সময় অত্যাবশ্যক ছিল না। করোনা ও ডেঙ্গির প্রভাবে মানুষ নাকাল। নিম্ন আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে। এখন শুরু হয়েছে ইরি ধান আবাদের জমিতে কৃত্রিম পদ্ধতিতে পানি সেচ দেওয়া। মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের জন্য শ্যালো, গভীর নলকূপ, পাওয়ার পাম্প ইত্যাদি চালানো হয় ডিজেলের মাধ্যমে। ডিজেলের লিটারে ১৫ টাকা মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের হতাশার কারণ হয়েছে। এটি কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জন্য একটি বড় ধাক্কা। এ ধাক্কার আঘাত দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন বিঘ্নিত করবে এবং খাদ্যাভাব দেখা দিলে তার ঢেউ সামলানো সরকারের জন্য বেশ কঠিন হবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে, তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হতে থাকবে এবং এটি ইতোমধ্যে শুধু গণপরিবহণের ক্ষেত্রে নয়; সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান হয়ে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছে, যার মোকাবিলা করা সহজে সম্ভব নাও হতে পারে। গ্রামে যারা কুপি, হ্যারিকেন ব্যবহার করেন, তারা কৃষক, দিনমজুর, ভিক্ষুক শ্রেণির মানুষ। অন্ধকার ঘরে একটু আলো জ্বালিয়ে রাতের খাবার খেতেও তাদের ব্যয় বেড়ে গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ তেলের দাম বৃদ্ধিকে জীবনের অভিশাপ হিসাবে দেখছেন।

করোনার সংক্রমণ এখনো কমেনি; বরং ইউরোপের নানা দেশে আবারও লকডাউন শুরু হয়েছে। ইতিবাচক তেমন কিছুর উত্তরণ ঘটেনি। অথচ আমরা ড্যামকেয়ার ভাব নিয়ে চলাফেরা শুরু করেছি। সারা বিশ্বে খাদ্যসহ সবকিছুর উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। মানুষের পুষ্টিগ্রহণের মাত্রা কমে গেছে। দৈহিক শক্তি ও মানসিক ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আরব বিশ্বে নির্মাণ কাজ স্থবির হয়েছে। এখনো করোনার ওপর ইতিবাচক ভরসা না পেয়ে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে ব্যাপকভাবে। ওপেক জ্বালানি তেল উত্তোলন বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে নিকট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ বলছে, আমরা এখন তেলের দাম বাড়ালাম। এটি বিশ্ববাজারে দাম কমা মাত্রই আমাদের দেশে আবার কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। অথচ আমাদের দেশের বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো জিনিসের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আর কখনোই কমার নজির নেই। এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানি নির্ভর বাংলাদেশের করণীয় হলো, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি আরও বাড়িয়ে কৃষি ও কৃষক বাঁচানো। কারণ, কৃষি আমাদের করোনার করাল থাবা থেকে, মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আমাদের ভাত, শাক-সবজি, মাছগ্রহণ বহুলাংশে আমাদের বাঁচতে সহায়তা করেছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে মাছের মাধ্যমে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ২৯ শতাংশ। আমাদের দেশে মাছের মাধ্যমে খাদ্যে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ ৬৩ শতাংশ। আমাদের ব্রয়লার মুরগি, তেলাপিয়া, কই, পাঙ্গাশের নাম এখন ‘গার্মেন্টস প্রোটিন’। কারণ পোশাক শ্রমিকরা সপ্তাহে কমপক্ষে দুদিন এসব আমিষ কিনতে পারেন। এগুলোর দাম কম এবং এসব মাছ-মাংস এখন গরিবের আমিষ মেটানোর প্রধান উপায়। এ আমিষ গ্রহণ করে করোনাক্রান্ত হয়েও আমাদের দেশে মৃত্যুর হার কম হয়েছে বলে উন্নত দেশের গবেষকরা মনে করেন। তাই সরকারের বোঝা উচিত, জ্বালানি তেলের সঙ্গে দেশে করোনায় মৃত্যুহারের একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আপাতত কোনো রাজনীতি নেই বলে মনে হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এ নিয়ে ব্যাপক রাজনীতি শুরু হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বড় ভোক্তা। সেজন্য এদেশ মাদকের বাজারে পরিণত হয়েছে। মানি লন্ডারিং এখন আরেকটি বড় ব্যবসা। সেগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে সরানোর জন্য অহেতুক ভারতে জ্বালানি পাচার ও দেশের অভ্যন্তরে মূল্যবৃদ্ধি করে উন্মাদনা তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রতি বছর জ্বালানি খাতে ৫৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। ভর্তুকির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে, এ কথা সঠিক নয়। কৃষিতে ভর্তুকি আমাদের খাদ্য উৎপাদান বৃদ্ধি করবে, জীবন বাঁচাবে। নৌপরিবহণ ও মৎস্য আহরণের জন্য ট্রলারের জ্বালানি সস্তা হলে বেশি সামুদ্রিক মাছ ধরা যাবে। সামুদ্রিক মাছ দিয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হলে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।

জাপান গাড়ির দেশ। সেখানে একজন মানুষের গড়ে তিন-চারটি গাড়ি। সে দেশে একজন কৃষকের আরও বেশি গাড়ি ও ট্রাক্টর, ক্রেন, ক্রাশিং মেশিন ইত্যাদি থাকে। তাদের দেশে কৃষক ধনী ব্যক্তি। জাপানের চারদিকে সমুদ্র। তারা সমুদ্র উপকূলে বৃহৎ সংরক্ষণাগার তৈরি করে বিদেশ থেকে তেল কিনে মজুত গড়ে তুলেছে। স্থলে ভূমিকম্পের কথা মাথায় রেখে তারা সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে তেলের মজুত গড়ে তুলেছে। আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও তাদের জ্বালানির অভাব হবে না, যা আগামী বিশ বছরের জন্য যথেষ্ট। আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশে সেভাবে জ্বালানি কিনে মজুত গড়ে তোলা দরকার। জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তেলের বিকল্প অনুসন্ধান করাও জরুরি। সমতল ছাড়াও আমাদের সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে এবং নিজেরাই নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে সেগুলো আহরণ বা উত্তোলন করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য আমাদের দেশের তুলনায় বেশি। তাই মূল্য সমন্বয় করা না হলে জ্বালানি তেল পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ যুক্তি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এটি হাস্যকর যুক্তি। ভারত অনেক বড় দেশ। সেখানে আমাদের দেশ থেকে তেল পাচার হয়ে যাওয়ার কথাটা একটি আজব আবিষ্কার। এর চেয়ে ইলিশ মাছ, পাট, চামড়া, পুরোনো গরম কাপড়, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি স্থল ও আকাশপথে বেশি পাচার হয়। মিয়ানমারের ইয়াবা, ক্রিস্টাল বাংলাদেশে ঢুকে ভারতের অনেক রাজ্যে পাচার হয়ে থাকে। স্বর্ণ চোরাচালান তো আছেই। সেগুলোতে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। সেদিকে নজর নেই; অথচ মালবাহী ট্রাক কয়েক ফোঁটা জ্বালানি ভরে নিলে সেটাকে তেল পাচার বলা হচ্ছে কেন, তা মোটেও বোধগম্য নয়।

বস্তুত বাংলাদেশ থেকে ভারতে বছরে কী পরিমাণ জ্বালানি তেল পাচার হয়েছে বা হয়, এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। এটি একটি উদ্ভট ধারণা মাত্র। সেখানে বাংলাদেশ থেকে তেল পাচার হয়ে তাদের কোটি কোটি গাড়ি চলবে, এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তেল ইয়াবা নয়, পকেটে করে গোপনে পাচার করা যায়। আমাদের সীমান্তে পাহারাদার আছেন। তারা সবসময় সব গাড়ি চেক করেন। তেলের গাড়িকে তারা নিশ্চয়ই চেনেন। তাই তাদের চোখের সামনে দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে এসব গাড়িতে তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এটি যৌক্তিক বক্তব্য নয়।

বলা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে দাম কমা মাত্রই দেশে আবার তেলের দাম কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। আমাদের দেশের কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আর কখনো কমার নজির নেই। তাই বিশ্ববাজারের দিকে না তাকিয়ে দেশের স্বার্থে তেলের দাম কমানো উচিত।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

জ্বালানি তেল ও করোনায় মৃত্যুহার

 ড. মো. ফখরুল ইসলাম 
২৭ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ অস্থিরতা দিন দিন চরমে উঠে তেলনির্ভর সব শিল্প, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা তো বটেই, নিত্যপণ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে। ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালাদের ব্যবহৃত অকটেন, গ্যাস ইত্যাদির মূল্য বাড়েনি। তাই তারা এখনো চুপ করে থাকলেও বাজারে গিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখে মাথা গরম করা শুরু করে দিয়েছেন। সরকারি ডিপো থেকে জ্বালানি ভরে গাড়ি ব্যবহারকারী কর্তারা তো কখনোই এ বিষয়ে মাথা ঘামাননি, এখনো ঘামানোর দরকার বোধ করছেন না। কারণ, তারা গাড়ি, তেল, ড্রাইভার, মেইনটেন্যান্স সবকিছুর জন্য বড় অঙ্কের ভর্তুকি বা ভাতা পান। তেলের দাম বৃদ্ধিতে শুধু মরণদশা তাদের, যারা নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। প্রান্তিক কৃষক ও দিনমজুরদের দুর্দশার কথা সবার কর্ণগোচর হয় না।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মোটেও এ সময় অত্যাবশ্যক ছিল না। করোনা ও ডেঙ্গির প্রভাবে মানুষ নাকাল। নিম্ন আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে। এখন শুরু হয়েছে ইরি ধান আবাদের জমিতে কৃত্রিম পদ্ধতিতে পানি সেচ দেওয়া। মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের জন্য শ্যালো, গভীর নলকূপ, পাওয়ার পাম্প ইত্যাদি চালানো হয় ডিজেলের মাধ্যমে। ডিজেলের লিটারে ১৫ টাকা মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের হতাশার কারণ হয়েছে। এটি কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জন্য একটি বড় ধাক্কা। এ ধাক্কার আঘাত দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন বিঘ্নিত করবে এবং খাদ্যাভাব দেখা দিলে তার ঢেউ সামলানো সরকারের জন্য বেশ কঠিন হবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে, তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হতে থাকবে এবং এটি ইতোমধ্যে শুধু গণপরিবহণের ক্ষেত্রে নয়; সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান হয়ে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছে, যার মোকাবিলা করা সহজে সম্ভব নাও হতে পারে। গ্রামে যারা কুপি, হ্যারিকেন ব্যবহার করেন, তারা কৃষক, দিনমজুর, ভিক্ষুক শ্রেণির মানুষ। অন্ধকার ঘরে একটু আলো জ্বালিয়ে রাতের খাবার খেতেও তাদের ব্যয় বেড়ে গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ তেলের দাম বৃদ্ধিকে জীবনের অভিশাপ হিসাবে দেখছেন।

করোনার সংক্রমণ এখনো কমেনি; বরং ইউরোপের নানা দেশে আবারও লকডাউন শুরু হয়েছে। ইতিবাচক তেমন কিছুর উত্তরণ ঘটেনি। অথচ আমরা ড্যামকেয়ার ভাব নিয়ে চলাফেরা শুরু করেছি। সারা বিশ্বে খাদ্যসহ সবকিছুর উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। মানুষের পুষ্টিগ্রহণের মাত্রা কমে গেছে। দৈহিক শক্তি ও মানসিক ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আরব বিশ্বে নির্মাণ কাজ স্থবির হয়েছে। এখনো করোনার ওপর ইতিবাচক ভরসা না পেয়ে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে ব্যাপকভাবে। ওপেক জ্বালানি তেল উত্তোলন বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে নিকট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ বলছে, আমরা এখন তেলের দাম বাড়ালাম। এটি বিশ্ববাজারে দাম কমা মাত্রই আমাদের দেশে আবার কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। অথচ আমাদের দেশের বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো জিনিসের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আর কখনোই কমার নজির নেই। এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানি নির্ভর বাংলাদেশের করণীয় হলো, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি আরও বাড়িয়ে কৃষি ও কৃষক বাঁচানো। কারণ, কৃষি আমাদের করোনার করাল থাবা থেকে, মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আমাদের ভাত, শাক-সবজি, মাছগ্রহণ বহুলাংশে আমাদের বাঁচতে সহায়তা করেছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে মাছের মাধ্যমে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ২৯ শতাংশ। আমাদের দেশে মাছের মাধ্যমে খাদ্যে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ ৬৩ শতাংশ। আমাদের ব্রয়লার মুরগি, তেলাপিয়া, কই, পাঙ্গাশের নাম এখন ‘গার্মেন্টস প্রোটিন’। কারণ পোশাক শ্রমিকরা সপ্তাহে কমপক্ষে দুদিন এসব আমিষ কিনতে পারেন। এগুলোর দাম কম এবং এসব মাছ-মাংস এখন গরিবের আমিষ মেটানোর প্রধান উপায়। এ আমিষ গ্রহণ করে করোনাক্রান্ত হয়েও আমাদের দেশে মৃত্যুর হার কম হয়েছে বলে উন্নত দেশের গবেষকরা মনে করেন। তাই সরকারের বোঝা উচিত, জ্বালানি তেলের সঙ্গে দেশে করোনায় মৃত্যুহারের একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আপাতত কোনো রাজনীতি নেই বলে মনে হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এ নিয়ে ব্যাপক রাজনীতি শুরু হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বড় ভোক্তা। সেজন্য এদেশ মাদকের বাজারে পরিণত হয়েছে। মানি লন্ডারিং এখন আরেকটি বড় ব্যবসা। সেগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে সরানোর জন্য অহেতুক ভারতে জ্বালানি পাচার ও দেশের অভ্যন্তরে মূল্যবৃদ্ধি করে উন্মাদনা তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রতি বছর জ্বালানি খাতে ৫৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। ভর্তুকির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে, এ কথা সঠিক নয়। কৃষিতে ভর্তুকি আমাদের খাদ্য উৎপাদান বৃদ্ধি করবে, জীবন বাঁচাবে। নৌপরিবহণ ও মৎস্য আহরণের জন্য ট্রলারের জ্বালানি সস্তা হলে বেশি সামুদ্রিক মাছ ধরা যাবে। সামুদ্রিক মাছ দিয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হলে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।

জাপান গাড়ির দেশ। সেখানে একজন মানুষের গড়ে তিন-চারটি গাড়ি। সে দেশে একজন কৃষকের আরও বেশি গাড়ি ও ট্রাক্টর, ক্রেন, ক্রাশিং মেশিন ইত্যাদি থাকে। তাদের দেশে কৃষক ধনী ব্যক্তি। জাপানের চারদিকে সমুদ্র। তারা সমুদ্র উপকূলে বৃহৎ সংরক্ষণাগার তৈরি করে বিদেশ থেকে তেল কিনে মজুত গড়ে তুলেছে। স্থলে ভূমিকম্পের কথা মাথায় রেখে তারা সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে তেলের মজুত গড়ে তুলেছে। আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও তাদের জ্বালানির অভাব হবে না, যা আগামী বিশ বছরের জন্য যথেষ্ট। আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশে সেভাবে জ্বালানি কিনে মজুত গড়ে তোলা দরকার। জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তেলের বিকল্প অনুসন্ধান করাও জরুরি। সমতল ছাড়াও আমাদের সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে এবং নিজেরাই নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে সেগুলো আহরণ বা উত্তোলন করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য আমাদের দেশের তুলনায় বেশি। তাই মূল্য সমন্বয় করা না হলে জ্বালানি তেল পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ যুক্তি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এটি হাস্যকর যুক্তি। ভারত অনেক বড় দেশ। সেখানে আমাদের দেশ থেকে তেল পাচার হয়ে যাওয়ার কথাটা একটি আজব আবিষ্কার। এর চেয়ে ইলিশ মাছ, পাট, চামড়া, পুরোনো গরম কাপড়, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি স্থল ও আকাশপথে বেশি পাচার হয়। মিয়ানমারের ইয়াবা, ক্রিস্টাল বাংলাদেশে ঢুকে ভারতের অনেক রাজ্যে পাচার হয়ে থাকে। স্বর্ণ চোরাচালান তো আছেই। সেগুলোতে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। সেদিকে নজর নেই; অথচ মালবাহী ট্রাক কয়েক ফোঁটা জ্বালানি ভরে নিলে সেটাকে তেল পাচার বলা হচ্ছে কেন, তা মোটেও বোধগম্য নয়।

বস্তুত বাংলাদেশ থেকে ভারতে বছরে কী পরিমাণ জ্বালানি তেল পাচার হয়েছে বা হয়, এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। এটি একটি উদ্ভট ধারণা মাত্র। সেখানে বাংলাদেশ থেকে তেল পাচার হয়ে তাদের কোটি কোটি গাড়ি চলবে, এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তেল ইয়াবা নয়, পকেটে করে গোপনে পাচার করা যায়। আমাদের সীমান্তে পাহারাদার আছেন। তারা সবসময় সব গাড়ি চেক করেন। তেলের গাড়িকে তারা নিশ্চয়ই চেনেন। তাই তাদের চোখের সামনে দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে এসব গাড়িতে তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এটি যৌক্তিক বক্তব্য নয়।

বলা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে দাম কমা মাত্রই দেশে আবার তেলের দাম কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। আমাদের দেশের কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আর কখনো কমার নজির নেই। তাই বিশ্ববাজারের দিকে না তাকিয়ে দেশের স্বার্থে তেলের দাম কমানো উচিত।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন