পৃথিবীর এখন গভীর অসুখ
jugantor
পৃথিবীর এখন গভীর অসুখ

  আতাহার খান  

০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। কিছুতেই তা থামছে না। যদি সঠিক সীমার ভেতরে এ তাপমাত্রা বেঁধে রাখা না যায়, তাহলে আমাদের এ প্রিয় পৃথিবী আরও উষ্ণ হয়ে উঠবে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কয়লাসহ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনই এর অন্যতম প্রধান কারণ। যদি এখনই এর রশি টেনে ধরা না হয়, তাহলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ আগামী চার বছরে শীর্ষে গিয়ে পৌঁছাবে। তখন ব্যাপক রদবদল ঘটবে পৃথিবীর জলবায়ুর। মানুষের জীবনযাত্রার ধরনও বদলে যাবে। দেখা দেবে আচরণগত পরিবর্তন।

জলবায়ুগত পরিবর্তন ও এর প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) একটি হুঁশিয়ারি রিপোর্ট প্রকাশ করে ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ (আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ)। তাতে জানা যায়, আইপিসিসির তৈরি করা ওই রিপোর্টের তৃতীয় পর্বে আছে এ হুঁশিয়ারির কথা। রিপোর্টটি আগামী বছরের মার্চে প্রকাশ হওয়ার কথা। আইপিসিসির রিপোর্টটিকে ভাগ করা হয়েছে তিন পর্বে। পর্ব তিনটি হলো-জলবায়ু পরিবর্তনের বিজ্ঞান, এর প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কীভাবে কমানো যায়। আসলেই বড় রকম ঝুঁকির মুখে রয়েছে এ পৃথিবী। সময় হাতে খুব কম। তাই ভয়াবহ এ দুর্যোগ মোকাবিলার স্বার্থে আগামী দশকের মাঝামাঝি কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবকটি কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে গোটা বিশ্ব থেকে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা সম্ভব হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন, তা আসলেই কি সম্ভব? উন্নত বিশ্ব গ্রিনহাউজ নিঃসরণের সর্বনিম্ন সীমা ঠিক করতে পারেনি বলে জাতিসংঘে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলতে বাধ্য হয়েছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্য এখন লাইফসাপর্টে। জলবায়ু সম্মেলনের গ্লাসগো চুক্তিকে তিনি আপসের দলিল বলেও উল্লেখ করেছেন। এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোট কপ২৬ কোয়ালিশনের মুখপাত্র আসাদ রেহমান তো আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে উঁচু গলায় বলেছেন, এ চুক্তি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এ দুটি মন্তব্যই পরিষ্কার করে দেয়, কদিন আগে শেষ হওয়া গ্লাসগো সম্মেলন আসলে কতটা সফল হয়েছে। তাই এ চুক্তিকে অনেকটা অর্ধেক খালি গ্লাসের সঙ্গেই অনায়াসে তুলনা করা যায়। তবে ধনী দেশগুলো এ কথাকেই আশাবাদী কণ্ঠে ঘুরিয়ে বলার চেষ্টা করেছে, গ্লাসটি অর্ধেক ভরা।

জলবায়ুর মতো অতি জরুরি একটা বিষয়ে ধনী দেশগুলো মূলত ফাঁপা বুলি আওড়িয়েছে। তাদের কারণে জলবায়ুর সংকটে পড়া দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের বিষয়টি থেকে গেছে অমীমাংসিত। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থ দ্বিগুণ প্রয়োজন, শুধু এটুকুই স্বীকার করেছে ধনী দেশগুলো। গ্লাসগো সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করা এবং কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর এ অনৈক্যই আমাদের এ পৃথিবীর অসুখ বাড়িয়ে চলেছে। আমরা জানি, জীবাশ্ম জ্বালানির প্রধান দুটি পদার্থ কয়লা আর ডিজেল। এ দুটি পদার্থের ব্যবহার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। ফলে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি বেড়ে গেছে কার্বনের নির্গমন। কার্বনের এ নির্গমন মাত্রা যদি কমিয়ে আনা না যায়, তার মানে এর সর্বনিম্ন মাত্রা ঠিক করা না হয়, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে একবার করে ৩০ কোটি মানুষের বসবাসের বিশাল এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। এর মধ্যে আছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় শহর। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, কী ধরনের মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে বিশ্ববাসীকে।

দেড় শতাধিক দেশের ১১ হাজারের বেশি বিজ্ঞানী এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তারা আরও জানিয়েছেন, পরিবেশগত প্রচলিত পথ জরুরি ভিত্তিতে পালটানো প্রয়োজন। তা না হলে বিশ্বের সবখানে দেখা দেবে ভয়াবহ বিপর্যয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মাসিক বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশন-এর একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয় বিজ্ঞানীদের সতর্ক করা এ খবরটি।

এর মানে, কয়লা আর ডিজেলের সর্বাধিক ব্যবহারের কারণেই আজ মোকাবিলা করতে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগকে। এখানে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে উন্নত বিশ্বের আন্তরিকতা নিয়ে। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তাদের শুভবুদ্ধির উন্মেষ কবে ঘটবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়! যেন কিছুই হয়নি, অথবা ঘটেনি-এরকম ভাব বজায় রেখে ধনী দেশগুলো নির্ভাবনায় পার করছে সময়। এ মানসিকতা দুঃখজনক বৈ আর কিছুই নয়। অথচ বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি হিসাবে কয়লা আর ডিজেলের ব্যবহার এখন সর্বাধিক পর্যায়ে রয়েছে-এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, কয়লা ও ডিজেলের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি নির্গমন ঘটে কার্বনের। এ কার্বন শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী নয়, ওজোন স্তরকেও ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আসলেই আমাদের হাতে সময় খুব কম। যে করে হোক, কয়লা ও ডিজেল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তা না হলে বেড়েই চলবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি? বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্যই দক্ষিণ ও উত্তর মেরুর বরফ গলতে শুরু করেছে। এতে সমুদ্রের পানির উচ্চতাও যাচ্ছে বেড়ে। তার ওপর যুক্ত হচ্ছে বহুগুণ বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই ঘটছে এসব দুর্যোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামা শিল্পোন্নত দেশগুলো লক্ষ্য হাসিলের জন্য মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করছে কয়লা ও ডিজেল। এতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের উদ্গিরণ বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বাড়ছে। পাশাপাশি তা ক্ষতিসাধন করে চলেছে বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত ওজোন স্তরকেও।

আমাদের অনেকেরই জানা, পৃথিবীর চারদিক ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল বেশকিছু গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত। এসব গ্যাস মশারির মতো পরম যত্নে ঘিরে রাখে পৃথিবীকে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্যাসগুলো হলো অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, হিলিয়াম, ওজোন ইত্যাদি।

জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বায়ুমণ্ডলের গুরুত্ব সীমাহীন। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণ কি জানেন? পৃথিবীকে আবৃত করে থাকা বায়ুমণ্ডল দিনদিন তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে। এজন্য দায়ী হলো মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। মানুষই তাদের নানা কাজের মধ্য দিয়ে বায়ুমণ্ডলকে দিনদিন অনিরাপদ করে তুলছে। তারপরও পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য প্রাকৃতিকভাবেই কিছু রক্ষাবর্ম আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ওজোন স্তর। বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত এ ওজোন আবার দুস্তরে বিভক্ত। প্রথম স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৬ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অংশকে বলা হয় ট্রপোস্ফিয়ার-সেখানে ১০ শতাংশ ওজোন বিরাজ করে। আর দ্বিতীয় স্তর ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে শুরু করে ৫০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ দ্বিতীয় স্তরকে বলা হয় স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার। সাধারণভাবে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের অংশটাই হলো মূল ওজোন স্তর। সেখানে ৯০ শতাংশ ওজোন বিরাজ করে। দ্বিতীয় স্তরটিই ওজোন গ্যাস দিয়ে তৈরি এক ধরনের বিশেষ আচ্ছাদন, যাকে ধরা যেতে পারে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিশেষ এক ধরনের ছাকনি। এর মধ্য দিয়ে সূর্যের রশ্মি পরিশোধিত হয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। ফলে সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে নিরাপদ থাকতে পারছে প্রাণিজগৎ। তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ওজোন স্তর কোনোভাবে যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার পবিত্র দায়িত্ব আমাদেরই।

যদি ওজোন স্তর কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বাধাহীনভাবে ভূপৃষ্ঠে এসে পড়বে-তখন উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। সংগত কারণে শস্যের উৎপাদনও হ্রাস পাবে এবং মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বনাঞ্চল। এ অবস্থায় বৃক্ষরাজির ক্ষেত্রে কার্বন শোধন করার ক্ষমতাও কমে যাবে। অপরিশোধিত ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাবে বায়ুমণ্ডলে। তখন বায়ুমণ্ডল সত্যি সত্যি হয়ে উঠবে অনিরাপদ-চোখের সামনেই অসহায় হয়ে আমাদের দেখতে হবে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বেড়ে যাওয়ার দৃশ্য। আজ আমরা আসলেই সেই মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি এসে পড়েছি।

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের স্বার্থেই চাই ওজোন স্তরকে তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য প্রয়োজন মন্ট্রিল প্রটোকলের বাধ্যবাধকতাগুলো অনুসরণ করা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি যদি ঠিকমতো পালন করা হয়, তাহলে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি ওজোন স্তরকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে আগের অবস্থায়। তাই কয়লা ও ডিজেলের প্ল্যান্টগুলো পুরো বন্ধ করার পাশাপশি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী বাকি দ্রব্যগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। এর মধ্যে আছে রেফ্রিজারেশন ও এয়ারকন্ডিশনিং সেক্টরে এইচসিএফসির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার-এর উৎপাদন ও ব্যবহার পুরো বন্ধ করে দিয়ে বিকল্প উদ্ভাবনের জন্য দরকার উন্নত বিশ্বের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর যৌথভাবে কাজ করা।

কিন্তু কে শোনেন কার কথা! আমাদের দুর্ভাগ্য, পৃথিবীর তাপমাত্রা অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ঠিক করার কাজটি নিয়ে যত সময়ক্ষেপণ হবে, মতানৈক্য থাকবে, তত মোকাবিলা করতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। এ ঝুঁকি এড়ানোর পথ হলো, শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোকে এক টেবিলে বসিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে অবশ্যই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আমাদের এ পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার প্রধান একটি কারণ জীবাশ্ম গ্যাস, যাকে আমরা গ্রিনহাউজ অ্যাফেক্ট বলি। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো-কার্বন ও মিথেলসহ অন্যান্য গ্যাস গত দেড় লাখ বছরের চেয়েও বহুগুণ বেশি বেড়ে গেছে।

হ্যাঁ, আমরা মানছি, এ মহাবিপদ সত্যই কোনো একটি দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিষয়টি যেহেতু বৈশ্বিক, তাই একে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। মানবজাতিসহ প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি এখন সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একে হালকাভাবে দেখা মানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে আরও কাছে ডেকে আনা। তাই সময় খরচ না করে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে এনে কার্বনমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে ১৮৭টি দেশ প্যারিস চুক্তি করেছিল। সুখবর হলো, স্পেনের মাদ্রিদ সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পরও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টিকে ধীরে ধীরে অধিকাংশ দেশই গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তারা এখন বিকল্প উপায়ও বেছে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সুখবর।

তবে এর আগের ২৫টি কপ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি কমিয়ে আনার কথা কখনোই আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় স্থান পায়নি। এবারই গ্লাসগো সম্মেলনে প্যারিস রুল বুক বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। তাতে অবশ্যম্ভাবীভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় কার্বন নিঃসরণে স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ঘোষণায় আরও আছে, গ্রিনহাউজ গ্যাস কমিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত কারণে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ভূমিকা হালনাগাদ করার কথা। গ্লাসগো ঘোষণায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে মিথেন উদ্গিরণ বন্ধের কথা। আরও আছে বন উজাড় বন্ধের কথাও। এটি হয়তো অনেকেরই জানা, প্রাকৃতিকভাবে বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর গ্যাস শোধন করে বৃক্ষরাজি। তাই সময়ক্ষেপণ না করে বন উজাড় বন্ধ করা জরুরি।

দিন যত এগোচ্ছে, ততই পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কিছুতেই দূর হচ্ছে না মতবিরোধ। এ দৃশ্য আমরা দেখেছি সদ্যসমাপ্ত গ্লাসগো সম্মেলনেও। যেখানে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার প্রশ্নে উচ্চোকিত, সেখানে মহাশক্তিধররা নির্বিকার। চীন এখনো কয়লানির্ভর প্ল্যান্টের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটায় এ চিন। দ্বিতীয় স্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর তৃতীয় স্থানে ভারত। সবচেয়ে অবাক হওয়ার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে ব্রাজিল। সেখানে অরণ্য ধ্বংসের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে সক্রিয়। সত্যিই পৃথিবীর এখন গভীর অসুখ। এ অসুখের দ্রুত শুশ্রূষা চাই। বাসযোগ্য সুন্দর এক পৃথিবী গড়ে তোলার স্বার্থে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

আতাহার খান : সিনিয়র সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, কবি

পৃথিবীর এখন গভীর অসুখ

 আতাহার খান 
০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। কিছুতেই তা থামছে না। যদি সঠিক সীমার ভেতরে এ তাপমাত্রা বেঁধে রাখা না যায়, তাহলে আমাদের এ প্রিয় পৃথিবী আরও উষ্ণ হয়ে উঠবে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কয়লাসহ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনই এর অন্যতম প্রধান কারণ। যদি এখনই এর রশি টেনে ধরা না হয়, তাহলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ আগামী চার বছরে শীর্ষে গিয়ে পৌঁছাবে। তখন ব্যাপক রদবদল ঘটবে পৃথিবীর জলবায়ুর। মানুষের জীবনযাত্রার ধরনও বদলে যাবে। দেখা দেবে আচরণগত পরিবর্তন।

জলবায়ুগত পরিবর্তন ও এর প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) একটি হুঁশিয়ারি রিপোর্ট প্রকাশ করে ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ (আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ)। তাতে জানা যায়, আইপিসিসির তৈরি করা ওই রিপোর্টের তৃতীয় পর্বে আছে এ হুঁশিয়ারির কথা। রিপোর্টটি আগামী বছরের মার্চে প্রকাশ হওয়ার কথা। আইপিসিসির রিপোর্টটিকে ভাগ করা হয়েছে তিন পর্বে। পর্ব তিনটি হলো-জলবায়ু পরিবর্তনের বিজ্ঞান, এর প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কীভাবে কমানো যায়। আসলেই বড় রকম ঝুঁকির মুখে রয়েছে এ পৃথিবী। সময় হাতে খুব কম। তাই ভয়াবহ এ দুর্যোগ মোকাবিলার স্বার্থে আগামী দশকের মাঝামাঝি কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবকটি কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে গোটা বিশ্ব থেকে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা সম্ভব হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন, তা আসলেই কি সম্ভব? উন্নত বিশ্ব গ্রিনহাউজ নিঃসরণের সর্বনিম্ন সীমা ঠিক করতে পারেনি বলে জাতিসংঘে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলতে বাধ্য হয়েছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্য এখন লাইফসাপর্টে। জলবায়ু সম্মেলনের গ্লাসগো চুক্তিকে তিনি আপসের দলিল বলেও উল্লেখ করেছেন। এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোট কপ২৬ কোয়ালিশনের মুখপাত্র আসাদ রেহমান তো আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে উঁচু গলায় বলেছেন, এ চুক্তি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এ দুটি মন্তব্যই পরিষ্কার করে দেয়, কদিন আগে শেষ হওয়া গ্লাসগো সম্মেলন আসলে কতটা সফল হয়েছে। তাই এ চুক্তিকে অনেকটা অর্ধেক খালি গ্লাসের সঙ্গেই অনায়াসে তুলনা করা যায়। তবে ধনী দেশগুলো এ কথাকেই আশাবাদী কণ্ঠে ঘুরিয়ে বলার চেষ্টা করেছে, গ্লাসটি অর্ধেক ভরা।

জলবায়ুর মতো অতি জরুরি একটা বিষয়ে ধনী দেশগুলো মূলত ফাঁপা বুলি আওড়িয়েছে। তাদের কারণে জলবায়ুর সংকটে পড়া দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের বিষয়টি থেকে গেছে অমীমাংসিত। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থ দ্বিগুণ প্রয়োজন, শুধু এটুকুই স্বীকার করেছে ধনী দেশগুলো। গ্লাসগো সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করা এবং কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর এ অনৈক্যই আমাদের এ পৃথিবীর অসুখ বাড়িয়ে চলেছে। আমরা জানি, জীবাশ্ম জ্বালানির প্রধান দুটি পদার্থ কয়লা আর ডিজেল। এ দুটি পদার্থের ব্যবহার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। ফলে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি বেড়ে গেছে কার্বনের নির্গমন। কার্বনের এ নির্গমন মাত্রা যদি কমিয়ে আনা না যায়, তার মানে এর সর্বনিম্ন মাত্রা ঠিক করা না হয়, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে একবার করে ৩০ কোটি মানুষের বসবাসের বিশাল এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। এর মধ্যে আছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় শহর। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, কী ধরনের মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে বিশ্ববাসীকে।

দেড় শতাধিক দেশের ১১ হাজারের বেশি বিজ্ঞানী এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তারা আরও জানিয়েছেন, পরিবেশগত প্রচলিত পথ জরুরি ভিত্তিতে পালটানো প্রয়োজন। তা না হলে বিশ্বের সবখানে দেখা দেবে ভয়াবহ বিপর্যয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মাসিক বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশন-এর একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয় বিজ্ঞানীদের সতর্ক করা এ খবরটি।

এর মানে, কয়লা আর ডিজেলের সর্বাধিক ব্যবহারের কারণেই আজ মোকাবিলা করতে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগকে। এখানে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে উন্নত বিশ্বের আন্তরিকতা নিয়ে। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তাদের শুভবুদ্ধির উন্মেষ কবে ঘটবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়! যেন কিছুই হয়নি, অথবা ঘটেনি-এরকম ভাব বজায় রেখে ধনী দেশগুলো নির্ভাবনায় পার করছে সময়। এ মানসিকতা দুঃখজনক বৈ আর কিছুই নয়। অথচ বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি হিসাবে কয়লা আর ডিজেলের ব্যবহার এখন সর্বাধিক পর্যায়ে রয়েছে-এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, কয়লা ও ডিজেলের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি নির্গমন ঘটে কার্বনের। এ কার্বন শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী নয়, ওজোন স্তরকেও ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আসলেই আমাদের হাতে সময় খুব কম। যে করে হোক, কয়লা ও ডিজেল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তা না হলে বেড়েই চলবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি? বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্যই দক্ষিণ ও উত্তর মেরুর বরফ গলতে শুরু করেছে। এতে সমুদ্রের পানির উচ্চতাও যাচ্ছে বেড়ে। তার ওপর যুক্ত হচ্ছে বহুগুণ বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই ঘটছে এসব দুর্যোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামা শিল্পোন্নত দেশগুলো লক্ষ্য হাসিলের জন্য মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করছে কয়লা ও ডিজেল। এতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের উদ্গিরণ বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বাড়ছে। পাশাপাশি তা ক্ষতিসাধন করে চলেছে বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত ওজোন স্তরকেও।

আমাদের অনেকেরই জানা, পৃথিবীর চারদিক ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল বেশকিছু গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত। এসব গ্যাস মশারির মতো পরম যত্নে ঘিরে রাখে পৃথিবীকে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্যাসগুলো হলো অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, হিলিয়াম, ওজোন ইত্যাদি।

জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বায়ুমণ্ডলের গুরুত্ব সীমাহীন। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণ কি জানেন? পৃথিবীকে আবৃত করে থাকা বায়ুমণ্ডল দিনদিন তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে। এজন্য দায়ী হলো মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। মানুষই তাদের নানা কাজের মধ্য দিয়ে বায়ুমণ্ডলকে দিনদিন অনিরাপদ করে তুলছে। তারপরও পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য প্রাকৃতিকভাবেই কিছু রক্ষাবর্ম আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ওজোন স্তর। বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত এ ওজোন আবার দুস্তরে বিভক্ত। প্রথম স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৬ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অংশকে বলা হয় ট্রপোস্ফিয়ার-সেখানে ১০ শতাংশ ওজোন বিরাজ করে। আর দ্বিতীয় স্তর ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে শুরু করে ৫০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ দ্বিতীয় স্তরকে বলা হয় স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার। সাধারণভাবে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের অংশটাই হলো মূল ওজোন স্তর। সেখানে ৯০ শতাংশ ওজোন বিরাজ করে। দ্বিতীয় স্তরটিই ওজোন গ্যাস দিয়ে তৈরি এক ধরনের বিশেষ আচ্ছাদন, যাকে ধরা যেতে পারে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিশেষ এক ধরনের ছাকনি। এর মধ্য দিয়ে সূর্যের রশ্মি পরিশোধিত হয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। ফলে সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে নিরাপদ থাকতে পারছে প্রাণিজগৎ। তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ওজোন স্তর কোনোভাবে যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার পবিত্র দায়িত্ব আমাদেরই।

যদি ওজোন স্তর কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বাধাহীনভাবে ভূপৃষ্ঠে এসে পড়বে-তখন উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। সংগত কারণে শস্যের উৎপাদনও হ্রাস পাবে এবং মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বনাঞ্চল। এ অবস্থায় বৃক্ষরাজির ক্ষেত্রে কার্বন শোধন করার ক্ষমতাও কমে যাবে। অপরিশোধিত ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাবে বায়ুমণ্ডলে। তখন বায়ুমণ্ডল সত্যি সত্যি হয়ে উঠবে অনিরাপদ-চোখের সামনেই অসহায় হয়ে আমাদের দেখতে হবে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বেড়ে যাওয়ার দৃশ্য। আজ আমরা আসলেই সেই মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি এসে পড়েছি।

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের স্বার্থেই চাই ওজোন স্তরকে তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য প্রয়োজন মন্ট্রিল প্রটোকলের বাধ্যবাধকতাগুলো অনুসরণ করা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি যদি ঠিকমতো পালন করা হয়, তাহলে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি ওজোন স্তরকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে আগের অবস্থায়। তাই কয়লা ও ডিজেলের প্ল্যান্টগুলো পুরো বন্ধ করার পাশাপশি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী বাকি দ্রব্যগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। এর মধ্যে আছে রেফ্রিজারেশন ও এয়ারকন্ডিশনিং সেক্টরে এইচসিএফসির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার-এর উৎপাদন ও ব্যবহার পুরো বন্ধ করে দিয়ে বিকল্প উদ্ভাবনের জন্য দরকার উন্নত বিশ্বের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর যৌথভাবে কাজ করা।

কিন্তু কে শোনেন কার কথা! আমাদের দুর্ভাগ্য, পৃথিবীর তাপমাত্রা অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ঠিক করার কাজটি নিয়ে যত সময়ক্ষেপণ হবে, মতানৈক্য থাকবে, তত মোকাবিলা করতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। এ ঝুঁকি এড়ানোর পথ হলো, শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোকে এক টেবিলে বসিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে অবশ্যই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আমাদের এ পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার প্রধান একটি কারণ জীবাশ্ম গ্যাস, যাকে আমরা গ্রিনহাউজ অ্যাফেক্ট বলি। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো-কার্বন ও মিথেলসহ অন্যান্য গ্যাস গত দেড় লাখ বছরের চেয়েও বহুগুণ বেশি বেড়ে গেছে।

হ্যাঁ, আমরা মানছি, এ মহাবিপদ সত্যই কোনো একটি দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিষয়টি যেহেতু বৈশ্বিক, তাই একে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। মানবজাতিসহ প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি এখন সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একে হালকাভাবে দেখা মানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে আরও কাছে ডেকে আনা। তাই সময় খরচ না করে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে এনে কার্বনমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে ১৮৭টি দেশ প্যারিস চুক্তি করেছিল। সুখবর হলো, স্পেনের মাদ্রিদ সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পরও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টিকে ধীরে ধীরে অধিকাংশ দেশই গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তারা এখন বিকল্প উপায়ও বেছে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সুখবর।

তবে এর আগের ২৫টি কপ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি কমিয়ে আনার কথা কখনোই আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় স্থান পায়নি। এবারই গ্লাসগো সম্মেলনে প্যারিস রুল বুক বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। তাতে অবশ্যম্ভাবীভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় কার্বন নিঃসরণে স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ঘোষণায় আরও আছে, গ্রিনহাউজ গ্যাস কমিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত কারণে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ভূমিকা হালনাগাদ করার কথা। গ্লাসগো ঘোষণায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে মিথেন উদ্গিরণ বন্ধের কথা। আরও আছে বন উজাড় বন্ধের কথাও। এটি হয়তো অনেকেরই জানা, প্রাকৃতিকভাবে বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর গ্যাস শোধন করে বৃক্ষরাজি। তাই সময়ক্ষেপণ না করে বন উজাড় বন্ধ করা জরুরি।

দিন যত এগোচ্ছে, ততই পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কিছুতেই দূর হচ্ছে না মতবিরোধ। এ দৃশ্য আমরা দেখেছি সদ্যসমাপ্ত গ্লাসগো সম্মেলনেও। যেখানে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার প্রশ্নে উচ্চোকিত, সেখানে মহাশক্তিধররা নির্বিকার। চীন এখনো কয়লানির্ভর প্ল্যান্টের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটায় এ চিন। দ্বিতীয় স্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর তৃতীয় স্থানে ভারত। সবচেয়ে অবাক হওয়ার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে ব্রাজিল। সেখানে অরণ্য ধ্বংসের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে সক্রিয়। সত্যিই পৃথিবীর এখন গভীর অসুখ। এ অসুখের দ্রুত শুশ্রূষা চাই। বাসযোগ্য সুন্দর এক পৃথিবী গড়ে তোলার স্বার্থে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

আতাহার খান : সিনিয়র সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, কবি

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন