আনন্দ-বেদনার পঞ্চাশ বছর
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
আনন্দ-বেদনার পঞ্চাশ বছর

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এই ডিসেম্বরে আমার বয়স সত্তর পেরিয়ে ৭১-এ পড়ল। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে আমি একুশ বছরের একজন টগবগে তরুণ ছিলাম। আর সেই সময়ই বাংলা মায়ের বুকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল। ২৬ মার্চ পাবনা পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুট করে পাওয়া একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে ২৭ মার্চ প্রায় সারা দিন ধরে টিঅ্যান্ডটি ভবনে অবস্থানরত পাক বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলাম এবং আমার মতো আরও অনেকে সেদিন টিঅ্যান্ডটি ভবন চারদিক থেকে ঘেরাও করে গুলিবর্ষণ করেছিল।

২৮ মার্চ দেখা গেল সেখানে অবস্থানরত পাক আর্মিদের সবাই নিহত হয়েছে। ওই বয়সে সেদিনের গুলি চালানোর প্রথম অনুভূতি আজও আমাকে আলোড়িত করে। অতঃপর ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা পাক আর্মিমুক্ত থাকার পর পাক বাহিনীর আবার পাবনা দখল, মে মাসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ভারত গমন ইত্যাদি ঘটনার কথাও আজ ৫০ বছর পর স্মৃতির দুয়ারে করাঘাত করে আমার চেতনাকে জাগ্রত করে তোলে।

টেলিফোন ভবন যুদ্ধের পর থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা পাক হানাদারমুক্ত ছিল। তারপর পাক আর্মি আবার পাবনা দখল করে নেয়। আর এ সময়ে পাবনার বিভিন্ন স্থানে তারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে সেসব প্রতিরোধ যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদতবরণ করেন। অবশেষে পাক আর্মি পাবনা শহর দখলে নিয়ে অনেক স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এ অবস্থায় অনেকের মতো আমি এবং বাদল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে পাড়ি জমাই। একদিন ভোররাতে মা-বাবাকে না বলেই ভারতের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও সীমান্ত পার হতে না পারায় সীমান্তবর্তী এক লোহা পেটানো কামারের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেদিন সেই কামার আমাদের পরম যত্নে গরম ভাত ও মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাইয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে আবার ভোররাতে ডেকে তুলে দিয়ে, কীভাবে বর্ডার ক্রস করতে হবে তা বলে দিয়েছিলেন।

আমরা সেই কামারের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকলেও তাকে পরে আর কোনোদিন খুঁজে বের করার চেষ্টা করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারিনি বা করিনি। আমাদের এ ব্যর্থতার জন্য আমরা তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। সেদিন সেই কামার আমাদের ‘বর্ডার পাস করা রিস্ক আছে’ এই কথা বলে সাবধান করে বর্ডার ক্রসের কায়দা শিখিয়ে না দিলে আমরা হয়তো সেখানেই মারা পড়তাম।

কারণ আরও ঘণ্টাখানেক হেঁটে সেদিন সকালে বর্ডার ক্রস করতে গিয়ে দেখি, প্রায় ১০০ মানুষের গুলিবিদ্ধ লাশ নো ম্যানস্ ল্যান্ডে পড়ে আছে। জানতে পারলাম বাংলাদেশি এসব মানুষ কিছুক্ষণ আগে বর্ডার ক্রসের সময় পাক আর্মির গুলিতে নিহত হয়েছেন। সীমান্তের লোকেরা আরও জানালেন, আমরাও আধা ঘণ্টা আগে এখানে পৌঁছালে পাক আর্মির নির্মমতার শিকার হতাম। আল্লাহই আমাদের বাঁচিয়েছেন।

মহান আল্লাহ এভাবে আমাকে এবং আমার সঙ্গীদের আরও একবার সীমান্তে যুদ্ধরত অবস্থায় বাঁচিয়ে দিয়েছেন। সে কাহিনী একটু ভিন্নতর। প্রথম দফায় আমি আর বাদল ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা ট্রেনিং ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে পরদিন আমি চোখের ভাইরাস (চোখ ওঠা) রোগে আক্রান্ত হই এবং সেই সঙ্গে জ্বর হওয়ায় কলকাতা গিয়ে আমাদের পাবনার মনসুর চাচার (প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী) সহায়তায় চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসি।

কিন্তু দুদিন যেতেই আমাদের একজন প্রতিবেশী এসে আমার মাকে বললেন, ‘তোমার ছেলে ভারত থেকে ফিরেছে, একথা পাক আর্মির কানে গেলে, ওকে ধরে নিয়ে শট (শ্যুট) করে দিবে’! কথাটি শোনার পর আমার কানেও পানি গেল। এদিকে পাবনার অবস্থাও তখন খুব খারাপ, পাক আর্মি গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দু এবং মুক্তিবাহিনী খুঁজে বেড়াচ্ছে।

যাকে পাচ্ছে জিজ্ঞেস করছে, ‘ইধারভি হিদু হ্যায়, মুকুত হ্যায়’? এ অবস্থায় পরদিন সকালে পাক আর্মি হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করায় আমাদের বাড়ির পাশে কালীবাড়ী নামক স্থানে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হলে আমি ছোট ছোট ভাইবোনসহ মাকে নিয়ে চরঘোষপুরে আমাদের এক পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। বাবা সকাল সকাল বেরিয়েছিলেন বলে, সন্ধ্যায় এসে আমাদের খুঁজে বের করেন। এ অবস্থায় সেদিন রাতটা কোনোমতে পার করে ভোরবেলা পরিবার-পরিজন ত্যাগ করে পাক আর্মিকে ধ্বংস করার প্রত্যয়ে আবার ভারতে গিয়ে এবারে আমি শিকারপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে উপস্থিত হই।

শিকারপুর ট্রেনিং ক্যাম্প আমাদের পাবনার শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল এবং সেখানে মূলত গেরিলা ট্রেনিং প্রদান করা হতো। আমি দশ দিনের গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ি। স্বল্পকালীন এ ট্রেনিংয়ের সময় আমাদের এক্সপ্লোসিভস লাগিয়ে কোনো স্থাপনা ধ্বংস করা বা উড়িয়ে দেওয়া, দুই প্রকার স্থলমাইন বসানোসহ কিছু খুঁটিনাটি বিষয় শেখানো হয়েছিল।

বিশেষ করে রাতের বেলা জঙ্গলে ট্রেনিংয়ের বিষয়টি আমার কাছে খুব রোমাঞ্চকর লেগেছিল। সঙ্গে কোনো ম্যাচ বাক্স রেখে কাঠি জ্বালানো যাবে না, সিগারেট ফুঁকলে সে আলো পর্যন্ত শত্রুকে সাহায্য করবে, ক্রলিং করার কঠোর পরিশ্রম, এক্সপ্লোসিভের দড়ি বা সুতাটি ‘আগ লেনে যানেওলা’ এবং সেই আগ লেনে যানেওয়ালার গায়ে আগুন লাগিয়ে সরে আসা- এমনসব ঘটনা শিখতে পেরে তা কাজে লাগিয়ে সেদিন ওই বয়সে আমি ভীষণ গর্ববোধ করেছিলাম। যা হোক, ট্রেনিং শেষে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে গিয়ে যে সম্মুখ যুদ্ধটির মুখোমুখি হয়েছিলাম, সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে সেই কথাটি বলতে চাই।

আমরা ৫-৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ধরমদিয়া-প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে পার হতে বসেছি, এমন সময় নো ম্যান্স ল্যান্ড শেষে আমাদের এলাকায় একজন কৃষক হাতের নিড়ানি দিয়ে ইশারা করে আমাদের তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢোকার তাগিদ দেওয়ায় আমরা ভালো করে লক্ষ করে দেখি কিছুটা দূরে এক ট্রাক পাক আর্মি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সীমান্তের এই কাঁচা রাস্তায় পাক আর্মির ট্রাক আসবে আমরা ভাবিনি।

অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা দৌড়ে পাশের একটি শুকনো ডোবায় আশ্রয় গ্রহণ করার সঙ্গে পাক আর্মি দেখে ফেলায় আমাদের প্রতি গুলিবর্ষণ শুরু করে। ডোবাটির পাশেই একটি আখক্ষেত থাকায় আমাদের কিছুটা সুবিধা হওয়ায় আমরাও থেমে থেমে গুলিবর্ষণ করে পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করলে, এবারে তারা বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে এবং তাদের সে গুলি আখের পাতা পর্যন্ত ছিন্নভিন্ন করে ফেলে।

এ অবস্থায় প্রায় পনেরো মিনিট গোলাগুলি চলার পর ভারতের দিক থেকে বিএসএফ পাক আর্মিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং তারপর এভাবে পাঁচ মিনিট তাদের সাপোর্টিং ফায়ার চলার পর পাক আর্মি স্থানত্যাগ করলে আমরা ভেতরে ঢুকে একজন শেল্টার মাস্টারের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। অতঃপর দেশের অভ্যন্তরে দু-একটি অপারেশন চালানোর মাধ্যমে বাকি সময়টি পার হয়ে যায়। একবার একটি রেল লাইনের ফিশ প্লেট উড়িয়ে দিয়ে কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদীগামী পাক আর্মির একটি ট্রেন রুখে দেওয়াসহ ভেড়ামারা পাওয়ার স্টেশনের পার্শ্ববর্তী একটি বৈদ্যুতিক টাওয়ার ধ্বংস করেছিলাম। স্থানাভাবে সেসব ঘটনাসহ আরও কিছু ঘটনা এখানে বলা সম্ভব হলো না।

আজ, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসব মনে পড়লে দেশের অবস্থা দেখে কখনো কখনো বিচলিত হয়ে পড়ি। সেদিন এক বৃদ্ধ ডাক্তার সাহেব, যিনি কোনো প্র্যাকটিস করেন না, বাড়িভাড়ার ওপর নির্ভরশীল, তিনি বললেন, স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়ায় বারবার তার নথি অডিটে পাঠানো হয়। এসব যাতনা সহ্য করতে না পেরে এবারে কিছু টাকা ঘুস দিয়ে এলেও সংশ্লিষ্ট অফিসার ফোন করে জানিয়েছেন, ‘তাকে দিয়ে আসা খামটির ওজন কম হয়ে গিয়েছে!’

ডাক্তার সাহেব এ বিষয়ে মৃদু প্রতিবাদ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে অফিসারটি নাকি বলেছেন, ‘যান আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, কমিশনারও জানে যে আমি ঘুস খাই!’ অপর ঘটনায় হাইকোর্টের একজন বিচারপ্রার্থী জানালেন, কয়েক বছর ঘুরে হাইকোর্টের রায় হলেও রায়ের কপি পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরি করে তিনি বাষ্পোচ্ছ্বাস রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর গজব পড়বে!’

পথেঘাটে চলে ফিরে এসব কথা শুনি আর ভাবি, আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর তো পূর্ণ হলো, কিন্তু আমরা স্বাধীন তো? স্বাধীন হলে, পথেঘাটে, অফিস-আদালতে আজ এখনো এত অনাচার কেন? তারপর আবারও ভাবি, এত কিছু সত্ত্বেও দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনায় ৫০টি বছর ভালোই গেল।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

আনন্দ-বেদনার পঞ্চাশ বছর

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এই ডিসেম্বরে আমার বয়স সত্তর পেরিয়ে ৭১-এ পড়ল। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে আমি একুশ বছরের একজন টগবগে তরুণ ছিলাম। আর সেই সময়ই বাংলা মায়ের বুকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল। ২৬ মার্চ পাবনা পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুট করে পাওয়া একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে ২৭ মার্চ প্রায় সারা দিন ধরে টিঅ্যান্ডটি ভবনে অবস্থানরত পাক বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলাম এবং আমার মতো আরও অনেকে সেদিন টিঅ্যান্ডটি ভবন চারদিক থেকে ঘেরাও করে গুলিবর্ষণ করেছিল।

২৮ মার্চ দেখা গেল সেখানে অবস্থানরত পাক আর্মিদের সবাই নিহত হয়েছে। ওই বয়সে সেদিনের গুলি চালানোর প্রথম অনুভূতি আজও আমাকে আলোড়িত করে। অতঃপর ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা পাক আর্মিমুক্ত থাকার পর পাক বাহিনীর আবার পাবনা দখল, মে মাসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ভারত গমন ইত্যাদি ঘটনার কথাও আজ ৫০ বছর পর স্মৃতির দুয়ারে করাঘাত করে আমার চেতনাকে জাগ্রত করে তোলে।

টেলিফোন ভবন যুদ্ধের পর থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা পাক হানাদারমুক্ত ছিল। তারপর পাক আর্মি আবার পাবনা দখল করে নেয়। আর এ সময়ে পাবনার বিভিন্ন স্থানে তারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে সেসব প্রতিরোধ যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদতবরণ করেন। অবশেষে পাক আর্মি পাবনা শহর দখলে নিয়ে অনেক স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এ অবস্থায় অনেকের মতো আমি এবং বাদল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে পাড়ি জমাই। একদিন ভোররাতে মা-বাবাকে না বলেই ভারতের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও সীমান্ত পার হতে না পারায় সীমান্তবর্তী এক লোহা পেটানো কামারের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেদিন সেই কামার আমাদের পরম যত্নে গরম ভাত ও মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাইয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে আবার ভোররাতে ডেকে তুলে দিয়ে, কীভাবে বর্ডার ক্রস করতে হবে তা বলে দিয়েছিলেন।

আমরা সেই কামারের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকলেও তাকে পরে আর কোনোদিন খুঁজে বের করার চেষ্টা করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারিনি বা করিনি। আমাদের এ ব্যর্থতার জন্য আমরা তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। সেদিন সেই কামার আমাদের ‘বর্ডার পাস করা রিস্ক আছে’ এই কথা বলে সাবধান করে বর্ডার ক্রসের কায়দা শিখিয়ে না দিলে আমরা হয়তো সেখানেই মারা পড়তাম।

কারণ আরও ঘণ্টাখানেক হেঁটে সেদিন সকালে বর্ডার ক্রস করতে গিয়ে দেখি, প্রায় ১০০ মানুষের গুলিবিদ্ধ লাশ নো ম্যানস্ ল্যান্ডে পড়ে আছে। জানতে পারলাম বাংলাদেশি এসব মানুষ কিছুক্ষণ আগে বর্ডার ক্রসের সময় পাক আর্মির গুলিতে নিহত হয়েছেন। সীমান্তের লোকেরা আরও জানালেন, আমরাও আধা ঘণ্টা আগে এখানে পৌঁছালে পাক আর্মির নির্মমতার শিকার হতাম। আল্লাহই আমাদের বাঁচিয়েছেন।

মহান আল্লাহ এভাবে আমাকে এবং আমার সঙ্গীদের আরও একবার সীমান্তে যুদ্ধরত অবস্থায় বাঁচিয়ে দিয়েছেন। সে কাহিনী একটু ভিন্নতর। প্রথম দফায় আমি আর বাদল ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা ট্রেনিং ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে পরদিন আমি চোখের ভাইরাস (চোখ ওঠা) রোগে আক্রান্ত হই এবং সেই সঙ্গে জ্বর হওয়ায় কলকাতা গিয়ে আমাদের পাবনার মনসুর চাচার (প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী) সহায়তায় চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসি।

কিন্তু দুদিন যেতেই আমাদের একজন প্রতিবেশী এসে আমার মাকে বললেন, ‘তোমার ছেলে ভারত থেকে ফিরেছে, একথা পাক আর্মির কানে গেলে, ওকে ধরে নিয়ে শট (শ্যুট) করে দিবে’! কথাটি শোনার পর আমার কানেও পানি গেল। এদিকে পাবনার অবস্থাও তখন খুব খারাপ, পাক আর্মি গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দু এবং মুক্তিবাহিনী খুঁজে বেড়াচ্ছে।

যাকে পাচ্ছে জিজ্ঞেস করছে, ‘ইধারভি হিদু হ্যায়, মুকুত হ্যায়’? এ অবস্থায় পরদিন সকালে পাক আর্মি হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করায় আমাদের বাড়ির পাশে কালীবাড়ী নামক স্থানে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হলে আমি ছোট ছোট ভাইবোনসহ মাকে নিয়ে চরঘোষপুরে আমাদের এক পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। বাবা সকাল সকাল বেরিয়েছিলেন বলে, সন্ধ্যায় এসে আমাদের খুঁজে বের করেন। এ অবস্থায় সেদিন রাতটা কোনোমতে পার করে ভোরবেলা পরিবার-পরিজন ত্যাগ করে পাক আর্মিকে ধ্বংস করার প্রত্যয়ে আবার ভারতে গিয়ে এবারে আমি শিকারপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে উপস্থিত হই।

শিকারপুর ট্রেনিং ক্যাম্প আমাদের পাবনার শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল এবং সেখানে মূলত গেরিলা ট্রেনিং প্রদান করা হতো। আমি দশ দিনের গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ি। স্বল্পকালীন এ ট্রেনিংয়ের সময় আমাদের এক্সপ্লোসিভস লাগিয়ে কোনো স্থাপনা ধ্বংস করা বা উড়িয়ে দেওয়া, দুই প্রকার স্থলমাইন বসানোসহ কিছু খুঁটিনাটি বিষয় শেখানো হয়েছিল।

বিশেষ করে রাতের বেলা জঙ্গলে ট্রেনিংয়ের বিষয়টি আমার কাছে খুব রোমাঞ্চকর লেগেছিল। সঙ্গে কোনো ম্যাচ বাক্স রেখে কাঠি জ্বালানো যাবে না, সিগারেট ফুঁকলে সে আলো পর্যন্ত শত্রুকে সাহায্য করবে, ক্রলিং করার কঠোর পরিশ্রম, এক্সপ্লোসিভের দড়ি বা সুতাটি ‘আগ লেনে যানেওলা’ এবং সেই আগ লেনে যানেওয়ালার গায়ে আগুন লাগিয়ে সরে আসা- এমনসব ঘটনা শিখতে পেরে তা কাজে লাগিয়ে সেদিন ওই বয়সে আমি ভীষণ গর্ববোধ করেছিলাম। যা হোক, ট্রেনিং শেষে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে গিয়ে যে সম্মুখ যুদ্ধটির মুখোমুখি হয়েছিলাম, সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে সেই কথাটি বলতে চাই।

আমরা ৫-৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ধরমদিয়া-প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে পার হতে বসেছি, এমন সময় নো ম্যান্স ল্যান্ড শেষে আমাদের এলাকায় একজন কৃষক হাতের নিড়ানি দিয়ে ইশারা করে আমাদের তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢোকার তাগিদ দেওয়ায় আমরা ভালো করে লক্ষ করে দেখি কিছুটা দূরে এক ট্রাক পাক আর্মি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সীমান্তের এই কাঁচা রাস্তায় পাক আর্মির ট্রাক আসবে আমরা ভাবিনি।

অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা দৌড়ে পাশের একটি শুকনো ডোবায় আশ্রয় গ্রহণ করার সঙ্গে পাক আর্মি দেখে ফেলায় আমাদের প্রতি গুলিবর্ষণ শুরু করে। ডোবাটির পাশেই একটি আখক্ষেত থাকায় আমাদের কিছুটা সুবিধা হওয়ায় আমরাও থেমে থেমে গুলিবর্ষণ করে পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করলে, এবারে তারা বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে এবং তাদের সে গুলি আখের পাতা পর্যন্ত ছিন্নভিন্ন করে ফেলে।

এ অবস্থায় প্রায় পনেরো মিনিট গোলাগুলি চলার পর ভারতের দিক থেকে বিএসএফ পাক আর্মিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং তারপর এভাবে পাঁচ মিনিট তাদের সাপোর্টিং ফায়ার চলার পর পাক আর্মি স্থানত্যাগ করলে আমরা ভেতরে ঢুকে একজন শেল্টার মাস্টারের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। অতঃপর দেশের অভ্যন্তরে দু-একটি অপারেশন চালানোর মাধ্যমে বাকি সময়টি পার হয়ে যায়। একবার একটি রেল লাইনের ফিশ প্লেট উড়িয়ে দিয়ে কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদীগামী পাক আর্মির একটি ট্রেন রুখে দেওয়াসহ ভেড়ামারা পাওয়ার স্টেশনের পার্শ্ববর্তী একটি বৈদ্যুতিক টাওয়ার ধ্বংস করেছিলাম। স্থানাভাবে সেসব ঘটনাসহ আরও কিছু ঘটনা এখানে বলা সম্ভব হলো না।

আজ, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসব মনে পড়লে দেশের অবস্থা দেখে কখনো কখনো বিচলিত হয়ে পড়ি। সেদিন এক বৃদ্ধ ডাক্তার সাহেব, যিনি কোনো প্র্যাকটিস করেন না, বাড়িভাড়ার ওপর নির্ভরশীল, তিনি বললেন, স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়ায় বারবার তার নথি অডিটে পাঠানো হয়। এসব যাতনা সহ্য করতে না পেরে এবারে কিছু টাকা ঘুস দিয়ে এলেও সংশ্লিষ্ট অফিসার ফোন করে জানিয়েছেন, ‘তাকে দিয়ে আসা খামটির ওজন কম হয়ে গিয়েছে!’

ডাক্তার সাহেব এ বিষয়ে মৃদু প্রতিবাদ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে অফিসারটি নাকি বলেছেন, ‘যান আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, কমিশনারও জানে যে আমি ঘুস খাই!’ অপর ঘটনায় হাইকোর্টের একজন বিচারপ্রার্থী জানালেন, কয়েক বছর ঘুরে হাইকোর্টের রায় হলেও রায়ের কপি পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরি করে তিনি বাষ্পোচ্ছ্বাস রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর গজব পড়বে!’

পথেঘাটে চলে ফিরে এসব কথা শুনি আর ভাবি, আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর তো পূর্ণ হলো, কিন্তু আমরা স্বাধীন তো? স্বাধীন হলে, পথেঘাটে, অফিস-আদালতে আজ এখনো এত অনাচার কেন? তারপর আবারও ভাবি, এত কিছু সত্ত্বেও দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনায় ৫০টি বছর ভালোই গেল।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন