কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি
jugantor
আশেপাশে চারপাশে
কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি

  চপল বাশার  

২৯ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি

২৩ নভেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তথাকথিত কিশোর গ্যাংয়ের ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এক দম্পতি ছিনতাইয়ের শিকার হলে র‌্যাব সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং চারজন ছিনতাইকারীকে লুণ্ঠিত মালামালসহ আটক করতে সমর্থ হয়। আটক চারজনের দেওয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব আরও পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। পরদিন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গ্রেফতার ৯ জনের মধ্যে ৩ জনের বয়স ১৪ বছরের কম, অন্যরাও কম বয়সি, তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অতএব, এদের ‘কিশোর গ্যাং’ বলা যায়। এই গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় ২০ জন। এদের সবার নাম, ঠিকানা, দলের নেতা, পৃষ্ঠপোষকের তথ্যও র‌্যাব পেয়েছে। তাদের ধরার জন্য অভিযান চলছে।

খুবই ভালো খবর। বেশ বড় একটি ‘কিশোর গ্যাং’কে র‌্যাব চিহ্নিত করেছে, ৯ জনকে আটক করেছে। অন্যরাও ধরা পড়বে আশা করা যায়। কিন্তু গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক তথা বড় ভাইদের চিহ্নিত করতে পারলেও তাদের ধরা যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। কারণ তারা তো ‘গডফাদার’; এরা এতই ক্ষমতাবান যে এদের চিহ্নিত করা গেলেও স্পর্শ করা যায় না। আশঙ্কা করা অমূলক হবে না যে, গডফাদাররা গ্রেফতারকৃত কিশোরদের জামিনে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করবেন। জেল থেকে বেরিয়েই কিশোর অপরাধীরা আবার তাদের অপকর্ম পূর্ণোদ্যমে শুরু করবে। এমনটাই তো ঘটছে ঢাকা মহানগর এবং দেশের অন্যান্য নগর জনপদে।

মোহাম্মপুরে সম্প্রতি চিহ্নিত কিশোর গ্যাংই ঢাকা মহানগরীতে এ ধরনের একমাত্র অপরাধী চক্র নয়। আমাদের রাজধানী নগরীতেই শতাধিক কিশোর গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এদের অত্যাচার ও উপদ্রবে নগরবাসী অতিষ্ঠ। এরা ছিনতাই, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি তো করছেই, এমনকি মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও ধর্ষণের মতো অপরাধেও জড়িত হচ্ছে। কিশোররা এখন খুন-খারাবি করতেও শিখেছে। এদের কাছে ধারালো ছুরি, ড্যাগার, চাপাতির মতো দেশীয় অস্ত্রও থাকে। এরা এখন মোটরবাইকও চালায়। দল বেঁধে শহরের রাস্তায় তীব্রগতিতে বাইক চালিয়ে চলাচল করে।

বয়সের হিসাবে কিশোর হলেও অপরাধ ঘটানোর ক্ষেত্রে এরা কিশোর বা ছোট নয়। এদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে বড় ভাইরা আছেন! তারাই কিশোরদের অভিভাবক, রক্ষক। তাদের আশ্রয় দেন, ধরা পড়লে ছাড়িয়েও আনেন। বয়সে কম অর্থাৎ ১৮ বছরের কম হওয়ায় এরা অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা কিশোর বলে গণ্য হয় এবং বিদ্যমান আইনের সুবিধা পায়। কিশোর অপরাধীদের জন্য ব্রিটিশ আমলে প্রণীত আইন নমনীয়। কিশোর অপরাধীরা সহজে জামিন পায়। শাস্তির ক্ষেত্রেও লঘুদণ্ড, জেলে না পাঠিয়ে সংশোধনাগারে রাখা হয়। নমনীয় আইন ও লঘুদণ্ডের সুযোগ নিয়ে ‘কিশোর’ অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিরাজমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কিশোর অপরাধসংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। অপরাধ কতটা গুরুতর, সেটাই বিবেচনা করা উচিত, অপরাধীর বয়স নয়। গুরুতর অপরাধের জন্য গুরুদণ্ড পেতে হবে, বয়স যাই হোক।

কিশোর অপরাধ আগেও ছিল। কিন্তু এতটা ভয়াবহ বা মারাত্মক ছিল না। গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। এরা এখন সংগঠিতভাবে অপরাধ করছে, যে জন্য পেয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ উপাধি। প্রত্যেক গ্যাংয়ের একজন নেতা থাকে, তার নামেই গ্যাংয়ের নামকরণ হয়। ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি ‘কিশোর গ্যাং’ সক্রিয় রয়েছে। সে হিসাবে শতাধিক গ্যাং রয়েছে রাজধানীতে। প্রতিটি গ্যাংয়ের অন্তত ২০ জন সদস্য আছে। কোনো কোনো দলে আরও বেশি সদস্য রয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়।

এরা এখন এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যে, জনগণ স্থানীয় ‘কিশোর গ্যাং’ লিডার ও তার দলের সদস্যদের সমীহ করে চলতে বাধ্য হন। পাড়া বা মহল্লায় কোনো নতুন ভাড়াটে এলে তার ওপর উপদ্রব শুরু হয়, চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। স্থানীয় দোকানপাট, বাজার থেকে চাঁদা আদায় তো স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদপত্র, বেসরকারি টিভির নিউজ বুলেটিন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক-অভিভাবকরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি। যে কোনো বেআইনি কাজে তারা ‘কিশোর গ্যাং’কে নিয়োগ করে। কেউ যদি নতুন বাড়ি তৈরি করেন, তাহলে তাদের বলা হয় নির্ধারিত দোকান থেকেই সিমেন্ট, বালু, ইট, রড ইত্যাদি নির্মাণসামগ্রী কিনতে হবে, অন্য দোকান থেকে নয়। অন্যথায় বাড়ি করতে দেওয়া হবে না। বলাই বাহুল্য, বড় ভাইদের নির্ধারিত দোকানের নির্মাণসামগ্রী নিম্নমানের হলেও অনেক বেশি দামে কিনতে হয় এবং বাড়তি মুনাফা তাদের পকেটেই যায়। এক্ষেত্রে ‘কিশোর গ্যাং’ তাদের পৃষ্ঠপোষকদের লাঠিয়াল বাহিনীর কাজ করে। শুধু বাড়িঘর নির্মাণ নয়, যে কোনো বেসরকারি অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট স্থাপনের ক্ষেত্রেও কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সন্তুষ্ট রাখতে হয়। এদের সন্তুষ্ট না রেখে ঠিকাদাররাও নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদাবাজির মতো অপরাধ ও অনিয়ম এখন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপরাধ যারা দমন করবেন এবং অনিয়ম দূর করবেন, তাদের তৎপরতাও সন্তোষজনক নয়।

ঢাকা মহানগরীতে যারা বসবাস করেন, তারা সবাই ‘কিশোর গ্যাং’দের অপকর্ম সম্পর্কে অবহিত। কারণ মহানগরীর এমন কোনো পাড়া-মহল্লা নেই যেখানে ‘কিশোর গ্যাং’দের উৎপাত নেই। যে কোনো মহল্লার রাস্তা বা গলিতে গেলেই দেখা যাবে ৭-৮ জন কিশোর বা তরুণ একসঙ্গে বসে বা দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এদের ধূমপান করতে দেখা যায়। এরা রাস্তায় দাঁড়িয়েই গাঁজা বা মাদক সেবনও করে। অভিযোগ রয়েছে, এদের কারণে স্কুলছাত্রীরা রাস্তায় চলাচল করতে ভয় পায়, অভিভাবকরাও আতঙ্কে থাকেন।

কিশোর গ্যাংদের মধ্যে দলাদলির কারণে ঝগড়া-ঝাটি ও মারধরের ঘটনা প্রায়ই ঘটে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করে। এসব দলাদলি কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরীতে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে।

কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হলো কেন? গ্যাংয়ের সদস্য হয় কারা? এটা গবেষণার বিষয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধানত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরাই এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়। যারা ভালো ছাত্র নয় অথবা লেখাপড়াই করে না, যাদের কোনো কাজ নেই, তারা সহজেই বিপথগামী হয়। কারণ ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। একজন বিপথগামী আরেকজনকে সঙ্গে নেয়। এভাবেই দল বা গ্যাং গড়ে ওঠে। প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা কিশোরদের অপরাধ করতে উৎসাহিত করে।

কেবল ঢাকা মহানগর নয়, দেশের সবকটি নগর ও শহরাঞ্চলে ‘কিশোর গ্যাং’ গজিয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের সূত্র উদ্ধৃত করে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাং সদস্যের সংখ্যা আট হাজারের বেশি। এ পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য, কারণ দেশের ৬৪ জেলার ৬৪ শহরে মোট কিশোর অপরাধী আট হাজার হতেই পারে। কেবল ঢাকা নগরীতেই শতাধিক কিশোর গ্যাংয়ের দু’হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে।

গত বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনা মহামারির সময়ে দেড় বছর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচলাবস্থায় ছিল দীর্ঘকাল। অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন ছিল এবং এখনো আছে। এ পরিস্থিতিতে সব ধরনের অপরাধ বেড়েছে। কিশোর অপরাধীর সংখ্যাও বেড়েছে।

কিশোর গ্যাং তথা কিশোর অপরাধ দমন করতে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। এদের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগও নেই। জনগণের নিরাপত্তা ও দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। সারা দেশে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা যদি আট হাজার হয়, তাহলে এদের শক্ত হাতে দমন করা আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন কাজ নয়।

সর্বত্র একযোগে অভিযান চালানো হলে সবকটি কিশোর গ্যাংই দমন করা সম্ভব। কিশোর অপরাধীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, কিশোর অপরাধ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনও করতে হবে। কিশোর গ্যাংদের যারা পৃষ্ঠপোষক, তাদের বিরুদ্ধেও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

চপল বাশার : লেখক, সাংবাদিক

basharbd@gmail.com

আশেপাশে চারপাশে

কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি

 চপল বাশার 
২৯ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি
প্রতীকী ছবি

২৩ নভেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তথাকথিত কিশোর গ্যাংয়ের ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এক দম্পতি ছিনতাইয়ের শিকার হলে র‌্যাব সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং চারজন ছিনতাইকারীকে লুণ্ঠিত মালামালসহ আটক করতে সমর্থ হয়। আটক চারজনের দেওয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব আরও পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। পরদিন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গ্রেফতার ৯ জনের মধ্যে ৩ জনের বয়স ১৪ বছরের কম, অন্যরাও কম বয়সি, তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অতএব, এদের ‘কিশোর গ্যাং’ বলা যায়। এই গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় ২০ জন। এদের সবার নাম, ঠিকানা, দলের নেতা, পৃষ্ঠপোষকের তথ্যও র‌্যাব পেয়েছে। তাদের ধরার জন্য অভিযান চলছে।

খুবই ভালো খবর। বেশ বড় একটি ‘কিশোর গ্যাং’কে র‌্যাব চিহ্নিত করেছে, ৯ জনকে আটক করেছে। অন্যরাও ধরা পড়বে আশা করা যায়। কিন্তু গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক তথা বড় ভাইদের চিহ্নিত করতে পারলেও তাদের ধরা যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। কারণ তারা তো ‘গডফাদার’; এরা এতই ক্ষমতাবান যে এদের চিহ্নিত করা গেলেও স্পর্শ করা যায় না। আশঙ্কা করা অমূলক হবে না যে, গডফাদাররা গ্রেফতারকৃত কিশোরদের জামিনে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করবেন। জেল থেকে বেরিয়েই কিশোর অপরাধীরা আবার তাদের অপকর্ম পূর্ণোদ্যমে শুরু করবে। এমনটাই তো ঘটছে ঢাকা মহানগর এবং দেশের অন্যান্য নগর জনপদে।

মোহাম্মপুরে সম্প্রতি চিহ্নিত কিশোর গ্যাংই ঢাকা মহানগরীতে এ ধরনের একমাত্র অপরাধী চক্র নয়। আমাদের রাজধানী নগরীতেই শতাধিক কিশোর গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এদের অত্যাচার ও উপদ্রবে নগরবাসী অতিষ্ঠ। এরা ছিনতাই, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি তো করছেই, এমনকি মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও ধর্ষণের মতো অপরাধেও জড়িত হচ্ছে। কিশোররা এখন খুন-খারাবি করতেও শিখেছে। এদের কাছে ধারালো ছুরি, ড্যাগার, চাপাতির মতো দেশীয় অস্ত্রও থাকে। এরা এখন মোটরবাইকও চালায়। দল বেঁধে শহরের রাস্তায় তীব্রগতিতে বাইক চালিয়ে চলাচল করে।

বয়সের হিসাবে কিশোর হলেও অপরাধ ঘটানোর ক্ষেত্রে এরা কিশোর বা ছোট নয়। এদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে বড় ভাইরা আছেন! তারাই কিশোরদের অভিভাবক, রক্ষক। তাদের আশ্রয় দেন, ধরা পড়লে ছাড়িয়েও আনেন। বয়সে কম অর্থাৎ ১৮ বছরের কম হওয়ায় এরা অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা কিশোর বলে গণ্য হয় এবং বিদ্যমান আইনের সুবিধা পায়। কিশোর অপরাধীদের জন্য ব্রিটিশ আমলে প্রণীত আইন নমনীয়। কিশোর অপরাধীরা সহজে জামিন পায়। শাস্তির ক্ষেত্রেও লঘুদণ্ড, জেলে না পাঠিয়ে সংশোধনাগারে রাখা হয়। নমনীয় আইন ও লঘুদণ্ডের সুযোগ নিয়ে ‘কিশোর’ অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিরাজমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কিশোর অপরাধসংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। অপরাধ কতটা গুরুতর, সেটাই বিবেচনা করা উচিত, অপরাধীর বয়স নয়। গুরুতর অপরাধের জন্য গুরুদণ্ড পেতে হবে, বয়স যাই হোক।

কিশোর অপরাধ আগেও ছিল। কিন্তু এতটা ভয়াবহ বা মারাত্মক ছিল না। গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। এরা এখন সংগঠিতভাবে অপরাধ করছে, যে জন্য পেয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ উপাধি। প্রত্যেক গ্যাংয়ের একজন নেতা থাকে, তার নামেই গ্যাংয়ের নামকরণ হয়। ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি ‘কিশোর গ্যাং’ সক্রিয় রয়েছে। সে হিসাবে শতাধিক গ্যাং রয়েছে রাজধানীতে। প্রতিটি গ্যাংয়ের অন্তত ২০ জন সদস্য আছে। কোনো কোনো দলে আরও বেশি সদস্য রয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়।

এরা এখন এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যে, জনগণ স্থানীয় ‘কিশোর গ্যাং’ লিডার ও তার দলের সদস্যদের সমীহ করে চলতে বাধ্য হন। পাড়া বা মহল্লায় কোনো নতুন ভাড়াটে এলে তার ওপর উপদ্রব শুরু হয়, চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। স্থানীয় দোকানপাট, বাজার থেকে চাঁদা আদায় তো স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদপত্র, বেসরকারি টিভির নিউজ বুলেটিন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক-অভিভাবকরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি। যে কোনো বেআইনি কাজে তারা ‘কিশোর গ্যাং’কে নিয়োগ করে। কেউ যদি নতুন বাড়ি তৈরি করেন, তাহলে তাদের বলা হয় নির্ধারিত দোকান থেকেই সিমেন্ট, বালু, ইট, রড ইত্যাদি নির্মাণসামগ্রী কিনতে হবে, অন্য দোকান থেকে নয়। অন্যথায় বাড়ি করতে দেওয়া হবে না। বলাই বাহুল্য, বড় ভাইদের নির্ধারিত দোকানের নির্মাণসামগ্রী নিম্নমানের হলেও অনেক বেশি দামে কিনতে হয় এবং বাড়তি মুনাফা তাদের পকেটেই যায়। এক্ষেত্রে ‘কিশোর গ্যাং’ তাদের পৃষ্ঠপোষকদের লাঠিয়াল বাহিনীর কাজ করে। শুধু বাড়িঘর নির্মাণ নয়, যে কোনো বেসরকারি অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট স্থাপনের ক্ষেত্রেও কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সন্তুষ্ট রাখতে হয়। এদের সন্তুষ্ট না রেখে ঠিকাদাররাও নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদাবাজির মতো অপরাধ ও অনিয়ম এখন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপরাধ যারা দমন করবেন এবং অনিয়ম দূর করবেন, তাদের তৎপরতাও সন্তোষজনক নয়।

ঢাকা মহানগরীতে যারা বসবাস করেন, তারা সবাই ‘কিশোর গ্যাং’দের অপকর্ম সম্পর্কে অবহিত। কারণ মহানগরীর এমন কোনো পাড়া-মহল্লা নেই যেখানে ‘কিশোর গ্যাং’দের উৎপাত নেই। যে কোনো মহল্লার রাস্তা বা গলিতে গেলেই দেখা যাবে ৭-৮ জন কিশোর বা তরুণ একসঙ্গে বসে বা দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এদের ধূমপান করতে দেখা যায়। এরা রাস্তায় দাঁড়িয়েই গাঁজা বা মাদক সেবনও করে। অভিযোগ রয়েছে, এদের কারণে স্কুলছাত্রীরা রাস্তায় চলাচল করতে ভয় পায়, অভিভাবকরাও আতঙ্কে থাকেন।

কিশোর গ্যাংদের মধ্যে দলাদলির কারণে ঝগড়া-ঝাটি ও মারধরের ঘটনা প্রায়ই ঘটে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করে। এসব দলাদলি কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরীতে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে।

কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হলো কেন? গ্যাংয়ের সদস্য হয় কারা? এটা গবেষণার বিষয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধানত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরাই এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়। যারা ভালো ছাত্র নয় অথবা লেখাপড়াই করে না, যাদের কোনো কাজ নেই, তারা সহজেই বিপথগামী হয়। কারণ ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। একজন বিপথগামী আরেকজনকে সঙ্গে নেয়। এভাবেই দল বা গ্যাং গড়ে ওঠে। প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা কিশোরদের অপরাধ করতে উৎসাহিত করে।

কেবল ঢাকা মহানগর নয়, দেশের সবকটি নগর ও শহরাঞ্চলে ‘কিশোর গ্যাং’ গজিয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের সূত্র উদ্ধৃত করে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাং সদস্যের সংখ্যা আট হাজারের বেশি। এ পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য, কারণ দেশের ৬৪ জেলার ৬৪ শহরে মোট কিশোর অপরাধী আট হাজার হতেই পারে। কেবল ঢাকা নগরীতেই শতাধিক কিশোর গ্যাংয়ের দু’হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে।

গত বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনা মহামারির সময়ে দেড় বছর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচলাবস্থায় ছিল দীর্ঘকাল। অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন ছিল এবং এখনো আছে। এ পরিস্থিতিতে সব ধরনের অপরাধ বেড়েছে। কিশোর অপরাধীর সংখ্যাও বেড়েছে।

কিশোর গ্যাং তথা কিশোর অপরাধ দমন করতে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। এদের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগও নেই। জনগণের নিরাপত্তা ও দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। সারা দেশে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা যদি আট হাজার হয়, তাহলে এদের শক্ত হাতে দমন করা আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন কাজ নয়।

সর্বত্র একযোগে অভিযান চালানো হলে সবকটি কিশোর গ্যাংই দমন করা সম্ভব। কিশোর অপরাধীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, কিশোর অপরাধ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনও করতে হবে। কিশোর গ্যাংদের যারা পৃষ্ঠপোষক, তাদের বিরুদ্ধেও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

চপল বাশার : লেখক, সাংবাদিক

basharbd@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন