জাত নিমের পাতা

প্রশ্নটা সৃজনশীল পদ্ধতির উত্তর দিলেন মুখস্থবিদ্যার!

  মাহবুব কামাল ১৭ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মতামত

প্রশ্নের ‘টু দ্য পয়েন্ট’ উত্তর দেয়ার রীতিটা বলতে গেলে উঠেই গেছে দেশ থেকে। পরিবর্তে শুরু হয়েছে ‘Beat around the bush.’ অর্থাৎ প্রসঙ্গ এড়িয়ে কুযুক্তিপূর্ণ এলোমেলো উত্তর দেয়া। প্রশ্নের মাধ্যমে যা জানতে চাওয়া হয়, উত্তরে যখন তা পাওয়া যায় না, তখন ধরে নিতে হবে এর পেছনে তিন কারণের অন্তত একটি দায়ী।

এক. উত্তরদাতা সঠিক উত্তর জানেন না। দুই. জানেন, তবে সেই উত্তর তার স্বার্থের পরিপন্থী। তিন. এমন কিছু কথা তার মাথায় জমে আছে যে, সেগুলো বলার জন্য তিনি উদগ্রীব থাকেন এবং প্রশ্নটিকে অসিলা হিসেবে ব্যবহার করে সেসব কথা শুনিয়ে দেন। ‘Beat around the bush’ প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টেলিভিশনের টকশোগুলোয়। এসব শো’তে মহারথীদের আসর বসে, তাদের কাউকে কাউকে শুধু ‘রথী’ বললে তারা মাইন্ডও করেন; কিন্তু তারা যেটাকে বলে ‘লাইনমতো চলা’, সেভাবে কথা বলেন না অথবা বলতে পারেন না। লাইনচ্যুত হওয়াই তাদের ধর্ম, তাতে ট্রেন কোন খাদে গিয়ে পড়ে পড়ুক। তেমন একটি লাইনচ্যুত ট্রেনের কথাই হবে এখন।

২৫ বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন উপলক্ষে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে এক মহারথীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- রবীন্দ্রনাথ এখন কতটা প্রাসঙ্গিক? খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন। নানা কারণে। এ দেশের তথাকথিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী’রা রবীন্দ্রনাথকে নাকচ করে নজরুলকে সর্বজনীন করে তোলার প্রয়াসে লিপ্ত রয়েছেন, যদিও নজরুলকে নতুন করে সর্বজনীন বানানোর কিছু নেই, তিনি তা হয়েই আছেন। এই জাতীয়তাবাদীদের পূর্বসূরিরা সেই যে পাকিস্তানি আমলে একটা বালখিল বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল- নজরুল বড়, না রবীন্দ্রনাথ- সেটাকে পরবর্তী সময়ে আরও ঝগড়ামুখর করেছে। এরা এমনকি রবীন্দ্রনাথরচিত আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটি পর্যন্ত বদলাতে চায় এবং এই জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে যারা স্বভাবে উগ্র, তারা তাকে ‘হিন্দুর বাচ্চা’ বলেও গালি দিয়ে থাকে। দিব্যচোখে আমরা দেখে চলেছি, হিজাব-নেকাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই উগ্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটি আরও একটি বড় কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এ গুরুত্ব নিহিত রয়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের কার্যকলাপে। তারা রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ কিংবা ‘সঞ্চয়িতা’ পড়া দূরের কথা, ছুঁয়েও দেখে না বোধকরি; এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাণী কিংবা সুর তাদের কানে সয় না। আসলে তার উপায়ও নেই। সে জন্মেছে ব্যান্ড মিউজিকের কান নিয়ে, স্মার্টফোনে স্ট্যাটাস কম্পোজ করার হাত সহযোগে।

আবার দেখুন, কট্টর বামপন্থীরা কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে অনেক আগেই নাকচ করে বসে আছে, যদিও ধর্ম না মানা তাদের অনেকেই হজ করার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথকেও ফিরে পেয়েছে। খোদ পশ্চিমবঙ্গেই, যেখানে রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও বিকাশ রহস্যের সূত্রপাত, সেখানকার বামপন্থীরা একসময় সিদ্ধান্ত টেনেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন বুর্জোয়া কবি, সাধারণ মানুষের কবি নন; কেউ কেউ অবশ্য বুর্জোয়ার পর ‘মানবতাবাদী’ শব্দটি যুক্ত করে বলতেন ‘বুর্জোয়া মানবতাবাদী’ কবি। এই ক্ল্যাসিকাল বিপ্লবীরা একটা সমীকরণও উদ্ভাবন করেছিলেন এমন : রিয়াল হিউম্যানিজম ইজ ইকুয়াল টু বুর্জোয়া হিউম্যানিজম মাইনাস প্রাইভেট প্রোপারটি’স মেন্টাল কমপ্লেক্স! তারা বলতে চেয়েছেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তিজনিত মানসিক উদ্বেগ রয়েছে যার মধ্যে, তিনি কখনও প্রকৃত মানবতাবাদী হতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ব্যক্তিগত সম্পত্তির মায়া বা মোহ ত্যাগ করতে পারেননি, তাই তিনি মানবতাবাদী নন, তার সাহিত্যে যা আছে তা ধনীর দান-খয়রাতের মানবতা! এসব আল্ট্রা-বিপ্লবীরা এখন অনেক শুধরেছেন; তবে ওই যে কথা, কোনো মতবাদ বা আদর্শ কখনও একেবারেই নিঃশেষ হয় না, ধ্বংসাবশেষ হলেও থেকে যায়।

এতসব পরিস্থিতির মধ্যে বাস করে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটির মীমাংসা হওয়া জরুরি। কিন্তু প্রশ্নটা যাকে করা হয়েছিল, সমাজে একজন রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার নামডাক থাকলেও প্রশ্নের ‘টু দ্য পয়েন্ট’ উত্তর না দিয়ে পাকিস্তানি জমানায় তিনি রবীন্দ্রবিরোধী কত বাঘ-ভাল্লুক মেরেছিলেন, তার সবিস্তার বর্ণনা দিয়ে গেছেন। সত্য কথা, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকীতে এবং তারপর দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার বাঙালিরা তাদের মননে রবীন্দ্রনাথকে চিরস্থায়ী আসনে বসানোর লক্ষ্যে নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আলোচ্য ব্র্যান্ড-ভক্ত সেই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, চাই কী নেতৃত্বও দিয়েছিলেন বলা যায়। সেসব কথা বলার অনেক উপায় আছে বটে। আত্মজীবনীতে থাকতে পারে তা, অথবা ‘পাকিস্তানে রবীন্দ্রচর্চা ও আমি’ নামে একটি আলাদা গ্রন্থও রচনা করা যায়। কিন্তু না, বর্তমানকালে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা কতটা- এ প্রশ্নের জবাবেই তাকে বলতে হয়েছে সেসব কথা! আর যদি কখনও সুযোগ না পান! এতবড় গৌরবের কথা জাতিকে না জানালে চলে?

২.

অবশ্য প্রশ্নটির উত্তর দিতে হলে রবীন্দ্রনাথকে বুঝে ওঠা চাই। পাঠক খেয়াল করুন, বলেছি বুঝে ওঠা চাই, ‘সম্পূর্ণ বুঝে ওঠা চাই’ বলিনি। কারণ রবীন্দ্রনাথকে পূর্ণ অবয়বে চিনতে পারা অতো সহজ নয়। হ্যাঁ, কেউ একজন যত বড় রবীন্দ্র-গবেষকই হোন না কেন, তাকে বলা চলে- রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনার জ্ঞান ভাসাভাসা। এই লেখকের এক বন্ধু আরও ভালো বলেছিল। চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনি কী জানেন? সে বলেছিল- কিছু জানি না। বোর্ডের এক সদস্য বিস্মিত হয়ে বললেন- বাংলায় পাস করে আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু জানেন না! সে বলেছে- আমার এত স্পর্ধা নেই যে, বলি রবীন্দ্রনাথকে আমি জানি, বুঝি! এই বন্ধুই একবার আরেক বন্ধুকে ‘শেষের কবিতা’ পড়তে দেখা অবস্থায় বইটি কেড়ে নিয়ে বলেছিল- রবীন্দ্রনাথের শেষ নাই, রবীন্দ্রচর্চা বৃথা তাই। নিজের কথা যদি বলি, আজও বুঝে উঠতে পারিনি ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ সামন্ততন্ত্রের ধস, নাকি অন্যকিছু বোঝাতে চেয়েছেন। এসব কারণেই বুঝি রবীন্দ্র-সমগ্রের চেয়ে রবীন্দ্র-সমালোচনার পরিমাণ অনেক অনেক বেশি।

অবশ্য সবাইকে এই পৃথিবীর সবকিছুই বুঝতে হবে, পৃথিবীর স্বয়ং স্রষ্টাও মানুষকে তেমন নির্দেশ দেননি। তবে সংবাদপত্রের সিনেমাক্রিটিক যদি সত্যজিৎকে সামান্যও না বোঝে, সেটা যেমন ক্রাইমের পর্যায়ে পড়ে, তেমন বাঙালি মাত্রই যদি রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা হলেও না চিনে থাকে, সেটাও বড় ধরনের অপরাধ। সেই সামান্য জ্ঞানের ওপর ভর করে উপরের প্রশ্নটির সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়ার গুরুভার তুলে নিতে হল এই লেখককে। সংক্ষিপ্ত বললাম, কারণ রবীন্দ্রনাথের ওপর হাজারটা পিএইচডির থিসিস পেপার তৈরি করা সম্ভব, ঈশ্বর অসংখ্য মানস দিয়ে গড়েছিলেন এক রবীন্দ্রনাথ। মনস্কতার কত রূপ যে ছিল তার- সমাজমনস্কতা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রেম ইত্যাদি নানা মনস্কতায় ঠাসা ছিল তার মাথা। অতিবিপ্লবীরা তাকে যে বুর্জোয়া অভিধা দিয়েছে, তাদেরকেও বলা যায় রবীন্দ্রনাথের ছিল শ্রেণীমনস্কতাও। সে কথায় পরে আসছি। আরেকটু বলে নিই- বুদ্ধিজীবীরা যেমন রেনেসাঁ, ফরাসি বিপ্লব, মধ্যযুগ, ধ্র“পদী, নয়া ধ্র“পদী ইত্যাদি শব্দ ছাড়া কথা বলতে বা লিখতে পারেন না, আমরা তেমন কঠিন কঠিন কথা বলব না। এ কলাম যেহেতু কোনো গবেষণাপত্র নয়, নিছকই সাততাড়াতাড়ির সাহিত্য, তাই খুব সাধারণ আলোচনায় ছোট করে একালে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা বোঝার চেষ্টা করব আমরা।

৩.

ধরুন, চাকরি জীবনের শেষদিনে আপনার জন্য একটি বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্য যে কাউকে ধার করলে কি বক্তার আলোচনা এতটা বেদনাঘন হবে? শুনুন বক্তা বলছেন- এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে সবচেয়ে পুরাতন কথা, সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন, যেতে নাহি দিব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়! এই উদ্ধৃতি কি শুধুই সমকালের জন্য মর্মস্পর্শী, নাকি যতদিন থাকবে মৃত্যু, ততোদিন? মানুষকে চিরজীবী করার পদ্ধতি যদি কখনও উদ্ভাবন করা সম্ভব হয় (আল্লাহ মাফ করুন), সেটা আলাদা কথা। আবার ধরুন, এক যুবক একটি কালো মেয়ের প্রেমে পড়েছে। সে কোথায় পাবে বালিকার মর্মভেদী এমন প্রেমের সংলাপ- কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ। আপনি রসিকতাটা পর্যন্ত করছেন রবীন্দ্রনাথেরই দ্বারস্থ হয়ে, বলছেন- যা-কিছু হারায়, গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর। কিংবা বর্তমানকালেই ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির দায় এমডির ঘাড় থেকে সরিয়ে যখন শাখা ম্যানেজারের ওপর বর্তানো হয়, তখন এর চেয়ে আর কত বড় অসহায়ত্ব দেখাতে পারে সে- তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে! মানসিক সংকটের বৃষ্টি হতে থাকলে কে না রবীন্দ্রনাথের ছাতার নিচে আশ্রয় নেয়! আবার দেখুন, এক তরুণ মোবাইলে তার বান্ধবীকে বলছে- আই ফিল লোন, বিলিভ মি আই কান্ট লিভ উইদাউট ইউ। এটা দিয়ে কি একাকীত্বটাকে ঠিকমতো বোঝানো গেল? সে যদি বলত- জানো একেলা কাহারে বলে? যবে ভরা মন নিয়ে বসে আছি, দিতে চাই নিতে কেউ নাই- এর চেয়ে একাকীত্ব, এর থেকে নিঃসঙ্গতা আর কী হতে পারে!

যেসব মার্ক্সবাদী রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা বাজারে চালানো যায় না ধরনের কথা বলে তাকে বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি বলতে চান, তারা আসলে তার কাছ থেকে ফলিত মার্ক্সবাদ (অঢ়ঢ়ষরবফ গধৎীরংস) আশা করেন। রবীন্দ্রনাথ কেন তার সব সম্পদ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে গান্ধীর মতো নেংটি-চটি পরেননি, জীবিত থাকলে তাকে জিজ্ঞেস করা যেত। কিন্তু যখন পড়ি- এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভূরি ভূরি/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি- তখন ভূমিহীন শ্রেণীটির জন্য তার দরদ ও ভূস্বামীদের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্ববিরোধিতার কথা যদি বলি, সেটা নেই কার? এ বড় দীর্ঘ আলোচনা, স্পেস কমে আসছে।

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটির সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রেম যদি শাশ্বত হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথও শাশ্বত। লাইলী-মজনু কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের সময় মনে হয়েছিল প্রেমের উপাখ্যানের সেটাই বুঝি শেষ। কিন্তু না, এটা টিকে থাকবে ততোদিন, যতোদিন থাকবে মানুষ ও তার প্রবৃত্তি। প্রেম মানুষের এমন এক প্রবৃত্তি, এমনকি ধর্মীয় অনুশাসনও আনতে পারেনি তাকে বশে। রবীন্দ্রনাথ তার বিশেষত সঙ্গীতে প্রেম-ভালোবাসাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছেন। প্রেমের দশ রাগের প্রতিটিকেই তিনি রাঙিয়ে তুলেছেন নানা বর্ণে ও চতুর্মাত্রিকতায়। বস্তুত প্রেমানুভূতির এমন কোনো অন্ধি-সন্ধি নেই, যেখানে তিনি ভ্রমণ করেননি। অতঃপর রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা কখনও শেষ হওয়ার নয়।

আমাদের জাতীয় সঙ্গীতসহ বাঙালির সামগ্রিক জীবনাচরণ নিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল অবিভক্ত উপমহাদেশে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় কোনো কবিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আমাদের জাতীয় সঙ্গীত রচনার। এই সঙ্গীতটি ছিল বাংলার প্রতি বাঙালির ভালোবাসার নির্যাস। বাণী ও সুরে বাংলার প্রতি ভালোবাসার এমন অকৃত্রিম প্রকাশ আর কোনো সঙ্গীতে পাওয়া যায় না। আর রবীন্দ্রনাথের ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে যারা জাতীয় সঙ্গীত বদলানোর কথা বলেন, তাদের জন্য দুটো সত্য ঘটনা উল্লেখ করতে হবে। প্রথমটি এমন- এদেশের এক নামকরা মুসলমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি কেন পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা না করে ভারতের সঙ্গে করছেন? তিনি বলেছিলেন- ধরুন আপনি বাজারে গিয়ে দেখলেন দু’জন আম-বিক্রেতা ডালি সাজিয়ে বসেছে। এদের একজন মুসলমান, আরেকজন হিন্দু এবং দেখলেন মুসলমানের আমগুলোয় পচন ধরেছে, দামও বেশি আর হিন্দুরগুলো ভালো, দাম কম। আপনি কার আম কিনবেন? দ্বিতীয় ঘটনাটি ইউরোপের। যীশুর ওপর এক রচনা প্রতিযোগিতায় এক ইহুদি প্রথম পুরস্কার জিতে গেলেন। পুরস্কারপ্রদান অনুষ্ঠানে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- ইহুদি হয়ে তার তো প্রফেট মুসা সম্পর্কেই জ্ঞান বেশি থাকার কথা, যীশুর ওপর এত চমৎকার লিখলেন কীভাবে তিনি। সেই লোক উত্তর দিয়েছিল- বিজনেস ইজ বিজনেস। পুরস্কারের আশায় আমি যীশু নিয়ে রীতিমতো গবেষণায় নেমেছিলাম।

আসলে ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্মকে যাচ্ছেতাইভাবে ছোট করে ফেলেছে। এরা হজে যাচ্ছেন বিধর্মীদের বানানো প্লেনে চড়ে, প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অবদানগুলো ছাড়া তাদের ইহজাগতিক জীবন বলেই কিছু থাকে না, অথচ কথায় কথায় বলবেন খ্রিস্টানদের দেশ কিংবা ইহুদি-নাছারার দল! এরা অসুখ-বিসুখে শুধুই দোয়া-কালামে আটকে না থেকে ছুটে যান প্রসিদ্ধ ডাক্তারের কাছে, অথচ কেউ মেডিকেল কলেজে মরণোত্তর দেহদান করলে তাকে অধার্মিক আখ্যা দেন। ওই লাশটি কাটাছেঁড়া করা ছাড়া যে ডাক্তার হওয়া যায় না, এই চিন্তা মাথায় থাকে না। ব্যবহারিক জীবনকে যে ধর্মের এমন অপব্যাখ্যা দ্বারা সামাল দেয়া যায় না, তাদের বোঝাবে কে? সব মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি এবং ধর্ম নির্ধারণে মানুষের কোনো হাত নেই, জন্মসূত্রেই নির্ধারিত হয় তার ধর্ম এবং বাবা-মা’র ধর্মের লিগাসি খুব সহজে অতিক্রম করা যায় না- এই বোধটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে উগ্রপন্থী মুসলমানদের জন্য।

সমাজটাকে বেশি পর্যবেক্ষণ করতে নেই, তাতে মন খারাপ হয়। যেমন, দেখতে পাচ্ছি প্রাসঙ্গিকতার দাবি উপেক্ষা করে তরুণ প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। আমরা যখন নাইন-টেনে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়েছি। এখনকার তরুণদেরও নিঃশ্বাস বন্ধ থাকে, তবে সেটা স্ট্যাটাসে কতটা লাইক পড়বে তা দেখার প্রত্যাশায়। তরুণরা বড়জোর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছে, তবে সেটা বাণীর কারণে নয়, তাদের উপযোগী করে যখন সুরটা বদলানো হচ্ছে, তখন। কলকাতার ‘বেডরুম’ ছবিতে ‘মায়াবন বিহারিনী হরিণী’ গানটিকে যেমন জেনারেশনারাইজ্ড করা হয়েছে।

তবে কি রবীন্দ্রনাথ এখন কেবল বয়স্কদের কবি এবং এই বয়স্করা চলে গেলে তিনি আর থাকবেন না? বয়স্করা রবীন্দ্র-স্বাদ পেয়েছিল বলেই সেই স্বাদ জিহ্বায় লেগে আছে। যারা স্বাদই পায়নি, বয়সকালে তারা কীভাবে তুলবে ঢেকুর? ‘রক্তকরবী’ নাটকটি দেখতে গিয়ে গুনে দেখেছি দর্শক-শ্রোতার প্রায় ৯০ শতাংশই বয়স্ক-বয়স্কা। আবার মলিয়েরের কোনো নাটকে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। রম্য, হাসি-ঠাট্টাই তাদের পছন্দ। যদি তা-ও হয়, তাহলে বলব সৈয়দ মুজতবা আলী নন, রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বিনোদন-লেখক। এই বিনোদনের সন্ধান জানে না তারা, জানলেও বিনোদন নেয়ারও একটা যোগ্যতা লাগে, সেটা তাদের আছে কিনা সন্দেহ। ‘হৈমন্তী’ গল্পে জ্যৈষ্ঠের খররৌদ্রই তো তার অশ্রুশূন্য রোদন- এই বাক্যের হৃদয় নিংড়ানো করুণ রস যে নিতে পারবে না, সে তো বলবেই- খরায় আবার কীসের আনন্দ!

সত্য কথা, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের স্বাধীনতা তো নয়ই, ভারতের স্বাধীনতাও দেখে যেতে পারেননি। স্বাধীন বাঙালির আচরণ কেমন হয়, তাই দেখা সম্ভব হয়নি তার। পৃথিবীবাসীর মনন ভাংচুর করেছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সেটাও দেখেননি তিনি। দেখেননি যন্ত্রসভ্যতার অভাবনীয় উৎকর্ষের ফলে কতটা থিতিয়েছে মানুষের আবেগ। তাই হয়তো তার সাহিত্যকর্ম ও দর্শন কিছুটা খাটো হয়ে আছে। কিন্তু তাতে কিছু যায়-আসে না। উদারনৈতিকতাই বুঝি তার তীব্রতম আকর্ষণ। পৃথিবীতে যতদিন সংকীর্ণতা থাকবে, থাকবে রুদ্ধ প্রাণ, ঘাটতি থাকবে ভালোবাসার, মেলে ধরতে কুণ্ঠিত থাকবে মানুষ তার প্রশস্ত হƒদয়- ততোদিন কে তাকে আলগা করে? বাঙালির যে মানস তিনি গঠন করে দিয়ে গেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও অকল্পনীয় যন্ত্রসভ্যতা তার মৌলিক কাঠামোটিকে ধ্বংস করতে পারেনি। তাকে নাকচ করতে চাইলে পরক্ষণেই তারই সঙ্গীত এসে ভর করবে কণ্ঠে-

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে

দেখতে আমি পাইনি।

পুনশ্চ : পাঠক, বলুন তো রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কবিতা কোন্টি? আপনাদের মাইন্ড রিড করছি খুব- কেউ ভাবছেন ‘পৃথিবী’ বলব নাকি? কেউ আবার হয়তো ভাবছেন ‘আফ্রিকা’ই তার শ্রেষ্ঠ কবিতা। না, এসবের কোনোটাই না। আমার মতে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতাটাই তার শ্রেষ্ঠ কবিতা। পাঁচ বছর বয়সে তিনি লিখেছিলেন- জল পড়ে, পাতা নড়ে। দেখুন কী এক আশ্চর্য বিজ্ঞানমনস্কতা ফুটে উঠেছে এই কবিতায়। কার্যকারণ সূত্র (পধঁংব ধহফ বভভবপঃ) প্রয়োগ করে তিনি বলছেন- পাতা এমনি এমনি নড়ে না, জল পড়ে বলেই পাতা নড়ে!

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter