করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন বাস্তবে কি ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’
jugantor
করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন বাস্তবে কি ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’

  ড. রাশিদুল হক  

০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টটি কী? ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস-২ (SARS-CoV-2) ভাইরাসটির জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি সময়ের ব্যবধানে জিন পরিব্যাপ্তি বা মিউটেশনের মাধ্যমে অসংখ্যবার রূপ বদলিয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের যে কয়েকটি ভ্যারিয়েন্ট বা প্রকরণ বেশি আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার মধ্যে যুক্তরাজ্যের বি.১.১.৭ বা আলফা প্রকরণ, দক্ষিণ আফ্রিকার বি ১.৩৫১ বা বেটা প্রকরণ, ব্রাজিলের পি .১ বা গামা প্রকরণ এবং ভারতে প্রথম শনাক্ত দুটি প্রকরণ বি.১.৬১৭.১ বা কাপ্পা ও বি.১.৬১৭.২ বা ডেল্টা ছিল উল্লেখযোগ্য (আর হক : যুগান্তর, এপ্রিল ৫, ২০২১)।

এ প্রকরণগুলোর মধ্যে কিছু কিছু প্রকরণের অধিক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা, অধিকতর গুরুতর রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা এবং টিকার কার্যকারিতা হ্রাস করার ক্ষমতা থাকার কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। সেই কারণে উপরোল্লিখিত সব বৈশিষ্ট্যসংবলিত ডেল্টা প্রকরণকে সব থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রকরণ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।

সম্প্রতি বতসোয়ানা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত করোনাভাইরাসের আরও একটি নতুন প্রকরণ বিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্য কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে; কারণ ভাইরাসের এ জাতটির আরএনএ জিনোমে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চসংখ্যক পরিব্যাপ্তি ঘটেছে, যার কারণে ভাইরাসটিকে আরও সংক্রমণযোগ্য করে তুলেছে এবং বিদ্যমান ভ্যাকসিনগুলোর জন্য কম সংবেদনশীল করার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

ভাইরাসের এ প্রকরণটির প্যাঙ্গো বংশনাম বি.১.১.৫২৯। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে একটি উদ্বেগজনক প্রকরণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং গ্রিক বর্ণ ‘ওমিক্রন’ অনুযায়ী এটির নামকরণ করেছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ এখন পর্যন্ত ২৪টি দেশে ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ওমিক্রন শনাক্ত হওয়ার খবর এখনো জানা যায়নি, তবে এটি কেবল সময়ের ব্যাপার।

স্পাইক প্রোটিনের গুরুত্ব : সার্স-কোভি-২ ভাইরাস তার ‘আরএনএ জিনোম (RNA genome)’-এর তথ্য (code) অনুযায়ী, সর্বসাকুল্যে ৩০-৩২টি প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম; যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি অ্যান্টিজেন প্রোটিন হচ্ছে স্পাইক (Spike)। করোনা সংক্রমণের জন্য মানবকোষের আবরণীপৃষ্ঠে (cell membrane) অবস্থিত ‘অ্যাঞ্জিওটেনসিন-রূপান্তরিত এনজাইম-২ (এসিই-২ বা ACE-2) রিসেপ্টর প্রোটিনের সঙ্গে স্পাইক প্রোটিনটির সংযুক্ত হওয়ার পরই ভাইরাসগুলো মানবকোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তাদের অসংখ্য প্রতিলিপি তৈরি করে, যা আমাদের ফুসফুসসহ দেহের অন্যান্য অঙ্গগুলোকে অকার্যকর করে দেয়।

এসিই-২’র সঙ্গে এ বন্ধন বাধ্যবাধকতাপূর্ণ বলেই আমাদের দেহে যেসব অঙ্গে বা কোষগুলোতে এসিই-২ প্রোটিন বিদ্যমান নয়, সেসব কোষগুলোর ভেতর কোরোনাভাইরাস প্রবেশ করার কোনো সুযোগ থাকে না। সংক্রমণশীল স্পাইক প্রোটিনের যে অংশটুকু সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো-‘রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন’ (RBD : আরবিডি); অর্থাৎ পুরো স্পাইক প্রোটিনের পরিবর্তে কেবল ‘আরবিডি’ এসিই-২ রিসেপ্টর প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পুরো ভাইরাসকে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়। রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন ২০০টি অ্যামিনো অ্যাসিড নিয়ে গঠিত।

ওমিক্রন কেন এত উদ্বেগপূর্ণ : অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করছেন, ওমিক্রনের অস্বাভাবিক পরিব্যাপ্তি বা মিউটেশনের কারণে করোনার অন্যান্য প্রকরণের তুলনায় ওমিক্রন ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে, যার ভয়াবহতা অনেকে অ্যাপোক্যালিপ্স বা মহাপ্রলয়ের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। ওমিক্রন প্রকরণটির ‘আরএনএ’ জিনোমে পঞ্চাশটিরও অধিক বংশানুগত পরিব্যাপ্তি ঘটেছে, যার মধ্যে কয়েকটি বেশ উদ্বেগপূর্ণ।

তাছাড়া অনেক পরিব্যাপ্তি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ডেল্টাসহ অন্যান্য প্রকরণগুলোর সঙ্গেও সাদৃশ্য নেই। এগুলোর মধ্যে বত্রিশটি পরিব্যাপ্তি স্বয়ং ‘স্পাইক’ প্রোটিনের মধ্যেই ঘটেছে [Callaway E, Nature, Vol 600 Dec 2 2021); যে প্রোটিনটি এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত করোনাভাইরাস রোগের বিভিন্ন টিকার মূল লক্ষ্যবস্তু। তুলনামূলকভাবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের স্পাইক প্রোটিনে পরিব্যাপ্তির সংখ্যা হলো ১৮টি। এ ছাড়া স্পাইক প্রোটিনের যে অংশটুকু অর্থাৎ ‘RBD’ মানবকোষের অভ্যন্তরে করোনা প্রবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেই অঞ্চলটিতে ওমিক্রনের ১৫টি পরিব্যাপ্তির উপস্থিতি আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অতিরিক্তভাবে প্রকরণটির ‘ফুরিন ক্লিভেজ সাইটে (Furin Cleavage site) তিনটি পরিব্যাপ্তি থাকার কারণে করোনার সংক্রমকতা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। এরূপ পরিব্যাপ্তির উপস্থিতির কারণে সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের ওমিক্রন প্রকরণটির সংবহনযোগ্যতা, অনাক্রম্যতন্ত্র (immune system)কে এড়ানোর ক্ষমতা এবং টিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি কিনা, সে ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী এক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রকরণটিকে আগ্রহজনক প্রকারণের পরিবর্তে দ্রুত উদ্বেগজনক প্রকরণ হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)।

ডেল্টা বনাম ওমিক্রন : স্পাইক প্রোটিনে করোনাভাইরাসের ডেল্টা প্রকরণে পরিব্যাপ্তির সংখ্যা হলো ১৮টি। সে তুলনায় ওমিক্রন স্পাইক প্রোটিনে ৩২টি পরিব্যাপ্তি শনাক্ত হয়েছে (ইতালিয়ান এক বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন, সেখানে ৪৩টি পরিব্যাপ্তি রয়েছে)। করোনাভাইরাসের মতো সংক্রামক একটি ভাইরাস, যা বিশ্বব্যাপী ইতোমধ্যে বায়ান্ন লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে; সেখানে যদি আবার কোনো নতুন প্রকরণ ডেল্টার চেয়েও বেশি সংক্রমণযোগ্য হয়, তাহলে তা মহামারি থেকে পুনরুদ্ধারের পথ জটিল করে তুলবে।

এরই মধ্যে আমরা ডেল্টা প্রকরণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছি। এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের খতিয়ানে শীর্ষে ডেল্টা (আর হক: যুগান্তর, আগস্ট ২৩, ২০২১)। প্রায় ৯০ শতাংশ কোভিড-১৯ রোগী এ ডেল্টা প্রকরণ দ্বারাই আক্রান্ত। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন, ‘ওমিক্রন’ কি ডেল্টার ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে যাবে এবং এ ওমিক্রন আতঙ্ক ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ওমিক্রনের ভয়াবহতা নিয়ে এখনই কিছু বলার সময় আসেনি; কারণ এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণার ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।

ওমিক্রনের জটিল সব পরিব্যাপ্তি স্পাইক প্রোটিনের ‘রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেন’ এবং ‘এন-টার্মিনাল ডোমেনে (N-terminal domain)’ রয়েছে, যা এসিই-২-বন্ধন এবং অ্যান্টিবডিকে পাশ কাটাতে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস স্পাইক প্রোটিনে ‘ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট (Furin cleavage site)’ নামে একটি অঞ্চল বিদ্যমান, যা মানবকোষের ‘ফিউরিন’ এনজাইম দ্বারা স্পাইক প্রোটিনকে অনুকূল আকারে দুটি সেগমেন্টে (S1 I S2) বিভাজন করতে সাহায্য করে। এ বিচ্ছিন্নতার ফলেই সংক্রমণের হার বহুগুণ বেড়ে যায়।

ওমিক্রনের ‘S1-S2’ ফিউরিন ক্লিভেজ সাইটে ঘটে যাওয়া তিনটি পরিব্যাপ্তি (H655Y, N679K, P681H) বর্ধিত সংক্রমণের সঙ্গে সম্পৃক্ত (Yu et al, bioRxiv, August 4, 2021)। ‘E484A’ পরিব্যাপ্তি থাকার ফলে ভাইরাসটি খুব সহজেই দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অতিক্রম করতে পারে (Wise J, BMJ 372, 2021)। অধিকন্তু ওমিক্রনে ‘E484K’ পরিব্যপ্তি (যা ডেল্টাতে দেখা যায় না) মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে বলে এ ভ্যারিয়েন্টটি এত উদ্বেগজনক।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, Q498R এবং N501Y মিউটেশনের সংমিশ্রণ (যা ওমিক্রনে রয়েছে) উল্লেখযোগ্যভাবে এসিই-২ এর সঙ্গে বন্ধনকে বহুলাংশে বাড়িয়ে তোলে (Zahradnik et al., nature microbiology, 6, 2021)।

ওমিক্রন প্রতিরোধ এবং টিকার কার্যকারিতা : বর্তমানে ওমিক্রন প্রতিরোধে বিশেষ কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন নেই। যেসব করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা বর্তমানে প্রচলিত, সেগুলো উহান সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের (Wuhan-Hu-1) স্পাইক প্রোটিনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফাইজার-বায়োএনটেক ও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং মডার্নার টিকা হচ্ছে ‘এমআরএনএ (সজঘঅ)’ভিত্তিক।

ফাইজার ও মডার্না উভয়ই জানিয়েছে, তারা ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে টিকা কার্যকর করার কাজ করছে এবং ওমিক্রন প্রতিরোধে বিশেষায়িত একটি টিকা আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে তৈরি হবে; যদিও তাদের বর্তমান টিকা ওমিক্রন নিধনে অনেকটা নির্ভরযোগ্য। যারা ডেল্টা প্রকরণ প্রতিরোধে দুই ডোজের অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার/মডার্নার টিকা নিয়েছেন, তারা আবারও ওমিক্রনে সংক্রামিত হতে পারেন। তবে সেটি হয়তো হবে ‘ব্যুহভেদী সংক্রমণ (breakthrough infection)’।

দুই ডোজের টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেহে ব্যূহভেদী সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক সংক্রমণের তুলনায় লক্ষণ-উপসর্গগুলো মৃদু প্রকৃতির হয়। এ ছাড়া ভাইরাস নিরোধক মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি আলফা, বেটা, গামা এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে নিষ্ক্রিয় ও প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রিজেনেরন কোম্পানি বলেছে, তাদের কোভিড মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কম কার্যকর হতে পারে; ফলে ওমিক্রন প্রকরণটি আক্রমণাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তারা উপযুক্ত মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি নির্মাণের ইঙ্গিত দিয়েছে।

অপরদিকে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি মার্কের ভাইরাস-নিরোধক পিল ‘মলনুপিরাভির’ এবং ফাইজারের ‘প্যাক্সলোভিড’ ওমিক্রনের সংক্রমণ হ্রাস করতে অত্যন্ত কার্যকর ওষুধ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।

মলনুপিরাভির/প্যাক্সলোভিড দেহের অ্যান্টিবডিকে নিষ্ক্রিয় করার পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে ভাইরাসের আরএনএ প্রতিলিপিকে অকার্যকর করার মাধ্যমে তার প্রজননকে বাধা দেয়। বেক্সিমকোসহ কয়েকটি কোম্পানির মাধ্যমে মলনুপিরাভির বাংলাদেশেও বাজারজাত হয়েছে।

সংক্ষেপে, বতসোয়ানা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া নতুন ওমিক্রন রূপের SARS-CoV-2 ভাইরাসটি নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করার পর থেকে সবেমাত্র এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছে। প্রকরণটি ২৪টিরও বেশি দেশে নিশ্চিত হয়েছে এবং এটির সংক্রমণের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তাছাড়া করোনার ডেল্টা ও বেটা প্রকরণের তুলনায় ওমিক্রনের পুনরায় সংক্রমিত করার ক্ষমতা তিনগুণ বেশি।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা ওমিক্রনের রয়েছে (Callaway and Ledford, Dec 2, 2021)। ওমিক্রনের সংক্রমণযোগ্যতা ও তীব্রতা, সেই সঙ্গে ভ্যাকসিন এড়াতে এবং পুনরায় সংক্রমণ ঘটাতে এর সম্ভাব্যতা সম্পর্কে ধারণা পেতে বিজ্ঞানীদের আরও গবেষণার প্রয়োজন।

নিউইয়র্ক সিটির রকফেলার ইউনিভার্সিটির একজন ভাইরোলজিস্ট পল বিনিয়াস (Paul Bieniasy)-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক গবেষণাগারে স্পাইক প্রোটিনের একটি ‘পরিবর্তিত সংস্করণ’ তৈরি করেছিলেন, যার মিউটেশনগুলো ওমিক্রনের সঙ্গে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ। তাদের পরীক্ষায় সেই ‘পলিমিউট্যান্ট স্পাইক’ দুই ডোজে টিকা পাওয়ার বেশিরভাগ মানুষের দেহে তৈরি ‘পলিক্লোনাল অ্যান্টিবডি’কে নিষ্ক্রিয় করার প্রমাণ মিলেছে (Schmidt F et al, Nature 20 Sept, 2021)।

কাজেই ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনে প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া মিউটেশনগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারেই দেখা হচ্ছে। ওমিক্রনে সংক্রমণ এবং রোগের তীব্রতা বেড়ে বিশেষ করে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কম টিকা দেওয়া দেশগুলোতে ওমিক্রন প্রকরণটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতএব এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সংক্রমণে ওমিক্রন ডেল্টাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কিনা, সে বিষয়ে এখনো কিছু বলার সময় আসেনি; যদিও তা নিয়ে অনেকের মনে আশঙ্কা রয়েছে।

ড. রাশিদুল হক : সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী; সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র; অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন বাস্তবে কি ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’

 ড. রাশিদুল হক 
০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টটি কী? ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস-২ (SARS-CoV-2) ভাইরাসটির জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি সময়ের ব্যবধানে জিন পরিব্যাপ্তি বা মিউটেশনের মাধ্যমে অসংখ্যবার রূপ বদলিয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের যে কয়েকটি ভ্যারিয়েন্ট বা প্রকরণ বেশি আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার মধ্যে যুক্তরাজ্যের বি.১.১.৭ বা আলফা প্রকরণ, দক্ষিণ আফ্রিকার বি ১.৩৫১ বা বেটা প্রকরণ, ব্রাজিলের পি .১ বা গামা প্রকরণ এবং ভারতে প্রথম শনাক্ত দুটি প্রকরণ বি.১.৬১৭.১ বা কাপ্পা ও বি.১.৬১৭.২ বা ডেল্টা ছিল উল্লেখযোগ্য (আর হক : যুগান্তর, এপ্রিল ৫, ২০২১)।

এ প্রকরণগুলোর মধ্যে কিছু কিছু প্রকরণের অধিক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা, অধিকতর গুরুতর রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা এবং টিকার কার্যকারিতা হ্রাস করার ক্ষমতা থাকার কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। সেই কারণে উপরোল্লিখিত সব বৈশিষ্ট্যসংবলিত ডেল্টা প্রকরণকে সব থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রকরণ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।

সম্প্রতি বতসোয়ানা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত করোনাভাইরাসের আরও একটি নতুন প্রকরণ বিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্য কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে; কারণ ভাইরাসের এ জাতটির আরএনএ জিনোমে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চসংখ্যক পরিব্যাপ্তি ঘটেছে, যার কারণে ভাইরাসটিকে আরও সংক্রমণযোগ্য করে তুলেছে এবং বিদ্যমান ভ্যাকসিনগুলোর জন্য কম সংবেদনশীল করার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

ভাইরাসের এ প্রকরণটির প্যাঙ্গো বংশনাম বি.১.১.৫২৯। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে একটি উদ্বেগজনক প্রকরণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং গ্রিক বর্ণ ‘ওমিক্রন’ অনুযায়ী এটির নামকরণ করেছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ এখন পর্যন্ত ২৪টি দেশে ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ওমিক্রন শনাক্ত হওয়ার খবর এখনো জানা যায়নি, তবে এটি কেবল সময়ের ব্যাপার।

স্পাইক প্রোটিনের গুরুত্ব : সার্স-কোভি-২ ভাইরাস তার ‘আরএনএ জিনোম (RNA genome)’-এর তথ্য (code) অনুযায়ী, সর্বসাকুল্যে ৩০-৩২টি প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম; যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি অ্যান্টিজেন প্রোটিন হচ্ছে স্পাইক (Spike)। করোনা সংক্রমণের জন্য মানবকোষের আবরণীপৃষ্ঠে (cell membrane) অবস্থিত ‘অ্যাঞ্জিওটেনসিন-রূপান্তরিত এনজাইম-২ (এসিই-২ বা ACE-2) রিসেপ্টর প্রোটিনের সঙ্গে স্পাইক প্রোটিনটির সংযুক্ত হওয়ার পরই ভাইরাসগুলো মানবকোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তাদের অসংখ্য প্রতিলিপি তৈরি করে, যা আমাদের ফুসফুসসহ দেহের অন্যান্য অঙ্গগুলোকে অকার্যকর করে দেয়।

এসিই-২’র সঙ্গে এ বন্ধন বাধ্যবাধকতাপূর্ণ বলেই আমাদের দেহে যেসব অঙ্গে বা কোষগুলোতে এসিই-২ প্রোটিন বিদ্যমান নয়, সেসব কোষগুলোর ভেতর কোরোনাভাইরাস প্রবেশ করার কোনো সুযোগ থাকে না। সংক্রমণশীল স্পাইক প্রোটিনের যে অংশটুকু সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো-‘রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন’ (RBD : আরবিডি); অর্থাৎ পুরো স্পাইক প্রোটিনের পরিবর্তে কেবল ‘আরবিডি’ এসিই-২ রিসেপ্টর প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পুরো ভাইরাসকে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়। রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন ২০০টি অ্যামিনো অ্যাসিড নিয়ে গঠিত।

ওমিক্রন কেন এত উদ্বেগপূর্ণ : অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করছেন, ওমিক্রনের অস্বাভাবিক পরিব্যাপ্তি বা মিউটেশনের কারণে করোনার অন্যান্য প্রকরণের তুলনায় ওমিক্রন ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে, যার ভয়াবহতা অনেকে অ্যাপোক্যালিপ্স বা মহাপ্রলয়ের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। ওমিক্রন প্রকরণটির ‘আরএনএ’ জিনোমে পঞ্চাশটিরও অধিক বংশানুগত পরিব্যাপ্তি ঘটেছে, যার মধ্যে কয়েকটি বেশ উদ্বেগপূর্ণ।

তাছাড়া অনেক পরিব্যাপ্তি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ডেল্টাসহ অন্যান্য প্রকরণগুলোর সঙ্গেও সাদৃশ্য নেই। এগুলোর মধ্যে বত্রিশটি পরিব্যাপ্তি স্বয়ং ‘স্পাইক’ প্রোটিনের মধ্যেই ঘটেছে [Callaway E, Nature, Vol 600 Dec 2 2021); যে প্রোটিনটি এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত করোনাভাইরাস রোগের বিভিন্ন টিকার মূল লক্ষ্যবস্তু। তুলনামূলকভাবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের স্পাইক প্রোটিনে পরিব্যাপ্তির সংখ্যা হলো ১৮টি। এ ছাড়া স্পাইক প্রোটিনের যে অংশটুকু অর্থাৎ ‘RBD’ মানবকোষের অভ্যন্তরে করোনা প্রবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেই অঞ্চলটিতে ওমিক্রনের ১৫টি পরিব্যাপ্তির উপস্থিতি আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অতিরিক্তভাবে প্রকরণটির ‘ফুরিন ক্লিভেজ সাইটে (Furin Cleavage site) তিনটি পরিব্যাপ্তি থাকার কারণে করোনার সংক্রমকতা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। এরূপ পরিব্যাপ্তির উপস্থিতির কারণে সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের ওমিক্রন প্রকরণটির সংবহনযোগ্যতা, অনাক্রম্যতন্ত্র (immune system)কে এড়ানোর ক্ষমতা এবং টিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি কিনা, সে ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী এক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রকরণটিকে আগ্রহজনক প্রকারণের পরিবর্তে দ্রুত উদ্বেগজনক প্রকরণ হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)।

ডেল্টা বনাম ওমিক্রন : স্পাইক প্রোটিনে করোনাভাইরাসের ডেল্টা প্রকরণে পরিব্যাপ্তির সংখ্যা হলো ১৮টি। সে তুলনায় ওমিক্রন স্পাইক প্রোটিনে ৩২টি পরিব্যাপ্তি শনাক্ত হয়েছে (ইতালিয়ান এক বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন, সেখানে ৪৩টি পরিব্যাপ্তি রয়েছে)। করোনাভাইরাসের মতো সংক্রামক একটি ভাইরাস, যা বিশ্বব্যাপী ইতোমধ্যে বায়ান্ন লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে; সেখানে যদি আবার কোনো নতুন প্রকরণ ডেল্টার চেয়েও বেশি সংক্রমণযোগ্য হয়, তাহলে তা মহামারি থেকে পুনরুদ্ধারের পথ জটিল করে তুলবে।

এরই মধ্যে আমরা ডেল্টা প্রকরণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছি। এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের খতিয়ানে শীর্ষে ডেল্টা (আর হক: যুগান্তর, আগস্ট ২৩, ২০২১)। প্রায় ৯০ শতাংশ কোভিড-১৯ রোগী এ ডেল্টা প্রকরণ দ্বারাই আক্রান্ত। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন, ‘ওমিক্রন’ কি ডেল্টার ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে যাবে এবং এ ওমিক্রন আতঙ্ক ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ওমিক্রনের ভয়াবহতা নিয়ে এখনই কিছু বলার সময় আসেনি; কারণ এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণার ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।

ওমিক্রনের জটিল সব পরিব্যাপ্তি স্পাইক প্রোটিনের ‘রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেন’ এবং ‘এন-টার্মিনাল ডোমেনে (N-terminal domain)’ রয়েছে, যা এসিই-২-বন্ধন এবং অ্যান্টিবডিকে পাশ কাটাতে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস স্পাইক প্রোটিনে ‘ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট (Furin cleavage site)’ নামে একটি অঞ্চল বিদ্যমান, যা মানবকোষের ‘ফিউরিন’ এনজাইম দ্বারা স্পাইক প্রোটিনকে অনুকূল আকারে দুটি সেগমেন্টে (S1 I S2) বিভাজন করতে সাহায্য করে। এ বিচ্ছিন্নতার ফলেই সংক্রমণের হার বহুগুণ বেড়ে যায়।

ওমিক্রনের ‘S1-S2’ ফিউরিন ক্লিভেজ সাইটে ঘটে যাওয়া তিনটি পরিব্যাপ্তি (H655Y, N679K, P681H) বর্ধিত সংক্রমণের সঙ্গে সম্পৃক্ত (Yu et al, bioRxiv, August 4, 2021)। ‘E484A’ পরিব্যাপ্তি থাকার ফলে ভাইরাসটি খুব সহজেই দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অতিক্রম করতে পারে (Wise J, BMJ 372, 2021)। অধিকন্তু ওমিক্রনে ‘E484K’ পরিব্যপ্তি (যা ডেল্টাতে দেখা যায় না) মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে বলে এ ভ্যারিয়েন্টটি এত উদ্বেগজনক।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, Q498R এবং N501Y মিউটেশনের সংমিশ্রণ (যা ওমিক্রনে রয়েছে) উল্লেখযোগ্যভাবে এসিই-২ এর সঙ্গে বন্ধনকে বহুলাংশে বাড়িয়ে তোলে (Zahradnik et al., nature microbiology, 6, 2021)।

ওমিক্রন প্রতিরোধ এবং টিকার কার্যকারিতা : বর্তমানে ওমিক্রন প্রতিরোধে বিশেষ কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন নেই। যেসব করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা বর্তমানে প্রচলিত, সেগুলো উহান সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের (Wuhan-Hu-1) স্পাইক প্রোটিনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফাইজার-বায়োএনটেক ও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং মডার্নার টিকা হচ্ছে ‘এমআরএনএ (সজঘঅ)’ভিত্তিক।

ফাইজার ও মডার্না উভয়ই জানিয়েছে, তারা ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে টিকা কার্যকর করার কাজ করছে এবং ওমিক্রন প্রতিরোধে বিশেষায়িত একটি টিকা আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে তৈরি হবে; যদিও তাদের বর্তমান টিকা ওমিক্রন নিধনে অনেকটা নির্ভরযোগ্য। যারা ডেল্টা প্রকরণ প্রতিরোধে দুই ডোজের অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার/মডার্নার টিকা নিয়েছেন, তারা আবারও ওমিক্রনে সংক্রামিত হতে পারেন। তবে সেটি হয়তো হবে ‘ব্যুহভেদী সংক্রমণ (breakthrough infection)’।

দুই ডোজের টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেহে ব্যূহভেদী সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক সংক্রমণের তুলনায় লক্ষণ-উপসর্গগুলো মৃদু প্রকৃতির হয়। এ ছাড়া ভাইরাস নিরোধক মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি আলফা, বেটা, গামা এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে নিষ্ক্রিয় ও প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রিজেনেরন কোম্পানি বলেছে, তাদের কোভিড মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কম কার্যকর হতে পারে; ফলে ওমিক্রন প্রকরণটি আক্রমণাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তারা উপযুক্ত মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি নির্মাণের ইঙ্গিত দিয়েছে।

অপরদিকে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি মার্কের ভাইরাস-নিরোধক পিল ‘মলনুপিরাভির’ এবং ফাইজারের ‘প্যাক্সলোভিড’ ওমিক্রনের সংক্রমণ হ্রাস করতে অত্যন্ত কার্যকর ওষুধ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।

মলনুপিরাভির/প্যাক্সলোভিড দেহের অ্যান্টিবডিকে নিষ্ক্রিয় করার পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে ভাইরাসের আরএনএ প্রতিলিপিকে অকার্যকর করার মাধ্যমে তার প্রজননকে বাধা দেয়। বেক্সিমকোসহ কয়েকটি কোম্পানির মাধ্যমে মলনুপিরাভির বাংলাদেশেও বাজারজাত হয়েছে।

সংক্ষেপে, বতসোয়ানা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া নতুন ওমিক্রন রূপের SARS-CoV-2 ভাইরাসটি নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করার পর থেকে সবেমাত্র এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছে। প্রকরণটি ২৪টিরও বেশি দেশে নিশ্চিত হয়েছে এবং এটির সংক্রমণের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তাছাড়া করোনার ডেল্টা ও বেটা প্রকরণের তুলনায় ওমিক্রনের পুনরায় সংক্রমিত করার ক্ষমতা তিনগুণ বেশি।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা ওমিক্রনের রয়েছে (Callaway and Ledford, Dec 2, 2021)। ওমিক্রনের সংক্রমণযোগ্যতা ও তীব্রতা, সেই সঙ্গে ভ্যাকসিন এড়াতে এবং পুনরায় সংক্রমণ ঘটাতে এর সম্ভাব্যতা সম্পর্কে ধারণা পেতে বিজ্ঞানীদের আরও গবেষণার প্রয়োজন।

নিউইয়র্ক সিটির রকফেলার ইউনিভার্সিটির একজন ভাইরোলজিস্ট পল বিনিয়াস (Paul Bieniasy)-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক গবেষণাগারে স্পাইক প্রোটিনের একটি ‘পরিবর্তিত সংস্করণ’ তৈরি করেছিলেন, যার মিউটেশনগুলো ওমিক্রনের সঙ্গে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ। তাদের পরীক্ষায় সেই ‘পলিমিউট্যান্ট স্পাইক’ দুই ডোজে টিকা পাওয়ার বেশিরভাগ মানুষের দেহে তৈরি ‘পলিক্লোনাল অ্যান্টিবডি’কে নিষ্ক্রিয় করার প্রমাণ মিলেছে (Schmidt F et al, Nature 20 Sept, 2021)।

কাজেই ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনে প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া মিউটেশনগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারেই দেখা হচ্ছে। ওমিক্রনে সংক্রমণ এবং রোগের তীব্রতা বেড়ে বিশেষ করে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কম টিকা দেওয়া দেশগুলোতে ওমিক্রন প্রকরণটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতএব এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সংক্রমণে ওমিক্রন ডেল্টাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কিনা, সে বিষয়ে এখনো কিছু বলার সময় আসেনি; যদিও তা নিয়ে অনেকের মনে আশঙ্কা রয়েছে।

ড. রাশিদুল হক : সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী; সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র; অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন