সাম্প্রদায়িকতার উৎখাতে মূলে যেতে হবে
jugantor
সাম্প্রদায়িকতার উৎখাতে মূলে যেতে হবে

  অপূর্ব অনির্বাণ  

২৯ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রদায়িকতার উৎখাতে মূলে যেতে হবে

একটা জাতি উন্নত হয় তখনই যখন তারা বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তিকে (Diversity and Inclusion) গুরুত্ব দেয়। এ বৈচিত্র্য হলো বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, সংস্কৃতির মানুষের অন্তর্ভুক্তির বৈচিত্র্য। আর দেশ গড়ার কাজে এই বৈচিত্র্যকে কাজে লাগানোর মাঝেই আছে উন্নত হওয়ার মূলমন্ত্র। উন্নত দেশ সেই কাজটাই করে। তারা অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে জানে, ধর্ম নিয়ে মিথ্যা অহমিকায় ভোগে না, কিংবা ধর্মবিদ্বেষে নিজেদের ব্যস্ত রাখে না।

ধর্ম নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা আর ধর্মবিদ্বেষ-এক ব্যাপার নয়। একজন মানুষ কী বিশ্বাস করে বা করে না, এটা যেমন তার ব্যক্তিগত ব্যাপার/ ধর্মীয় পরিচয়, তেমনি একজন মানুষ অন্যের বিশ্বাসকে কতটা শ্রদ্ধা করে, সেটির মাঝেও তার ধর্মীয় পরিচয় লুক্কায়িত। নিজের ধর্মবিশ্বাস অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, ফেসবুকে, ইউটিউবে, এলাকায় ধর্মীয় বয়ানে ভিন্ন ধর্মের প্রতি কুৎসা ছড়ানো, হীন স্বার্থে অন্যের দ্বারা নিজ ধর্মগ্রন্থ অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে তাদের ঘর-বাড়ি/মন্দির/মূর্তি ভাংচুর, হত্যা, আক্রমণ, উচ্ছেদ, দেশত্যাগে বাধ্য করা-এসব বর্বর, অমানবিক কাজ বন্ধে কথা বলা, প্রতিবাদ করা এবং প্রতিহত করা সব সচেতন মানুষের কর্তব্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি দলের নীরবতা এবং প্রশাসনের ঘটনা জেনেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত এসব আক্রমণ ঘটে চলেছে। বিশেষত যেসব আক্রমণ অনায়াসে ঠেকানো যায় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে, প্রশাসনের সরব ভূমিকায় এবং প্রতিবেশীরা সরব হলে, সেটিও এবার দেখা গেল না! আমাদের দেশে সাধারণ শিক্ষা এবং ধর্মীয় শিক্ষায় নৈতিকতার যে বিশাল স্খলন ঘটছে, মানুষের সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার মাধ্যমে তা প্রকট হচ্ছে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দলগুলোর দাবিতে পাঠ্যপুস্তকের মান নিম্নগামী করাও এর জন্য দায়ী, যা আমাদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বীভৎস রূপ উন্মোচিত করে। সারা দেশে সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত করা হচ্ছে, আর সে স্থানে মৌলবাদী রাজনীতি আর বিদ্বেষী ওয়াজ মাহফিলের রমরমা ব্যবসার সুযোগ ক্রমবর্ধমান হচ্ছে! সংকুচিত মনন আর যাই হোক সৃজনশীল হয় না এবং অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ধারণ করে না।

যে কোনো মানুষের যৌক্তিক আচরণ কিংবা ন্যায় কাজ সমর্থন করা; আর অন্যায়টা অসমর্থন করা মানুষের কর্তব্য। তখন কারও উপরে আক্রমণ হলে সে কোন ধর্মের অনুসারী তা বিবেচনায় না নিয়েই মানুষ তার পাশে দাঁড়ায়। অথচ বাংলাদেশে হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় এবার যেভাবে মন্দিরে কুরআন রাখার মিথ্যা অভিযোগে প্রথমে কুমিল্লা, তারপর চট্টগ্রাম, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মূর্তি-মন্দির ভাঙা, দোকানপাট ভাঙচুর-লুটপাট, নোয়াখালীতে জেলেপল্লি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাতে আশপাশের মানুষের নীরবতা ও প্রশাসনের গাফিলতি দেখলাম, এতে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে চলে আসে। সরকার কি সত্যিই এসব বন্ধ হোক তা চায়, নাকি রাজনীতির মাঠে ব্লেম গেম চালু রাখতে চায়-এ প্রশ্ন অনেকের মুখে মুখে। অমুসলিমদের ওপর নির্যাতনের খবর পাওয়ার মতো গোয়েন্দা তথ্য আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর থাকে না, এ কথা একজন পাগলও কি বিশ্বাস করবে, যেখানে মাইকে, ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়ে আক্রমণ করা হয়!

মনে রাখতে হবে, আগে মানুষ, পরে ধর্ম। যারা মানুষের চেয়ে ধর্মকে বড় মনে করে তারাই বকধার্মিক, সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিক। যে অন্য দেশে নিজ ধর্মীয় স্থানে আঘাত বা নিজ ধর্মবিশ্বাসীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে কথা বলে অথচ নিজ দেশে নিজ ধর্মের লোকদের দ্বারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণের সময় চুপ থাকে, সে আসলে ভেতরে ভেতরে সাম্প্রদায়িক। সময় তাদের চিনে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

আমরা যেমন ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার নিন্দা জানাই, তেমনি একই সালে শ্রীলংকায় চার্চে হামলারও নিন্দা জানাই। যেভাবে ভারতে ১৯৯২ সালে উগ্রবাদীদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ভাঙার নিন্দা জানাই, সেভাবে বাংলাদেশে মন্দির-মূর্তি ভাঙার তাণ্ডবলীলারও নিন্দা জানাই। ধর্মবিশ্বাসী লোক যদি সহনশীল না হয়, তাহলে তার ধর্মবিশ্বাস যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি তাদের ব্যবহারকারী ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধের প্রশ্নও সামনে আসে। সে কারণে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বিলুপ্ত করা এখন সময়ের দাবি। কোনো আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মভিত্তিক হয় না, বরং যে কোনো ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের অবস্থান হয় নিরপেক্ষ (secular)।

তালেবান আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর বাংলাদেশের উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর আস্ফালন আরও বেড়ে চলেছে। অথচ উগ্র মতবাদ দিয়ে যে দেশ চলবে না, তা তালেবানের সে দেশের ওপর অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞা জারি হলে বহু লোক দেশান্তরি হবে-এ বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। আফগানিস্তানের শাসন সে দেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই করবেন, কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নয়। তার মানে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের উগ্র মতাদর্শ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেবে, রাষ্ট্রে বিরাজমান অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেবে না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে এদের অনুসারী উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীদের থামাতে, দেশের উন্নয়ন এবং নারী-পুরুষ সমতা গড়তে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বিলুপ্তি তাই অতি জরুরি। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বাতিল করে আওয়ামী লীগ বলেছিল যে আবার ক্ষমতায় গেলে তারা রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করবে। এমনকি, ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন’ গঠন করার অঙ্গীকারও করেছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ঘুমের ঘোরে আছে। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে পরপর আরও দু’বার ক্ষমতায় যাওয়ার পরও সরকার কথা রাখেনি। তাহলে প্রশ্ন আসে অমুসলিমরা তাদের ভোট দিয়ে আর বিশ্বাস করে কি ধোঁকা খাচ্ছে? এসব কি তাদের জন্যও একসময় বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে না? যখন ঘোর কেটে যাবে তখন দেখবে বিচারহীনতার কারণে প্রশ্রয় পাওয়া মৌলবাদীরা দেশ দখল করার দ্বারপ্রান্তে। তখন আওয়ামী লীগ কি রেহাই পাবে? এমনকি আওয়ামী লীগের যারা এসবের সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে কার্পণ্য কেন? তাদের স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া (পরে সমালোচনার কারণে প্রত্যাহার) কিসের ইঙ্গিত বহন করে?

ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করা এবং সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার মাঝেই আছে একটা দেশের উন্নয়নের মূলমন্ত্র-সরকারকে এটা সবার আগে বুঝতে হবে, অন্যায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার মূল উদঘাটন করতে হবে যাতে রাজনৈতিক দোষারোপের খেলায় মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়।

মূল উৎপাটন করতে না পারলে এসব সাম্প্রদায়িক উসকানি, মারামারি, হানাহানি হতেই থাকবে প্রতি বছর, আর এসবের ফায়দা লুটবে ধর্ম ব্যবসায়ী আর কপট রাজনীতিকরা। সরকারি দলের কারও কারও সংশ্লিষ্টতা এবং সরকারের নীরবতা, এমনকি অপরাধীদের না ধরে, যাদের নামে ভুয়া আইডি খুলে ফেসবুকে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়ে সহিংসতা করা হয়, উলটো তাদের গ্রেফতার করে জেলে পোড়া, শুধু প্রকৃত অপরাধীদের এসব সহিংসতা বারবার করার উৎসাহ দেয়নি, বরং সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তা ছাড়া, এসব সহিংসতা ছড়ানোর মূল মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবকে কেন জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না তাও বোধগম্য নয়। ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার করে যে কোনো সহিংস ঘটনা ঘটলে, তার দায় তারাও এড়াতে পারে না।

ভোটের রাজনীতিতে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বাতিল করা বরং সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল, সেটা তারা করেছে, সেখানে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা তো সে অর্থে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জই নয়। যে মৌলবাদীদের প্রশ্রয় না দেওয়ার ওপর দেশের অগ্রগতি, নারী-পুরুষ সমতা নির্ভর করছে, তাদের ভয়ে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বাতিল না করতে চাওয়া তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আর অসাম্প্রদায়িকতা একসঙ্গে থাকা হলো স্ববিরোধী নীতি। রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের বিরুদ্ধে আওয়ামী কোনো কোনো নেতার কথা বলা তো ’৭২-এর চার মূলনীতির বিরুদ্ধে কথা বলা তথা বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করার শামিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তে উন্নত দেশের মতো সরকারে থেকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন চালুর ব্যবস্থা যদি আওয়ামী লীগ করতে পারে, তাহলে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বাতিলও করতে পারে। না করতে চাওয়ার মাঝে আওয়ামী লীগের সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার যোগসূত্র আছে কি-না-সেই সন্দেহ আর প্রশ্ন আজ সচেতন মহলে।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধে ‘সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কমিশন’ গঠন করাও জরুরি। ‘সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের দাবি অনেক দিনের। অমুসলিমরা বাংলাদেশে আক্ষরিকভাবে সংখ্যালঘু, এর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক খেসারত তাদের দিতে হচ্ছে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে, যা সভ্য সমাজে কল্পনাতীত। তাই আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা এখন তাদের নৈতিক দায়িত্ব। আর ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন’-এর স্থলে ‘সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কমিশন’ গঠন করাই যুক্তিযুক্ত। স্বাধীন এই কমিশনের চেয়ারম্যান মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি/দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ হতে পারেন। কমিশন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল দ্বারা অমুসলিমদের নির্যাতনের বিপক্ষে কাজ করবে। ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’-এর স্থলে ‘সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আইন’ প্রণয়ন করতে হবে। উন্নত দেশ অসাম্প্রদায়িকতা নিশ্চিত করে বলে ওরা উন্নত। ফলে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিভাজন থাকে না, থাকে না সেই বিভাজনের কারণে আক্রমণ-নির্যাতন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ধর্মীয় বিবেচনায় কখন উন্নত হবে? আর কত দিন ধর্মীয় কারণে মানুষ মার খাবে, প্রাণ দেবে, বাড়ি-জমি হারাবে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে, আর সরকারের ঘুম ভাঙবে? তত দিনে দেশটা মৌলবাদ শাসিত হয়ে সাধারণ মানুষের আর দেশ গড়ার বীর কর্মজীবী নারীদের অধিকার হরণ করে নেবে না তো?

অপূর্ব অনির্বাণ : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; পিএইচডি গবেষক, কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া

সাম্প্রদায়িকতার উৎখাতে মূলে যেতে হবে

 অপূর্ব অনির্বাণ 
২৯ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সাম্প্রদায়িকতার উৎখাতে মূলে যেতে হবে
ফাইল ছবি

একটা জাতি উন্নত হয় তখনই যখন তারা বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তিকে (Diversity and Inclusion) গুরুত্ব দেয়। এ বৈচিত্র্য হলো বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, সংস্কৃতির মানুষের অন্তর্ভুক্তির বৈচিত্র্য। আর দেশ গড়ার কাজে এই বৈচিত্র্যকে কাজে লাগানোর মাঝেই আছে উন্নত হওয়ার মূলমন্ত্র। উন্নত দেশ সেই কাজটাই করে। তারা অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে জানে, ধর্ম নিয়ে মিথ্যা অহমিকায় ভোগে না, কিংবা ধর্মবিদ্বেষে নিজেদের ব্যস্ত রাখে না।

ধর্ম নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা আর ধর্মবিদ্বেষ-এক ব্যাপার নয়। একজন মানুষ কী বিশ্বাস করে বা করে না, এটা যেমন তার ব্যক্তিগত ব্যাপার/ ধর্মীয় পরিচয়, তেমনি একজন মানুষ অন্যের বিশ্বাসকে কতটা শ্রদ্ধা করে, সেটির মাঝেও তার ধর্মীয় পরিচয় লুক্কায়িত। নিজের ধর্মবিশ্বাস অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, ফেসবুকে, ইউটিউবে, এলাকায় ধর্মীয় বয়ানে ভিন্ন ধর্মের প্রতি কুৎসা ছড়ানো, হীন স্বার্থে অন্যের দ্বারা নিজ ধর্মগ্রন্থ অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে তাদের ঘর-বাড়ি/মন্দির/মূর্তি ভাংচুর, হত্যা, আক্রমণ, উচ্ছেদ, দেশত্যাগে বাধ্য করা-এসব বর্বর, অমানবিক কাজ বন্ধে কথা বলা, প্রতিবাদ করা এবং প্রতিহত করা সব সচেতন মানুষের কর্তব্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি দলের নীরবতা এবং প্রশাসনের ঘটনা জেনেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত এসব আক্রমণ ঘটে চলেছে। বিশেষত যেসব আক্রমণ অনায়াসে ঠেকানো যায় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে, প্রশাসনের সরব ভূমিকায় এবং প্রতিবেশীরা সরব হলে, সেটিও এবার দেখা গেল না! আমাদের দেশে সাধারণ শিক্ষা এবং ধর্মীয় শিক্ষায় নৈতিকতার যে বিশাল স্খলন ঘটছে, মানুষের সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার মাধ্যমে তা প্রকট হচ্ছে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দলগুলোর দাবিতে পাঠ্যপুস্তকের মান নিম্নগামী করাও এর জন্য দায়ী, যা আমাদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বীভৎস রূপ উন্মোচিত করে। সারা দেশে সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত করা হচ্ছে, আর সে স্থানে মৌলবাদী রাজনীতি আর বিদ্বেষী ওয়াজ মাহফিলের রমরমা ব্যবসার সুযোগ ক্রমবর্ধমান হচ্ছে! সংকুচিত মনন আর যাই হোক সৃজনশীল হয় না এবং অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ধারণ করে না।

যে কোনো মানুষের যৌক্তিক আচরণ কিংবা ন্যায় কাজ সমর্থন করা; আর অন্যায়টা অসমর্থন করা মানুষের কর্তব্য। তখন কারও উপরে আক্রমণ হলে সে কোন ধর্মের অনুসারী তা বিবেচনায় না নিয়েই মানুষ তার পাশে দাঁড়ায়। অথচ বাংলাদেশে হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় এবার যেভাবে মন্দিরে কুরআন রাখার মিথ্যা অভিযোগে প্রথমে কুমিল্লা, তারপর চট্টগ্রাম, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মূর্তি-মন্দির ভাঙা, দোকানপাট ভাঙচুর-লুটপাট, নোয়াখালীতে জেলেপল্লি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাতে আশপাশের মানুষের নীরবতা ও প্রশাসনের গাফিলতি দেখলাম, এতে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে চলে আসে। সরকার কি সত্যিই এসব বন্ধ হোক তা চায়, নাকি রাজনীতির মাঠে ব্লেম গেম চালু রাখতে চায়-এ প্রশ্ন অনেকের মুখে মুখে। অমুসলিমদের ওপর নির্যাতনের খবর পাওয়ার মতো গোয়েন্দা তথ্য আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর থাকে না, এ কথা একজন পাগলও কি বিশ্বাস করবে, যেখানে মাইকে, ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়ে আক্রমণ করা হয়!

মনে রাখতে হবে, আগে মানুষ, পরে ধর্ম। যারা মানুষের চেয়ে ধর্মকে বড় মনে করে তারাই বকধার্মিক, সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিক। যে অন্য দেশে নিজ ধর্মীয় স্থানে আঘাত বা নিজ ধর্মবিশ্বাসীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে কথা বলে অথচ নিজ দেশে নিজ ধর্মের লোকদের দ্বারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণের সময় চুপ থাকে, সে আসলে ভেতরে ভেতরে সাম্প্রদায়িক। সময় তাদের চিনে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

আমরা যেমন ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার নিন্দা জানাই, তেমনি একই সালে শ্রীলংকায় চার্চে হামলারও নিন্দা জানাই। যেভাবে ভারতে ১৯৯২ সালে উগ্রবাদীদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ভাঙার নিন্দা জানাই, সেভাবে বাংলাদেশে মন্দির-মূর্তি ভাঙার তাণ্ডবলীলারও নিন্দা জানাই। ধর্মবিশ্বাসী লোক যদি সহনশীল না হয়, তাহলে তার ধর্মবিশ্বাস যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি তাদের ব্যবহারকারী ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধের প্রশ্নও সামনে আসে। সে কারণে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বিলুপ্ত করা এখন সময়ের দাবি। কোনো আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মভিত্তিক হয় না, বরং যে কোনো ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের অবস্থান হয় নিরপেক্ষ (secular)।

তালেবান আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর বাংলাদেশের উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর আস্ফালন আরও বেড়ে চলেছে। অথচ উগ্র মতবাদ দিয়ে যে দেশ চলবে না, তা তালেবানের সে দেশের ওপর অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞা জারি হলে বহু লোক দেশান্তরি হবে-এ বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। আফগানিস্তানের শাসন সে দেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই করবেন, কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নয়। তার মানে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের উগ্র মতাদর্শ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেবে, রাষ্ট্রে বিরাজমান অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেবে না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে এদের অনুসারী উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীদের থামাতে, দেশের উন্নয়ন এবং নারী-পুরুষ সমতা গড়তে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বিলুপ্তি তাই অতি জরুরি। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বাতিল করে আওয়ামী লীগ বলেছিল যে আবার ক্ষমতায় গেলে তারা রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করবে। এমনকি, ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন’ গঠন করার অঙ্গীকারও করেছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ঘুমের ঘোরে আছে। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে পরপর আরও দু’বার ক্ষমতায় যাওয়ার পরও সরকার কথা রাখেনি। তাহলে প্রশ্ন আসে অমুসলিমরা তাদের ভোট দিয়ে আর বিশ্বাস করে কি ধোঁকা খাচ্ছে? এসব কি তাদের জন্যও একসময় বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে না? যখন ঘোর কেটে যাবে তখন দেখবে বিচারহীনতার কারণে প্রশ্রয় পাওয়া মৌলবাদীরা দেশ দখল করার দ্বারপ্রান্তে। তখন আওয়ামী লীগ কি রেহাই পাবে? এমনকি আওয়ামী লীগের যারা এসবের সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে কার্পণ্য কেন? তাদের স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া (পরে সমালোচনার কারণে প্রত্যাহার) কিসের ইঙ্গিত বহন করে?

ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করা এবং সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার মাঝেই আছে একটা দেশের উন্নয়নের মূলমন্ত্র-সরকারকে এটা সবার আগে বুঝতে হবে, অন্যায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার মূল উদঘাটন করতে হবে যাতে রাজনৈতিক দোষারোপের খেলায় মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়।

মূল উৎপাটন করতে না পারলে এসব সাম্প্রদায়িক উসকানি, মারামারি, হানাহানি হতেই থাকবে প্রতি বছর, আর এসবের ফায়দা লুটবে ধর্ম ব্যবসায়ী আর কপট রাজনীতিকরা। সরকারি দলের কারও কারও সংশ্লিষ্টতা এবং সরকারের নীরবতা, এমনকি অপরাধীদের না ধরে, যাদের নামে ভুয়া আইডি খুলে ফেসবুকে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়ে সহিংসতা করা হয়, উলটো তাদের গ্রেফতার করে জেলে পোড়া, শুধু প্রকৃত অপরাধীদের এসব সহিংসতা বারবার করার উৎসাহ দেয়নি, বরং সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তা ছাড়া, এসব সহিংসতা ছড়ানোর মূল মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবকে কেন জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না তাও বোধগম্য নয়। ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার করে যে কোনো সহিংস ঘটনা ঘটলে, তার দায় তারাও এড়াতে পারে না।

ভোটের রাজনীতিতে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বাতিল করা বরং সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল, সেটা তারা করেছে, সেখানে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা তো সে অর্থে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জই নয়। যে মৌলবাদীদের প্রশ্রয় না দেওয়ার ওপর দেশের অগ্রগতি, নারী-পুরুষ সমতা নির্ভর করছে, তাদের ভয়ে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বাতিল না করতে চাওয়া তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আর অসাম্প্রদায়িকতা একসঙ্গে থাকা হলো স্ববিরোধী নীতি। রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের বিরুদ্ধে আওয়ামী কোনো কোনো নেতার কথা বলা তো ’৭২-এর চার মূলনীতির বিরুদ্ধে কথা বলা তথা বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করার শামিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তে উন্নত দেশের মতো সরকারে থেকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন চালুর ব্যবস্থা যদি আওয়ামী লীগ করতে পারে, তাহলে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বাতিলও করতে পারে। না করতে চাওয়ার মাঝে আওয়ামী লীগের সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার যোগসূত্র আছে কি-না-সেই সন্দেহ আর প্রশ্ন আজ সচেতন মহলে।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধে ‘সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কমিশন’ গঠন করাও জরুরি। ‘সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের দাবি অনেক দিনের। অমুসলিমরা বাংলাদেশে আক্ষরিকভাবে সংখ্যালঘু, এর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক খেসারত তাদের দিতে হচ্ছে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে, যা সভ্য সমাজে কল্পনাতীত। তাই আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা এখন তাদের নৈতিক দায়িত্ব। আর ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন’-এর স্থলে ‘সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কমিশন’ গঠন করাই যুক্তিযুক্ত। স্বাধীন এই কমিশনের চেয়ারম্যান মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি/দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ হতে পারেন। কমিশন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল দ্বারা অমুসলিমদের নির্যাতনের বিপক্ষে কাজ করবে। ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’-এর স্থলে ‘সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আইন’ প্রণয়ন করতে হবে। উন্নত দেশ অসাম্প্রদায়িকতা নিশ্চিত করে বলে ওরা উন্নত। ফলে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিভাজন থাকে না, থাকে না সেই বিভাজনের কারণে আক্রমণ-নির্যাতন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ধর্মীয় বিবেচনায় কখন উন্নত হবে? আর কত দিন ধর্মীয় কারণে মানুষ মার খাবে, প্রাণ দেবে, বাড়ি-জমি হারাবে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে, আর সরকারের ঘুম ভাঙবে? তত দিনে দেশটা মৌলবাদ শাসিত হয়ে সাধারণ মানুষের আর দেশ গড়ার বীর কর্মজীবী নারীদের অধিকার হরণ করে নেবে না তো?

অপূর্ব অনির্বাণ : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; পিএইচডি গবেষক, কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন